Posts Tagged ‘এল্রিচ’

ফুরান্তিস বনাম অফুরান্তিস

ডিসেম্বর 25, 2012

পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে – এরকম প্রেডিকশন বোধহয় একমাত্র মায়া-সভ্যতার অবদান নয়। আদি-অনন্তকাল ধরেই ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় বিভিন্ন সভ্যতায় এই ভবিষ্যতবাণী ব্যবহার হয়ে আসছে। মানব-সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবার কথা আসে ঐ হাত ধরেই। তবে আজকাল বিজ্ঞানীরাও মাঝে মাঝে বলেন অমুক সালে অমুক জায়গায় দু’চারটে উল্কা পড়ে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। কিন্তু যখন একজন অর্থনীতিবিদ বা সমাজ-বিজ্ঞানী বলেন সভ্যতার শেষের কথা তখন তিনি ঠিক কি বোঝাতে চান?

পৃথিবীর সম্পদ সীমিত অথচ মানুষের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। এর ওপর ভিত্তি করে এক শ্রেণীর অর্থনীতিবিদ অনেকদিন ধরেই বলে আসছেন যে একটা সময় আসন্ন যখন অর্থনীতির “গ্রোথ” ঋণাত্ত্বক হয়ে যাবে – অর্থাৎ জীবনযাত্রার মান আর বাড়বে না। এই যেমন এখন চারদিকে নতুন নতুন বাড়ি-ব্রিজ-রাস্তা হচ্ছে – তেমনটা আর থাকবে না। আমি এই অর্থনীতিবিদদের দলটাকে নাম দিই ফুরান্তিস – মানে সবকিছু ফুরিয়ে যাবে, এরকমটাই তাদের মত।

অন্য আরেকটা দল আছে যাদের বক্তব্য মানব-সভ্যতার এই ক্রমোন্নতি অবশ্যম্ভাবী। স্বাভাবিক পৃথিবীতে মানুষ ঠিকই তার উন্নতির পথ খুঁজে নেবে। যদি কিছু ফুরিয়ে যায় তার বিকল্প বের করবে, বিকল্প দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়লে অন্য কোনো পথে সেই সামগ্রীর ব্যবহার বন্ধ করে দেবে, তাও আদম্য মানুষ ফিরে তাকাবে না। মানবসভ্যতার ইতিহাস থেকে আজ অবধি দেখলে এই কর্নুকোপিয়ানদের মতামতই সঠিক বলে মনে হয়। এদের নাম দিই অফুরান্তিস – মানে কিছুই ফুরাবার নয়, ভাবখানা এমন।

ফুরান্তিস দলের কর্ণধার হলেন ম্যালথাস। ম্যালথাস সেই ১৭৯৮ সালেই একটা মারাত্মক বই লিখে তখনকার সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাতে তিনি দেখিয়েছিলেন জনসংখ্যার বৃদ্ধির প্রবণতা এক্সপোনেন্সিয়াল অথচ খাদ্য ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের সরবরাহ কেবলমাত্র লিনিয়ার-গ্রোথ পেতে পারে। অর্থাৎ, কোনো সমৃদ্ধির সময়ে জনসংখ্যা কিছুদিন বাড়ার পরেই খাদ্যে ঘাটতি দেখা যাবে – সমৃদ্ধির সময়ের পরেই আসবে দুর্ভিক্ষ, বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধ আর মোটের ওপর ঋণাত্ত্বক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। ম্যালথাসের নাম থেকে এই বিশেষ সময়ের নাম দেওয়া হয় ম্যালথাসিয়ান ক্যাটাস্ট্রফি

