Posts Tagged ‘উপনিবেশ’

অ্যাডাম স্মিথের দৃষ্টিতে উপনিবেশ-অর্থনীতি

ডিসেম্বর 25, 2012

ঔপনিবেশিকতা নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে দেখলাম বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথের বই দ্য ওয়েলথ অব নেশনশে (১৭৭৬) ঔপনিবেশিকতা ও তার অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা আছে। অ্যাডাম স্মিথের লেখা বইটিকে আধুনিক অর্থনীতির জনক বলা যায়। বইতে কলো্নী সংক্রান্ত অর্থনীতি নিয়ে আলোচনার সময় মাথায় রাখা দরকার যে অ্যাডাম স্মিথ ঔপনিবেশিকতার তীব্র বিরোধী ছিলেন। কিন্তু তার বিরোধিতা মানবিকতা বা অধিকারের প্রশ্নে নয়, নিতান্তই অর্থনীতির প্রশ্নে। যদিও তার বইতে তিনি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীকে বরাবর দায়ী করেছেন বাংলার দুরাবস্থার জন্য, কিন্তু তার অর্থনীতির ফোকাস থেকে সরে যান নি। তিনি বইতে দেখানোর চেষ্টা করেছেন ঔপনিবেশিকের জন্যও কলোনী-ব্যবস্থা লাভজনক নয় ও দীর্ঘমেয়াদে যে দেশগুলো ঔপনিবেশিক হবে না, তারা অন্যেদের থেকে অর্থনৈতিকভাবে অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে।

উপনিবেশের সাথে ইউরোপের ব্যবসা দু’ভাবে দেখছেন স্মিথ। প্রথমটা শুধুমাত্র ব্যবসার সম্পর্ক – যাতে ইউরোপীয়রা লাভ করছে। বর্তমান উপনিবেশেরা কেউই খুব একটা শিল্পোন্নত নয়, তাই সেই দেশগুলো থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করা ও শিল্পজাত পণ্য বিক্রি করার কাজটা ইউরোপীয়রা ভাল-ভাবেই করছে। এই ব্যবসায় লাভ এতটাই হচ্ছে যে তার ফলে মুদ্রার অপর পিঠ দেখা হচ্ছে না। মুদ্রার অপর পিঠ ক্ষতিকর – সেটা হল একচেটিয়া বাণিজ্য। একচেটিয়া বাণিজ্য ঔপনিবেশিকের জন্য ক্ষতিকর। কারণ কি?

