Archive for the ‘রাজনীতি’ Category

ইউরোর চাবিকাঠি জার্মানীর হাতে

ডিসেম্বর 25, 2012

ইংল্যান্ডের উত্তরের গ্রামগুলোতে গবাদি পশু চরে বেড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট স্থান থাকত – যা ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত – অর্থাৎ কমন প্রপার্টি। নিজের স্বার্থের কথা ভেবে সব মালিকই চাইত আরও বেশী করে গবাদি পশু চারণ করে বেশী লাভের টাকা ঘরে তুলতে, স্বভাবতই নিজেদের জমি ব্যবহার না করে ওই কমন-প্রপার্টিই ব্যবহৃত হত চারণের জন্য। কিন্তু একসময় দেখা দিল বিপর্যয়, ঘাস গজানোর তুলনায় গবাদি পশুর খেয়ে ফেলার হার বেড়ে গেল, ফলে গবাদি পশুর খাওয়ার জায়গা ফুরোলো। এই থট-এক্সারসাইজ থেকেই একটা সুন্দর তত্ত্বের উদ্ভব। ট্র্যাজেডি অব কমনস শেক্সপিয়ারের লেখা আরেকটি উপন্যাস নয়, বরং একটি তত্ত্ব যার প্রভাব বর্তমান পৃথিবীতে হরহামেশাই চোখে পড়ে।

গ্যারেট হার্ডিন নামে এক বিজ্ঞানী সায়েন্স পত্রিকায় প্রথম প্রকাশ করেন এই নামটা, কিন্তু এর প্রভাব চলে আসছে এর অনেক আগে থেকেই। মূল বক্তব্য হল, যে সম্পদ সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত, সকলেই তার সর্বাধিক ব্যবহারের চেষ্টা করে। আর এই ধরণের সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহার খুব দ্রুত সামগ্রিক বিপদ ডেকে আনতে পারে। সেই “সম্পদ” কখনও বঙ্গোপসাগরের মাছ, কখনও রাস্তা (একটা কার্টুন দেখে বুঝতে পারেন), কখনো সামগ্রিক পরিবেশ। আরও উদাহরণ দিলে গণতান্ত্রিক দেশে সরকারী সম্পত্তি একইভাবে ট্র্যাজেডি অব কমনসের শিকার, রাষ্ট্রায়াত্ত শিল্পের পতনের পেছনে অনেকাংশেই একই তত্ত্ব কাজ করে। অর্থনীতিও ব্যতিক্রম নয়। আর সাম্প্রতিক ইউরোপীয় অর্থনীতির পতনে আমি এই ট্র্যাজেডি অব কমনসের ছায়া দেখতে পাই।

ষাটের দশকে ইউরোপের ছয়টি দেশ মিলেজুলে নিজেদের অর্থনীতি থেকে সীমারেখা মুছে দিতে চেয়েছিল। তাদের সেই প্রচেষ্টার সফল রূপায়ণ ঘটে ১৯৯৩ সালে, যখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন তৈরী হয়। আরো বছর দশেকের মধ্যেই ইউনিয়নের সদস্য বেড়ে দাঁড়ায় ২৭-এ। ইউনিয়ন গঠনের কেন্দ্রীয় চালক ছিল অভিন্ন মুদ্রা ইউরোর প্রবর্তন – যার ফলে এক ছাতার তলায় আসতে পেরেছিল ইউরোপের ছোটো-বড় দেশগুলো। স্বাভাবিক ভাবেই এক ছাতার তলায় আসায় গ্রীসের মত দেশে বিনিয়োগের ঝুঁকি কমে যায়, যার ফলে ঋণ-সংগ্রহে সুদের হারও কমে যায়। এইটা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। আপনি যদি কোনও ব্যক্তিকে ঋণ দিতে চান তাহলে যা ঝুঁকি, একটা গোষ্ঠীকে দিতে চাইলে স্বাভাবিকভাবেই তার চেয়ে কম ঝুঁকি – কারণ আপনি স্বাভাবিকভাবেই আশা করবেন গোষ্ঠীর মধ্যে কিছু লোক থাকবেই যারা ঋণ ঠিকঠাক কাজে লাগাবে ও শেষমেষ আপনার টাকা শোধ করে দেবে। অর্থনীতির প্রথম ধাপে, এভাবেই গ্রীস, ইতালী, পর্তুগাল বা স্পেনের মত দেশ অনেক ঋণ নিয়ে দেশে বিনিয়োগ করল – স্থানীয় অর্থনীতিতে জোয়ার এল।

উল্টোদিকে, ফ্রান্স বা জার্মানীর মত দেশও লাভবান হল। তাদের রপ্তানী বাজার রাতারাতি বড় হয়ে গেল। এদের মধ্যে বিশেষত জার্মানীর জিডিপি সম্পূর্ণ রপ্তানীমুখী। রপ্তানী বাড়ায় উৎপাদন বাড়ল, তাছাড়া বিশেষত চিনে জার্মান মেশিনারীর বিশেষ চাহিদা দেখা দেওয়ায় জার্মানীর অর্থনীতি ফুলে-ফেঁপে উঠল। জার্মানীর বাণিজ্য-উদ্বৃত্ত বাড়তে থাকল। এই উদ্বৃত্ত টাকা ঋণের মাধ্যমে জমা হতে থাকল ওই দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলোতে। জার্মানী ইউরোর পূর্ণ সদব্যবহার করল – একদিকে তাদের ঋণের টাকায় দক্ষিণ ইউরোপের ক্রেতারা জিনিস কিনতে থাকল, অন্যদিকে সময় গেলে তাদের অর্থনীতি আরও বেশী দক্ষ হয়ে উঠতে থাকল।

এদিকে ঋণের টাকা একেক-দেশ একেক-ভাবে ব্যবহার করেছে। স্পেনে আমেরিকার মত রিয়েল এস্টেট বুদবুদ তৈরী হয়েছে, গ্রীসে সরকারী কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ। গ্রীসের ঋণ এতটাই বেড়ে গেল যে ইউরো শুরুর সময় মাস্ট্রিক্ট চুক্তিও(৩%-এর কম ঘাটতি) বছরের পর বছর অগ্রাহ্য করতে থাকল। গ্রীসের সাথে তুরস্কের দীর্ঘ-বিবাদের ফলে গ্রীস আয়ের বড় অংশ খরচা করেছে মারণাস্ত্রের পেছনেও। মজার কথা, এই আমদানীর বড় অংশই এসেছিল জার্মানী থেকেই। মূলধন হাতে পেয়ে দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলোর লেবার-কস্ট বাড়তে থাকল, অর্থাৎ তাদের রপ্তানী বাড়ার সম্ভাবনা কমে যেতে থাকল।

যে আশা নিয়ে এক-ইউরোর যাত্রা শুরু হয়েছেল, বছর দশেকের মধ্যেই তার মধ্যে পরিষ্কার ফাটল দেখা দিল। যে কমন-পুল-অব-রিসোর্স ছিল, তার অদক্ষ ব্যবহার শুরু হল। জার্মানী যতই বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বাড়ালো গ্রীস, ইতালী ও স্পেনের ঘাটতি বাড়তে থাকল। এই অবস্থায় গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়ে এল আমেরিকায় অর্থনৈতিক দুর্যোগ – যার শুরু হল রিয়েল এস্টেট বাবলের হাত ধরে। দুর্যোগের মূল কারণ যেহেতু ছিল অত্যাধিক ও সহজলভ্য ঋণ, বিপর্যয়ের পরে সব ব্যাঙ্কই ঋণ দেওয়ার আগে দশবার ভাবতে শুরু করল। যে অর্থনীতিগুলোর অবস্থা ততটা ভাল ছিল না, অর্থাৎ যারা সামর্থ্যের বেশী ঋণ নিয়ে রেখেছিল – তাদের কপাল পুড়ল। তবে বলে রাখা ভাল, গ্রীসের ক্ষেত্রে অত্যধিক ঋণের জন্য দায়ী যেমন সরকার – স্পেনের ক্ষেত্রে কিন্তু মর্টগেজ আর রিয়েল এস্টেট বাবল মূল ঋণ-গ্রহীতা। অর্থাৎ স্পেন সরকার চুক্তি মেনে চলেও ঋণের বোঝায় ডুবে গেছে। এই অবস্থায় ব্যাঙ্ক সব জায়গায় ঋণে সুদের হার আর সমান রাখল না – দুর্বলতর অর্থনীতিতে ঝুঁকি যতই বাড়তে থাকল, সুদের হারও তেমন চড়চড় করে উঠতে শুরু করল। স্পেনে যারা বাড়ি কিনেছিল – তাদের ধার শোধ করা আরও শক্ত হয়ে গেল।

এই অবস্থায় সোজাসাপটা পথ দুটো – প্রথমটা হল খরচা কমিয়ে দেওয়া। খরচা কমানোর মানে বাজার কমে যাওয়া, মানে মন্দা – এদিকে মন্দা তো ২০০৮ থেকেই চলছে। যার মানে মন্দা আরো জাঁকিয়ে বসবে। এর মানে স্পেন, ইতালী, পর্তুগাল বা গ্রীসে আরো বেশী লোকে ধার শোধ করতে পারবে না। মন্দার মানে রাজনৈতিক অশান্তি – মানে বাজার থেকে আরও বিনিয়োগ বেরিয়ে যাবে, অর্থাৎ আরও মন্দা। অন্য পথটা হল খরচা না কমানো। কিন্তু এর মানে হল আরো বড় সমস্যার দিকে এগিয়ে যাওয়া। সব দেশেরই ঋণভার বেড়ে চলেছে – এভাবে চললে আরও ঋণভার বাড়বে, কারণ ঋণ কমানোর কোনও দায় থাকবে না। আস্তে আস্তে সবাই মিলে ডুববে একই সমুদ্রে। অনেকেরই মনে হতে পারে, জার্মানীই সবথেকে সুবিধাজনক অবস্থায় আছে ইউরোপীয় অর্থনীতিতে। কথাটা সত্যি হলেও তাদেরও হাত-পা বাঁধা। হঠাৎ করে তাদের মুখ্য বাজারে মন্দা দেখা দিলে তাদের অর্থনীতিতে আরও বড় ধাক্কা দেখা দেবে – তা নিয়ে কারও দ্বিমত থাকার কারণ নেই। তাছাড়া, এককালীন ঋণ-ডিফল্টে তাদের দুই ট্রিলিয়ন ডলার গচ্চা যাবে বলেও মনে করা হচ্ছে। তাই চাইলেও জার্মানী ডিভোর্স পাচ্ছে না – নিজের লাভের কথা ভেবেই শুধু বুলি আউড়েই শান্ত থাকতে হচ্ছে। অবশ্য তারা সুযোগ বুঝে তর্জন-গর্জন করা কমাচ্ছে না। তাদের বক্তব্য – গ্রীসসহ দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলোর অর্থনীতির রাশ আরও কড়া হাতে ধরতে হবে। বিশেষত গ্রীসের ওপর সকলেই বিশেষভাবে খাপ্পা – কারণ গ্রীসের ঋণগ্রহীতা সরকার। তাই সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন শর্ত, যার মধ্যে আছে সরকারী কর্মচারীদের বেতন-হ্রাস বা শিক্ষা-স্বাস্থ্য-খাতে টাকা কমানোর শর্তও। সম্প্রতি গ্রীসের ভোটের ফলাফলে মনে হয়েছে – গ্রীসের জনগণও সেটা মেনে নিয়েছে। আপাতত মনে হয় আগামী বছর কয়েক ইউরোপ খরচ কমানোর পথেই হাঁটবে। আর ইউরোপের ওপর জার্মানীর কর্তৃত্ব আরও জোরদার হবে।

