Archive for the ‘শিক্ষা’ Category

বাংলাদেশের অ্যাডমিশন টেস্ট নিয়ে আমার কিছু কথা

জানুয়ারি 11, 2008

অনেকদিন ধরেই অরকুটে বিভিন্ন গ্রুপে বিভিন্নজনের প্রোফাইল দেখে আমার ধারণা হয়েছিল যে বাংলাদেশ বুয়েটে অন্তত অর্ধেক ছাত্রই আসে নটরডাম কলেজ থেকে। আরো কিছু সার্চের পরে, আজকেই একটা ফোরামে পড়তে গিয়ে দেখলাম বাংলাদেশের অগ্রণী প্রতিষ্ঠান বুয়েটে প্রবেশিকা পরীক্ষায় সুযোগ পাওয়া প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ ছাত্রই নটরডাম কলেজের। একই রকমের মেয়েদের যে ক’টি প্রোফাইল দেখা যায় বুয়েটের, তারাও অধিকাংশই ভিকারুন্নিসা স্কুলের। বাংলাদেশের এই দুটো স্কুল যথেষ্ট নামকরা, কিন্তু যে হারে এরা ডমিনেট করে পরবর্তী কেরিয়ার – সেটা দেখে আমি বিস্মিত।

এখানে (পশ্চিমবঙ্গে), একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণী সাধারণত ভাল স্কুলেই সবাই পড়তে চায়। গ্রামের ছাত্ররা মূলত নিকটবর্তী শহরের স্কুলে গিয়েই পড়াশোনা করে। এর সাথে সমান্তরালে আছে ইংরেজী মাধ্যম স্কুল। ইংরেজী মাধ্যম স্কুল আবার দুরকম, একদল পড়ে রাজ্যের সিলেবাসে ও আমাদের মতই প্লাস টু হিসাবে উচ্চমাধ্যমিক দেয় প্রথম ভাষা হিসাবে ইংরেজী নিয়ে। আর আরেকদল সরাসরি জাতীয় সিলেবাসে পরীক্ষা দেয়। উচ্চমাধ্যমিকের সাথে সাথেই জয়েন্ট এন্ট্রান্স (এই পরীক্ষার মাধ্যমে সব ইঞ্জিনিয়ারিং ও ডাক্তারী কলেজে প্রবেশ করে) পরীক্ষার র‌্যাঙ্ক অনুসারে ডাক্তারী বা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে সবাই সুযোগ পায়। একই সাথে অনুষ্ঠিত হয় আই-আই-টি প্রবেশিকা পরীক্ষা, আর জাতীয় মেডিকেল প্রবেশিকা। আবার এক রাজ্যের ছেলে অন্য রাজ্যের প্রবেশিকা পরীক্ষাতেও বসতে পারে – যেমন অন্ধ্রের ৮২ হাজার ইঞ্জিনিয়ারিং-এর সিট অনেকটাই আসে বাইরের রাজ্যের থেকেই।

কিন্তু এখানে কয়েকটা স্কুলের এতটা আধিপত্য নেই। যেমন ধরুন আমি পড়েছি শিবপুর বি-ই কলেজ থেকে (মোটামুটি পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয়)। কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগে আমরা ৩২ জন পড়তাম। শুধুমাত্র দুটো স্কুলের দুজন করে ছাত্র ছিল, বাকি সবাই যার যার স্কুলের একমাত্র প্রতিনিধি। সবাই আসে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অংশ থেকে – বিভিন্ন স্কুল থেকে। শহরের স্কুলের আধিপত্য থাকলেও গ্রামের স্কুলের থেকে আসা ছাত্রও কম নয়। যেমন দুর্গাপুর, মেদিনীপুর বা শিলিগুড়ির ছাত্র সংখ্যায় যথেষ্ট বেশীই থাকত। গোটা কলেজে আমাদের একই ব্যাচের চারশ ছাত্রের মধ্যে কোনো স্কুলের কুড়ি-ত্রিশজনের বেশী পাওয়া দুষ্কর বলে আমার ধারণা। সবথেকে বেশী ছাত্র আসে কোলকাতা সাউথ পয়েন্ট হাই স্কুল থেকে – তাও ব্যাচের ১০ শতাংশেরও কম।