স্মিথের মতে ঔপনিবেশিকেরা একে অপরের সাথে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এই একচেটিয়া বাণিজ্যের সুবিধাটুকু হারিয়ে ফেলে। ইংল্যন্ডের পক্ষে তুলো আনা সহজ বলে ইংল্যান্ড টেক্সটাইলের ক্ষেত্রে বেশী দাম চাইতে যেমন পারে, তেমন ইন্দোনেশিয়ার মালিক ডাচেরা মশলার জন্য বেশী দাম চাইছে। উভয়ের কারও সকল সম্পত্তির ওপর যেহেতু অধিকার নেই, তাই স্থানীয় ভোগের ক্ষেত্রে ছাড়া ইউরোপে রপ্তানীর ক্ষেত্রে লাভ-লোকসান মোটের ওপর শূন্যে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। এ তো গেল প্রথম সমস্যা। এর পরের সমস্যা হল শিফট অব ক্যাপিটাল বা মূলধনের সরণ। স্মিথের মতে মূলধনের স্বভাবই হল কম লাভজনক ব্যবসা থেকে সরে বেশী লাভজনক ব্যবসায় চলে যাওয়া। ঔপনিবেশিকের ঘরোয়া বাজারের মূলধন ইউরোপীয় বাণিজ্য থেকে সরে কলোনী বাণিজ্যে চলে যাবে – যা দীর্ঘমেয়াদে দেশকে ইউরোপীয় বাণিজ্যে দুর্বল করে দেবে। যদি ভবিষ্যতে কখনো কলোনী-বাণিজ্য অনিশ্চিত হয়ে পড়ে তাহলে ঔপনিবেশিকের অনেক পরিশ্রম করে গড়ে তোলা কলোনী বাণিজ্য থেকে মূলধন আবার সরিয়ে আনা শক্ত হবে। এই একচেটিয়া বাণিজ্য বিষয়ে স্মিথের একটা পর্যবেক্ষণ ও একটা ভবিষ্যতবাণীর উল্লেখ না করে পারছি না। স্মিথের মতে ইউরোপে নৌশক্তি ও ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে অগ্রণী ছিল স্পেন ও পর্তুগাল। সেইমত তারাই প্রথম কলোনী-বাণিজ্যে নামে। কিন্তু স্মিথের মতে, দক্ষিণ আমেরিকাকে কলোনী বানাবার পরে এই দুই দেশের বাণিজ্য এদের উপনিবেশের পথ ধরে মূলত কৃষিভিত্তিক হয়ে পড়ে। তাই ধীরে ধীরে তাদের ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প মার খাবে ও ফলশ্রুতিতে নৌশক্তিও দুর্বল হয়ে পড়বে। অন্যদিকে গরিব ডেনমার্ক (তৎকালীন ডেনমার্ক ও নরওয়ে) বা সুইডেন (বর্তমানের সুইডেন ও ফিনল্যান্ড) – যাদের অর্থনীতি বাকিদের তুলনায় দুর্বল বা জার্মানী – যার নৌশক্তি সীমিত – তারা তাদের মূলধনের সর্বোত্তম ব্যবহারে (ইউরোপমুখী বাণিজ্য) মনোযোগ দেবে ও কখনও কলোনী বাণিজ্য বিপন্ন হলে এরা ঔপনিবেশিকদের তুলনায় অনেক দ্রুত উন্নতি করবে।

আমি ১৮৭০ সালে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মাথাপিছু গড় আয়ের সাথে বর্তমানের বিভিন্ন দেশের গড় আয়ের একটা তুলনা দিলাম। তালিকা (ব্র্যাকেটে র‌্যাঙ্ক) থেকে স্পষ্ট, স্পেন ও পর্তুগাল তাদের প্রাথমিক ঔপনিবেশিক সুবিধা হারিয়েছে সেই উনিশ শতকের গোড়ায় লাতিন আমেরিকার ওপর থেকে দখল উঠে যাওয়ায়। ব্রিটেন, ফ্রান্স ও হল্যান্ড আছে মাঝে আর ওপরে আছে সুইডেন, নরওয়ে ও ডেনমার্ক – ঠিক যেমনটা বলেছিলেন স্মিথ। জার্মানীর ক্ষেত্রে বিষয়টা ততটা খাটে নি, হয়ত পূর্ব-জার্মানীর কারণে। ১৭৭৬ সালে বসে উপনিবেশ-উত্তর পৃথিবীর অর্থনীতি সম্পর্কে ভবিষ্যতবাণী করার মত একটা শক্ত পরীক্ষায় স্মিথ উত্তীর্ণ। আগের লেখায় আমি দেখিয়েছিলাম উপনিবেশ-উত্তর যুগে উপনিবেশগুলোর তুলনায় ঔপনিবেশিকেরা অনেক দ্রুত উন্নতি করেছে। আসলে, যারা উপনিবেশ-ব্যবসায় নামে নি অথচ মুক্ত-বাণিজ্যে নাম লিখিয়েছে, তারা আরও তাড়াতাড়ি উন্নতি করেছে।

ব্রিটেন – ৩১৯০(১), ৩৭৭৮০(৭)
স্পেন – ১২০৭(৭), ৩০৯০০(৮)
পর্তুগাল – ৯৭৫(৯), ২১২৫০(৯)
ডেনমার্ক – ২০০৩(৩), ৬০৩৯০(২)
নরওয়ে – ১৩৬০(৬), ৮৮৮৯০(১)
সুইডেন – ১৬৬২(৫), ৫৩২৩০(৩)
নেদারল্যান্ডস – ২৭৫৭(২), ৪৯৭৩০(৪)
ফিনল্যান্ড – ১১৪০(৮), ৪৮৪২০(৫)
জার্মানী – ১৮৩৯(৪), ৪৩৯৮০(৬)

