Posts Tagged ‘ইউরোপ’

ইউরোর চাবিকাঠি জার্মানীর হাতে

ডিসেম্বর 25, 2012

ইংল্যান্ডের উত্তরের গ্রামগুলোতে গবাদি পশু চরে বেড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট স্থান থাকত – যা ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত – অর্থাৎ কমন প্রপার্টি। নিজের স্বার্থের কথা ভেবে সব মালিকই চাইত আরও বেশী করে গবাদি পশু চারণ করে বেশী লাভের টাকা ঘরে তুলতে, স্বভাবতই নিজেদের জমি ব্যবহার না করে ওই কমন-প্রপার্টিই ব্যবহৃত হত চারণের জন্য। কিন্তু একসময় দেখা দিল বিপর্যয়, ঘাস গজানোর তুলনায় গবাদি পশুর খেয়ে ফেলার হার বেড়ে গেল, ফলে গবাদি পশুর খাওয়ার জায়গা ফুরোলো। এই থট-এক্সারসাইজ থেকেই একটা সুন্দর তত্ত্বের উদ্ভব। ট্র্যাজেডি অব কমনস শেক্সপিয়ারের লেখা আরেকটি উপন্যাস নয়, বরং একটি তত্ত্ব যার প্রভাব বর্তমান পৃথিবীতে হরহামেশাই চোখে পড়ে।

গ্যারেট হার্ডিন নামে এক বিজ্ঞানী সায়েন্স পত্রিকায় প্রথম প্রকাশ করেন এই নামটা, কিন্তু এর প্রভাব চলে আসছে এর অনেক আগে থেকেই। মূল বক্তব্য হল, যে সম্পদ সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত, সকলেই তার সর্বাধিক ব্যবহারের চেষ্টা করে। আর এই ধরণের সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহার খুব দ্রুত সামগ্রিক বিপদ ডেকে আনতে পারে। সেই “সম্পদ” কখনও বঙ্গোপসাগরের মাছ, কখনও রাস্তা (একটা কার্টুন দেখে বুঝতে পারেন), কখনো সামগ্রিক পরিবেশ। আরও উদাহরণ দিলে গণতান্ত্রিক দেশে সরকারী সম্পত্তি একইভাবে ট্র্যাজেডি অব কমনসের শিকার, রাষ্ট্রায়াত্ত শিল্পের পতনের পেছনে অনেকাংশেই একই তত্ত্ব কাজ করে। অর্থনীতিও ব্যতিক্রম নয়। আর সাম্প্রতিক ইউরোপীয় অর্থনীতির পতনে আমি এই ট্র্যাজেডি অব কমনসের ছায়া দেখতে পাই।

ষাটের দশকে ইউরোপের ছয়টি দেশ মিলেজুলে নিজেদের অর্থনীতি থেকে সীমারেখা মুছে দিতে চেয়েছিল। তাদের সেই প্রচেষ্টার সফল রূপায়ণ ঘটে ১৯৯৩ সালে, যখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন তৈরী হয়। আরো বছর দশেকের মধ্যেই ইউনিয়নের সদস্য বেড়ে দাঁড়ায় ২৭-এ। ইউনিয়ন গঠনের কেন্দ্রীয় চালক ছিল অভিন্ন মুদ্রা ইউরোর প্রবর্তন – যার ফলে এক ছাতার তলায় আসতে পেরেছিল ইউরোপের ছোটো-বড় দেশগুলো। স্বাভাবিক ভাবেই এক ছাতার তলায় আসায় গ্রীসের মত দেশে বিনিয়োগের ঝুঁকি কমে যায়, যার ফলে ঋণ-সংগ্রহে সুদের হারও কমে যায়। এইটা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। আপনি যদি কোনও ব্যক্তিকে ঋণ দিতে চান তাহলে যা ঝুঁকি, একটা গোষ্ঠীকে দিতে চাইলে স্বাভাবিকভাবেই তার চেয়ে কম ঝুঁকি – কারণ আপনি স্বাভাবিকভাবেই আশা করবেন গোষ্ঠীর মধ্যে কিছু লোক থাকবেই যারা ঋণ ঠিকঠাক কাজে লাগাবে ও শেষমেষ আপনার টাকা শোধ করে দেবে। অর্থনীতির প্রথম ধাপে, এভাবেই গ্রীস, ইতালী, পর্তুগাল বা স্পেনের মত দেশ অনেক ঋণ নিয়ে দেশে বিনিয়োগ করল – স্থানীয় অর্থনীতিতে জোয়ার এল।