ইউরোপের এই দুর্যোগের মধ্যে একটা কথা কেউ বলছে না – সেটা হল এশিয়ার কথা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন তৈরীর সময় বলা হয়েছিল গাড়ি-শিল্পের কথা। জার্মান গাড়ি শিল্পের জন্য যন্ত্রপাতি তৈরীর শিল্প ইতালি বা স্পেনে তৈরী হবার কথা ছিল। তার জায়গায় সেই যন্ত্রপাতি এখন আসছে চিন, জাপান বা থাইল্যান্ড থেকে। অর্থাৎ, ইউরোপের ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পের নিচের দিকটা (Low value added parts) নিয়ে নিয়েছে এশিয়া। জার্মানী থেকে আসা ঋণের টাকায় ইতালী বা স্পেন শিল্পের পরিকাঠামো বানায় নি – বিনিয়োগ করে গেছে রিয়েল এস্টেট বাবলে। খেসারত দিতে হচ্ছে তাদের।

পর্তুগালের অর্থনীতির সমস্যার একটা দিক বেশ মজার। বছরের পর বছর যেই অ্যাঙ্গোলাকে শোষণ করে পর্তুগালের সম্পদ এসেছিল, আজকে সেই অ্যাঙ্গোলাই পর্তুগালের অর্থনীতির ভরসা। উপনিবেশিকতার সূত্রে অ্যাঙ্গোলার সরকারী ভাষা পর্তুগীজ। আর তাদের অর্থনীতিতে এখন বুম চলছে – তেলের আবিষ্কারের হাত ধরে। স্বভাবতই দলে দলে পর্তুগীজ ইঞ্জিনিয়ার-ডাক্তার দেশের ২৫% বেকারী এড়িয়ে চাকরি জোটাতে পাড়ি দিচ্ছে অ্যাঙ্গোলার দিকে। না – এবারে আর রাইফেল হাতে নয় – হাতে রেসিউমে – লক্ষ্য ভালো চাকরি, ক্ষমতা দখল নয়। পর্তুগাল এখন অ্যাঙ্গোলা থেকে যা রেমিট্যান্স আনে, তার থেকে কম আনে ব্রিটেন থেকে। নিয়তির পরিহাসে অ্যাঙ্গোলা এখন আর পর্তুগাল থেকে বিশেষ একটা রেমিট্যান্স পায় না।

ইউরোর সমস্যা দেখে ট্র্যাজেডি অব কমনসের কথাই বারবার মনে হয়। মৌলিক-ভাবে ভিন্ন ধারার কয়েকটি অর্থনীতি যদি একসাথে চলতে চায় তাহলে তাদের মধ্যে “কমন-পুল-অব-মানি” সবাই নিজের দিকে টেনে নিতে চাইবে। সবাই বেশী বেশী করে ধার করবে, কারণ পতন ঠেকানোর দায় তাদের একার নয় – বাকিদেরও। উলটোপথে হেঁটে বরং জার্মানী এখন দুই ট্রিলিয়ন ডলার গচ্চা দেওয়ার মুখে। তাই প্রথম থেকেই রেগুলেশন ব্যাপারটা জোরেসোরে না কাজে লাগালে এইরকম অর্থনৈতিক গাঁটছড়া টিকবে না – ভবিষ্যতেও না। তবে এটাও জেনে রাখা ভাল – জাপান, চিন বা জার্মানীর মত রপ্তানী-নির্ভর দেশ সব দেশের পক্ষে হওয়া সম্ভব না – পুরোনো পাটিগণিতের নিয়মেই সম্ভব না। বিক্রেতা বা উৎপাদক আছে বলেই ভোক্তা আছে – এটাও যেমন ঠিক, এর উল্টো-টাও তেমনভাবেই সত্য। তাই জার্মানীর মত দেশকেও নিজের উৎপাদন যাতে ভোগের তুলনায় খুব বেশী না হয়ে যায় – তার দিকে নজর রাখতে হবে।

জার্মানী এর আগে দু-বার ইউরোপের কর্তৃত্ব নিতে চেয়েছিল। দুবারেই যুদ্ধের হাত ধরে। আর দুবারেই পরিণতি হয়েছিল করুণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমস্ত অর্থনৈতিক দায় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল জার্মানীর ওপর – যার পরিণতিতে জার্মান মুদ্রায় এতটা মুদ্রাস্ফীতি হয়েছিল যে ১৯২৩ সালে এক মার্কিণ ডলারের বিরুদ্ধে ৪ ট্রিলিয়ণ জার্মান মার্ক পাওয়া যেত (১৯১৪ সালে ১ ডলার ছিল ৪ মার্ক)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পরে ভেঙে তাদের দু-টুকরো করে দেওয়া হল, যা জোড়া লাগতে দীর্ঘ ৪৫ বছর সময় লাগল। যদি গ্রীসের মত ইতালী, স্পেন আর পর্তুগালকেও জার্মানী নিজের “প্যাকেজে” রাজী করিয়ে ফেলতে পারে – তাহলে দীর্ঘদিনের জন্য অর্ধেক ইউরোপ জার্মানীর কার্যত উপনিবেশে পরিণত হবে। ঋণের বোঝা থেকে চট করে মুক্তি মিলবে না, অথচ জার্মান পণ্য তাদের কিনে যেতে হবে – মানে দেশে শিল্প সম্ভাবনা কম। হিটলার যে কাজটা সমরাস্ত্র দিয়ে করে দেখাতে পারেননি, কর্মঠ জার্মানরা অর্থনীতির হাত ধরে তাই করে দেখিয়ে দিচ্ছে – এভাবেও ফিরে আসা যায়।

আরো কিছু সহজপাঠ্য –
১) তিন ধাপে ইউরোপের ক্রাইসিস
২) বিবিসি থেকে
৩) গ্যারেট হার্ডিনের পেপার
৪) বিবিসির ডকুমেন্টরি

প্রথম ছবিটি এন-পি-আর ব্লগ থেকে, দ্বিতীয় ও তৃতীয়টি উইকি থেকে ও চতুর্থটি নিউ-ইয়র্ক টাইমস ব্লগ থেকে নেওয়া।

Advertisements

পারভেজ হুদভয়ের চোখে আজকের পাকিস্তান

ডিসেম্বর 25, 2012

সচলায়াতনে পাকিস্তানী হিউম্যানিস্ট কোনো লেখকের লেখা প্রকাশিত হয় নি। আমি পারভেজ হুদভয়ের একটা সময়পোযোগী সাক্ষাৎকার বাংলায় অনুবাদ করে দিলাম। এম-এই-টি থেকে পি-এইচ-ডি করা পারভেজ হুদভয় ১৯৭৩ সাল থেকে পাকিস্তানের কায়েদে আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক। ইনি পাকিস্তানে মশাল নামে একটি সংগঠনেরও পরিচালক। এই সংগঠনের কাজ হল নারীশিক্ষার প্রসার ও পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি। বিজ্ঞান-সচেতনতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে নির্মিত ওনার ১৩ পর্বের ডকুমেন্টরিও পাকিস্তান টিভিতে প্রচারিত হয়েছে। ২০০৩ সালে বিজ্ঞানশিক্ষা প্রসারের ওপর কাজ করার জন্য ইউনেস্কো থেকে উনি বিশেষ পুরষ্কার পান।

নিচের সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ক্রিশ্চিনা ওটেন, জার্মান ফোকাস পত্রিকার জন্য। এটা প্রকাশিত হয়েছে কাউন্টারকারেন্টসে, গত ১৫ই ডিসেম্বর।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক মুম্বই হামলার পরে ক্রমাগত খারাপ হয়েই চলেছে। যুদ্ধ লাগার সম্ভাবনা কতটা?

জনগণের দাবী সত্ত্বেও মনমোহন সরকার সীমান্ত পেরিয়ে কোনো আক্রমণ করেনি। দেশে অনেকের সমালোচনা সত্ত্বেও পাকিস্তান সরকার লস্কর-ই-তৈবার বিরুদ্ধে কিছু ব্যবস্থা নিচ্ছে। হয়ত এখন আর কিছু হবে না, তবে এখনকার মত কোনো সম্ভাবনা না থাকলেও আরো একবার একই রকমের হামলা হলে ব্যাপারটা যুদ্ধের আকার ধারণ করতেই পারে।

লস্কর-ই-তৈবার সাথে আর সন্ত্রাসী দলগুলোর তফাৎ কোথায়? পাকিস্তান কি সত্যিই এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে?

আজ থেকে বছর পনের আগে আই-এস-আই আর আর্মির হাত ধরে কাশ্মীরে ভারতীয় সেনার বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করার জন্য লস্করের গোড়াপত্তন। আজকের দিনে এরা খুব বিরল প্রজাতির সন্ত্রাসী দল যাদের পাকিস্তানী রাষ্ট্র বা সেনাবাহিনী সম্পর্কে কোনো অভিযোগ নেই, কিন্তু বাকি সকলেই এদের শত্রু হয়ে গেছে। এখন শুনছি পাকিস্তান কিছু লস্কর সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। সময়ই বলে দেবে এটা আন্তর্জাতিক চাপ কমানোর চেষ্টা না সত্যিকারের সন্ত্রাসদমন প্রচেষ্টা। যদি সত্যিকারের প্রচেষ্টা হয়ে থাকে, তাহলে কিছু সময়ের মধ্যেই আর্মি আর আই-এস-আই এর সাথে এদের শত্রুতা দেখা দেবে, যেমনটা হয়েছিল জৈশ-ই-মহম্মদের ক্ষেত্রে।

মুম্বাই গণহত্যা সম্পর্কে পাকিস্তানের জনগণের প্রতিক্রিয়া কি?

