বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ও ভবিষ্যত

বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ঘাটতি নিয়ে দেশীয় পত্রপত্রিকায় অনেক লেখা হয়। বিশেষত ভারতের ও চিনের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে অনেক লেখাই আসে, একইরকম ভাবে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি নিয়েও কিছু লেখা আসে। আমি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাণিজ্যের রেকর্ড নিয়ে কিছু পরিসংখ্যান নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলাম। একটা প্যাটার্ন স্পষ্ট চোখে পড়ে। বাংলাদেশ এশিয়ার দেশগুলোর সাথে ঘাটতি বাণিজ্য চালায়। আবার উল্টোদিকে উন্নত ইউরোপীয় দেশগুলো ও আমেরিকার সাথে বাণিজ্য-উদ্বৃত্ত থাকে। এর সাথে আছে সারা বিশ্ব থেকে পাঠানো শ্রমিকদের রেমিট্যান্স। এই সবে মিলে বাংলাদেশ আয়ের চেয়ে সামান্য কিছু কম ব্যয় করে। এই উদ্বৃত্ত বা কারেন্ট একাউন্ট সারপ্লাস বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার তহবিল মজবুত করে। এ ছাড়া আছে ক্যাপিটাল একাউন্ট – যেখানে জমা পড়ে বিদেশী বিনিয়োগের টাকা। বৈদেশিক মুদ্রা তহবিল (ক্যাপিটাল একাউন্ট ও কারেন্ট একাউন্ট সারপ্লাস) বাংলাদেশের মুদ্রার (টাকা) বিনিময়মূল্য নির্দিষ্ট রাখতেও সাহায্য করে। মোটের ওপর এভাবেই বাংলাদেশের অর্থনীতি চলছে।

আমি মূলত আলোচনা করব বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে। বাংলাদেশের পত্রিকায় এই বিশেষ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় অনেক। মূল বক্তব্য থাকে দেশ আমদানী-নির্ভর হবার সমস্যা, এর সাথে আসে কিছু রাজনৈতিক আলোচনা। পরিসংখ্যানগতভাবে খুব একটা গভীরে আলোচনা যায় না, তাই আমি কিছু পরিসংখ্যান প্রস্তুত করার চেষ্টা করি। আমি ২০০৯ সালে বাংলাদেশের ২৫ টি বৃহত্তম এশিয়ান বাণিজ্য পার্টনার নিয়ে কিছু চার্ট তৈরী করলাম। দেখা গেল – এর ২৩টি দেশের সাথেই বাংলাদেশের ঘাটতি বাণিজ্য চলে। উদ্বৃত্ত বাণিজ্য চলে শুধুমাত্র ইরান ও তাজিকিস্তানের সাথে। এর মধ্যে ক্রমাণ্বয়ে চিন, ভারত, সিঙ্গাপুর, জাপান, মালয়েশিয়া, হংকং ও দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে দুশো মিলিয়ন ডলারেরও বেশী বাণিজ্য ঘাটতি। ভারতের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি ১৭৮৪ মিলিয়ন ইউরো (আমদানী ১৯৭৪ মিলিয়ন , রপ্তানী ১৯০ মিলিয়ন) ও অপর প্রতিবেশী মায়ানমারের সাথে ঘাটতি ৪৫ মিলিয়ন ইউরোর (আমদানী ৫০ মিলিয়ন, রপ্তানী ৫ মিলিয়ন)। চিনের সাথে সর্বোচ্চ ঘাটতি ২৪৫১ মিলিয়ন ইউরোর (আমদানী ২৫২২ মিলিয়ন ও রপ্তানী ৭১ মিলিয়ন)। ১৫টি দেশের একটা চার্ট দিলাম –