উল্টোদিকে, ফ্রান্স বা জার্মানীর মত দেশও লাভবান হল। তাদের রপ্তানী বাজার রাতারাতি বড় হয়ে গেল। এদের মধ্যে বিশেষত জার্মানীর জিডিপি সম্পূর্ণ রপ্তানীমুখী। রপ্তানী বাড়ায় উৎপাদন বাড়ল, তাছাড়া বিশেষত চিনে জার্মান মেশিনারীর বিশেষ চাহিদা দেখা দেওয়ায় জার্মানীর অর্থনীতি ফুলে-ফেঁপে উঠল। জার্মানীর বাণিজ্য-উদ্বৃত্ত বাড়তে থাকল। এই উদ্বৃত্ত টাকা ঋণের মাধ্যমে জমা হতে থাকল ওই দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলোতে। জার্মানী ইউরোর পূর্ণ সদব্যবহার করল – একদিকে তাদের ঋণের টাকায় দক্ষিণ ইউরোপের ক্রেতারা জিনিস কিনতে থাকল, অন্যদিকে সময় গেলে তাদের অর্থনীতি আরও বেশী দক্ষ হয়ে উঠতে থাকল।

এদিকে ঋণের টাকা একেক-দেশ একেক-ভাবে ব্যবহার করেছে। স্পেনে আমেরিকার মত রিয়েল এস্টেট বুদবুদ তৈরী হয়েছে, গ্রীসে সরকারী কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ। গ্রীসের ঋণ এতটাই বেড়ে গেল যে ইউরো শুরুর সময় মাস্ট্রিক্ট চুক্তিও(৩%-এর কম ঘাটতি) বছরের পর বছর অগ্রাহ্য করতে থাকল। গ্রীসের সাথে তুরস্কের দীর্ঘ-বিবাদের ফলে গ্রীস আয়ের বড় অংশ খরচা করেছে মারণাস্ত্রের পেছনেও। মজার কথা, এই আমদানীর বড় অংশই এসেছিল জার্মানী থেকেই। মূলধন হাতে পেয়ে দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলোর লেবার-কস্ট বাড়তে থাকল, অর্থাৎ তাদের রপ্তানী বাড়ার সম্ভাবনা কমে যেতে থাকল।

যে আশা নিয়ে এক-ইউরোর যাত্রা শুরু হয়েছেল, বছর দশেকের মধ্যেই তার মধ্যে পরিষ্কার ফাটল দেখা দিল। যে কমন-পুল-অব-রিসোর্স ছিল, তার অদক্ষ ব্যবহার শুরু হল। জার্মানী যতই বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বাড়ালো গ্রীস, ইতালী ও স্পেনের ঘাটতি বাড়তে থাকল। এই অবস্থায় গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়ে এল আমেরিকায় অর্থনৈতিক দুর্যোগ – যার শুরু হল রিয়েল এস্টেট বাবলের হাত ধরে। দুর্যোগের মূল কারণ যেহেতু ছিল অত্যাধিক ও সহজলভ্য ঋণ, বিপর্যয়ের পরে সব ব্যাঙ্কই ঋণ দেওয়ার আগে দশবার ভাবতে শুরু করল। যে অর্থনীতিগুলোর অবস্থা ততটা ভাল ছিল না, অর্থাৎ যারা সামর্থ্যের বেশী ঋণ নিয়ে রেখেছিল – তাদের কপাল পুড়ল। তবে বলে রাখা ভাল, গ্রীসের ক্ষেত্রে অত্যধিক ঋণের জন্য দায়ী যেমন সরকার – স্পেনের ক্ষেত্রে কিন্তু মর্টগেজ আর রিয়েল এস্টেট বাবল মূল ঋণ-গ্রহীতা। অর্থাৎ স্পেন সরকার চুক্তি মেনে চলেও ঋণের বোঝায় ডুবে গেছে। এই অবস্থায় ব্যাঙ্ক সব জায়গায় ঋণে সুদের হার আর সমান রাখল না – দুর্বলতর অর্থনীতিতে ঝুঁকি যতই বাড়তে থাকল, সুদের হারও তেমন চড়চড় করে উঠতে শুরু করল। স্পেনে যারা বাড়ি কিনেছিল – তাদের ধার শোধ করা আরও শক্ত হয়ে গেল।