তবে এ সব সত্ত্বেও স্মিথ বলেছেন, একচেটিয়া বাণিজ্যের ফলে আপেক্ষিক ক্ষতির তুলনায় হয়ত বর্তমান কলোনী-বাণিজ্য বস্তুটা বেশী লাভজনক। কিন্তু আসল লোকসান অন্যখানে। এই একচেটিয়া বাণিজ্য চালিয়ে যেতে গেলে যে সামরিক শক্তিতে যে পরিমাণ বিনিয়োগ করতে হয় সেই খরচা একচেটিয়া বাণিজ্য থেকে আসা লাভের তুলনায় অনেক বেশী। ১৭৩৯ সালে শুরু হওয়া ইঙ্গ-স্প্যানিশ যুদ্ধের উদাহরণ টেনে বলেছেন – এটা যেন গুপ্তধনের সন্ধান পাওয়া দুইদল দস্যুর লড়াই। লড়াই শেষে উভয়েই ভাগ-বাঁটোয়ারায় সম্মত হল বটে – কিন্তু ততক্ষণে তাদের অনেক শক্তিক্ষয় হয়েই গেছে। মুক্ত-বাণিজ্যের পরিবর্তে একচেটিয়া বাণিজ্যে যে বাড়তি লাভ হচ্ছে তার থেকে অনেক বেশীই ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে সাম্রাজ্য বজায় রাখতে। এরপরে উপনিবেশগুলো চিরকাল ঔপনিবেশিক শাসন মেনে নেবে এমনটা ভাবারও কোনো কারণ নেই, তাদের স্বাধীনতা ঘোষণার সাথেই ঔপনিবেশিকদের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হবে। শুধু এখানেই শেষ না, এই বাড়তি সামরিক শক্তি ও সাম্রাজ্য বজায় রাখতে যে দক্ষ মানব-সম্পদ ব্যবহার হচ্ছে তারা অন্য কোনো অধিকতর উৎপাদনশীল খাতে (স্মিথের মতে ম্যানুফ্যাকচারিং) সময় বিনিয়োগ করতে পারত। সবশেষে, একচেটিয়া বাণিজ্য ও তার নিমিত্ত সামরিক শক্তি – এই দুই খাতে বেশী মনোযোগী হওয়ায় সরকারের পক্ষে নাগরিকদের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার দিকে নজর দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না। লবি অব শপ-কিপার্স কার্যত সরকার চালাচ্ছে – দেশের অন্যান্য শ্রেণীর মানুষ সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

ঔপনিবেশিকতার ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরার পরেও স্মিথের ব্যাখ্যা থেমে থাকে নি। ইংল্যান্ড কি তাহলে উপনিবেশগুলোকে স্বাধীন করে দেবে? স্মিথ বলেছেন – ব্যাপারটা অত সহজ না। কার্যত এটাই আদর্শ হলেও ইতিহাসে কোনো দেশই স্বেচ্ছায় কোনো দেশই সূচ্যাগ্র মেদিনীও ছেড়ে দেয় নি, তার জন্য যত ক্ষতি বা কষ্টই স্বীকার করতে হোক না কেন। কারণ এই বিষয়টা দেশের গৌরবের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত আছে, আর সাধারণ মানুষ চাইলেও দেশের শাসক শ্রেণীর কাছে দেশের গৌরব বিষয়টার মূল্য অপরিসীম। আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধিতেও বুঝেছি যে সাম্রাজ্যবাদের মূলকথা আসলে এইখানেই। নিজের অধীনস্থ মানুষ বা অঞ্চলের পরিমাপের মাধ্যমে মানুষের শূন্য আত্মগৌরবের জন্ম, যা বিবর্তনীয় ইতিহাসের পথে অন্যান্য জীবের মধ্যেও পরিলক্ষিত হয়। এর সন্ধানেই সাম্রাজ্যবাদের পেছনে ছোটে দেশ, শাসক বা রাষ্ট্র – তাতে দেশের লাভ হতে পারে, লোকসানও হতে পারে।

মুক্তবাণিজ্যের সমর্থক স্মিথ এরপরে বর্ণনা দিয়েছেন কি ভাবে উপনিবেশের সাথে সুসম্পর্ক রেখে শুধু মুক্ত-বাণিজ্য চালানোই দেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত। ট্যাক্স-অনুপাতে ভোটাধিকার দিয়ে একটা আন্তর্জাতিক পার্লামেন্ট তৈরীর প্রস্তাবও আছে। সবেমিলে, স্মিথের লেখায় আমি এমন অনেক সামগ্রী পেলাম যা ১৭৭৬ সালে লেখা কোনো বইতে পাব বলে ভেবে দেখিনি। আগ্রহী পাঠকেরা বইটার ফ্রি-পিডিএফ ভার্সান, সংক্ষেপিত যে কোনো ভার্সান বা ওই সংক্রান্ত আর্টিকেল পড়ে দেখতে পারেন। অর্থনীতি নিয়ে বিন্দুমাত্র আগ্রহ থাকলে বলেই দিতে পারি – হতাশ হবেন না।

পড়ে দেখতে পারেন –
১) বইটার পিডিএফ
২) সাম্রাজ্যবাদ দিয়ে লেখার সংক্ষেপ
৩) ইউরোপের কিছু দেশের মাথাপিছু আয়ের গুগল-চার্ট

উপনিবেশের পরে

ডিসেম্বর 25, 2012

দেশ থেকে বাইরে কাটিয়ে দিলাম দীর্ঘ সাড়ে চার বছর। মাঝে দেশে গেছি বার-দুয়েক। দেশেও উন্নতি হচ্ছে, বড় বড় বিল্ডিং হচ্ছে, চাকরি হচ্ছে রাস্তাঘাট হচ্ছে – দিনে দিনে দিন-বদলের ছোঁয়া দেখা যায়। ধানক্ষেত জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে হাউসিং ডেভেলপমেন্ট জোনের জন্য। কিছু পরিবর্তন আমেরিকাতেও হচ্ছে। মন্দার পরবর্তী রাস্তাঘাট মেরামতের কাজ এখন কমে আসছে, যত মন্দা কাটছে ততই বোঝা যাচ্ছে মন্দার পরবর্তী রিকভারি হয়ত তত চাকরি আনবে না বাজারে। হাউসিং বাবল বার্স্ট করার পরে দাম আবার বাড়া শুরু হয়েছে বটে কিন্তু বাবলের সময়ের দামের কাছাকাছি পর্যায়ে যেতেও এখনও অন্তত বছর পাঁচেক বাকি। তাও তফাৎ চোখে পড়ে। প্রথম বিশ্ব আর তৃতীয় বিশ্ব নামগুলো ঠিক কে কিভাবে দিয়েছিল জানি না, দেশে গেলেই দুই বিশ্বের তফাতের কথা ভালভাবে বোঝা যায়। একটা বছর তিনেকের শিশু দুয়েক দিনেই হয়ত বুঝে যায় পার্থক্যটা।

ছোটবেলায় ইতিহাস-সাহিত্য বা সমাজ-বিজ্ঞানের ক্লাসে একটা ব্যাপার আমাদের মাথায় খুব ভালভাবে গেঁথে দেবার একটা চেষ্টা করা হয়েছে। আমাদের, মানে যারা একদা উপনিবেশ ছিলাম, সেই দেশগুলোর স্বাধীনতার সময় থেকেই এই বিষয়ে সকলে একমত – অন্যের উপনিবেশে পরিণত না হলে হয়ত আমরাও এমন উন্নত দেশই হতাম। ইতিহাসে পড়েছি, ইউরোপিয়ান ঔপনিবেশিকদের আসার আগে আমরা যথেষ্ট ধনীই ছিলাম – ইউরোপীয়রা দেশে আসার জন্য ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্র পার হত। শ’-দুয়েক বছরের ঔপনিবেশিক ইতিহাস সব বদলে দিয়ে গেছে। উপনিবেশকালে আমাদের দেশগুলো থেকে কাঁচামাল নিয়ে গিয়ে ইউরোপে শিল্প-কারখানায় ব্যবহার করা হত, আমাদের ন্যায্য মূল্য দেওয়া হত না। আমাদের গর্বের ক্ষুদ্র-কুটীর শিল্প ধ্বংস হয়ে গেছে উপনিবেশ অবস্থায়, দেশের বাজার ছেয়ে গেছে বিদেশী পণ্য-সামগ্রীতে। ঔপনিবেশিক প্রভুদের কৃষি বা কৃষকের বিষয়ে গুরুত্ব ছিল না – তাই আমাদের একের পর এক দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে স্বাধীনতার পরে আমরা দ্রুত উন্নতি করা শুরু করি। খাদ্য-বিষয়ক নিরাপত্তা এসেছে, স্বাস্থ্য-শিক্ষা সবকিছুতেই ভুরিভুরি উন্নয়নের নিদর্শন আসে স্বাধীনতার পরে। আসলে জাতি হিসাবে আমরা উন্নতই, পুরোনো ট্র্যাকে ফিরে যেতে কিছু সময় লাগছে আর কি। এমনকি অমর্ত্য সেনের লেখা পড়েও সেইরকম মনে হয়।

ইতিহাস মিথ্যা বলে। ইতিহাস বইতে ইচ্ছামত লিখে পাবলিশ করে দেওয়া যায়। কিন্তু পরিসংখ্যান মিথ্যা বলে না। তাই আমি পরিসংখ্যান দিয়েই দেখার চেষ্টা করলাম সত্যি কি ঘটেছে উপনিবেশ আর ঔপনিবেশিকদের মধ্যে। সহজ সূত্রে যদি ধরেই নেওয়া যায় যে উপনিবেশের কাঁচামালের পয়সায় ঔপনিবেশিকদের এত রমরমা, তাহলে ধরেই নেওয়া যায় যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যখন উপনিবেশগুলো এক-ধাক্কায় স্বাধীনতা পেয়ে গেল, তখন ঔপনিবেশিকদের সর্বনাশ আর উপনিবেশদের রমরমা।

কিন্তু এই গ্রাফ থেকে দেখি পুরো তার উল্টোটাই ঘটে চলেছে। মাথাপিছু গড় আয় – যা কিনা ব্যবহারিক জীবনে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের অন্যতম নির্ণায়ক, তা ঔপনিবেশিক দেশগুলোতে ঊর্ধ্বমুখী। ক্রমাগত মাটি ঘেঁষে চলার পরে এই শতকের পরে উপনিবেশগুলোতে কিছুটা হলেও গড় আয়ে কিছুটা উন্নতি দেখা যায়। দুইয়ের মধ্যে ব্যবধান বেড়েই চলেছে – এমনকি গত দশকেও এই ব্যবধান প্রায় দেড়গুণ বেড়েছে। যদিও আমরা অনেক আন্দোলনের মাধ্যমে ঔপনিবেশিকদের কাছ থেকে স্বাধীনতা আদায় করেছি, কিন্তু ব্যর্থতার গ্রাফ দেখে মনে হয় ওদেরই আমাদের স্বাধীনতা যেচে দিয়ে দেওয়া উচিত ছিল।

তাহলে এবার আসা যাক আসল প্রশ্নটাতে। কেন এই গ্যাপ? কেন বছরের পর বছর এই গ্যাপ বেড়েই চলেছে। প্রথম বিশ্ব কেন প্রথম থেকে যাচ্ছে আর তৃতীয় কেন আরো বেশী করে তৃতীয় থেকে যাচ্ছে? কবে থেকে এই তফাৎ কমবে? আমার কাছে কিছু কিছু ভাসা ভাসা উত্তর আছে – কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই। কিছু ধারণা করা যায় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী প্রথম বিশ্বের রাজনৈতিক পটভূমিকা থেকে। ইউরোপীয়দের কাছে আর উপনিবেশ নেই, তাই গত কয়েক দশকের উপনিবেশ নিয়ে যুদ্ধের বাতাবরণও নেই। জার্মানী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দ্রুত উন্নতি করে, কিন্তু এবারে আর তা নিয়ে বাকি দেশগুলোর সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হয় নি। সার্বিকভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর প্রথম বিশ্বে দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্কের বহুল উন্নতি ঘটে, আগের অর্ধশতকের বৈরিতার ইতিহাস মাথায় রাখলে তা অভাবনীয় ধরে নেওয়া যায়। এর কিছুটা কারণ ঠান্ডা যুদ্ধ – অন্যটা পুঁজীর বিকাশ। সম্পর্কোন্নয়ন যদি প্রথম কারণ হয়ে থাকে, দ্বিতীয় কারণ অবশ্যই অর্থনীতির ধারা। কাঁচামালের ওপর নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ায় প্রথম বিশ্বের অর্থনীতি আরো বেশী করে টার্শিয়ারী খাতে (সার্ভিস, ব্যাঙ্কিং, অটোমেশন, গাড়ি – ইত্যাদি সেক্টর) নির্ভর করতে থাকে, যার ভিত্তি হিসাবে তাদের শিক্ষাব্যবস্থা আর উদ্ভাবনী ক্ষমতার কথা মাথায় আসে।

অন্যদিকে প্রাক্তন উপনিবেশগুলোতে শক্তিশালী জাতীয়তাবাদের যে ধাক্কায় স্বাধীনতা এসেছিল, তার হাত ধরে দেশগুলো ব্যবসা-অবান্ধব হয়ে ওঠে। সময়ের উপযোগি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার জায়গায় কৃষি বা ক্ষুদ্রশিল্পের পেছনে বিনিয়োগ করা হয় রাষ্ট্রিয় সম্পদ। বিদেশী বিনিয়োগ থেকে দক্ষতা – অনেক কিছুই বর্জন করা হয়। এর ওপর তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর নিজেরদের মধ্যেও সম্পর্কও ভাল ছিল না। সবের ফলে সার্বিকভাবেই পিছিয়ে পড়তে থাকে তৃতীয় বিশ্ব – এবার আর পরাধীনতার কারণে নয়, নিজেদের ব্যর্থতায়। তবে সামাজিক পরিকাঠামোর উন্নয়নের ফলে ও বিজ্ঞানের সার্বিক অগ্রগতির কারণে স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মানে উন্নতি ঘটে – যার কিছুটা হলেও ফল উন্নয়নশীল দেশগুলো ভোগ করছে শেষ দশকে।

ইতিহাসে ফিরে গেলে কি মনে হয় আরো আগে স্বাধীনতা পেলে বা একেবারেই পরাধীন না হলে কি আমরা আরো ভাল থাকতাম? আমি এ নিয়ে সংশয়বাদী। আজ থেকে প্রায় শ’দেড়েক বছর আগে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের দিকে ফিরে তাকালে দেখি ভারতীয়রা তখন মুঘল বা মারাঠা রাজাদের পুনরায় মসনদে বসানোর জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু এর পেছনে কোনও আধুনিক রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নেই। মুঘল বাদশা’র ফরমান বা নানাসাহেবের বক্তব্যে যতটা ইংরেজ বিতাড়নের চেষ্টা আছে তার সিকিভাগও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা বা সংবিধান লেখার প্রচেষ্টা নেই। এর সাথে প্রায় আট দশক আগের আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণা দেখলে মনে হয় ১৮৫৭ সালেও ভারত বা ভারতীয়রা প্রস্তরযুগেই পড়ে ছিল। ওই সমসামিয়িক মার্কিণ কোর্ট তখন পেটেন্টের নন-অবভিয়াসনেস নিয়ে আলোচনা করছে। চার্লস ডারউইন বিবর্তন নিয়ে মানব-সমাজের গঠনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। আরও পিছিয়ে ভারতীয় ঐতিহাসিকদের প্রিয় মুঘল বাদশা আকবরের আমলে যদি ফিরে যাই তাহলে দেখা যায় বাদশা কিছুটা হলেও সমাজ-সংষ্কারের প্রচেষ্টা করেছেন বটে, কিন্তু সমসাময়িক ইউরোপের তুলনায় তা যথারীতি প্রস্তরযুগের। তার সমসাময়িক ইউরোপে গ্যালিলিও বা কেপলার গবেষণা করছেন অথচ আকবরের আমলে কোনও বিজ্ঞান-চর্চায় উৎসাহ দেবার লক্ষণ দেখা যায় না। শিল্প ও বাণিজ্য সম্পর্কে বাদশাহদের জ্ঞানও কোন অংশে বাড়তি পরে না। ব্রিটিশদের মুক্ত-বাণিজ্যের অধিকার দেবার সময় তারা কতটুকু লাভ-লোকসানের হিসাব করেছিলেন তা নিয়ে সন্দেহ আছে। আকবরের এক শতক আগেই ষষ্ঠ হেনরী ইংল্যান্ডে ২০ বছরের পেটেন্ট-ব্যবস্থা চালু করেছিলেন যা আজও চালু আছে। মেধা – তার আবার সত্ত্ব ও তার সংরক্ষণ – এই ব্যাপারটা এখনও দেশের অধিকাংশ মানুষ বোঝে বলে মনে হয় না। খোদ বাদশা আকবরের হাল দেখে মনে হয় ভারতের কোনও দেশীয় শাসক আধুনিক রাষ্ট্রের চিন্তা মাথায় আনতে সক্ষম ছিলেন না।

সংক্ষেপে বললে, আমাদের যা প্রাপ্য ছিল সেটাই আমরা হয়ত ভোগ করছি। ঔপনিবেশিকতা (যা আমার স্বাভাবিক ঘটনা বলেই মনে হয়) বলে কোনও বস্তু আদৌ না থাকলেও কি আমরা সত্যি উন্নত জীবন-যাপণ করতাম? তিনটের জায়গায় হয়ত গোটা কুড়ি দেশ থাকত উপমহাদেশে, যাদের কিছু কিছু তুলনামূলক-ভাবে ভাল হত অন্যের তুলনায়। এর বেশী খুব কিছু আশাবাদী হওয়ার কোনও সম্ভাবনা দেখি না। মুঘল-মারাঠা রাজা বা তাদের অধীনের সামন্তবর্গ আমাদের এর থেকে উন্নত জীবনযাত্রা এনে নিতে পারত বলে মনে হয় না।

ভবিষ্যতে কি এর আমূল পরিবর্তন হতে পারে? আমি খুব একটা আশাবাদী নই। ঔপনিবেশিকদের মধ্যে সবথেকে খারাপ পারফর্মার হল পর্তুগাল। আর আমাদের উন্নয়নশীল বিশ্বে স্টার পারফর্মার হল মালয়েশিয়া। দুয়ের মধ্যে তুলনা করলে দেখি মালয়েশিয়ার সাথে ১৯৬০-এর দশকে পর্তুগালের মাথাপিছু আয়ের পার্থক্য ছিল মাত্র ১১০ ডলারের। তা এখন বেড়ে ১২,০০০ ডলারে চলে গেছে। অর্থাৎ ব্যবধান দশগুণ বেড়েছে। যেখানে আমাদের স্টার পারফর্মারের এই হাল, সেখানে আমরাই বা কিভাবে আশা রাখতে পারি?

তথ্য সূত্র – গুগলের তথ্যভাণ্ডার যা বিশ্বব্যাঙ্কের থেকে নেওয়া। এখানে আমি ডলার-জিডিপি দিয়ে মেপেছি যা কিছুটা বিতর্কিত। তবে আন্তর্দেশীয় তুলনার জন্য আমার ওটাই বেশী নিখুঁত বলে মনে হয়েছে।