ফুরান্তিসদের বিশেষ বাড়বাড়ন্ত শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে। এই সময়ে জন্মহার কমলেও মৃত্যুর হার তার থেকেও বেশী হারে কমে যাওয়ায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বাড়তে থাকে। পল এল্রিচ ও তার সহযোগী সিয়েরা ক্লাব ছিলেন এই দলের মানুষ। তার বইতে তিনি দাবী জানান যে সত্তরের দশকেই উন্নয়নশীল বিশ্ব দুর্ভিক্ষের পর দুর্ভিক্ষে উজার হয়ে যাবে , কারণ ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সাথে তাল মিলিয়ে সম্পদের জোগান দেওয়া ধরিত্রীর পক্ষে অসম্ভব। এই অবস্থার উন্নতির জন্য তিনি আবার কিছু নীতি-প্রবর্তনের দাবীও জানিয়েছিলেন। তবে বলাই বাহুল্য তার এইসব ভবিষ্যতবাণীর কোনোটাই ফলে নি। ২০০৯ সালে একটি সাক্ষাতকারে তাকে যখন প্রশ্ন করা হয়, উনি বলেন ওনার উদ্দেশ্য ছিল মানবজাতিকে সতর্ক করে দেওয়া এবং উনি তাতে সফল। বর্ধিত সতর্কতার কারণেই এই যাত্রায় প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করে সভ্যতা গণ-মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়ে গেছে।

তবে ফুরান্তিসদের মধ্যে সবথেকে স্টার হলেন ক্লাব অফ রোম। চার গবেষকের একটি দল ১৯৭২ সালে এম আই টি-র ল্যাবে পাঁচ প্যারামিটারের সিমুলেশন চালিয়ে দাবী জানান ২০১২-২০২০ সাল নাগাদ কোনো এক সময়ে আমাদের অর্থনৈতিক স্থিতি একটা এমন অবস্থায় পৌঁছবে যেখান থেকে আর বৃদ্ধি সম্ভব না। যে পাঁচটি প্যারামিটার এই ক্লাব অব রোম তাদের সিমুলেশনের জন্য ব্যবহার করেছিলেন সেগুলো হল – জনসংখ্যা, শিল্পায়ণ, দূষণ, খাদ্য উৎপাদন ও প্রাকৃতিক সম্পদের আহরণ মাত্রা। সিমুলেশনে দেখা যায় প্রাথমিকভাবে এই সব প্যারামিটারই ক্রমবর্ধমান কারণ একে অন্যের সাথে সম্পর্কিত। এইভাবে, একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় পৌঁছনর পরেই শুরু হয় ভাঙণ। ক্লাব অব রোম এই বিষয়ে প্রথম জনসমক্ষে প্রকাশ করেন লিমিটস-টু-গ্রোথ নামে একটি বইয়ে। । ২০০৩ সালে প্রকাশিত একটি আপডেটে দেখা যায় ১৯৭২-২০০২ অবধি এই পাঁচটি প্যারামিটারের পরিবর্তন হয়েছে ১৯৭২ সালে তাদের ভবিষ্যতবাণী যেমন হয়েছিল – ঠিক সেইভাবে। অর্থাৎ আমরা এগিয়ে যাচ্ছি হয়ত সেই ভাঙণের পথেই। তবে তারা এও যুক্ত করেন যে প্রযুক্তির অভূতপূর্ব বিকাশের ফলে তাদের সিমুলেশনে বর্ণিত ভাঙণ হয়ত আরেকটু দেরীতে (২১ শতকের শেষের দিকে) আসবে।

অনেক তো বললাম ফুরান্তিসদের কথা, এখন বলা যাক অফুরান্তিসদের কথা। আরবানা-শ্যাম্পেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জুলিয়ান সাইমন আবার বলেন যে জনসংখ্যাকে বোঝা হিসাবে দেখার ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভুল। বাড়তি জনসংখ্যা আদপে প্রযুক্তিগত উন্নয়নে সাহায্য করে। আর বাজার অর্থনীতি এমনভাবে চলে যাতে কোনো দামী জিনিসের বিকল্প সস্তা কিছু বের করতে পারলে দুয়ের দামই পড়ে যায়। ব্যাখ্যাটা অনেকটা এরকম –