auto

তবে এ থেকে পরিষ্কার বোঝা সম্ভব নয় কোন দেশের সাথে বাণিজ্য কতটা একমুখী (অর্থাৎ আমদানী-নির্ভর)। এজন্য আমি এই দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের মোট বাণিজ্য ও তাতে ঘাটতির অনুপাত হিসাব করলাম। এই হিসাবেও দেখা যায় অধিকাংশ এশিয়ান দেশের সাথেই বাংলাদেশের ঘাটতির অনুপাত ৫০% – এরও বেশী – অর্থাৎ ১০০ টাকা বাণিজ্য হলে ৫০ টাকা ঘাটতি। এরকম দেশের মধ্যে শিল্পোন্নত জাপান বা কোরিয়া যেমন আছে, উন্নয়নশীল ভারত-চিন-থাইল্যান্ড আছে তেমন স্বল্পোন্নত মায়ানমার বা নেপালও আছে। এদের সবার ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি অনুপাত ৫০ এরও বেশী, কার্যত নেপাল ছাড়া বাকিদের ক্ষেত্রে এই অনুপাত ৮০-র ও বেশী। আমি আমদানী নির্ভরতার একটা ইনডেক্স বানিয়ে তাতে দেশগুলোকে ক্রমাণ্বয়ে সাজালাম। সবার ওপরে আসে উজবেকিস্তান – যারা বাংলাদেশে ২৬৯ মিলিয়ন ইউরো মূল্যের রপ্তানী করেছেন, অথচ আমদানী করেছেন মাত্র ২ মিলিয়ন মূল্যের সামগ্রী। এর পরে একে একে আসে যথাক্রমে কুয়েত, চিন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, কাতার, তুর্কমেনিস্তান, ভারত, মায়ানমার ও জাপান।

auto

একটু গভীরে আলোচনা করি – তালিকার সবার ওপরে থাকা উজবেকিস্তানকে নিয়েই আলোচনা করা যাক। উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ মূলত তুলো কেনে বাংলাদেশের নিজস্ব টেক্সটাইল শিল্প চালানোর জন্য। উজবেকিস্তানে তুলো চাষ অনেক হলেও শ্রমিক তুলনায় কম – যা আছে বাংলাদেশে। তাই উজবেকিস্তান থেকে আমদানী করা কাঁচামাল যদি গারমেন্টস-এর আকারে পশ্চিমে যায় তাহলে দুই দেশেরই লাভ – যাকে বলে উইন-উইন সিচুয়েশন। সেইক্ষেত্রে বাংলাদেশ একতরফা বিশাল বাণিজ্য ঘাটতির সম্মুখীন হলেও এই কাঁচামাল আদপে বাংলাদেশের কাজে আসছে। তাই ঘাটতি বাণিজ্য সবসময় খারাপ নয়, যদি সেই ঘাটতি অন্য কোথাও রপ্তানী উদ্বৃত্তের কাজে আসে।

এই বাণিজ্য ঘাটতি কি চিন্তার বিষয়? আপাতত না। কারণ, মোটের ওপর বাংলাদেশের আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্য আছে। কিছু দেশের সাথে ঘাটতি বাড়লেও অন্য দেশের সাথে উদ্বৃত্ত বেড়ে সেই ঘাটতি পুষিয়ে যায়। তাছাড়া উজবেকিস্তানের ক্ষেত্রে যেমন দেখলাম, সেভাবে কাঁচামাল আমদানী বাড়লে সাময়িকভাবে কোনো কোনো দেশের সাথে একতরফা আমদানী-সম্পর্ক তৈরী হতেই পারে। এগুলোতে সমস্যা নেই। সহজভাবে ভাবলে এক ব্যক্তি অফিসে কাজ করে মাইনে পায় যা তার “বাণিজ্য-উদ্বৃত্ত”, আর সে যে যে দোকানে গিয়ে জিনিস কেনে তাদের সাথে তার “বাণিজ্য-ঘাটতি” – মোটের ওপর হিসাব নিয়ন্ত্রণে থাকলে চিন্তার কিছু থাকে না।