এবার আমার প্রশ্নে আসা যাক। একই স্কুল থেকে এত ছাত্র আসছে কি ভাবে? ধরে নেওয়া যাক সব ভাল ছাত্রই নটরডামে ভর্তি হয়। কিন্তু তার মানে কি এই নয় যে বাকি মফস্বলের কলেজগুলোয় কেউ পড়াশোনা করতে উতসাহী নয় নাকি তাতে ভাল পড়াশোনা হয় না। আমাদের এখানের মত আশা করি বাংলাদেশেও প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রস্তুতি প্রাইভেট টিউশন আর ব্যক্তিগত প্রস্তুতি-নির্ভর। সেক্ষেত্রে, কলেজ কি ভাবে এতটা পার্থক্য তৈরী করতে পারে? আর সরকার কি কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে একই স্কুলের এতটা আধিপত্য খর্ব করার জন্য?

এখানে একটা সময় পর্যন্ত কলকাতার ছাত্ররাই আধিপত্য বজায় রেখেছিল। কিন্তু আশির দশকে সরকারি হস্তক্ষেপে কয়েকটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে সেই চাকা ঘুরিয়ে দেওয়া। গবেষণা করে দেখা গেল গ্রামের দিকে ইংরেজী আর অংকেই ছাত্র-ছাত্রীরা বেশী কাঁচা। তাদের সুবিধার্থে সিলেবাসে ওই দুটি সাবজেক্ট সোজা করে দেওয়া হল – যাতে সবার পড়াশোনায় কিছুটা হলেও আগ্রহ থাকে। এর ফলে পাশের হার বাড়তে থাকে আর আস্তে আস্তে উতসাহ পেয়ে কিছুটা গ্রামের পাশের হার বাড়তে থাকে। অপরদিকে শিক্ষার মান পড়ে যায়, আগের মাধ্যমিক পাশ আর পরের মাধ্যমিক পাশের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত দেখা দেয়। নব্বই-দশকের শেষের দিকে জয়েন্ট-এন্ট্রান্সেও একই পদ্ধতি অবলম্বন করে গ্রামের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু মনে করা হয় সর্বভারতীয় পরীক্ষায় পশ্চিমবঙ্গের স্থান ক্রমাগতই পিছিয়ে গেছে। প্রথম দশে এখন একজনও আসে না সবসময়।

আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন হল মফস্বলের ছাত্ররা তাহলে কি ভাবে নটরডামে আসে? আমার তো অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ঢাকার ছাত্ররা এতে অনেকটা সুবিধা পেয়ে যায়, কারণ তারা হোমগ্রাউন্ডে বসে পড়াশোনার সুবিধা পায় বেশীদূর পর্যন্ত। তাছাড়া, মফস্বলের ছাত্ররা শুনলাম ঢাকায় আসে প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রস্তুতির কোচিং-এর জন্য। সেটাও তো সমস্যার বিষয়। এ নিয়ে সরকারের কোনো প্ল্যান আছে কি?

আমার ব্যক্তিগত ধারণায় বাংলাদেশের পড়াশোনা এখনো ঢাকা-নির্ভর। এখনো স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবারই ডমিনেট করে আর কয়েকটা নামী-দামী স্কুলেই ভাল ফলাফল করে। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে কিন্তু সংখ্যায় বড় কম বলেই মনে হচ্ছে। আমি এই বিষয়ে পুরো জানিনা, তাই পাঠকেরা আলোকপাত করলে খুশী হব। আর প্লিজ কেউ মাইন্ড খাবেন না।

Advertisements