Posts Tagged ‘উন্নয়ন’

উপনিবেশের পরে

ডিসেম্বর 25, 2012

দেশ থেকে বাইরে কাটিয়ে দিলাম দীর্ঘ সাড়ে চার বছর। মাঝে দেশে গেছি বার-দুয়েক। দেশেও উন্নতি হচ্ছে, বড় বড় বিল্ডিং হচ্ছে, চাকরি হচ্ছে রাস্তাঘাট হচ্ছে – দিনে দিনে দিন-বদলের ছোঁয়া দেখা যায়। ধানক্ষেত জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে হাউসিং ডেভেলপমেন্ট জোনের জন্য। কিছু পরিবর্তন আমেরিকাতেও হচ্ছে। মন্দার পরবর্তী রাস্তাঘাট মেরামতের কাজ এখন কমে আসছে, যত মন্দা কাটছে ততই বোঝা যাচ্ছে মন্দার পরবর্তী রিকভারি হয়ত তত চাকরি আনবে না বাজারে। হাউসিং বাবল বার্স্ট করার পরে দাম আবার বাড়া শুরু হয়েছে বটে কিন্তু বাবলের সময়ের দামের কাছাকাছি পর্যায়ে যেতেও এখনও অন্তত বছর পাঁচেক বাকি। তাও তফাৎ চোখে পড়ে। প্রথম বিশ্ব আর তৃতীয় বিশ্ব নামগুলো ঠিক কে কিভাবে দিয়েছিল জানি না, দেশে গেলেই দুই বিশ্বের তফাতের কথা ভালভাবে বোঝা যায়। একটা বছর তিনেকের শিশু দুয়েক দিনেই হয়ত বুঝে যায় পার্থক্যটা।

ছোটবেলায় ইতিহাস-সাহিত্য বা সমাজ-বিজ্ঞানের ক্লাসে একটা ব্যাপার আমাদের মাথায় খুব ভালভাবে গেঁথে দেবার একটা চেষ্টা করা হয়েছে। আমাদের, মানে যারা একদা উপনিবেশ ছিলাম, সেই দেশগুলোর স্বাধীনতার সময় থেকেই এই বিষয়ে সকলে একমত – অন্যের উপনিবেশে পরিণত না হলে হয়ত আমরাও এমন উন্নত দেশই হতাম। ইতিহাসে পড়েছি, ইউরোপিয়ান ঔপনিবেশিকদের আসার আগে আমরা যথেষ্ট ধনীই ছিলাম – ইউরোপীয়রা দেশে আসার জন্য ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্র পার হত। শ’-দুয়েক বছরের ঔপনিবেশিক ইতিহাস সব বদলে দিয়ে গেছে। উপনিবেশকালে আমাদের দেশগুলো থেকে কাঁচামাল নিয়ে গিয়ে ইউরোপে শিল্প-কারখানায় ব্যবহার করা হত, আমাদের ন্যায্য মূল্য দেওয়া হত না। আমাদের গর্বের ক্ষুদ্র-কুটীর শিল্প ধ্বংস হয়ে গেছে উপনিবেশ অবস্থায়, দেশের বাজার ছেয়ে গেছে বিদেশী পণ্য-সামগ্রীতে। ঔপনিবেশিক প্রভুদের কৃষি বা কৃষকের বিষয়ে গুরুত্ব ছিল না – তাই আমাদের একের পর এক দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে স্বাধীনতার পরে আমরা দ্রুত উন্নতি করা শুরু করি। খাদ্য-বিষয়ক নিরাপত্তা এসেছে, স্বাস্থ্য-শিক্ষা সবকিছুতেই ভুরিভুরি উন্নয়নের নিদর্শন আসে স্বাধীনতার পরে। আসলে জাতি হিসাবে আমরা উন্নতই, পুরোনো ট্র্যাকে ফিরে যেতে কিছু সময় লাগছে আর কি। এমনকি অমর্ত্য সেনের লেখা পড়েও সেইরকম মনে হয়।

ইতিহাস মিথ্যা বলে। ইতিহাস বইতে ইচ্ছামত লিখে পাবলিশ করে দেওয়া যায়। কিন্তু পরিসংখ্যান মিথ্যা বলে না। তাই আমি পরিসংখ্যান দিয়েই দেখার চেষ্টা করলাম সত্যি কি ঘটেছে উপনিবেশ আর ঔপনিবেশিকদের মধ্যে। সহজ সূত্রে যদি ধরেই নেওয়া যায় যে উপনিবেশের কাঁচামালের পয়সায় ঔপনিবেশিকদের এত রমরমা, তাহলে ধরেই নেওয়া যায় যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যখন উপনিবেশগুলো এক-ধাক্কায় স্বাধীনতা পেয়ে গেল, তখন ঔপনিবেশিকদের সর্বনাশ আর উপনিবেশদের রমরমা।