৯/১১ এর পরে যেমন আনন্দোৎসব দেখা গিয়েছিল, সে জায়গায় মুম্বই হামলার পরে পাকিস্তানি জনগণ প্রাথমিকভাবে ভারতের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। কিন্তু ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো যখনই পাকিস্তানকে দোষ দেওয়া শুরু করল, তখন প্রথমে ক্রোধ ও পরে অস্বীকারের রাস্তায় হাঁটতে থাকে সবাই। পাকিস্তানের মাটি থেকেই আক্রমণের ছক কষা হয়েছে – এ দাবী তারা মানতে নারাজ। জনপ্রিয় টিভি-নিউজ ব্যক্তিত্বরা সবাই টিভিতে এসে একের পর এক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব খাড়া করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বছর কয়েক আগে এই ব্যক্তিত্বরাই কান্দাহার বিমান ছিনতাই মামলায় র’-এর ছায়া দাঁড় করিয়ে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছিল, যার কোনোটাই ধোপে টেঁকেনি। পাকিস্তান যে কারগিলের ঘটনায় জড়িত, তা-ও এরা হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। সমঝোতা এক্সপ্রেসের বোমা হামলার উল্লেখ করে এখন তারা একে একে হিন্দু জঙ্গী গোষ্ঠী, আমেরিকা বা ইহুদীদের দোষারোপ করে।

পাকিস্তান অনেককাল ধরেই বলে আসছে যে ভারতের দিক থেকে হামলার আশঙ্কা করলে তারাই প্রথম নিউক্লিয়ার হামলা করবে। পাকিস্তানে সেরকম কোনো সম্ভাবনা দেখছেন আপনি?

মুম্বাই হামলার সপ্তাহখানেক আগে জারদারি আশ্বস্ত করেছেন যে পাকিস্তান কখনই প্রথমে নিউক্লিয়ার আক্রমণ করবে না। ভারতও বছর দশেক আগেই এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে জারদারির এই দাবী ভিত্তিহীন কারণ পাকিস্তান আর্মির পক্ষ থেকে এরকম কোনো বক্তব্য রাখা হয় নি। সবাই জানে, পাকিস্তানে আর্মির হাতেই নিউক্লিয়ার বোমা আছে। অনেকদিন ধরেই বিভিন্ন বিশেষজ্ঞরা পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সিমুলেশন করে সিদ্ধান্তে এসেছেন যে কোনোভাবে যুদ্ধ শুরু হলে নিউক্লিয়ার বোমাতে গিয়েই যুদ্ধ শেষ হবে।

সন্ত্রাসীরা আফগানিস্থান আর সেখানের পশ্চিমি সেনাদের ছেড়ে কেন ভারতকে লক্ষ্য হিসাবে বেছে নিল?

লস্করের মূল ঘাঁটি হল লাহোরের কাছে ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে অবস্থিত মুর্দিকে শহরে। এই শহরে এদের আছে একটা বড় ট্রেনিং ক্যাম্প আর সমাজসেবক সংস্থা। লস্করের অধিকাংশ সদস্যই পাঞ্জাবী, তাই এরা আফগানিস্থানে লড়াই করার পক্ষে অনুপযুক্ত, কারণ এরা সহজে পাশতুন বা আফগানদের সাথে মিশে যেতে পারে না। লস্কর হল ভারতমুখী ও কাশ্মীরমুখী একটি সন্ত্রাসী দল। কিন্তু, পাকিস্তানের অন্যান্য জঙ্গীগোষ্ঠীদের মতই এরাও ভারত, আমেরিকা আর ইসরায়েলের মধ্যে বোঝাপড়া আছে বলে মনে করে। তাই, এরা সবাই এই দেশগুলোর শত্রু।

মুম্বই-সন্ত্রাসীদের হামলার দাবী কি ছিল?

সব জিম্মিদের হত্যা করা হয়েছে আর কোনো দাবী সরকারীভাবে প্রকাশিত হয় নি। লস্কর বা সমধর্মী পাকিস্তানি জঙ্গীগোষ্ঠীদের উদ্দেশ্য খুবই পরিষ্কার। এই ক্ষেত্রে, ভারতের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কেন্দ্রস্থল হিসাবে মুম্বইকে আক্রমণ করা হয়েছে, হয়ত ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বাধিয়ে দেওয়াও উদ্দেশ্য ছিল। ভারত-সীমান্তে পাকিস্তানী সেনা সরালে তাদের দলের তালিবানদের সুবিধা হবে। ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিন্দু দক্ষিণপন্থীদের হাত শক্ত করাও এদের লক্ষ্যের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, কারণ এর ফলে এদের দলে আরো নতুন মুখ পাওয়া সোজা হবে। সবেশেষে, অমুসলিমদের বিরুদ্ধে ক্ষোভের উদ্গিরণও ঘটেছে এই আক্রমণে।

পশ্চিমা সাংবাদিকেরা বলছেন আল-কায়দা আর লস্কর-ই-তৈবা এখন যৌথ কার্যক্রম চালাচ্ছে, এ বিষয়ে আপনার মত কি?

এদের উদ্দেশ্য একই রকম হলেও সামান্য কিছু মতাদর্শগত তফাৎ থাকতেই পারে। সন্ত্রাসীদের দুনিয়ায় সামান্য মতাদর্শের পার্থক্যই দুই দলের মিলিত কার্যক্রমের জন্য যথেষ্ট প্রতিবন্ধকতা হয়ে দেখা দিতে পারে। এখনও অবধি এদের যৌথ কার্যক্রমের কোনো পরিচয় পাওয়া যায় নি, তাই এই ধারণাকে আমি এখনও সন্দেহাতীত বলে মনে করি না।

এই সন্ত্রাসে কাশ্মীরের ভূমিকা কতটা?

কাশ্মীরে ১৯৮৭ থেকেই বিপ্লব চলছে। ১৯৮৭ সালের ভোটে ব্যাপক আকারে কারচুপির ফলে এক গণবিক্ষোভ সৃষ্টি হয় যা ভারত সেনা পাঠিয়ে বলপূর্বক দমন করে। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এই সুযোগে এক গোপন যুদ্ধ শুরু করে ভারতের বিরুদ্ধে। ইউনাইটেড জিহাদ কাউন্সিল বলে এক ২২টি পাকিস্তানী সংগঠনের সমবায় সংস্থা সেনা ও আই-এস-আই-এর সহায়তায় তাদের কার্যকলাপ চালিয়ে যায়। এদের সহায়তায় জেনারেল মুশারফ ১৯৯৯ সালে কারগিলে যুদ্ধ শুরু করেন। এতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্ষতি হলেও পাকিস্তানও শেষমেষ সেনা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। জেনারেল মুশারফ যুদ্ধে বিজয়ীর মর্যাদা পান, আর ভীরু বলে চিহ্ণিত হন নওয়াজ শরিফ। এর পরের ঘটনা সবারই জানা।

পাকিস্তানি সমাজের কোন অংশ আল কায়দা আর ওসামা বিন লাদেনকে সমর্থন করে?

বালুচিস্তান আর সিন্ধে ওসামার প্রতি সমর্থন পাঞ্জাব আর উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের তুলনায় অনেক কম। মজার কথা হল পাকিস্তানের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী নিজেরা পশ্চিম-ঘেঁষা জীবনযাপণ করেন আবার ওসামার প্রতি সমর্থন বা পশ্চিম-বিদ্বেষও তাদের মধ্যেই বেশী। আমি খুবই অবাক হই যখন তালিবান আত্মঘাতী ঘাতকেরা দেশের মসজিদ, শোকসভা, হাসপাতাল, মেয়েদের স্কুল আক্রমণ করে বা নিরীহ পুলিশদের মেরে ফেলে অথচ তাদের বিরুদ্ধে কিছু শোনা যায় না। জনগণ এতটাই আমেরিকা-বিরোধী যে এই ঘটনাগুলোও তাদের মনে দাগ কাটে না। অনেক সময় পাকিস্তানী বামপন্থীরাও তালিবানদের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী শক্তি বলে ভুল ভেবে বসে।

এ বিষয়ে আপনার মতামত কি? এই তালিবানদের কি সত্যিই পাকিস্তান-সমাজে কিছু অবদান আছে?

পৃথিবীর সর্বত্র মানুষ যা চায় পাকিস্তানীদেরও তাই দাবী। খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান, চাকরি-বাকরি, উন্নত বিচারব্যবস্থা ও উন্নয়নমুখী সরকার আর সুরক্ষা। এর সাথে আছে শিক্ষা ও চিন্তা ও ধর্মাচরণের স্বাধীনতা যা ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইটস ডিক্লারেশনে আছে। এর পরে আসে দেশের সার্বভৌমত্ব, বিদেশনীতি ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যু। এ কারণে, পাকিস্তানে এই তালিবান-গোত্রীয়রা কোনো অবদান রেখেছে বলে মনে হয় না। তারা পরিবার-পরিকল্পনা-বিরোধী, সংখ্যালঘু-বিরোধী, নারীশিক্ষার বিরোধী। বহির্বিশ্ব সম্পর্কে এদের কোনো জ্ঞান নেই, জানার কোনো ইচ্ছাও নেই। তারা শুধু যুদ্ধের মাধ্যমেই সমাধান খোঁজে। পাকিস্তানে এবারের ভোটে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে জনগণ এদের পছন্দ করে না।

২০০২ এর জানুয়ারীতে পারভেজ মুশারফ ঘোষণা করেছিলেন যে পাকিস্তানের জমি ব্যবহার করে কেউ সীমানা পেরিয়ে আক্রমণ চালাতে পারবে না। সেই প্রতিশ্রুতি কি রাখা হয়েছিল?

এই ঘোষণার পরে সত্যিই সীমানা পেরিয়ে আক্রমণ অনেকটা কমে গিয়েছিল, কিন্তু কোনোভাবেই নির্মূল হয়ে যায় নি। অক্টোবরের ভূমিকম্পের পরে আমি নিজে ত্রাণের কাজে আজাদ কাশ্মীরের বিভিন্ন অংশে ঘুরে এসেছি। দেখেছি – লস্কর-ই-তৈবা, জৈশ-ই-মুহম্মদ বা সিপাহী-ই-সাহেবা আর অন্যান্য নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন ত্রাণ বিলি করছে। এদের ত্রাণ বিতরণের পরিকল্পনা পাকিস্তান সরকার বা আর্মির চেয়ে অনেকগুণ উন্নত – এমনকি আহত সেনাদেরও এরা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করেছে। অথচ, পারভেজ মুশারফকে কয়েক মাস পরে এ কথা বলাতে দেখলাম উনি রেগে যাচ্ছেন, যেন এই দলগুলো নিয়ে আলোচনাও নিষিদ্ধ।

পাকিস্তানে কিছু গোষ্ঠী আছে যারা আমেরিকা-বিরোধী ও কড়া ধর্মীয় আইন প্রবর্তন করার পক্ষে, আর উল্টোদিকে দেশের সরকার আমেরিকার বন্ধুদেশ বলে নিজেদের দাবী জানায়। এই মেরুকরণের কারণ কি? পাকিস্তানে উগ্রবাদের উত্থানে এই মেরুকরণের ভূমিকা কতটা?

পাকিস্তানে মৌলবাদী শক্তির উত্থানের মূলে আছেন আমেরিকা ও রোনাল্ড রেগানের সমর্থিত পাকিস্তানী জেনারেল জিয়া উল হক। আজ থেকে বছর পঁচিশেক আগে, এই দুই নেতা হাত মিলিয়ে আফগানিস্তানে সোভিয়েতদের তাড়ানোর জন্য দেশে উগ্রবাদী শক্তির বীজ বপন করেন। সেই সময়ে মৌলবাদের প্রসারে আমেরিকা খুশীই হত, কারণ সেই প্রসার তাদের লক্ষ্যপূরণের মাধ্যম হিসাবে কাজ করত। সেই একই সময়ে, জেনারেল জিয়ার আমলে সারা দেশে একটা সামাজিক পরিবর্তন দেখা দেয়। সব সরকারি অফিসে নামাজ পড়া বাধ্যতামূলক করা হল, জনসমক্ষে অপরাধীদের বেত্রাঘাত করা শুরু হল, রমজানে উপোস না করলে শাস্তির ব্যবস্থা করা হল, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের সময় ইসলাম সম্পর্কিত জ্ঞানেরও পরীক্ষা নেওয়া শুরু হল এবং সব মুসলিমদের জন্য জিহাদ বাধ্যতামূলক করা হল। কিন্তু আজকে সেই উগ্রবাদীদের সাথেই সরকারের লড়াইতে যেতে হয়েছে, আবার সেই আমেরিকারই নির্দেশে। দেশের আর্মি ও সরকার আমেরিকার সাথে থাকলেও তাই জনগণ স্বাভাবিকভাবেই আমেরিকা বিরোধী।

প্রেসিডেন্ট জারদারি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে উনি উগ্রবাদীদের খুঁজে তাদের ট্রেনিং ক্যাম্প ধ্বংস করবেন। কিন্তু কাজে সেরকম কোনো লক্ষণ দেখছি না। উনি কি এর চেয়ে বেশী কিছু করতে চান না? নাকি এর থেকে বেশী কিছু করার ক্ষমতাই ওনার নেই?

আসল ক্ষমতা পাকিস্তানের আর্মির হাতে। এই উগ্রবাদীদের সাথে লড়াইতে দু’হাজার সেনা মারা পড়েছে। তাও আর্মি ভেতর থেকে নিশ্চিত নয় যে এই উগ্রবাদীরা পাকিস্তান দেশটাকে বাঁচিয়ে রাখার পরিপন্থী। আমি এদের এই দ্বিধার কারণ বুঝি। বছরের পর বছর ধরে আর্মিতে এই বুঝিয়ে লোক নেওয়া হয়েছে যে তারা ভারতের সাথে যুদ্ধ করবে ও ইসলামকে রক্ষা করবে। কার্যত, এখন তারা লড়াই করছে এমন এক দলের সাথে যারা ইসলামের আরো বড় রক্ষক। শুধু তাই নয়, আর্মিকে এখন ভারতের সাথে যুদ্ধও করতে হচ্ছে না। এই ধোঁয়াশা থেকেই তাদের ডিমরালাইজেশন আর তার সাথে যোগ হয়েছে গণসমর্থনের অভাব। উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে পাকিস্তানী সেনাদের অনেকেই তাই যুদ্ধের আগেই আত্মসমর্পণ করে দিচ্ছে।

সরকারের উগ্রবাদ-বিরোধী যুদ্ধ কি আপনি সমর্থন করেন?

জীবনে এই প্রথমবারের মত আমি মনে করি আর্মিকে সমর্থন করা দরকার, যতক্ষণ তারা নিরীহ লোকদের ছেড়ে শুধু উগ্রবাদীদের খুঁজে মারতে পারবে। দুঃখের বিষয়, নিজেদের কাজ কমানোর জন্য আর্মি এখন কোনো গ্রামে কিছু উগ্রবাদী আছে বলে সন্দেহ করলেই গোটা গ্রামশুদ্ধু উড়িয়ে দিচ্ছে। এরকম নিরীহ মানুষ হত্যা করা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।

পাকিস্তান একসময় তালিবানদের অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছে। আল-কায়দার সদস্যদের ধরে দেবার জন্য সদস্যপিছু পাকিস্তানকে সি-আই-এ টাকা দেয়। সেই টাকা নাকি পাকিস্তান উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে তালিবানদের সাহায্য করার জন্য ব্যবহার করে?

আর্মি তালিবানদের হাতে পর্যুদস্ত হলেও তারা এখনও “ভাল” আর “খারাপ” তালিবানদের মধ্যে তফাৎ করে। “ভাল” তালিবানেরা শুধু আমেরিকা, ন্যাটো ও ভারতীয়দের লক্ষ্য করে আক্রমণ চালায়, আর “খারাপ” তালিবানেরা পাকিস্তানের আর্মির বিরুদ্ধেও আক্রমণ চালিয়ে যায়। যখন আমেরিকানরা আফগানিস্তান থেকে চলে যাবে, এই “ভাল” তালিবানেরা তখন আফগানিস্তানের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কে সাহায্য করবে। জালালুদ্দিন হাক্কানি এরকমই এক “ভাল” তালিবান নেতা। আবার মৌলানা ফজলুল্লাহের মত নেতা হলেন “খারাপ” তালিবান কারণ এরা পাকিস্তান আর্মিকেও ছেড়ে কথা বলেন না। আর্মি সাধারণত এদের “ভারতের চর” আখ্যা দিয়ে প্রচার চালায়।

পাকিস্তান নিউক্লিয়ার স্টেট। এই নিউক্লিয়ার বোমা তালিবান বা আল কায়দার হাতে চলে যাবার সম্ভাবনা কতটা?

আমি বেশী চিন্তিত এই ভেবে যদি কোনোভাবে কিছু নিউক্লিয়ার বোমা তৈরীর অন্তর্বর্তী পদার্থ (সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম) তাদের হাতে চলে যায়। মজার কথা পশ্চিমের দেশগুলো আজকাল নিউক্লিয়ার অস্ত্র তৈরীতে ততটা মনযোগী নয়। নিউক্লিয়ার বোমা আজ আর ক্ষমতার মেরুকরণ করে না, কারণ সুস্থচিন্তার কোনো রাষ্ট্র কখনই এই বোমা ব্যবহার করতে পারবে না। এর ফলে আজকে নিউক্লিয়ার বোমা পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকেই সম্পূর্ণ দূর করা সম্ভব। জঙ্গীদের হাত থেকে বোমা বাঁচানোর এই একটা পথই খোলা আছে।

আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষার্থে ভারত কি করতে পারে?

ভারতের কোনোমতেই পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধে যাওয়া উচিত নয়। এমনকি যদি ভারত জেতেও, তাহলেও তাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বিশাল হবে। কোনো ছোটো হামলাও আঞ্চলিক স্বার্থবিরোধী হবে, কারণ এর ফলে জঙ্গীদের সাথে আর্মির আঁতাত আবারও মজবুত হবে। আর কোনো ছোটো হামলার প্রতিক্রিয়া অনেক বড় হয়ে দেখা দিতে পারে। পাকিস্তানে জঙ্গীঘাঁটি বন্ধ করে দেবার দাবী আমি সমর্থন জানাই, কিন্তু সেই কাজটা পাকিস্তানের নিজেরই করা উচিত। আঞ্চলিক ভারসাম্যের জন্য, পাকিস্তান ও ভারত, উভয় দেশেরই উচিত নিজের নিজের দেশ থেকে দক্ষিণপন্থী ও মৌলবাদী শক্তিকে কড়া হাতে উচ্ছেদ করা।

এই লড়াই-এর অন্তিম ফলাফল সম্পর্কে আপনার ভবিষ্যৎবাণী কি? পাকিস্তানে উগ্রবাদীরাই জিতবেন, না পশ্চিমারাই আর্মির সাহায্যে তাদের পরাজিত করতে সক্ষম হবেন?

সমস্যা খুবই গুরুতর কিন্তু সমাধান অসম্ভব কিছু নয়। গত এক দশকে আমেরিকার সাম্রাজবাদী নীতি ও ইরাক আক্রমণের ফলে জনমানসে আমেরিকা বিরোধী এক মনোভাব তৈরী হয়েছে যার ফলে যারাই আমেরিকার বিরোধিতা করছে তাদেরই তারা সমর্থন করতে পিছপা হচ্ছে না। পাকিস্তানীরা তালিবানদের সামাজিক ও আচার-আচরণগত নীতি সমর্থন করে না। অথচ তারা আমেরিকা-বিরোধী বলে গণসমর্থন পায়। আমি আশা রাখছি বারাক ওবামা ক্ষমতায় এলে আমেরিকা পাকিস্তানের যে ক্ষতি করেছে তার কিছু ক্ষতিপূরণ করবে। কিন্তু মূল কথা হল, পাকিস্তানীদের নিজেদেরই এই সমস্যা সমাধান করতে হবে, বুঝতে হবে কোনো সভ্য দেশ হিসাবে দাঁড়াতে গেলে এসব চলে না। পাকিস্তানকে পশ্চিমা সমর্থন কিছুটা গোপন রাখতে হবে হয়ত। একই ভাবে, পাকিস্তানকে আলাদা করে শাস্তি দিলে বা কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে তালিবান বা সমগোত্রীয়রা রাষ্ট্রের আরো বেশী ক্ষমতা দখল করে ফেলবে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এর চেয়ে বড় কোনো দুশ্চিন্তার কারণ নেই।

ষাট বছরে ভারত

জানুয়ারি 11, 2008

ভারতের স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহ সম্প্রতি CNN-IBN চ্যানেলের হয়ে স্বাধীন ভারতের দশটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তুলে ধরেছেন, যেগুলোকে স্বাধীন ভারতের যাত্রাপথে বিভিন্ন মোড় বলে ভাবা যেতে পারে। কোনো ঘটনা ভাল প্রভাব এনেছে তো কোনোটি খারাপ। তবে ভারতীয় জনমানসে এই ঘটনাগুলোর স্মৃতি বা পরিণতি বহুকাল থাকবে। ঘটনাগুলোর মধ্যে আটটি রাজনৈতিক ও বাকিদুটোকে অরাজনৈতিক বলা চলে।

প্রথমটি শুরু হয় কাশ্মীরের ভারত সংযুক্তি নিয়ে। পাকিস্তান কাশ্মীর আক্রমণ করলে, স্বাধীন জম্মু ও কাশ্মীরের রাজা হরি সিং ও নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ আবদুল্লা ভারতের সাথে প্রতিরক্ষার বিনিময়ে ‘Treaty of Accession’-এ সই করেন। চুক্তিমত ভারত পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ করে। এক শান্তিপূর্ণ গণভোটের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে জাতিসংঘ যুদ্ধ থামালেও পরবর্তীকালে ভারত ও পাকিস্তান কেউই গণভোটে কোনোরকম আগ্রহ না দেখিয়ে কাশ্মীর নিয়ে বারবার যুদ্ধে লিপ্ত হয়। অপরদিকে, কাশ্মীরের জনগণ তাদের বলপূর্বক ভারতভুক্তির প্রতিবাদে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করে। কাশ্মীর ছাড়াও আরো কিছু রাজতন্ত্রের বলপূর্বক ভারতভুক্তি নিয়ে আজও প্রশ্নচিহ্ণ থেকে গেছে।

দ্বিতীয়টি হল ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারক সংবিধান রচনা। ১৯৪৯ সালে রচিত এই সংবিধান ১৯৫০ সালে কার্যকর হয়। সংবিধানের সাহায্যে ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের পথ চলা শুরু হলেও পরবর্তীকালে বারবার সংবিধান লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে স্বাধীন ভারতে।

তৃতীয় ঘটনা হল ১৯৫২ সালের প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচন। নির্বাচন চলাকালে লোকজনের উৎসাহ ও উদ্দীপনা ছিল তা আজো দেখা যায় না। ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসেন স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু, কিন্তু ভোটের অঘোষিত নায়ক ছিলেন সুকুমার সেন, ভারতের প্রথম নির্বাচন কমিশনার। তিনি ভোট পরিচালনায় বহু অদ্ভূত পন্থা অবলম্বন করেছিলেন যা সমসাময়িক বিশ্বে নজিরবিহীন। তবে তখনকার মত এখনো ভোটপ্রক্রিয়ায় জনগণের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্নচিহ্ণ রয়েই গেছে। তবে, শুরু থেকেই ভোটে সব ভারতীয়র ভোটাধিকার ছিল, যা তৎকালীন বিশ্বে হাতে গোনা কয়েকটি দেশে পাওয়া যেত, ছিলনা আমেরিকা বা সুইজারল্যান্ডেও।
(আমি এবিষয়ে খুঁজে দেখলাম ভারতেও যৌন প্রতিবন্ধীদের(হিজড়ে) ভোটাধিকার দেওয়া হয় নব্বই-এর দশকে – সুতরাং সবার ভোটাধিকার ছিল না। বর্তমানে লোকসভায় একজন প্রতিনিধিও এই গোষ্ঠিভুক্ত।)

চতুর্থ হল পঞ্চাশের দশকের ভাষাভিত্তিক রাজ্য-পুনর্গঠন। ১৯৫২ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামী পট্টি শ্রীরামালু তেলেগুভাষী অন্ধ্রপ্রদেশের জন্য ৫৮ দিন অনশনের পরে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যু এক আন্দোলনের সুচনা করে যার ফলশ্রুতিতে গঠিত হয় সহায়তা কমিশন। কমিশনের বক্তব্য অনুসারে গঠিত হয় কেরল, অন্ধ্র ও কর্নাটক। পরে বাকি রাজ্যগুলোও পুনর্বিন্যস্ত হয় একই প্রক্রিয়ায়। ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠনের সাথে সাথে সব রাজ্যকে নিজস্ব ভাষায় রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়, যার ফলে আজও হিন্দিকে জাতীয় বা সরকারি ভাষা হিসাবে কেন্দ্র চাপিয়ে দিতে পারেনি।

পঞ্চম ঘটনা হল পোখরাণের পরমাণু বোমা পরীক্ষা। এর মধ্যে নেহেরুর জায়গায় এসে গেছেন ইন্দিরা, নেহেরুর সুযোগ্য কন্যা। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭৪ অবধি গবেষণার ফল হিসাবে ভারত ষষ্ঠ দেশ হিসাবে পরমাণু শক্তিধর হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। রামচন্দ্র গুহর মতে, এই ঘটনার পর থেকে গান্ধীবাদী শান্তিকামী বিদেশনীতি ভারত ধীরে ধীরে বর্জন করে আন্তর্জাতিক সুবিধাবাদী বিদেশনীতি গ্রহণ করে।

ষষ্ঠ হল ১৯৭৪-এর কুখ্যাত জরুরী অবস্থা। ঘটনার সূত্রপাত ঘটে এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ে যখন ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচন অবৈধ ঘোষণা করা হয়। ১৯ মাসের এই জরুরী অবস্থায় এই সময়ে সংবিধান ও লোকসভা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ইন্দিরা গান্ধী স্বৈরাচারী শাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। সারাদেশে কংগ্রেস জনপ্রিয়তা হারায় ও ফলশ্রুতিতে ১৯৭৭-এর নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসেন মোরারজি দেশাই। ইন্দিরা গান্ধী নিজে দুটি নির্বাচন কেন্দ্র থেকে দাঁড়িয়ে দুটিতেই পঞ্চাশ হাজারেরও বেশী ভোটে পরাজিত হন। দেশে কংগ্রেস কেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটে।

সপ্তম হল ১৯৮৯ এর মন্ডল কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করা। প্রধানমন্ত্রী ভিপি সিংহ এই আইন পাশ করিয়ে নিম্নবর্গীয় জাতিদের জন্য অতিরিক্ত ২৭% সংরক্ষণ চালু করেন। এই ঘটনা ভারতের ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত সিদ্ধান্ত যা আজও বিভিন্ন আকারে আত্মপ্রকাশ করে আসছে। সম্প্রতি আই-আই-টি সহ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একই সংরক্ষণ কার্যকর করার সময় একই বিতর্ক উঠে আসে। বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে সংরক্ষণের মাধ্যমে সত্যি কতটা উন্নতি হয় – সেই প্রশ্ন। আর আছে অর্থনৈতিক মাত্রার পরিবর্তে সামাজিক মাত্রায় সংরক্ষণে সমাজের সুস্থিতি নষ্ট হবার সম্ভাবনা।

অষ্টমে আসে ১৯৯২ সালের বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার ঘটনা। এর ফলশ্রুতিতে ভারতে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের অবনতি ঘটে। নেহেরু যে ‘হিন্দু পাকিস্তান’ বর্জন করতে চেয়েছিলেন, ঘুরেফিরে তাই যেন হাতছানি দেয় পরবর্তী নির্বাচনে। এখন অবস্থার উন্নতি হলেও ভারতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিরুদ্ধে এটাই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

এরপরে অরাজনৈতিক ঘটনাদুটো চলে আসে। আসে ১৯৮৩ সালের ক্রিকেট বিশকাপ জয়। এই জয় আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গণে ভারতের প্রথম বিশ্বজয়। তার থেকেও বড় কথা, এর ফলে ক্রিকেট ভারতের নবতম ফ্যাশনে পরিণত হয়। উঠে আসেন একের পর এক ক্রিকেট আইকন – কপিল দেব, গাভাসকার ও শচিন তেন্ডুলকর। ভারতে আয়োজিত পরবর্তী বিশ্বকাপের সময় সেই উন্মাদনা আরো গভীরে প্রোথিত হয়।

সবশেষে আসে ভারতের অর্থনৈতিক সংষ্কার। ১৯৯১ সালে বেকায়দায় পড়ে সরকার যে উদারীকরণের পথে চলা শুরু করেছিল, তা আজকে ভারতের অর্থনৈতিক উন্নতির শুরু বলে পরিগণিত হয়। একদা সমাজতান্ত্রিক অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিংহ যে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছিলেন, তার ফলে ভারতের অর্থনীতি যেমন একদিকে বার্ষিক ৬% হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, ভারতীয় কোম্পানিরা যেমন শূন্য থেকে শুরু করে তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার বাজারে স্থান করে নিয়েছে, তেমনই ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান দিন গেছে বেড়েই চলেছে। তৈরী হয়ছে পুঁজিহীন বনাম পুঁজিবাদীদের এক অদৃশ্য লড়াই। মোটের ওপর আপাতদৃষ্টিতে অর্থনৈতিক সংষ্কারের ফলাফল ভাল বলে মনে হলেও আরো দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হবে এর সঠিক মূল্যায়নের জন্য।

এছাড়াও আলোচনায় আসে ষাটের দশকে আই-আই-টির পত্তন, একাত্তরের ভারত-পাক যুদ্ধ, পরিবেশবাদী চিপকো আন্দোলন, ইনফোসিসের ন্যাসড্যাকে যোগদান ও টাটার কোরাস কিনে নেবার ঘটনাও।

আমি অনুষ্ঠানের মূল বক্তব্যের সাথে সহমত হলেও ১৯৮৩-এর বিশ্বকাপ জয়ের পরিবর্তে চিপকো আন্দোলনকে আগে রাখবো। কারণ ভারতের মত গরিব দেশে যে পরিবেশ রক্ষায় গণ-আন্দোলন হতে পারে, সেটাই প্রমাণ করে দেয় সত্তরের দশকের এই আন্দোলন। পরে নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। তাছাড়া, বর্তমান শিল্পায়নের যুগে পরিবেশ-রক্ষার গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

তবে একটা ব্যাপার অনস্বীকার্য যে ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা দিবসে কেউ হলফ করে বলতে পারেনি যে এই দেশ ষাট বছর অটুট থাকবে। পশ্চিমের রাজনীতিবিদরা মনে করেছিলেন বহুভাষা-ধর্মের দেশে অচিরেই ফাটল ধরবে। অর্থনীতিবিদেরা মনে করেছিলেন ব্রিটিশ পুঁজির প্রস্থান ও প্রযুক্তির অভাবে শিল্পায়ন হবে না। কিন্তু সব সত্ত্বেও ভারতের ষাট বছর পূরণ হল। রামচন্দ্র গুহর মতে এর জন্য সর্বাধিক কৃতিত্ব প্রাপ্য হল ভারতীয় সংবিধানের, তাই শ্রেষ্ঠর শিরোপা যায় সংবিধান প্রণয়নের – স্বাধীন ভারতে এটাই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

অনুষ্ঠানের ভিডিওটি পাবেন এখানে

ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদ

জানুয়ারি 11, 2008

সম্প্রতি একটা লেখায় সঞ্জীব বড়ুয়ার সাক্ষাতকার পড়লাম, তার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিচ্ছিন্নতাবাদ-বিরোধী হিসাবে আমার কিছু বক্তব্য রাখলাম

উত্তর পূর্বে যদি একটা দেশ বানাতে হয় তাহলে সেটা হবে আবার আরেকটা রাষ্ট্রভিত্তিক জাতি। কারণ, ওই অঞ্চলে অসংখ্য ভাষা আর উপজাতি আছে। কুইবেক বা বাস্কের সাথে এটা তুলনীয় নয় – কারণ তাতে একটা নির্দিষ্ট অংশের জনগণ নির্দিষ্ট পরিচিতির ভিত্তিতে আলাদা হতে চান।

দুটো উদাহরণ দেওয়া যাক। প্রথম উদাহরণ – আসাম। আসামে অহমিয়া সম্প্রদায় উলফাকে সমর্থন করেছিল, কিন্তু ২o% বাঙালী বা পশ্চিমের ১০% বড়ো উপজাতিরা সমর্থন করেনি। উলটে বড়োরা আরো একটা পৃথক রাজ্যের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। সেই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের আলাদা স্বশাসিত অঞ্চল দেওয়াও হয়। যদি জাতি-রাষ্ট্র হত, তাহলে বড়োদের আলাদা দেশ দিতে হত, যেটা ওই সংক্ষিপ্ত অঞ্চলে তাদের সমস্যা ছাড়া সমাধান কিছু দিত না।

দ্বিতীয় উদাহরণ, নাগাল্যান্ড। নাগাল্যান্ডে নাগারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও সংখ্যালঘুদের সংখ্যা কম কিছু নয়। যেমন ধরা যাক কুকি দের কথা, তারা নাগাল্যান্ডের আদি বাসিন্দা। এবার যদি নাগা-পরিচালিত স্বাধীন নাগাল্যান্ড গঠিত হয় তাহলে তারা কোথায় যাবে? এখন যেমন নাগাল্যান্ডের রেডিও থেকে ২৫টি (ভেবে দেখুন) ভাষায় সম্প্রচার করা হয় (উপজাতি ১৫টির আলাদা ভাষা আর সাথে আশেপাশের রাজ্যের ভাষায় সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠান), সত্যিকারের জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন করতে হলে তাদের সবাইকে আলাদা রাষ্ট্র দিতে হবে, তাই না? এবার দেখুন নাগাল্যান্ড কতটা জায়গা নিয়ে গঠিত। সেখানে কি ৩-৪টি আলাদা রাষ্ট্রও গঠন করা সম্ভব? না কুকিরা ভুলে যেতে পারবে নাগারা কিভাবে তাদের একের পর এক গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে? আর একসাথে নাগা-পরিচালিত দেশে থাকতে পারবে?

উত্তর-পূর্বে যদি সব রাজ্যের মূল ট্রাইব-গুলোর সাথে কথা বলা যায় তাহলে দেখবেন তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার ভাব আছে। যদি এক লেভেল আগে গিয়ে মাইনরিটিদের সাথে কথা বলেন, তাহলে বুঝবেন তারা এই আলাদা জাতি-রাষ্ট্রকে কতটা ভয় পায়। এত সংক্ষিপ্ত অঞ্চলে যদি এত অসংখ্য ভাষাভাষি মানুষ আর এত উপজাতি থাকে তাদের এই সমস্যা স্বাভাবিক। ভারতের রাজ্যভিত্তিক শাসনব্যাবস্থার কারণে অসুবিধা কিছুটা প্রশমিত হলেও মোটের ওপর সত্যিকারের জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন করা উত্তর-পূর্বে সম্ভব নয়। আমরা সবাইকে দেখতে একইরকম বলে বাইরে থেকে মনে করে থাকি তারা যেন একই জাতি-গোষ্ঠীভুক্ত। যে যুক্তিতে ভারতীয় মূল ভুখন্ডের বাসিন্দা হিসাবে আমি মেজরিটি আর উত্তর-পূর্ব মাইনরিটি, সেই একই যুক্তিতে উত্তর-পূর্বে প্রতিটি রাজ্যেও তো মেজরিটি আর মাইনরিটি আলাদা আছে, সেখানেও একই সমস্যা নতুন আকারে জেগে উঠবে।

আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হল সেনা মোতায়েন। ভারতের সব বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের একটা নির্দিষ্ট সিকোয়েন্স আছে। প্রথমে, বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রস্তাব দেওয়া হয়। তাতে সরকার রাজি হয় না। তখন শুরু হয় সশস্ত্র সংগ্রাম – শুরু হয় অপহরণ, ভয় দেখানো। তখন পাঠানো হয় সেনা। বিচ্ছিন্নতাবাদী দলগুলি সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের সংখ্যালঘুদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করে – যার ফলে আন্দোলন বিচ্ছিন্নতাবাদী থেকে সাম্প্রদায়িক রূপ নেয়। সেনা অত্যাচার শুরু করে – শুরু হয় লক-আপে মৃত্যু, গ্রাম থেকে পুরুষদের ধরে নিয়ে যাওয়া। আর সেনা অত্যাচারের মাধ্যমে ব্যাপারটা পাকাপাকিভাবে সমাজে গেঁথে যায়। উদাহরণ, সম্পূর্ণ উত্তর-পূর্ব ভারত ও কাশ্মীর। সেনা মোতায়েন করলে তার উপজাত হিসাবে আসে অত্যাচার, আর না করলে ওই অংশের মাইনরিটি আর অন্য রাজ্য থেকে আগতদের দুর্গতি। দুটোর মধ্যে কোনটা ভালো সেটা আমি অন্তত জানি না। তবে সেনা অত্যাচার আমি কোনোভাবেই সমর্থন করি না, কারণ আমরা আজকে ভারতের অধিবাসী কোনো এক সময়ে এরকমই সেনা অত্যাচারের কারণেই যা পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দমনে পশ্চিম-পাকিস্তান চালিয়েছিল। আমার মতে, সেনাদের এ বিষয়ে আরো সচেতন করে তুলতে হবে। হয়ত বলা সহজ, কিন্তু সত্যিকারে কিছু নিরীহ মানুষের মাঝে বন্দুকধারীকে ছেড়ে দিলে তার মানসিকতা আর সংযমের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া খুবই শক্ত – শত হোক, সেও মানুষ, মেশিন নয়। বাস্তবে তার কাছ থেকেও সবসময় ‘আদর্শ ব্যবহার’ পাওয়া সম্ভব নয়।

এবার আসা যাক অর্থনৈতিক সমস্যার গভীরে। ভেবে দেখুন ভারতে কাশ্মীর বা উত্তর-পূর্বে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন আছে, কিন্তু তামিলনাডু বা কেরলে নেই। এর মানে কি এই যে এই রাজ্যগুলো দিল্লী-কর্তৃক আনন্দের সাথে শাসিত হয় বা এদের কালচার দিল্লীর কালচারের সাথে খুব মেলে? তা নয়। এদের অর্থনৈতিক ব্যাপারটাকে এরা গুরুত্ব দেয় খুব বেশী। তাই এরা একসাথে দিব্যি আছে। এদের আঞ্চলিক পার্টি আছে, তারাই পর্যায়ক্রমে রাজ্য শাসন করে। দিল্লীর সাথে এদের সম্পর্ক আসে শুধু আক্ষরিক অর্থে দেশের বাইরে গেলে। লেখক বলেছেন পঞ্জাবের বিচ্ছিন্নতাবাদের উদাহরণ। পঞ্জাবের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শুরু হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে। এই আন্দোলন এখন শেষ, কারণ অর্থনৈতিক। পাঞ্জাবীরা বুঝেছে দীর্ঘদিন লড়াই চালালে তাদের অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়বে। তাছাড়া, বিভিন্ন শহরে যে শিখেরা থাকে তারা ক্ষতগ্রস্ত হয়েছিল এই আন্দোলনে, যেমন কোলকাতায় শিখ-অধ্যুষিত অঞ্চলের দোকান থেকে লোকে জিনিস কিনতে যেতে ভয় পেত। আর এই আন্দোলনের কারণে আর্মিতে শিখ বা পাঞ্জাবীদের সংখ্যা কমেনি, এখনো সেনাবাহিনীর ১০% শিখ। তারা সব গুরুত্বপূর্ণ পদে আছে ও দেশকে যথেষ্ট ভালবাসে। বাস্তবে ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন মনমোহন সিং, যিনি শিখ ও পাঞ্জাবী। বাস্তবসম্মত চিন্তাই শিখ আন্দোলন শেষ হওয়ার কারণ।

অর্থনৈতিক কারণ একটা বড় কারণ। ভারত মূলত গরীব দেশ, কিন্তু গরীবদের দেশ নয়। শাসনক্ষমতা সবই প্রধানত ধনীদের কুক্ষিগত। আস্তে আস্তে অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে বটে, কিন্তু এখনো অনেক দিন লাগবে গরীবের শাসন কায়েম হতে। কিন্তু উত্তর-পূর্বের মানুষের অবস্থার খুব-একটা পরিবর্তন ঘটে নি এতবছরেও। তারা চোখের সামনে দেখছে পাশাপাশি রাজ্য-গুলো উন্নতি করে চলেছে, তারা পারছেনা। একটা কারণ যোগাযোগ-ব্যবস্থার অভাব (কাশ্মীরেও তাই)। অন্যটা গুরুত্বপূর্ণ – লোকসভায় জনপ্রতিনিধির সংখ্যা কম (উত্তর-পূর্বের প্রতিনিধি ২৫ জন, লোকসভার ৫৪২ জনের মধ্যে)। তাই এদের হয়ে লবি করার কেউ নেই। আমার মনে হয় এই ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দিয়ে ভেবে অঞ্চলের সিট বাড়ানো উচিত। সেক্ষেত্রে আবার ভারতের ‘লোক-অনুপাতে সিটের’ কন্সেপ্ট ভাঙতে হয়, সেটা তখন সব রাজ্যই দাবী করে বসবে।

তৃতীয় বিশ্বে আরেকটা দেশ এরকম জাতি-ভিত্তিক রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্রভিত্তিক জাতির সমস্যায় ভুগছে – সেটা আরো একটা একইরকম ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন অনে জাতি অধ্যুষিত রাষ্ট্র – ইন্দোনেশিয়া। তাদের অনেক দ্বীপেই নিজস্ব স্বাধীনতা আন্দোলন চলে, যেমন্ সুমাত্রার উত্তরে আকে রাজ্যে, বা সুলেওয়েসিতে চলে আলাদা হবার আন্দোলন। চলত তিমুর দ্বীপে। কেন? একই কারণ – ভারতের মতই।

এবার দেখি উন্নত বিশ্বে। এক-জাতি এক-রাষ্ট্র এই কন্সেপ্ট টা পৃথিবীতে আমদানি করে ইউরোপিয়ানরা। তার আগে ‘জোর-যার-মুলুক-তার’ গোছের দেশ চলত। ইউরোপে বহুজাতিক রাষ্ট্রের ধারণা চলেনি, এই সেদিনও চেক আর শ্লোভাকেরা আলাদা হয়ে গেল। কিন্তু অপরদিকে, একটা শক্তিশালী ইউরোপিয়ান ইউনিয়ানের ধারণাও কিন্তু ইউরোপিয়দেরই। যদিও তা এখনো সদ্যোজাত, কিন্তু তাও ইউরোপ ওই পথেই হাঁটছে – এক ইউরোপিয় পার্লামেন্ট, এক সংবিধান, এক কারেন্সী আর এক পাসপোর্ট। তার সাথে সাথে দেশে নিজস্ব ধারণাকেও সমর্থন জানানো হবে, সংস্কৃতি আলাদা বলেই যে তারা একসাথে থাকবে না, রাষ্ট্রের বেড়া রিজিড হতেই হবে সেটার তো কোনো মানে নেই। পৃথিবী এখন দেশের বেড়াজাল ভেদ করে মানুষে মানুষে সম্পর্ক গঠনে উদ্যোগ নিচ্ছে। ইন্টারনেটে বসে যে আমি এই লেখার মাধ্যমে আপনাদের মতামত জানাচ্ছি – ট্রান্সলেশন টুল দিয়ে চিনা ভাষার সাইট দেখে নিচ্ছি, সবই কিন্তু আস্তে আস্তে মানুষে মানুষে দূরত্ব কমিয়ে দেয়। আবার অপরদিকে ভেবে দেখুন, এই দূরত্ব কমাবার প্রয়াস শুরু করার জন্যও ন্যূনতম অর্থনৈতিক সচ্ছলতা আর শিক্ষা লাগে, ইস্যুটা আবার ঘুরেফিরে অর্থনীতিতে আর বেসিক এডুকেশনে এসে পড়ে।

রিজিডিটির কথা এলে আমার মিজোরামের কথা মনে পড়ে। মিজোরামের মিজোদের অনেকদিনের আন্দোলন যে তাদের সাথে বর্মার মিজোদের সম্পর্ক রক্ষার জন্য সরকারি সমর্থন চাই। ইতিহাস বলে মিজোরা বর্মা ও ভারতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকত। ইংরেজরা কিছুটা অংশ ভারতে আর বাকিটা বর্মাকে দিয়ে যায়। তাতে কি মানুষ কি আর থেমে থাকে? আত্মীয়-স্বজন দুটো আলাদা দেশে ভাগ হয়ে গেলে কে শান্তিতে থাকতে পারে। তার ওপর যোগ হয় বি-এস-এফের উৎপাত, ওপারে যাওয়া যাবে না। ফলশ্রুতি – আন্দোলন, প্রথমে শান্তিপূর্ণ, পরে সশস্ত্র। সমাধান কি? (আমি সমাধান শোনার পরে অবাক হয়ে গেছিলাম) খুবই সহজ। ৮০ কিমি একটা অঞ্চল দেওয়া হয়েছে যেখান দিয়ে মিজোরা দুদেশের মধ্যে যাতায়াত করতে পারবে। তাতেই মিজোরা খুশী। মূল আন্দোলন তাই আজ আর নেই, মিজোরামে এখন দিব্যি ঘুরে-বেড়িয়ে আসা যায়। মিজোরামকে এখন ভারতের ‘দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার’ দ্বার হিসাবে গড়ে তোলা হচ্ছে। কি সহজ সমাধান – কিন্তু এর জন্য কেন সশশ্ত্র আন্দোলন করতে হল?

গত, তিন চার বছর আমি বিভিন্ন মাধ্যমে সব বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি, সরকার আর সেনাবাহিনীর বক্তব্য পড়েছি। ফলাফলে, আমি আমি সমাধান খুঁজে পাইনি খুব একটা। তবে অর্থনৈতিক ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত, আর লেখকের সাথে ভিন্নমত। আর এও বলতে পারি, যে শিক্ষা আর অর্থনীতির সাথে এই সমস্যাও আস্তে আস্তে দূর হবে। কুইবেকে জনগণ তো ভোট দিয়ে কানাডায় অন্তর্ভুক্তির স্বীকৃতি দিয়েছে। এখন, সত্যি কথা বলতে আমি রাষ্ট্র ব্যাপারটাকেই সমর্থন করতে পারি না। ধর্ম আর ভাষার মত মানুষের ওপর আবার এও এক ‘পরিচয়’ চাপিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা। মানুষই আসল, রাষ্ট্র, ধর্ম আর ভাষা সবই ভুল, আরোপিত। রাষ্ট্রনীতি গঠনের সময় সেই ব্যাপারটাতে গুরুত্ব দিলে আমার মনে হয় না সমস্যার কিছু আছে। আমি আশা করব ভবিষ্যতে ভারত-সরকার নীতি নির্ধারণের সময় ‘মেজরিটি’ আর ‘মাইনরিটি’র কথা বা ভেবে শুধু মানুষের কথা ভেবেই চিন্তা-ভাবনা চালাবে।

টাইমে ভারত

জানুয়ারি 11, 2008

টাইম ম্যাগাজিন সম্প্রতি ভারতের স্বাধীনতার ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে অনেকগুলো লেখা বের করেছে। লেখা গুলো পড়ে ভাল লাগল। ভারতের ভাল-খারাপ দিকগুলো তুলে ধরা হয়েছে। আর আছে একটা অসাধারণ ফোটো সিকোয়েন্স – যাতে ৬০ বছরের ইতিহাস সংক্ষেপে প্রতিফলিত হয়েছে।

প্রথম লেখাটায় কিছু সমকালীন ভারতীয় স্লোগানের উল্লেখ আছে। কিভাবে সেগুলো পরিবর্তিত হচ্ছে – “মেরা ভারত মহান” থেকে “মেরা ভারত জওয়ান”। দ্বিতীয় লেখায় আছে দেশ বিভাগের পরে দেশে আসা অসংখ্য রিফিউজির মধ্যে একটি পরিবারের কথা। তারা তিনটে জেনারেশনে কিভাবে আবার দাঁড়িয়ে গেল। তার পরেরটা মূলত পাকিস্তান নিয়ে, কিভাবে লাল মসজিদের ঘটনা আর তার পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান বিভক্ত হয়ে গেছে। তার সাথে আছে পাকিস্তানের ইতিহাস। তার পরে আছে ভারতীয় রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী কুশল পাল সিং এর কথা – যার কোম্পানী ডি-এল-এফ ভারতের সবচেয়ে বড় রিয়েল এস্টেট কোম্পানী। পাঁচে আছে গণতন্ত্র – এম যে আকবর আর রিজভির কথামত যা ভারতের সবচয়ে উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব। ছয়ে আছে ভারতীয় অর্থনীতির পুনরুত্থানের কথা। এখানে একটা ভাল কথা লিখেছে দেখলাম – ভারতকে দীর্ঘ ইতিহাসে কখনই গরীব দেশ বলে মনে করা হত না – মাত্র ২০০ বছরে একটা দেশ কি ভাবে গরিব হয়ে গেল সেটাও বিশ্লেষণ করা হয়েছে এই প্রবন্ধে। সাথে আছে চিরাচরিত সফটওয়ার শিল্পের কথা। শেষে আছে কিছু ব্যক্তির বক্তব্য।

লেখার ধারা বেশ ভাল। আমি মোটামুটি পাকিস্তান সংক্রান্ত অধ্যায়টা ছাড়া বাকি সবই পড়েছি। লেখায় গত ৬০ বছরের সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে – আর আশা ব্যক্ত করা হয়েছে যে ভারত আবার পুরোনো ইতিহাসের মত দিনে ফিরে যাবে।

মূল লেখা
ফোটো ব্লগ
পরিসংখ্যানে ভারত

দক্ষিণ কোরিয়া বনাম দক্ষিণ এশিয়া

জানুয়ারি 11, 2008

দক্ষিণ এশিয়া গত পঞ্চাশ বছরে কতটা পিছিয়ে গেছে তা সবাই মনে রাখে না। কিন্তু কিভাবে অন্যেরা এগিয়ে গেছে তা সত্যিই বিস্ময়কর।

ভারতের অর্থনীতি বর্তমানে ৯% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরকম পঞ্চাশ বছর চলতে পারলে দেশ কোথায় পৌঁছতে পারে তা বোঝা যায় এই তুলনায়। বোঝা যায় কিভাবে আমরা নিজেদের ধোঁকা দিয়ে নিজেদেরই ছোটো করেছি – একটা উদাহরণ দিয়ে। দক্ষিণ কোরিয়া এখন এশিয়ার দ্বিতীয় ধনীতম দেশ (বড় দেশগুলোর মধ্যে)। দেখা যাক তারা কিভাবে এত ধনী হয়ে গেল।

ছবিতে দেখুন নিতান্ত ষাটের দশক অবধি দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে আমাদের বিশেষ একটা পার্থক্য ছিল না। কিন্তু ১৯৬২ থেকে ১৯৮৯ অবধি তাদের অর্থনীতি ৮% হারে বৃদ্ধি পায়। ফলে তাদের মাথাপিছু গড় আয় মাত্র ৮৭ ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৪,৮৩০ ডলারে।

একটা প্রবন্ধে সেদিন পড়লাম ওদের ‘সাক্সেস স্টোরি’। মূল কারণ বলা হয় চারটি –
১) ভাল সরকার, শিক্ষা আর পরিকাঠামোমুখী নীতি।
২) জাপান ও আমেরিকার সাহায্য।
৩) শিল্পক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার
৪) শক্তিশালী প্রাইভেট সেক্টর

আমার এতসব লেখার লক্ষ্য একটাই। যারা মনে করেন পুঁজীবাদী ব্যবস্থা খারাপ আর এই ব্যবস্থায় মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি ঘটে না, তারা কিভাবে এর ব্যাখ্যা দেবেন? মানুষের উন্নতি কি অর্থনৈতিক উন্নতি ছাড়া সম্পূর্ণ হয়?

তাছাড়া আমাদের কলোনিয়াল হ্যাংওভারের কারণে আমরা বিদেশী পুঁজী ভয় পাই। দক্ষিণ কোরিয়া বিদেশ থেকে পুঁজী বা প্রযুক্তি দুই-ই নিয়ে দেশ গঠন করেছে। তাতে তাদের কি সার্বভৌমত্বের ক্ষতি হয়েছে?

মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার একটি মৌলিক অধিকার। আমাদের দেশগুলোর নীতি-নির্ধারকের সেটা মাথায় রেখে নীতি নির্ধারণ করেন না। কবে যে সুদিন আসবে এখানে …

বেনজির হত্যা

জানুয়ারি 11, 2008

(লেখার মতামত আমার ব্যক্তিগত – ইন্ডিয়া-পাকিস্তান ফ্রেন্ডশিপ কমিউনিটির সদস্য হিসাবে ও পাকিস্তানে সংবাদপত্র নিয়মিত পড়ার কারণে আমার নিজস্ব ধারণা থেকে লেখা)

আমার মনে হয়না তালিবানি জঙ্গী ছাড়া বেনজিরের হত্যা আর কেউ করেছে – পর্দার পেছনেও আর কারো স্থান পাওয়াও মুশকিল। মুশারফ যতই বলুন, এই ঘটনায় সবথেকে বড় ক্ষতি তার নিজেরই হয়েছে – তাই আমার মনে হয়না এত বোকার মত কাজটা করিয়েছে।

তালিবানিরা আগে থেকেই ঘোষণা করেছিল যে মহিলা রাষ্ট্রপ্রধান তারা কিছুতেই মেনে নেবেন না কারণ তা ইসলাম-বিরোধী। আর বেনজির দেশে ফেরার চেষ্টা করলে তাকে একই কারণে হত্যা করা হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ভোট হলে বেনজিরের জয় সুনিশ্চিত ছিল। সুতরাং ওই জঙ্গী-গোষ্ঠীরাই এটা সরাসরি কারো মদত ছাড়াই এই কাণ্ড করিয়েছে বলে আমার ধারণা।

অনেকেই বলে থাকতে পারেন যে এই গোষ্টীগুলোর এত দাপট কি ভাবে যদি না এদের পেছনে কারো মদত থেকে থাকে। মদতের কথায় পরে আসা যেতে পারে, তবে আপাতত বলে রাখি এদের শক্তি সম্পর্কে আমার কোনো সন্দেহ নেই। কিছুদিন আগেই খবরে প্রকাশ যে বেশ কিছু পাকিস্তানি আর্মি কম্যান্ডারও এদের পেছনে আছে। এমনকি, বার-দুয়েক, পাকিস্তানি আর্মির সৈন্য নিজে আত্মঘাতী হামলা চালিয়ে তার সহকর্মীদের মেরে ফেলার ঘটনাও সামনে এসেছে। সুতরাং, জন-সমর্থনের প্রশ্নে এদের খুব একটা সমস্যা আছে বলে মনে হয় না। এর পরে আসে, অস্ত্র-সমর্থনের প্রশ্ন। যেহেতু পাকিস্তানি আর্মির একাংশ এদের সাথে জড়িত তাই সে বিষয়েও এদের কোনো সমস্যা নেই।

উত্তর-পূর্ব পাকিস্তান আর বালুচিস্তানে আছে আফগানিস্তান থেকে বিতাড়িত এক দল তালিবানি। মজার ব্যাপার হচ্ছে, পাকিস্তান সরকার থেকে এই আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা কখনই শাসন করার চেষ্টা করা হয়নি। ফেডারাল ট্রাইবাল ল এর সমর্থনে, এই ওয়াজিরিস্তান অঞ্চল সর্বদাই “স্বাধীন” ছিল। তাই যখন পাকিস্তান আর্মি তাদের অঞ্চলে জঙ্গী খোঁজার নামে হামলা শুরু করল তারা সেটাকে তাদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বলে মনে করা শুরু করল। শুধু তাই নয়, ৯/১১ পরবর্তী পাকিস্তানে তিন ধরনের দল তৈরী হল। এক দল দেশ থেকে যে কোনো মূল্যে তালিবান ও জঙ্গীবাদ দূর করা পক্ষে, একদল বাস্তবসম্মত ভাবে আমেরিকার সাথে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই বলে মনে করত আর শেষ আরেকদল যে কোনো মূল্যে আমেরিকা বিরোধিতা করতে প্রস্তুত। তাদের সমর্থন আর বিপক্ষের দল তৈরী হল পাকিস্তানে আর শুরু হল আইডিওলজিকাল কনফ্লিক্ট। যেহেতু পাকিস্তানে লোকের হাতে বন্দুকের অভাব নেই, তাই অচিরেই এই বিবাদ গলা ছেড়ে বন্দুকের আওয়াজে নেমে এল। বেনজির প্রথমদলের সমর্থক ছিলেন বলে, এই বিবাদ-কেই শর্ট টার্মে বেনজিরের হত্যার কারণ বলে চিহ্নিত করা যায়।

এবারে আসা যাক তুলনামূলক গূঢ় কারণে। আমি প্রথমে আমেরিকার ভূমিকায় আসি। সোভিয়েত ইউনিয়নের পেছনে লাগার জন্য আমেরিকা আশির দশকে ব্যবহার করত এই তালিবানিদের। আমেরিকা থেকে আসা ও রাশিয়ানদের ফেলে যাওয়া অস্ত্রবলে এরা বলীয়ান – সাথে আছে গরিলা যুদ্ধের ট্রেনিং যা আমেরিকানরা দিয়ে গেছে। আপাতদৃষ্টিতে এদের মৌলবাদী বলে মনে হলেও এরা এরকম মৌলবাদী ছিল না – আমেরিকা আর সি-আই-এ ‘নাস্তিক’ কমিউনিস্টদের আটকানোর জন্য যে ট্রেনিং ক্যাম্পগুলো তৈরী করেছিল, তাতে এদের মৌলবাদীত্বে দীক্ষিত করা হয়েছে। আমার এই ধারণার কারণ ভারতে (বিশেষত কোলকাতায়) বসবাসরত আফগান আর পাশতুনরা। এদের মধ্যে একজনও কোনো মৌলবাদী ধারণায় উদ্বুদ্ধ নয় – বরং শান্তিপূর্ণ ভাবে জীবন-যাপণ করে – আর দশজন বাঙালীর মতই। একই জনগোষ্ঠীর লোকে যদি আরেক জায়গায় শান্তিপূর্ণভাবে বাস করতে পারে, তবে মূল জনগোষ্ঠীকে কিভাবে মৌলবাদী বলা চলে?

সবশেষে আসা যায় পাকিস্তানের ইতিহাসের দিকে। স্বাধীনতার পর থেকেই যেহেতু (পশ্চিম) পাকিস্তান প্রায় সংখ্যালঘু-শূন্য হয়ে পড়ে – তাই রাজনীতিকরা দলাদলি করার জন্য আবার বেছে নেন ধর্মকেই। শুরু হয় কে কতটা বেশী ধর্মপরায়ণ – তার ভিত্তিতে দলাদলি। প্রথম ধাপ হিসাবে দলাদলি শুরু হয় আহমদিয়া (কাদিয়ানি) দের নিয়ে। সময় যত এগোয়, কাদিয়ানিরা একরকম এক-কোণে আশ্রয় নেয়। এদের কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে দেন জিয়া। উনি, আইন করে কাদিয়ানিদের মসজিদ বানানো বন্ধ করে দেন, আর পাকিস্তানের ইসলামিক পাসপোর্ট পাবার জন্য কাদিয়ানি নবীকে ‘ইমপোস্টার’ হিসাবে ডিক্লারেশন দেওয়া বাধ্যতামূলক করে দেন (বলাই বাহুল্য – এখনো এই আইনগুলোর পরিবর্তন হয়নি)। এই জিয়ার আমলেই পাকিস্তানের আইডিওলজিকাল পার্টিশন নিশ্চিত হয়। কাদিয়ানিদের কফিনে পেরেক পোঁতা শেষ হলেও দলাদলি শেষ হয় না। রাজনীতিকরা শুরু করেন পরবর্তী পার্টিশন – সূফী বনাম তালিবানি। একই সময়ে, আশির দশকে প্রচুর আফগান পাকিস্তানে রিফিউজি হিসাবে চলে আসে, যারা এই তালিবানি ঘরাণাকে পাকিস্তানে সুপ্রতিষ্ঠিত করে।

একরকম ভাবে দেখলে আমার ব্যক্তিগত মতে, পাকিস্তানে এই আইডিওলজিকাল পার্টিশন হবারই ছিল। পারিপার্শ্বিকতা তাকে হয়ত ত্বরান্বিত করেছে। ধর্মের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করলে সব সময়েই নিজেকে বেশী ধার্মিক দেখিয়ে বেশী সুবিধা অর্জনের প্রচেষ্টা জনগণের মধ্যে দানা বাঁধে। আর জনগণ যদিও বা দূরে থাকতে চায়, তাদের ব্যবহার করার মত রাজনীতিকের অভাব হয় না কখনই। আর সেই আইডিওলজিকাল পার্টিশন এখন পূর্ণোদ্যমে একের পর এক প্রাণহন্তারক হামলার আকারে আত্মপ্রকাশ করেছে – এ তো হবারই ছিল।

এখন যদি মুশারফ সরে গিয়ে দেশে গণতন্ত্রও আসে, আমার মনে হয়না একদিনে সমস্যার সমাধান হবে। অন্তত, বিশ বছর গণতন্ত্রে থাকলে যদি বা কিছু পরিবর্তন হয়। গণতন্ত্রের একটা সুবিধা হল এতে একটা প্ল্যাটফর্ম পাওয়া যায় যাতে লোকে ধৈর্য ধরতে শেখে, আলোচনার মাধ্যমে বিবাদ-মীমাংসা শেখে আর দেশের অন্যপ্রান্তে জন-মতামত সম্পর্কে ধারণা করতে শেখে। এই তালিবানি জঙ্গীরা যদি জানত যে দেশের অধিকাংশ মানুষ তাদের আসলে পছন্দ করে না, তবে হয়ত অনেকেই অস্ত্রের পথ ছেড়ে দিত – ব্রেনওয়াশ করাও শক্ত হত। লোকে সামরিক শাসনে ধৈর্য না হারিয়ে ভোটের জন্য ৫ বছর অপেক্ষা করতে শিখত। তাই পাকিস্তানের এই বিবাদ থেকে মুক্তির একটাই পথ – গণতন্ত্র।

ভারত-পাকিস্তান যৌথ সমীক্ষা

জানুয়ারি 11, 2008

কিছুদিন আগে স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে ভারত-পাকিস্তান যৌথ সমীক্ষা চালিয়েছিল কয়েকটি সংস্থা। এদের মধ্যে পাকিস্তানের ডন নিউস ও ভারতের আই-বি-এন মিলে চালানো সমীক্ষার ফলাফল মিলেছে। অধিকাংশ ব্যাপারে দুদেশের শহুরে জনগণ একমত হলেও কিছু কিছু ব্যাপারে আলাদা মানসিকতা থেকেই যায়। দুদেশের লোকজনই উল্লেখযোগ্যভাবে গণতন্ত্রের সমর্থন করেছেন। আবার কাশ্মীর প্রশ্নে তাদের মত আলাদা।

সমীক্ষার সংক্ষিপ্ত তালিকা পাওয়া যাবে ডন-এর সাইটে। এর সাথে আছে কিছু বিশ্লেষণও। সমীক্ষার বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে কাশ্মীর প্রসঙ্গে। আছে জম্মু ও শ্রীনগরের মতের অমিল, সেইসঙ্গে ভারত ও পাকিস্তানের ভোটদাতাদের মতানৈক্য। এরপরে আসে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক। সম্পর্ক ভাল করার আগ্রহ থাকলেও পাশের দেশে ঘুরতে যাবার বিশেষ আগ্রহ দেখা যায় না ভোটে। মজার কথা, আমেরিকাকে কেউই ভাল চোখে দেখে নি। গণতান্ত্রিক দলগুলোতে আস্থা না থাকলেও আর্মির ওপর আস্থায় দুদেশের মতামত আলাদা। পার্লামেন্টে আস্থাও ভারতীয়দের বেশী বলেই দেখা যায়।

সবশেষে আসে ক্রিকেট ও বলিউড। ভারতে সবচেয়ে জনপ্রিয় পাকিস্তানি ক্রিকেটার আফ্রিদি, এর পরে আসে আক্রম ও শোয়েব আখতার। পাকিস্তানে জনপ্রিয় ক্রিকেটার শচিন ও তারপরে সৌরভ ও দ্রাবিড়। চিত্রতারকাদের মধ্যে সবার আগে আসে শাহরুখ, তারপরে সলমান ও শেষে অমিতাভ। নায়িকাদের মধ্যে পছন্দের তালিকায় আছেন ঐশ্বর্য, রানী ও কাজল।

পড়ে দেখতে পারেন পুরো রিপোর্টটা