কিন্তু ভবিষ্যতের কথা মাথায় রাখলে চিন্তার কিছু কিছু কারণ আছে। প্রথমত, বাংলাদেশের রপ্তানী-বাণিজ্যের ৮০% এরও বেশী শুধুমাত্র টেক্সটাইল ও গারমেন্টস-কেন্দ্রিক। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ ইউরোপে প্রতিদ্বন্দীদের তুলনায় কিছুটা শুল্ক-সুবিধা পায় স্বল্পোন্নত দেশ হিসাবে। ভবিষ্যতে এই সুবিধা না থাকলে এই শিল্পের সমস্যা তৈরী হতে পারে। একইভাবে, কাঁচামালের যোগানে সমস্যা সৃষ্টি হলেও রপ্তানী মার খেতে পারে। তবে বিগত কিছু বছরের ট্রেন্ড থেকে মনে হয় না এরকম সমস্যা তৈরী হতে পারে।

দ্বিতীয়ত বিশ্ব-বাণিজ্যের ভরকেন্দ্র যে আস্তে আস্তে এশিয়ার দিকে সরে আসছে তা সব অর্থনীতিবিদেরাই বলছেন। এশিয়ার সাথে বাণিজ্য ঘাটতি কিছু কিছু উদ্বৃত্তে না পরিণত করতে পারলে ভবিষ্যতে সমস্যা হতে পারে – কারণ পশ্চিমের বাজার এশিয়ার মত অত দ্রুতহারে ক্রমবর্ধমান নয়। সেক্ষেত্রে বাণিজ্য ঘাটতি ক্রমাগত বেড়েই চলবে। এশিয়ার দেশগুলোতে পশ্চিমের মত শস্তাশ্রমের অভাব নেই, তাই শ্রমঘন শিল্প ছাড়াও অন্যান্য দক্ষতাভিত্তিক শিল্পখাতে উন্নতি করতে হবে।

তৃতীয়ত বাংলাদেশে রপ্তানীমুখী শিল্পের বিকাশ ঘটাতে হবে। সন্দেহ নেই এটা অত সহজে হবে না, কারণ বাংলাদেশে কাঁচামালের প্রাপ্যতার সমস্যা আছে। তাও পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ সিঙ্গাপুরে ৩৫ মিলিয়ন ইউরো, মালয়েশিয়ায় ২৫ মিলিয়ন ইউরো থাইল্যান্ডে ২৪ মিলিয়ন ইউরো এবং মায়ানমারে ৫ মিলিয়ন ইউরো মূল্যের সামগ্রী রপ্তানী করেছে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দূরত্বের নিরিখে এই চারটে দেশই বাংলাদেশের প্রতিবেশী-তুল্য। এবং এদের জিডিপি ও বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিমাণও যথেষ্ট বেশী। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের রপ্তানী-ব্যর্থতা চোখে পড়ার মত। একই ভাবে, সংযুক্ত আরব আমীরশাহী, কুয়েত ও কাতারে বাংলাদেশের রপ্তানীর পরিমাণ যথাক্রমে ৪১, ৫ ও ৪ মিলিয়ন ইউরো। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো তেল ও গ্যাস রপ্তানী করে প্রায় বাকি সবই আমদানী করে। আবার এই দেশগুলোতে প্রচুর সংখ্যায় বাংলাদেশী কর্মরত। তাই এখানেও বাংলাদেশের রপ্তানী-ব্যর্থতা চোখে পড়ে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার চারটি দেশে ভারতের রপ্তানী যথাক্রমে ৩৬৬৯, ১৭২৫, ১১২৮ ও ১৫০ মিলিয়ন ইউরো। আর মধ্যপ্রাচ্যের তিনটি দেশে রপ্তানী হল ১৪৭৬২, ৫১৪ ও ৪২৯ মিলিয়ন ইউরো। এশিয়া-মুখী বাণিজ্যে বাংলাদেশকে আরও দ্রুত রপ্তানী বাড়াতে হবে, এটাই বোঝা যায়।