কিন্তু এই গ্রাফ থেকে দেখি পুরো তার উল্টোটাই ঘটে চলেছে। মাথাপিছু গড় আয় – যা কিনা ব্যবহারিক জীবনে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের অন্যতম নির্ণায়ক, তা ঔপনিবেশিক দেশগুলোতে ঊর্ধ্বমুখী। ক্রমাগত মাটি ঘেঁষে চলার পরে এই শতকের পরে উপনিবেশগুলোতে কিছুটা হলেও গড় আয়ে কিছুটা উন্নতি দেখা যায়। দুইয়ের মধ্যে ব্যবধান বেড়েই চলেছে – এমনকি গত দশকেও এই ব্যবধান প্রায় দেড়গুণ বেড়েছে। যদিও আমরা অনেক আন্দোলনের মাধ্যমে ঔপনিবেশিকদের কাছ থেকে স্বাধীনতা আদায় করেছি, কিন্তু ব্যর্থতার গ্রাফ দেখে মনে হয় ওদেরই আমাদের স্বাধীনতা যেচে দিয়ে দেওয়া উচিত ছিল।

তাহলে এবার আসা যাক আসল প্রশ্নটাতে। কেন এই গ্যাপ? কেন বছরের পর বছর এই গ্যাপ বেড়েই চলেছে। প্রথম বিশ্ব কেন প্রথম থেকে যাচ্ছে আর তৃতীয় কেন আরো বেশী করে তৃতীয় থেকে যাচ্ছে? কবে থেকে এই তফাৎ কমবে? আমার কাছে কিছু কিছু ভাসা ভাসা উত্তর আছে – কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই। কিছু ধারণা করা যায় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী প্রথম বিশ্বের রাজনৈতিক পটভূমিকা থেকে। ইউরোপীয়দের কাছে আর উপনিবেশ নেই, তাই গত কয়েক দশকের উপনিবেশ নিয়ে যুদ্ধের বাতাবরণও নেই। জার্মানী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দ্রুত উন্নতি করে, কিন্তু এবারে আর তা নিয়ে বাকি দেশগুলোর সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হয় নি। সার্বিকভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর প্রথম বিশ্বে দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্কের বহুল উন্নতি ঘটে, আগের অর্ধশতকের বৈরিতার ইতিহাস মাথায় রাখলে তা অভাবনীয় ধরে নেওয়া যায়। এর কিছুটা কারণ ঠান্ডা যুদ্ধ – অন্যটা পুঁজীর বিকাশ। সম্পর্কোন্নয়ন যদি প্রথম কারণ হয়ে থাকে, দ্বিতীয় কারণ অবশ্যই অর্থনীতির ধারা। কাঁচামালের ওপর নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ায় প্রথম বিশ্বের অর্থনীতি আরো বেশী করে টার্শিয়ারী খাতে (সার্ভিস, ব্যাঙ্কিং, অটোমেশন, গাড়ি – ইত্যাদি সেক্টর) নির্ভর করতে থাকে, যার ভিত্তি হিসাবে তাদের শিক্ষাব্যবস্থা আর উদ্ভাবনী ক্ষমতার কথা মাথায় আসে।

অন্যদিকে প্রাক্তন উপনিবেশগুলোতে শক্তিশালী জাতীয়তাবাদের যে ধাক্কায় স্বাধীনতা এসেছিল, তার হাত ধরে দেশগুলো ব্যবসা-অবান্ধব হয়ে ওঠে। সময়ের উপযোগি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার জায়গায় কৃষি বা ক্ষুদ্রশিল্পের পেছনে বিনিয়োগ করা হয় রাষ্ট্রিয় সম্পদ। বিদেশী বিনিয়োগ থেকে দক্ষতা – অনেক কিছুই বর্জন করা হয়। এর ওপর তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর নিজেরদের মধ্যেও সম্পর্কও ভাল ছিল না। সবের ফলে সার্বিকভাবেই পিছিয়ে পড়তে থাকে তৃতীয় বিশ্ব – এবার আর পরাধীনতার কারণে নয়, নিজেদের ব্যর্থতায়। তবে সামাজিক পরিকাঠামোর উন্নয়নের ফলে ও বিজ্ঞানের সার্বিক অগ্রগতির কারণে স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মানে উন্নতি ঘটে – যার কিছুটা হলেও ফল উন্নয়নশীল দেশগুলো ভোগ করছে শেষ দশকে।