“জনসংখ্যা ও আয়ের বৃদ্ধি সীমিত সময়ের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদের চাহিদা বৃদ্ধি করে দাম বাড়িয়ে দেয়। এই বাড়তি দাম ব্যবসায়ী আর আবিষ্কারকদের কাছে ইনসেন্টিভ হিসাবে কাজ করে। তারা সবাই সমাধান খোঁজার কাজে সময় ও অর্থ বিনিয়োগ করে। এদের অধিকাংশই ব্যর্থ হলেও, শেষমেষ কেউ না কেউ বিকল্প কিছু একটা বের করে ফেলে। দীর্ঘমেয়াদে বিকল্প আসায় দাম আবার আগের স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে যায়।” 

 

শেষ করার আগে এই সাইমন আর এল্রিচের একটা বিবাদের কথা না বলে পারছি না। এল্রিচের দাবী প্রাকৃতিক সম্পদের দাম বাড়তেই থাকবে, কারণ বর্ধিত জনসংখ্যার চাপ। সাইমনের বক্তব্য দাম বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে তা স্থিতিশীল হয়ে যাবে। এই নিয়ে ১৯৮০ সালে সাইমন আর এল্রিচ একটা বেটিং করেন। এল্রিচের পছন্দমত পাঁচটি খনিজ দ্রব্যের (ক্রোমিয়াম, কপার, নিকেল, টিন ও টাংস্টেন) দাম দশ বছর পরে কত দাঁড়ায় তা দেখা হবে। এই দশ বছরে যদি দাম বেড়ে যায় তাহলে সাইমন এল্রিচকে বর্ধিত দামের সমানুপাতে “ক্ষতিপূরণ” দেবেন। উলটো হলে এল্রিচ দেবেন সাইমনকে। দশকের শেষে দেখা গেল সবাইকে অবাক করে শেষ হাসি হেসেছেন সাইমন, উনি পকেটস্থ করলেন ৫৭৬ ডলার। ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ এর মধ্যে পৃথিবীর জনসংখ্যা বেড়েছিল ৮০০ মিলিয়ন। অথচ পাঁচটি অবশ্য প্রয়োজনীয় খনিজের দাম গড়ে বাড়ল না। পাঁচটির প্রত্যেকটিই দামে কমে গেল। এবং সাইমনের কথাই সত্যি হল। ১৯৮০ সালে বসে যে কেউ হয়ত বলে দিতে পারত কপারের দাম এক দশক পরে বেড়ে যাবে, কারণ তখন কমিউনিকেশন নেট-ওয়ার্কের জন্য অবশ্য-প্রয়োজনীয় ছিল কপার। কিন্তু সেই দশকের মাঝে একবার অপটিক ফাইবার নেটওয়ার্ক বাজারে চলে আসার পরে আর কপারের প্রয়োজনীয়তা আগের মত রইল না। বাজারের চাহিদার সাথে দামও ঝটপট পড়ে গেল।

জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিষয়ক প্যানেলের মতে ২১ শতকে জনসংখ্যা “পিক” করবে, অর্থাৎ পরের শতাব্দীতে জনসংখ্যা কমতে থাকবে। তাছাড়া জনসংখ্যাকে এখন আর কেউ সেরকমভাবে “থ্রেট” বলে মনে করে না। এখন যখন খবরে মাঝে মাঝে পড়ি খনিজ তেল অর্থাৎ পেট্রোলিয়াম আর কত বছর পরে ফুরিয়ে যাবে তখন মনে হয় আমি কি জীবদ্দশায় পেট্রোলিয়াম-উত্তর যুগ দেখে যেতে পারব? ফুরান্তিস না অফুরান্তিস – কে হবেন জয়ী? খেয়াল রাখুন, ফুরান্তিসদের কিন্তু একবার জয়ই যথেষ্ট আর অন্যদিকে অফুরান্তিসদের জয়ী হতে হবে বারে বারে, মানবসভ্যতার উন্নয়নের পতাকা তুলে রাখতে।

Advertisements