এই অবস্থায় সোজাসাপটা পথ দুটো – প্রথমটা হল খরচা কমিয়ে দেওয়া। খরচা কমানোর মানে বাজার কমে যাওয়া, মানে মন্দা – এদিকে মন্দা তো ২০০৮ থেকেই চলছে। যার মানে মন্দা আরো জাঁকিয়ে বসবে। এর মানে স্পেন, ইতালী, পর্তুগাল বা গ্রীসে আরো বেশী লোকে ধার শোধ করতে পারবে না। মন্দার মানে রাজনৈতিক অশান্তি – মানে বাজার থেকে আরও বিনিয়োগ বেরিয়ে যাবে, অর্থাৎ আরও মন্দা। অন্য পথটা হল খরচা না কমানো। কিন্তু এর মানে হল আরো বড় সমস্যার দিকে এগিয়ে যাওয়া। সব দেশেরই ঋণভার বেড়ে চলেছে – এভাবে চললে আরও ঋণভার বাড়বে, কারণ ঋণ কমানোর কোনও দায় থাকবে না। আস্তে আস্তে সবাই মিলে ডুববে একই সমুদ্রে। অনেকেরই মনে হতে পারে, জার্মানীই সবথেকে সুবিধাজনক অবস্থায় আছে ইউরোপীয় অর্থনীতিতে। কথাটা সত্যি হলেও তাদেরও হাত-পা বাঁধা। হঠাৎ করে তাদের মুখ্য বাজারে মন্দা দেখা দিলে তাদের অর্থনীতিতে আরও বড় ধাক্কা দেখা দেবে – তা নিয়ে কারও দ্বিমত থাকার কারণ নেই। তাছাড়া, এককালীন ঋণ-ডিফল্টে তাদের দুই ট্রিলিয়ন ডলার গচ্চা যাবে বলেও মনে করা হচ্ছে। তাই চাইলেও জার্মানী ডিভোর্স পাচ্ছে না – নিজের লাভের কথা ভেবেই শুধু বুলি আউড়েই শান্ত থাকতে হচ্ছে। অবশ্য তারা সুযোগ বুঝে তর্জন-গর্জন করা কমাচ্ছে না। তাদের বক্তব্য – গ্রীসসহ দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলোর অর্থনীতির রাশ আরও কড়া হাতে ধরতে হবে। বিশেষত গ্রীসের ওপর সকলেই বিশেষভাবে খাপ্পা – কারণ গ্রীসের ঋণগ্রহীতা সরকার। তাই সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন শর্ত, যার মধ্যে আছে সরকারী কর্মচারীদের বেতন-হ্রাস বা শিক্ষা-স্বাস্থ্য-খাতে টাকা কমানোর শর্তও। সম্প্রতি গ্রীসের ভোটের ফলাফলে মনে হয়েছে – গ্রীসের জনগণও সেটা মেনে নিয়েছে। আপাতত মনে হয় আগামী বছর কয়েক ইউরোপ খরচ কমানোর পথেই হাঁটবে। আর ইউরোপের ওপর জার্মানীর কর্তৃত্ব আরও জোরদার হবে।

ইউরোপের এই দুর্যোগের মধ্যে একটা কথা কেউ বলছে না – সেটা হল এশিয়ার কথা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন তৈরীর সময় বলা হয়েছিল গাড়ি-শিল্পের কথা। জার্মান গাড়ি শিল্পের জন্য যন্ত্রপাতি তৈরীর শিল্প ইতালি বা স্পেনে তৈরী হবার কথা ছিল। তার জায়গায় সেই যন্ত্রপাতি এখন আসছে চিন, জাপান বা থাইল্যান্ড থেকে। অর্থাৎ, ইউরোপের ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পের নিচের দিকটা (Low value added parts) নিয়ে নিয়েছে এশিয়া। জার্মানী থেকে আসা ঋণের টাকায় ইতালী বা স্পেন শিল্পের পরিকাঠামো বানায় নি – বিনিয়োগ করে গেছে রিয়েল এস্টেট বাবলে। খেসারত দিতে হচ্ছে তাদের।

পর্তুগালের অর্থনীতির সমস্যার একটা দিক বেশ মজার। বছরের পর বছর যেই অ্যাঙ্গোলাকে শোষণ করে পর্তুগালের সম্পদ এসেছিল, আজকে সেই অ্যাঙ্গোলাই পর্তুগালের অর্থনীতির ভরসা। উপনিবেশিকতার সূত্রে অ্যাঙ্গোলার সরকারী ভাষা পর্তুগীজ। আর তাদের অর্থনীতিতে এখন বুম চলছে – তেলের আবিষ্কারের হাত ধরে। স্বভাবতই দলে দলে পর্তুগীজ ইঞ্জিনিয়ার-ডাক্তার দেশের ২৫% বেকারী এড়িয়ে চাকরি জোটাতে পাড়ি দিচ্ছে অ্যাঙ্গোলার দিকে। না – এবারে আর রাইফেল হাতে নয় – হাতে রেসিউমে – লক্ষ্য ভালো চাকরি, ক্ষমতা দখল নয়। পর্তুগাল এখন অ্যাঙ্গোলা থেকে যা রেমিট্যান্স আনে, তার থেকে কম আনে ব্রিটেন থেকে। নিয়তির পরিহাসে অ্যাঙ্গোলা এখন আর পর্তুগাল থেকে বিশেষ একটা রেমিট্যান্স পায় না।

ইউরোর সমস্যা দেখে ট্র্যাজেডি অব কমনসের কথাই বারবার মনে হয়। মৌলিক-ভাবে ভিন্ন ধারার কয়েকটি অর্থনীতি যদি একসাথে চলতে চায় তাহলে তাদের মধ্যে “কমন-পুল-অব-মানি” সবাই নিজের দিকে টেনে নিতে চাইবে। সবাই বেশী বেশী করে ধার করবে, কারণ পতন ঠেকানোর দায় তাদের একার নয় – বাকিদেরও। উলটোপথে হেঁটে বরং জার্মানী এখন দুই ট্রিলিয়ন ডলার গচ্চা দেওয়ার মুখে। তাই প্রথম থেকেই রেগুলেশন ব্যাপারটা জোরেসোরে না কাজে লাগালে এইরকম অর্থনৈতিক গাঁটছড়া টিকবে না – ভবিষ্যতেও না। তবে এটাও জেনে রাখা ভাল – জাপান, চিন বা জার্মানীর মত রপ্তানী-নির্ভর দেশ সব দেশের পক্ষে হওয়া সম্ভব না – পুরোনো পাটিগণিতের নিয়মেই সম্ভব না। বিক্রেতা বা উৎপাদক আছে বলেই ভোক্তা আছে – এটাও যেমন ঠিক, এর উল্টো-টাও তেমনভাবেই সত্য। তাই জার্মানীর মত দেশকেও নিজের উৎপাদন যাতে ভোগের তুলনায় খুব বেশী না হয়ে যায় – তার দিকে নজর রাখতে হবে।

জার্মানী এর আগে দু-বার ইউরোপের কর্তৃত্ব নিতে চেয়েছিল। দুবারেই যুদ্ধের হাত ধরে। আর দুবারেই পরিণতি হয়েছিল করুণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমস্ত অর্থনৈতিক দায় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল জার্মানীর ওপর – যার পরিণতিতে জার্মান মুদ্রায় এতটা মুদ্রাস্ফীতি হয়েছিল যে ১৯২৩ সালে এক মার্কিণ ডলারের বিরুদ্ধে ৪ ট্রিলিয়ণ জার্মান মার্ক পাওয়া যেত (১৯১৪ সালে ১ ডলার ছিল ৪ মার্ক)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পরে ভেঙে তাদের দু-টুকরো করে দেওয়া হল, যা জোড়া লাগতে দীর্ঘ ৪৫ বছর সময় লাগল। যদি গ্রীসের মত ইতালী, স্পেন আর পর্তুগালকেও জার্মানী নিজের “প্যাকেজে” রাজী করিয়ে ফেলতে পারে – তাহলে দীর্ঘদিনের জন্য অর্ধেক ইউরোপ জার্মানীর কার্যত উপনিবেশে পরিণত হবে। ঋণের বোঝা থেকে চট করে মুক্তি মিলবে না, অথচ জার্মান পণ্য তাদের কিনে যেতে হবে – মানে দেশে শিল্প সম্ভাবনা কম। হিটলার যে কাজটা সমরাস্ত্র দিয়ে করে দেখাতে পারেননি, কর্মঠ জার্মানরা অর্থনীতির হাত ধরে তাই করে দেখিয়ে দিচ্ছে – এভাবেও ফিরে আসা যায়।

আরো কিছু সহজপাঠ্য –
১) তিন ধাপে ইউরোপের ক্রাইসিস
২) বিবিসি থেকে
৩) গ্যারেট হার্ডিনের পেপার
৪) বিবিসির ডকুমেন্টরি

প্রথম ছবিটি এন-পি-আর ব্লগ থেকে, দ্বিতীয় ও তৃতীয়টি উইকি থেকে ও চতুর্থটি নিউ-ইয়র্ক টাইমস ব্লগ থেকে নেওয়া।

Advertisements