ইতিহাসে ফিরে গেলে কি মনে হয় আরো আগে স্বাধীনতা পেলে বা একেবারেই পরাধীন না হলে কি আমরা আরো ভাল থাকতাম? আমি এ নিয়ে সংশয়বাদী। আজ থেকে প্রায় শ’দেড়েক বছর আগে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের দিকে ফিরে তাকালে দেখি ভারতীয়রা তখন মুঘল বা মারাঠা রাজাদের পুনরায় মসনদে বসানোর জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু এর পেছনে কোনও আধুনিক রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নেই। মুঘল বাদশা’র ফরমান বা নানাসাহেবের বক্তব্যে যতটা ইংরেজ বিতাড়নের চেষ্টা আছে তার সিকিভাগও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা বা সংবিধান লেখার প্রচেষ্টা নেই। এর সাথে প্রায় আট দশক আগের আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণা দেখলে মনে হয় ১৮৫৭ সালেও ভারত বা ভারতীয়রা প্রস্তরযুগেই পড়ে ছিল। ওই সমসামিয়িক মার্কিণ কোর্ট তখন পেটেন্টের নন-অবভিয়াসনেস নিয়ে আলোচনা করছে। চার্লস ডারউইন বিবর্তন নিয়ে মানব-সমাজের গঠনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। আরও পিছিয়ে ভারতীয় ঐতিহাসিকদের প্রিয় মুঘল বাদশা আকবরের আমলে যদি ফিরে যাই তাহলে দেখা যায় বাদশা কিছুটা হলেও সমাজ-সংষ্কারের প্রচেষ্টা করেছেন বটে, কিন্তু সমসাময়িক ইউরোপের তুলনায় তা যথারীতি প্রস্তরযুগের। তার সমসাময়িক ইউরোপে গ্যালিলিও বা কেপলার গবেষণা করছেন অথচ আকবরের আমলে কোনও বিজ্ঞান-চর্চায় উৎসাহ দেবার লক্ষণ দেখা যায় না। শিল্প ও বাণিজ্য সম্পর্কে বাদশাহদের জ্ঞানও কোন অংশে বাড়তি পরে না। ব্রিটিশদের মুক্ত-বাণিজ্যের অধিকার দেবার সময় তারা কতটুকু লাভ-লোকসানের হিসাব করেছিলেন তা নিয়ে সন্দেহ আছে। আকবরের এক শতক আগেই ষষ্ঠ হেনরী ইংল্যান্ডে ২০ বছরের পেটেন্ট-ব্যবস্থা চালু করেছিলেন যা আজও চালু আছে। মেধা – তার আবার সত্ত্ব ও তার সংরক্ষণ – এই ব্যাপারটা এখনও দেশের অধিকাংশ মানুষ বোঝে বলে মনে হয় না। খোদ বাদশা আকবরের হাল দেখে মনে হয় ভারতের কোনও দেশীয় শাসক আধুনিক রাষ্ট্রের চিন্তা মাথায় আনতে সক্ষম ছিলেন না।

সংক্ষেপে বললে, আমাদের যা প্রাপ্য ছিল সেটাই আমরা হয়ত ভোগ করছি। ঔপনিবেশিকতা (যা আমার স্বাভাবিক ঘটনা বলেই মনে হয়) বলে কোনও বস্তু আদৌ না থাকলেও কি আমরা সত্যি উন্নত জীবন-যাপণ করতাম? তিনটের জায়গায় হয়ত গোটা কুড়ি দেশ থাকত উপমহাদেশে, যাদের কিছু কিছু তুলনামূলক-ভাবে ভাল হত অন্যের তুলনায়। এর বেশী খুব কিছু আশাবাদী হওয়ার কোনও সম্ভাবনা দেখি না। মুঘল-মারাঠা রাজা বা তাদের অধীনের সামন্তবর্গ আমাদের এর থেকে উন্নত জীবনযাত্রা এনে নিতে পারত বলে মনে হয় না।

ভবিষ্যতে কি এর আমূল পরিবর্তন হতে পারে? আমি খুব একটা আশাবাদী নই। ঔপনিবেশিকদের মধ্যে সবথেকে খারাপ পারফর্মার হল পর্তুগাল। আর আমাদের উন্নয়নশীল বিশ্বে স্টার পারফর্মার হল মালয়েশিয়া। দুয়ের মধ্যে তুলনা করলে দেখি মালয়েশিয়ার সাথে ১৯৬০-এর দশকে পর্তুগালের মাথাপিছু আয়ের পার্থক্য ছিল মাত্র ১১০ ডলারের। তা এখন বেড়ে ১২,০০০ ডলারে চলে গেছে। অর্থাৎ ব্যবধান দশগুণ বেড়েছে। যেখানে আমাদের স্টার পারফর্মারের এই হাল, সেখানে আমরাই বা কিভাবে আশা রাখতে পারি?

তথ্য সূত্র – গুগলের তথ্যভাণ্ডার যা বিশ্বব্যাঙ্কের থেকে নেওয়া। এখানে আমি ডলার-জিডিপি দিয়ে মেপেছি যা কিছুটা বিতর্কিত। তবে আন্তর্দেশীয় তুলনার জন্য আমার ওটাই বেশী নিখুঁত বলে মনে হয়েছে।

Advertisements