রপ্তানীমুখী শিল্পের বিকাশের জন্য দেশে বিনিয়োগের দরকার। বিশ্বব্যাঙ্কের ঋণ দিয়ে কিছু পরিকাঠামো গড়া যায় বটে কিন্তু বৈদেশিক বিনিয়োগই এশিয়ার বিভিন্ন দেশগুলোকে উন্নতির পথে ঠেলেছে। এখানে সমস্যা হল রাজনৈতিক। বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য বেশী ঝুঁকি নিচ্ছে, তাই তারা বেশী সুযোগসুবিধা চাইবে – যা নিয়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরী হয়। অথচ শিল্পায়নে বিনিয়োগের বিকল্প নেই। দেশের আয়-উদ্বৃত্ত দিয়ে যদি পরিকাঠামো তৈরী হয় তাহলে টাকার বিনিময়মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প অবশ্যই ভাল – কিন্তু কয়েকটি সেক্টর ছাড়া (যেমন মাইনিং, এগ্রো-বেসড) পৃথিবীতে সফল রপ্তানীমুখী রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের উদাহরণ খুবই কম। তাছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প অধিকাংশ সময়েই একচেটিয়া বাণিজ্যের অধিকার পায় যার ফলে দ্রুত স্বজনপোষণ ও দুর্নীতির পীঠস্থান হয়ে ওঠে। এশিয়ার শিল্পোন্নত কিছু দেশ (জাপান, কোরিয়া) থেকে বিনিয়োগ আনতে পারলে ভাল ছাড়া খারাপ কিছু হয় না, বিনিয়োগকারীরা নিজেরাই লবি করে ওইসব দেশে বাংলাদেশের জন্য বাণিজ্য সুবিধা করে দেবে।

শেষের কথায় আসি। রপ্তানীমুখী শিল্পের দরকার আছে ঠিকই, কিন্তু সেখানেও একটা প্রশ্নচিহ্ণ রেখে দেওয়া ভাল। রপ্তানীমুখী শিল্পের মাধ্যমে উন্নয়নের সবথেকে ভাল মডেল হল চিন। কিন্তু দেশে শিল্প গড়তে গিয়ে দেশের মধ্যে যে পরিমাণ দূষণের সম্মুখীন হতে হয় তার উদাহরণও চিন থেকে পাওয়া যায়। একইভাবে ভারতে শিল্প গঠনে জমি অধিগ্রহণের সময় একাধিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা থেকে বোঝা যায় বাংলাদেশেও শিল্পের বিকাশ অতটা সহজে হবে না। শুধু তাই নয়, চিন যেমন জাতিসংঘে ও বিশ্ব-দরবারে নিজের প্রভাব খাটিয়ে অনুন্নত দেশগুলো থেকে কাঁচামাল আমদানী করে, সেটাও বাংলাদেশের পক্ষে অতটা সহজ না-ও হতে পারে। তাই শিল্প ছাড়াও সেবা বা সার্ভিসেস সেক্টরে জোর দেওয়া দরকার। সেবা-খাতে সুবিধা হল এখানে প্রবৃদ্ধির জন্য মেধা-সম্পদ ছাড়া আর কোনো কাঁচামালের প্রয়োজন পড়ে না, পরিবেশ দূষণের সম্ভাবনাও অনেক কম (একমাত্র ব্যবহৃত বিদ্যুতের জন্য যতটা)। এর পরে রেমিট্যান্স ও শ্রমিক-রপ্তানী। এই খাতে বাংলাদেশের বর্তমান সাফল্যও চোখে পড়ার মত। তবু, পরিসংখ্যানের কথায় বলি, ২০১০ সালের বাংলাদেশের শ্রমিক-পিছু রেমিট্যান্সের পরিমাণ ২০৮৪ ডলার যেটা ভারতের ক্ষেত্রে ৪৮৬৭ ডলার। তাই, শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়ানোর কাজে সরকারী উদ্যোগ চাই, যাতে একই সংখ্যক শ্রমিক আরো বেশী রেমিট্যান্স পাঠাতে পারে, সেই সাথে বেশী শ্রমিক পাঠাবার উদ্যোগও জারী রাখতে হবে। বাণিজ্যের ভবিষ্যত হল বিশ্বায়ন ও মুক্তবাণিজ্যের হাত ধরে – মুক্তবাণিজ্যের বিশ্বে সাফল্যের জন্য দক্ষতা ও পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই।

Advertisements

ট্যাগ সমুহঃ , ,

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s


%d bloggers like this: