Archive for the ‘বাংলাদেশ’ Category

অপরাধী কে? সন্ত্রাসী না সমব্যাথী?

ডিসেম্বর 25, 2012

ঘটনার সূত্রপাত গতকাল। ব্রেকিং নিউজ হিসাবে সব টিভি চ্যানেল প্রচার করা শুরু করে এক বাংলাদেশী তরুণ ফেডারেল রিজার্ভে বোমা রাখতে গিয়ে ধরা পড়েছে। আরো সময় গেলে বের হয়ে আসে পুরো ব্যাপারটাই একটা স্টিং অপারেশনের ফসল। রেজয়ানুল নাফিস মার্কিন দেশে এসেছে মাত্র নয় মাস আগে। গত জুলাই মাসে ফেসবুকে তার কমেন্টের সূত্র ধরে তার ওপর নজরদারি শুরু হয়। এই অবস্থায় নাফিস মার্কিন দেশে বোমা হামলা চালানোর উদ্যোগ নিলে এফ বি আই-এর এজেন্ট তাকে নিষ্ক্রিয় বোমা সরবরাহ করে। নাফিস সেই ১০০০ পাউন্ড বোমা ফেডারেল রিজার্ভ (বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক ও ভারতের রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার সমতুল্য) -এর সামনে রেখে পাশের একটি হোটেলে বসে তাকে দুর-নিয়ন্ত্রকের সাহায্যে সক্রিয় করার চেষ্টা করে। এই পর্যায়ে বোমাটি ফাটে না এবং মার্কিন এজেন্ট তাকে গ্রেফতার করে মার্কিন আদালতে পেশ করে (গুয়ান্তানামো বে তে পাঠায় নি)।

এই পর্যন্ত ঘটনা কাল অবধি জানা ছিল। যেহেতু নাফিস স্টুডেন্ট ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিল, তার পরেই আমেরিকায় প্রশ্ন উঠতে থাকে স্টুডেন্ট ভিসা এত সহজে পেল। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ও ছাত্র-ছাত্রীরা শংকিত হয়ে ওঠে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০০১ এ টুইন টাওয়ারে হামলা পর থেকে ২০০৫ অবধি আমেরিকায় বাংলাদেশী ছাত্র-ছাত্রীদের বিশেষ সিকিউরিটি চেকের মধ্যে দিয়ে যেতে হত। অনেকেই মনে করছেন সেই অবস্থা আবার ফিরে আসতেই পারে, স্টুডেন্ট ভিসা সহ অন্যান্য ভিসা পাওয়াও এর ফলে শক্ত হয়ে যাবে। সমস্যা শুধু আমেরিকাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না ভিন্ন ভিন্ন দেশেও বাংলাদেশী নাগরিকদের যাওয়ার সময় অতিরিক্ত স্ক্রুটিনির সম্মুখীন হতে হবে তাও এখনও পরিষ্কার নয়।

অন্যদিকে, নাফিসের পরিবারবর্গ স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনায় ব্যথিত এবং মানতে নারাজ যে তাদের ঘরের ছেলে এ ধরনের নাশকতামূলক কাজকর্মের সাথে জড়িয়ে থাকতে পারে। আমেরিকাতেও অনেকেই স্টিং অপারেশনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন – তাদের বক্তব্য হল নাফিসের উদ্দেশ্য জানামাত্র তাকে ডিপোর্ট করা উচিত ছিল, তাহলে ঘটনা এতদূর এগোত না, সাজানো ঘটনায় টেররিস্ট ধরে মার্কিন নিরাপত্তার কোনও উন্নতি হবে না।

আজ এসে দেখতে পেলাম পুরোদমে দুই শ্রেণীর মতামত ফেসবুকে চলছে। দুই শ্রেণীর মূল বক্তব্য একই – আমাদের দোষ না, যত দোষ আমেরিকার। প্রথম শ্রেণীর বক্তব্য পুরো ঘটনা সাজানো হয়েছে যাতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত আরো জোরদার করা যায়। আরেকশ্রেণীর বক্তব্য পুরো ঘটনাই সাজানো হয়েছে ইসলামের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে – বিশ্ববাসীর কাছে ইসলামের নামে সন্ত্রাসের ছবি তুলে ধরার জন্যই এই ছক। সবশেষে জানা গেল বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মতামতরেখেছেন যে নাফিসের পরিচিতি নিয়ে উনি নিশ্চিত নন, নাফিস বাংলাদেশে বসবাসকারী অবৈধ রোহিঙ্গাদের মধ্যে একজন হতেও পারেন (যদিও নাফিসের বাবা কি ভাবে ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের ভাইস-প্রেসিডেন্ট হয়েছেন সে প্রশ্ন ওনাকে করাই অবান্তর)।

দুই ধরনের যুক্তিই আমার কাছে অন্তঃসারশূন্য লেগেছে। প্রথম কথা স্টিং অপারেশন আমেরিকায় অনেকদিন ধরেই চলে আসছে। এমনকি ভারতেও স্টিং অপারেশনে অনেক মন্ত্রী-আমলা ইতিপূর্বে ধরা পড়েছে। এই ধরনের অপারেশনে অপরাধের “ইন্টেন্ট” বা ইচ্ছা/চেষ্টা আছে এরকম যে কোনও ব্যক্তিকে তার অপরাধ সংঘটনে ছদ্ম-সাহায্য করা হয় যাতে সে কতদূর অবধি অপরাধ করতে পারে সেটা দেখে তাকে হাতে-নাতে ধরা হয়। অনেকেই প্রশ্ন করবেন বাংলাদেশে এ ধরনের স্টিং-অপারেশন কি চলে? এই উত্তরটা আমার সঠিক জানা নেই কিন্তু তৃতীয় বিশ্বে অপরাধের ইন্টেন্ট থাকলে অনেক সময়েই তাকে লক-আপে ঢুকিয়ে পিটিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয় যার থেকে স্টিং অপারেশন শতগুণে ভাল। দ্বিতীয় কথা, নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অব ল এন্ড সিকিউরিটির পরিসংখ্যান মতে, সেপ্টেম্বর ১১-র ঘটনার পরে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ১৫৬ টি কেসের মধ্যে ৯৭টিতেই এজেন্টদের ব্যবহার করা হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ডিফেন্স ল’ইয়ার চেষ্টা করেছে “আসামীকে ট্র্যাপ করা হয়েছে” – এই যুক্তি ব্যবহার করতে, কিন্তু কোনও ক্ষেত্রেই সফল হয়নি। এর থেকে প্রমাণিত যে শুধুমাত্র নির্বাচন আসন্ন বলেই এই অপারেশন চলছে তা নয়, সবসময়েই স্টিং অপারেশন চলছে – তার কনভিকশন রেট ১০০%।

স্টিং অপারেশন যে শুধু “মুসলিমদের সন্ত্রাসী বানানো”-র কাজে ব্যবহার হয়েছে তাও না। কখনও ড্রাগ-পেডলারদের ট্র্যাপে ফেলা হয়েছে, তারা যখন ড্রাগ ডেলিভারি করতে গেছে – পুলিশ হাতেনাতে ধরেছে তাদের। ফেসবুকে অপ্রাপ্তবয়স্ক সেজে বসে থাকা এফ-বি-আই এজেন্ট-এর সাথে যৌণ-সম্পর্কে লিপ্ত হবার প্রচেষ্টার কারণে জাভা প্রোগ্রামিং ল্যানগুয়েজের অন্যতম প্রণেতা প্যাট্রিক নটন (যার লেখা বই আমাদের অনেকেই পড়েছে) ধরা পড়ে শাস্তিও পেয়েছেন। অপরাধ লঘু হবার কারণে অনেক কম সাজা পেয়ে উনি ছাড়া পেয়ে গেছেন বটে কিন্তু স্টিং অপারেশন চালানোর কারণে তার অপরাধ লঘূতর করে দেখানোর প্রচেষ্টা সফল হয় নি। এবং এই ঘটনা ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার হামলার আগেই ঘটেছে। সব স্টিং-অপারেশনেই যে “মুসলিমদের সন্ত্রাসী বানানো”-র সফল অপারেশন ঘটে তাও না। দক্ষিণ ক্যালিফোর্ণিয়ার একটি মসজিদে এক প্রাক্তন ড্রাগ-পেডলারকে এজেন্ট হিসাবে নিয়োগ দেয় এফ বি আই। তার কিছুদিনের মধ্যেই মসজিদের অন্য কিছু ব্যক্তি সেই এজেন্টের আচরণ “সন্দেহজনক” বুঝে উল্টে এফ বি আই-কেরিপোর্ট করে। বাধ্য হয়ে ও সমস্যা নেই বুঝে তদন্ত বন্ধ করে দেয় এফ বি আই। আমি আমেরিকান হলে স্পষ্টতই স্টিং অপারেশনের সমর্থন করতাম, কারণ এই ধরনের অপারেশন শুধু বড় জোট গঠন হবার আগেই তাকে ভেঙে দিচ্ছে তাই না, আল-কায়দা সহ জঙ্গী গোষ্ঠীদের মধ্যেও যথেষ্ট “ডাউট” তৈরী করছে, যার ফলে “নিউ রিক্রুট” করার আগে তারা দশবার ভাবছে।

কিছুদিন আগেই মালালা ইউসুফজাই নামে পাকিস্তানী এক বালিকাকে তালেবানী “শিক্ষাব্যবস্থার” সমালোচনা করার কারণে গুলি খেতে হয়েছে। তালিবানী মুখপাত্র ঘটনা স্বীকার করে তার স্বপক্ষে যুক্তিও উপস্থাপন করেছেন। পাকিস্তানী সমাজেও ঘটনাটার বেশ নিন্দা শোনা যায়। কিন্তু ওই পর্যন্তই, কিছুদিনের মধ্যেই অসংখ্য ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হাজির হয় বাজারে ও পাকিস্তানী মধ্যবিত্ত নির্দ্বিধায় সব দোষ তালেবানের জায়গায় মার্কিন যড়যন্ত্রের ওপর চাপিয়ে দেয়। পাকিস্তানের সমস্যা অশিক্ষিত তালিবানেরা যত, তার থেকে ঢের বেশী গুণে এই সব অর্ধ-শিক্ষিতরা – যারা নিজের দোষ ঢাকতে সব-সময়ে ষড়যন্ত্রের কথা বলে বেড়ান। একই ঘটনা এখন বাংলাদেশেও ঘটছে – যদিও পাকিস্তানের দশায় যেতে অনেক দেরী আছে, কিন্তু অংকুরেই এসব বিনাশ করার প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

শুরুতেই বলেছি এফ বি আই আজকাল ফেসবুক সহ সোসাল মিডিয়ার ওপর কড়া নজরদারী করছে। সুতরাং এই ধরনের মতামত প্রচার করে বেড়ালে তাদের এই ধারণা বদ্ধমূল হবে যে এই নাফিসের পেছনে অসংখ্যা সমব্যাথী আছে যাদের অনেককেই হাতে বোমা তুলে দিলে তা মার্কিণ দূতাবাসে বা স্টক-এক্সচেঞ্জে আক্রমণ চালাতে দ্বিধা করবে না। নাফিস একা যতটা ভাবমুর্তির ক্ষতি করেছে, তার সমব্যাথীরা সমষ্টিগতভাবে তার বহুগুণ ক্ষতি বয়ে আনবে দেশের ওপর।

শেষটা করার আগে একটা উপায় নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করে যাই। রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচারের বদলা হিসাবে রামু-উখিয়াতে যারা বৌদ্ধ-হিন্দু মন্দিরে আক্রমণ চালিয়েছিলেন, সেই কয়েকশ’ উৎসাহীদের সবাইকে হাতে বোমা ধরিয়ে দিলে তাদের মধ্যে কিছু লোক থাকতেই পারে যারা এই বোমা জাপানী বা থাই বৌদ্ধদের মারার কাজে ব্যবহার করতে পারেন। আবার তাদের মধ্যে দু-একজন এমনও পাওয়া যাবে যারা সত্যি অর্থেই থাইল্যান্ড বা জাপানে যেতে সক্ষম। এই দুইয়ের মিল হয়ে গেলেই কিন্তু সর্বনাশ – বিদেশে গিয়ে বোমা ফাটিয়ে কেউ না কেউ দেশের নাম উজ্জ্বল করে আসবে। সুতরাং, এই ধরনের অপরাধীদের দেশেই জেলে পুরে ফেলা ভাল যাতে বিদেশে গিয়ে তারা ধরা না পড়ে। এদেরকে ধরিয়ে দিন – দেশের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখুন। বিদেশে ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে গেলে দেশের বিচার ও আইন-ব্যবস্থা ভাল করতেই হবে। আইনের শাসনের কোনও বিকল্প নেই।

নাফিসের ওপর অভিযোগ – সরকারী সূত্র

বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ও ভবিষ্যত

ডিসেম্বর 25, 2012

বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ঘাটতি নিয়ে দেশীয় পত্রপত্রিকায় অনেক লেখা হয়। বিশেষত ভারতের ও চিনের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে অনেক লেখাই আসে, একইরকম ভাবে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি নিয়েও কিছু লেখা আসে। আমি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাণিজ্যের রেকর্ড নিয়ে কিছু পরিসংখ্যান নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলাম। একটা প্যাটার্ন স্পষ্ট চোখে পড়ে। বাংলাদেশ এশিয়ার দেশগুলোর সাথে ঘাটতি বাণিজ্য চালায়। আবার উল্টোদিকে উন্নত ইউরোপীয় দেশগুলো ও আমেরিকার সাথে বাণিজ্য-উদ্বৃত্ত থাকে। এর সাথে আছে সারা বিশ্ব থেকে পাঠানো শ্রমিকদের রেমিট্যান্স। এই সবে মিলে বাংলাদেশ আয়ের চেয়ে সামান্য কিছু কম ব্যয় করে। এই উদ্বৃত্ত বা কারেন্ট একাউন্ট সারপ্লাস বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার তহবিল মজবুত করে। এ ছাড়া আছে ক্যাপিটাল একাউন্ট – যেখানে জমা পড়ে বিদেশী বিনিয়োগের টাকা। বৈদেশিক মুদ্রা তহবিল (ক্যাপিটাল একাউন্ট ও কারেন্ট একাউন্ট সারপ্লাস) বাংলাদেশের মুদ্রার (টাকা) বিনিময়মূল্য নির্দিষ্ট রাখতেও সাহায্য করে। মোটের ওপর এভাবেই বাংলাদেশের অর্থনীতি চলছে।

আমি মূলত আলোচনা করব বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে। বাংলাদেশের পত্রিকায় এই বিশেষ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় অনেক। মূল বক্তব্য থাকে দেশ আমদানী-নির্ভর হবার সমস্যা, এর সাথে আসে কিছু রাজনৈতিক আলোচনা। পরিসংখ্যানগতভাবে খুব একটা গভীরে আলোচনা যায় না, তাই আমি কিছু পরিসংখ্যান প্রস্তুত করার চেষ্টা করি। আমি ২০০৯ সালে বাংলাদেশের ২৫ টি বৃহত্তম এশিয়ান বাণিজ্য পার্টনার নিয়ে কিছু চার্ট তৈরী করলাম। দেখা গেল – এর ২৩টি দেশের সাথেই বাংলাদেশের ঘাটতি বাণিজ্য চলে। উদ্বৃত্ত বাণিজ্য চলে শুধুমাত্র ইরান ও তাজিকিস্তানের সাথে। এর মধ্যে ক্রমাণ্বয়ে চিন, ভারত, সিঙ্গাপুর, জাপান, মালয়েশিয়া, হংকং ও দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে দুশো মিলিয়ন ডলারেরও বেশী বাণিজ্য ঘাটতি। ভারতের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি ১৭৮৪ মিলিয়ন ইউরো (আমদানী ১৯৭৪ মিলিয়ন , রপ্তানী ১৯০ মিলিয়ন) ও অপর প্রতিবেশী মায়ানমারের সাথে ঘাটতি ৪৫ মিলিয়ন ইউরোর (আমদানী ৫০ মিলিয়ন, রপ্তানী ৫ মিলিয়ন)। চিনের সাথে সর্বোচ্চ ঘাটতি ২৪৫১ মিলিয়ন ইউরোর (আমদানী ২৫২২ মিলিয়ন ও রপ্তানী ৭১ মিলিয়ন)। ১৫টি দেশের একটা চার্ট দিলাম –

auto

তবে এ থেকে পরিষ্কার বোঝা সম্ভব নয় কোন দেশের সাথে বাণিজ্য কতটা একমুখী (অর্থাৎ আমদানী-নির্ভর)। এজন্য আমি এই দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের মোট বাণিজ্য ও তাতে ঘাটতির অনুপাত হিসাব করলাম। এই হিসাবেও দেখা যায় অধিকাংশ এশিয়ান দেশের সাথেই বাংলাদেশের ঘাটতির অনুপাত ৫০% – এরও বেশী – অর্থাৎ ১০০ টাকা বাণিজ্য হলে ৫০ টাকা ঘাটতি। এরকম দেশের মধ্যে শিল্পোন্নত জাপান বা কোরিয়া যেমন আছে, উন্নয়নশীল ভারত-চিন-থাইল্যান্ড আছে তেমন স্বল্পোন্নত মায়ানমার বা নেপালও আছে। এদের সবার ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি অনুপাত ৫০ এরও বেশী, কার্যত নেপাল ছাড়া বাকিদের ক্ষেত্রে এই অনুপাত ৮০-র ও বেশী। আমি আমদানী নির্ভরতার একটা ইনডেক্স বানিয়ে তাতে দেশগুলোকে ক্রমাণ্বয়ে সাজালাম। সবার ওপরে আসে উজবেকিস্তান – যারা বাংলাদেশে ২৬৯ মিলিয়ন ইউরো মূল্যের রপ্তানী করেছেন, অথচ আমদানী করেছেন মাত্র ২ মিলিয়ন মূল্যের সামগ্রী। এর পরে একে একে আসে যথাক্রমে কুয়েত, চিন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, কাতার, তুর্কমেনিস্তান, ভারত, মায়ানমার ও জাপান।

auto

একটু গভীরে আলোচনা করি – তালিকার সবার ওপরে থাকা উজবেকিস্তানকে নিয়েই আলোচনা করা যাক। উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ মূলত তুলো কেনে বাংলাদেশের নিজস্ব টেক্সটাইল শিল্প চালানোর জন্য। উজবেকিস্তানে তুলো চাষ অনেক হলেও শ্রমিক তুলনায় কম – যা আছে বাংলাদেশে। তাই উজবেকিস্তান থেকে আমদানী করা কাঁচামাল যদি গারমেন্টস-এর আকারে পশ্চিমে যায় তাহলে দুই দেশেরই লাভ – যাকে বলে উইন-উইন সিচুয়েশন। সেইক্ষেত্রে বাংলাদেশ একতরফা বিশাল বাণিজ্য ঘাটতির সম্মুখীন হলেও এই কাঁচামাল আদপে বাংলাদেশের কাজে আসছে। তাই ঘাটতি বাণিজ্য সবসময় খারাপ নয়, যদি সেই ঘাটতি অন্য কোথাও রপ্তানী উদ্বৃত্তের কাজে আসে।

এই বাণিজ্য ঘাটতি কি চিন্তার বিষয়? আপাতত না। কারণ, মোটের ওপর বাংলাদেশের আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্য আছে। কিছু দেশের সাথে ঘাটতি বাড়লেও অন্য দেশের সাথে উদ্বৃত্ত বেড়ে সেই ঘাটতি পুষিয়ে যায়। তাছাড়া উজবেকিস্তানের ক্ষেত্রে যেমন দেখলাম, সেভাবে কাঁচামাল আমদানী বাড়লে সাময়িকভাবে কোনো কোনো দেশের সাথে একতরফা আমদানী-সম্পর্ক তৈরী হতেই পারে। এগুলোতে সমস্যা নেই। সহজভাবে ভাবলে এক ব্যক্তি অফিসে কাজ করে মাইনে পায় যা তার “বাণিজ্য-উদ্বৃত্ত”, আর সে যে যে দোকানে গিয়ে জিনিস কেনে তাদের সাথে তার “বাণিজ্য-ঘাটতি” – মোটের ওপর হিসাব নিয়ন্ত্রণে থাকলে চিন্তার কিছু থাকে না।

কিন্তু ভবিষ্যতের কথা মাথায় রাখলে চিন্তার কিছু কিছু কারণ আছে। প্রথমত, বাংলাদেশের রপ্তানী-বাণিজ্যের ৮০% এরও বেশী শুধুমাত্র টেক্সটাইল ও গারমেন্টস-কেন্দ্রিক। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ ইউরোপে প্রতিদ্বন্দীদের তুলনায় কিছুটা শুল্ক-সুবিধা পায় স্বল্পোন্নত দেশ হিসাবে। ভবিষ্যতে এই সুবিধা না থাকলে এই শিল্পের সমস্যা তৈরী হতে পারে। একইভাবে, কাঁচামালের যোগানে সমস্যা সৃষ্টি হলেও রপ্তানী মার খেতে পারে। তবে বিগত কিছু বছরের ট্রেন্ড থেকে মনে হয় না এরকম সমস্যা তৈরী হতে পারে।

দ্বিতীয়ত বিশ্ব-বাণিজ্যের ভরকেন্দ্র যে আস্তে আস্তে এশিয়ার দিকে সরে আসছে তা সব অর্থনীতিবিদেরাই বলছেন। এশিয়ার সাথে বাণিজ্য ঘাটতি কিছু কিছু উদ্বৃত্তে না পরিণত করতে পারলে ভবিষ্যতে সমস্যা হতে পারে – কারণ পশ্চিমের বাজার এশিয়ার মত অত দ্রুতহারে ক্রমবর্ধমান নয়। সেক্ষেত্রে বাণিজ্য ঘাটতি ক্রমাগত বেড়েই চলবে। এশিয়ার দেশগুলোতে পশ্চিমের মত শস্তাশ্রমের অভাব নেই, তাই শ্রমঘন শিল্প ছাড়াও অন্যান্য দক্ষতাভিত্তিক শিল্পখাতে উন্নতি করতে হবে।

তৃতীয়ত বাংলাদেশে রপ্তানীমুখী শিল্পের বিকাশ ঘটাতে হবে। সন্দেহ নেই এটা অত সহজে হবে না, কারণ বাংলাদেশে কাঁচামালের প্রাপ্যতার সমস্যা আছে। তাও পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ সিঙ্গাপুরে ৩৫ মিলিয়ন ইউরো, মালয়েশিয়ায় ২৫ মিলিয়ন ইউরো থাইল্যান্ডে ২৪ মিলিয়ন ইউরো এবং মায়ানমারে ৫ মিলিয়ন ইউরো মূল্যের সামগ্রী রপ্তানী করেছে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দূরত্বের নিরিখে এই চারটে দেশই বাংলাদেশের প্রতিবেশী-তুল্য। এবং এদের জিডিপি ও বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিমাণও যথেষ্ট বেশী। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের রপ্তানী-ব্যর্থতা চোখে পড়ার মত। একই ভাবে, সংযুক্ত আরব আমীরশাহী, কুয়েত ও কাতারে বাংলাদেশের রপ্তানীর পরিমাণ যথাক্রমে ৪১, ৫ ও ৪ মিলিয়ন ইউরো। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো তেল ও গ্যাস রপ্তানী করে প্রায় বাকি সবই আমদানী করে। আবার এই দেশগুলোতে প্রচুর সংখ্যায় বাংলাদেশী কর্মরত। তাই এখানেও বাংলাদেশের রপ্তানী-ব্যর্থতা চোখে পড়ে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার চারটি দেশে ভারতের রপ্তানী যথাক্রমে ৩৬৬৯, ১৭২৫, ১১২৮ ও ১৫০ মিলিয়ন ইউরো। আর মধ্যপ্রাচ্যের তিনটি দেশে রপ্তানী হল ১৪৭৬২, ৫১৪ ও ৪২৯ মিলিয়ন ইউরো। এশিয়া-মুখী বাণিজ্যে বাংলাদেশকে আরও দ্রুত রপ্তানী বাড়াতে হবে, এটাই বোঝা যায়।

রপ্তানীমুখী শিল্পের বিকাশের জন্য দেশে বিনিয়োগের দরকার। বিশ্বব্যাঙ্কের ঋণ দিয়ে কিছু পরিকাঠামো গড়া যায় বটে কিন্তু বৈদেশিক বিনিয়োগই এশিয়ার বিভিন্ন দেশগুলোকে উন্নতির পথে ঠেলেছে। এখানে সমস্যা হল রাজনৈতিক। বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য বেশী ঝুঁকি নিচ্ছে, তাই তারা বেশী সুযোগসুবিধা চাইবে – যা নিয়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরী হয়। অথচ শিল্পায়নে বিনিয়োগের বিকল্প নেই। দেশের আয়-উদ্বৃত্ত দিয়ে যদি পরিকাঠামো তৈরী হয় তাহলে টাকার বিনিময়মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প অবশ্যই ভাল – কিন্তু কয়েকটি সেক্টর ছাড়া (যেমন মাইনিং, এগ্রো-বেসড) পৃথিবীতে সফল রপ্তানীমুখী রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের উদাহরণ খুবই কম। তাছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প অধিকাংশ সময়েই একচেটিয়া বাণিজ্যের অধিকার পায় যার ফলে দ্রুত স্বজনপোষণ ও দুর্নীতির পীঠস্থান হয়ে ওঠে। এশিয়ার শিল্পোন্নত কিছু দেশ (জাপান, কোরিয়া) থেকে বিনিয়োগ আনতে পারলে ভাল ছাড়া খারাপ কিছু হয় না, বিনিয়োগকারীরা নিজেরাই লবি করে ওইসব দেশে বাংলাদেশের জন্য বাণিজ্য সুবিধা করে দেবে।

শেষের কথায় আসি। রপ্তানীমুখী শিল্পের দরকার আছে ঠিকই, কিন্তু সেখানেও একটা প্রশ্নচিহ্ণ রেখে দেওয়া ভাল। রপ্তানীমুখী শিল্পের মাধ্যমে উন্নয়নের সবথেকে ভাল মডেল হল চিন। কিন্তু দেশে শিল্প গড়তে গিয়ে দেশের মধ্যে যে পরিমাণ দূষণের সম্মুখীন হতে হয় তার উদাহরণও চিন থেকে পাওয়া যায়। একইভাবে ভারতে শিল্প গঠনে জমি অধিগ্রহণের সময় একাধিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা থেকে বোঝা যায় বাংলাদেশেও শিল্পের বিকাশ অতটা সহজে হবে না। শুধু তাই নয়, চিন যেমন জাতিসংঘে ও বিশ্ব-দরবারে নিজের প্রভাব খাটিয়ে অনুন্নত দেশগুলো থেকে কাঁচামাল আমদানী করে, সেটাও বাংলাদেশের পক্ষে অতটা সহজ না-ও হতে পারে। তাই শিল্প ছাড়াও সেবা বা সার্ভিসেস সেক্টরে জোর দেওয়া দরকার। সেবা-খাতে সুবিধা হল এখানে প্রবৃদ্ধির জন্য মেধা-সম্পদ ছাড়া আর কোনো কাঁচামালের প্রয়োজন পড়ে না, পরিবেশ দূষণের সম্ভাবনাও অনেক কম (একমাত্র ব্যবহৃত বিদ্যুতের জন্য যতটা)। এর পরে রেমিট্যান্স ও শ্রমিক-রপ্তানী। এই খাতে বাংলাদেশের বর্তমান সাফল্যও চোখে পড়ার মত। তবু, পরিসংখ্যানের কথায় বলি, ২০১০ সালের বাংলাদেশের শ্রমিক-পিছু রেমিট্যান্সের পরিমাণ ২০৮৪ ডলার যেটা ভারতের ক্ষেত্রে ৪৮৬৭ ডলার। তাই, শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়ানোর কাজে সরকারী উদ্যোগ চাই, যাতে একই সংখ্যক শ্রমিক আরো বেশী রেমিট্যান্স পাঠাতে পারে, সেই সাথে বেশী শ্রমিক পাঠাবার উদ্যোগও জারী রাখতে হবে। বাণিজ্যের ভবিষ্যত হল বিশ্বায়ন ও মুক্তবাণিজ্যের হাত ধরে – মুক্তবাণিজ্যের বিশ্বে সাফল্যের জন্য দক্ষতা ও পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই।

আন্তর্জাতিক আদালতে বাংলাদেশ-মায়ানমার সমুদ্রসীমা বিরোধ

ডিসেম্বর 25, 2012

বাংলাদেশের সাথে মায়ানমারের আইনি লড়াই চলছে সমুদ্র-আইন বিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে। মামলার শুনানি চলছে, এই বছরের মধ্যেই (হয়ত সামনের মাসেই) রায় জানা যাবে। প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশ ও মায়ানমার দু’বার করে তাদের তরফে কাগজপত্র জমা দিয়েছে, এর পরে মৌখিক শুনানি শুরু হয়েছে। মৌখিক শুনানির প্রথম পর্যায়ে এখন বাংলাদেশের পক্ষের আইনজীবীরা সওয়াল করছেন। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখা থেকে অনেকেই জানেন হয়ত যে বাংলাদেশের সাথে মায়ানমারের সমুদ্রসীমা বিরোধের গুরুত্ব অনেকটা – বিশেষত বাংলাদেশ-মায়ানমার বিরোধপূর্ণ অঞ্চলটিতে গ্যাস পাওয়া যাওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্টই।


প্রাথমিক পর্যায়ের চারটি ডকুমেন্ট পড়েছি ও তার ভিত্তিতে কিছু কিছু বিষয় সবার সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করি। প্রথমত বাংলাদেশের মিডিয়াতে যতটা অঞ্চল বিরোধপূর্ণ বলে জানানো হচ্ছে, বাংলাদেশ কোর্টে কার্যত ততটা অঞ্চলের দাবী জানায়নি। উল্লেখ্য যে মায়ানমারও তাদের পুরোনো দাবী থেকে সরে কিছুটা কম অঞ্চল দাবী জানিয়েছে – দুয়ের ফলে বিরোধপূর্ণ অঞ্চল আয়তনে অনেক কমে গেছে। মায়ানমারের পুরোনো দাবী ছিল লম্বরেখার সাথে ২৪৩ ডিগ্রি রেখা বরাবর(ছবিতে হাল্কা নীল রেখা), যা এখন হয়েছে লম্বরেখার সাথে ২৩০ ডিগ্রি(মোটা নীল রেখা) রেখা বরাবর। একইভাবে বাংলাদেশের পুরোনো দাবী ছিল মোটা লাল রেখা বরাবর – অর্থাৎ ১৮০ ডিগ্রিতে, যা এখন হয়েছে ২১৫ ডিগ্রিতে – হাল্কা লাল রঙের রেখায়। এই অবস্থান পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ ও মায়ানমার – উভয়েরই মামলা জেতার সম্ভাবনা কিছুটা বেড়েছে। একই সাথে বাংলাদেশ জানিয়েছে তাদের আগের দাবীর যে ভিত্তি – সেই ১৯৭৪ সালের বাংলাদেশের সমুদ্র-আইনের বেশ কিছু অংশ ১৯৮২ সালের আন্তর্জাতিক আইনের সাথে মেলে না। তাই তারা তাদের দাবী কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে। দুঃখের বিষয়, এই পরিবর্তনের কথা সরকার পার্লামেন্ট বা জনগণকে জানায়নি – ফলে এখনও পত্রপত্রিকায় সমুদ্রসীমা বিষয়ক যে লেখা আসে তাতে বাংলাদেশের দাবী বলতে পুরোনো সীমাই দেখানো হয় ও পুরোনো যুক্তিই লেখা হয়ে আসছে।

কিছুদিন আগে পত্রপত্রিকায় একটি লেখা এসেছিল যে সুগত হাজরা নামে একজন গবেষক দাবী করেছেন যে দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ তলিয়ে গেছে। বাংলাদেশের প্রদত্ত ডকুমেন্টেও সেরকমই লেখা আছে।

“when a patch of sedimentary mud near the Bangladesh-India boundary known as South Talpatty emerged above the waterline in 1971 following a massive cyclone. No sooner had the feature emerged, however, than waves and storms began to wash it back into the sea. By 1990, satellite imagery showed that it had disappeared completely.” 

ডকুমেন্টের সাথে লাগানো ছবিতে দেওয়া আছে ১৯৭৩ ও ১৯৯০ সালের ওই দ্বীপের ছবি। এর মানে বোঝা যাচ্ছে, দ্বীপটি যে তলিয়ে গেছে, তা বিভিন্ন সরকারের পক্ষে জানানো সম্ভব ছিল ১৯৯০ থেকেই – কিন্তু তা জনগণকে জানানো হয়নি।

বাংলাদেশ-মায়ানমার আইনী লড়াই তিনটি মূল পর্যায়ে হচ্ছে – প্রথমটি টেরিটোরিয়াল সমুদ্রসীমা (সমুদ্রেতীর থেকে ১২ নটিকাল মাইল) নিয়ে, দ্বিতীয়টি পরবর্তী ২০০ নটিক্যাল মাইল নিয়ে ও শেষেরটা কন্টিনেন্টাল শেলফ নিয়ে (যা সমুদ্রতীর থেকে ৩৫০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত)।

টেরিটোরিয়াল সমুদ্রসীমা নিয়ে ১৯৭৪ সালে দুই দেশের মধ্যে একটি মিটিং হয়েছিল – যার বিস্তারিত মানচিত্র সহ বাংলাদেশ দাবী তুলে ধরেছে। মায়ানমারের তরফে ওই আলোচনাকে গুরুত্বহীন আখ্যা দিয়ে নতুন একটি রেখা প্রস্তাবনা করা হয়েছে। নতুন রেখাটি সেন্ট মার্টিন দ্বীপের অস্ত্বিত্ব উপেক্ষা করেই আঁকা সমদ্বিখণ্ডক রেখা। এ নিয়ে ভিন্নমতের যুক্তি ও প্রতি-যুক্তি চলছে।

পরবর্তী ২০০ নটিকাল মাইলের জন্য মায়ানমারের প্রস্তাব সমদূরত্ব রেখা টেনে সীমা বিভাজন – যে নিয়ে মিডিয়াতে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের এই বিষয়ে প্রস্তাবনা বাংলাদেশ-মায়ানমার টেরিটোরিয়াল জলসীমা থেকে কৌণিক সমদ্বিখণ্ডক রেখা দিয়ে বাংলাদেশ-মায়ানমার সমুদ্রসীমা বিভাজন করার। বাংলাদেশের বক্তব্য তাদের ভৌগোলিক অবস্থানের জন্য সমদ্বিখণ্ডক রেখা দিয়ে সমুদ্রসীমা টানা হলে তা অসম হবে, কারণ এর ফলে তারা আন্তর্জাতিক জলসীমায় সরাসরি প্রবেশ পাবে না ও উপকূলের দৈর্ঘ্যের অনুপাতে সুমুদ্রসীমার আয়তন হবে না। এ বিষয়ে তাদের জোরালো দাবী ১৯৬৯ সালের আন্তর্জাতিক আদালতের একটি বিবাদকে কেন্দ্র করে – যাতে একই রকম যুক্তি দেখিয়ে জার্মানী তার প্রতিবেশী ডেনমার্ক ও হল্যান্ডের বিরুদ্ধে জিতেছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক আইনে সমুদ্রসীমার টানার কথা বলা আছে সাম্যের ভিত্তিতে। মায়ানমারের বক্তব্য বাংলাদেশের অসাম্য প্রাকৃতিক অবস্থানের কারণে, আইন করে এর নিরসন করা কোর্টের দায়িত্ব হওয়া উচিত না।


সবশেষে আসে কন্টিনেন্টাল শেলফ – যা ২০০ থেকে ৩৫০ নটিক্যাল মাইলের মধ্যের সমুদ্রসীমা। এ নিয়ে বাংলাদেশের বক্তব্য – বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশ থেকে আসা নদীগুলোর বয়ে আনা পলি-সমৃদ্ধ – অর্থাৎ গ্রেট বেঙ্গল ফ্যানের অংশ। তাই বঙ্গোপসাগরকে বাংলাদেশের বিরবিচ্ছিন্ন মহাদেশীয় শেলফের প্রবর্ধক হিসাবে ধরা যায়। এ নিয়ে মায়ানমারের বক্তব্য বোধগম্য হয় নি – তবে কিছু ব্যতিক্রমী উদাহরণ তারা দিয়েছে। মায়ানমারের মুল বক্তব্য হল বর্তমান কোর্ট কন্টিনেন্টাল শেলফ নিয়ে আইনী সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না (No jurisdiction)। বলাই বাহুল্য, মায়ানমারের এই বক্তব্যের বিরোধিতা করছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ অন্য কোনো দেশের সাথে এই প্রথমবারের মত আইনী লড়াইতে গেছে। বলে রাখা ভাল যে এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশের দাবী যথেষ্ট ভালভাবেই উপস্থাপিত হলেও বাংলাদেশ যেহেতু এই মামলায় বাদী পক্ষ – তাই প্রমাণ করার দায়ভার বাংলাদেশের ঘাড়ে। অর্থাৎ, সঠিকভাবে প্রমাণ না করতে পারলে মায়ানমারের পক্ষে যাবে রায়। তবে তা সত্ত্বেও আইনী লড়াই যুদ্ধজাহাজ নিয়ে লড়াই করার থেকে বহুগুণে ভাল।

সূত্র –
১) বাংলাদেশের দাবী
২) মায়ানমারের প্রতি-দাবী
৩) বাংলাদেশের উত্তর
৪) মায়ানমারের প্রতি-উত্তর

পুরো ব্যাপারটা নিয়ে ধারণা পেতে হলে নিচের ছবিগুলোও দেখে নিন –
৫) টেরিটোরিয়াল ওয়াটার ক্লেমের ছবি 
৬) বাংলাদেশের কৌণিক সমদ্বিখণ্ডক
৭) মায়ানমারের সমদূরত্ব রেখা
৮) ভারত-বাংলাদেশ-মায়ানমারের কন্টিনেন্টাল শেলফ নিয়ে দাবী-প্রতিদাবীর মানচিত্র
৯) বাংলাদেশ ও মায়ানমারের পুরোনো দাবীর মানচিত্র
১০) গ্রেট বেঙ্গল ফ্যান
১১) বাংলাদেশের বিরোধপূর্ণ গ্যাস-ব্লকগুলো
সবশেষে –
আপডেট পেতে চোখ রাখুন কোর্টের ওয়েবপেজে

নদী অববাহিকা ও আন্তর্জাতিক আইন

ডিসেম্বর 25, 2012

জলসম্পদ নিয়ে দেশে দেশে বিবাদ বহুবছরের পুরোনো, কারণ জল মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান উপাদান। মধ্যপ্রাচ্যের মত অঞ্চলে যেখানে পৃথিবীর জলসম্পদের মাত্র ১% পাওয়া যায় অথচ জনসংখ্যা ক্রমবর্ধমান, সেখানে এই বিবাদ বাকী অংশের থেকে বেশী জোরালো। সাম্প্রতিককালে জলসম্পদের ক্রমাগত দুষ্প্রাপ্যতার কারণে বিবাদের সংখ্যাও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু জল-সম্পদের ভাগাভাগি নিয়ে আইনি সহায়তায় বিবাদ-মীমাংসা আধুনিক যুগে শুরু হয়েছিল ইউরোপ আর আমেরিকাতে। প্রথমদিকে মনে করা হত যে দেশ বা অঞ্চলে নদী বা কোনো জলসম্পদের অবস্থান, সেই দেশের সার্বভৌম অধিকার থাকবে সেই সম্পদের ওপর (Harmon Doctrine)। কিন্তু প্রযুক্তিগত উন্নতির পর বড় বড় বাঁধ তৈরীর ফলে বোঝা গেল এরকম অধিকারের ফলে অববাহিকার উজানের দেশ বেশী সুবিধা পেয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে অন্য বিকল্প হিসাবে মোহানার নিকটবর্তী দেশের প্রয়োজন ছিল নদীর জলের পরিমাণ ও গুণাবলীর ওপর সম্পূর্ণ অধিকার যাতে উজানের দেশ কোনোভাবেই সেই জল নিতে (বা দূষিত করতে) না পারে। উভয় নীতিই পক্ষপাত দোষে দুষ্ট, তাই এই দুই নীতি থেকে সরে এসে সমতার (Equity) নীতি অনুসারে জলসম্পদের বন্টন করার আইন চালু হল। সমতা অর্থাৎ সকল বিষয় ও প্রভাব ভেবে নিয়েই জলসম্পদ বন্টন হবে।

autoআন্তর্জাতিকভাবে প্রথম এই জলসম্পদ-আইন প্রস্তাব করা হল হেলসিঙ্কিতে। প্রাথমিকভাবে এই খসড়া প্রস্তাবনা বা গাইডলাইন শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক নদীগুলো জন্য প্রযোজ্য ছিল। এর পরে জাতিসংঘের উদ্যোগে ১৯৭০ সালে এ নিয়ে একটি বহুপাক্ষিক চুক্তির প্রস্তাবনা হয়। এর নাম দেওয়া হয় নৌচলাচল ব্যতিরেকে আন্তর্জাতিক নদীসম্পদ ব্যবহারের আইন (সংক্ষিপ্তপূর্ণাঙ্গ)। ১৯৯৭ সালে এই সনদের প্রস্তাবিত বয়ানের ওপর ভোটাভুটি হয় ও ১০৩-৩ ভোটে তা গৃহীত হয়। একে আইন হিসাবে গ্রাহ্য হবার জন্য সব দেশকে আভ্যন্তরীণ পার্লামেন্টে তার গ্রহণযোগ্যতা স্বীকার করতে হবে। সনদটির মূল সমস্যা দেখা দেয় চিন (তুরস্ক, চিন আর রোয়ান্ডা বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল **) এর বিরোধিতা করায়। এই চুক্তির ভবিষ্যত অনিশ্চিত তাই এখনও অবধি মাত্র ১৬টি দেশ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। (ছবিতে – স্বাক্ষরকারী দেশ, পক্ষের-বিপক্ষের দেশ)

আশার কথা, আন্তর্জাতিক আইন সংঘ (International Law Association) নামে একটি সংস্থা – যারা জাতিসংঘকে আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ক সাহায্য করে – তাদের প্রস্তাবিত আইনসমূহ নিয়ে বার্লিনে আলোচনার পরে ২০০৪ সালে জলসম্পদ আইনের প্রস্তাবনা (সংক্ষিপ্ত ,পূর্ণাঙ্গ) হয়। এই আইন আদপে জাতিসংঘের আইনের পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত রূপ, যাতে নৌচলাচল সম্পর্কিত আইনও অন্তর্ভুক্তি পেয়েছে এবং হেলসিঙ্কি আইনের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। এই আইন কমিটিতে ভারত ও বাংলাদেশের সদস্যরাও অংশগ্রহণ করেছে ও উভয় দেশই আইন নিজদেশে স্থানীয় আইনের মাধ্যমে একে গ্রহণ করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

autoআগের আইনগুলোর মত এক্ষেত্রেও আইনের মূলনীতি হল সমতা। তবে আগের তুলনায় বার্লিন কনভেনশনে অনেক স্পষ্টভাবে তা উল্লিখিত আছে। সমতার নীতি অনুসারে যে যে মাত্রা অনুসারে অববাহিকার একাধিক দেশের মধ্যে জলসম্পদ বন্টন হওয়া উচিত সেগুলো হল (আর্টিকেল ১২, ১৩) –
১) ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক অবস্থা
২) সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজন,
৩) জনসংখ্যা,
৪) এক দেশের ব্যবহার অন্য দেশকে প্রভাবিত করে,
৫) বর্তমান, ভবিষ্যত ও সম্ভাব্য ব্যবহার
৬) জলসম্পদ সংরক্ষণের ও উন্নয়নের খরচা
৭) বিকল্পের সুযোগ
৮) প্রস্তাবের সময়কাল
৯) পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব
১০) প্রাসঙ্গিক অন্য যে কোনো মাত্রা
এ বিষয়ে উল্লেখ্য যে এখানে জলসম্পদের মধ্যে পানীয় ও রান্নার জন্য ব্যবহৃত জলকে ধরা হচ্ছে না (ধরা হচ্ছে না খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত ন্যূনতম প্রয়োজনীয় জলকেও)। সমতার মাধ্যমে বন্টনের সময় জনসাধারণের জীবনধারণের জন্য অবশ্য-প্রয়োজনীয় জলের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে আর এজন্য প্রয়োজনীয় জল বরাদ্দ রাখতে হবে। (আর্টিকেল ১৪)

autoজলসম্পদ বন্টনের মত নৌচলাচলের ক্ষেত্রেও অববাহিকার সব দেশই একে অপরকে সমতার ভিত্তিতে স্বাধীনভাবে জলপথ ব্যবহার করতে দেবার কথা বলা আছে। নৌচলাচলের স্বাধীনতার মধ্যে পড়ে জলপথ ব্যবহারের, অববাহিকার বন্দর ও ডক ব্যবহারের এবং নদীপথে মালপত্র পরিবহনের স্বাধীনতা (অস্ত্রবাহী বা নৌবাহিনীর জাহাজ এই চুক্তির আওতায় আসে না) – অবশ্য সেজন্য ব্যবহারকারী দেশের ওপর নন-ডিস্ক্রিকিমিনেটরি কিছু শুল্ক আরোপ করা যেতে পারে। (আর্টিকেল ৪৩-৪৯)

এছাড়াও এই আইনে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি, অববাহিকার অবস্থা পর্যালোচনার কমিটি গঠন, ভৌমজল ব্যবহার, খরা-বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ দূষণ, জৈববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, বিবাদ-মীমাংসা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে মোট ৭৩টি অনুচ্ছেদ আছে। তবে এদের সকলেরই মূলভিত্তি একই – সমতা। কোনো অবস্থাতেই অববাহিকার সম্পদের সার্বভৌম অধিকারের কথা বলা নেই।

কিন্তু এই সমতার আইনটা নিয়ে বিশেষজ্ঞ ম্যাকেফ্রি প্রশ্ন তুলেছেন ও বলেছেন যে এই সমতার সংজ্ঞায়িতকরণের জন্য পরের বিশেষজ্ঞরা যে দ্বন্দে পড়বেন। একটা প্রশ্ন রেখেছেন উনি। ধরা যাক তিনটি দেশ (বা অঞ্চল) ক, খ আর গ একই নদী অববাহিকায় অবস্থিত(তুলনীয় বলে যথাক্রমে নেপাল, ভারত আর বাংলাদেশ ভাবতে পারেন)। ধরা যাক পর্বতসঙ্কুল “ক” অঞ্চলে কোনো চাষাবাদ হয়না কিন্তু সমতল “খ” ও “গ” দেশে হাজার হাজার বছর ধরেই চাষ হয়ে আসছে। এখন, প্রযুক্তির উন্নতির ফলে দেখা গেল “ক”-তেও চাষ করা সম্ভব হবে। তাই, ক সিদ্ধান্ত নিল যে তারও জল লাগবে। কিন্তু এর ফলে খ ও গ দেশে জলের যোগাণ কমতে বাধ্য। এখন সমতা এখানে কি ভাবে আনা সম্ভব হবে? যদি, ক-কে কিছু জল দিতেই হয় তাহলে খ আর গ বলবে আমাদের কৃষকেরা না খেয়ে মারা যাবে। আবার ক বলবে সমতা অনুসারে চাষ করার অধিকার আমার আছে, নদী অববাহিকার জলের ভাগ আমারও প্রাপ্য।

জটিলতা থাকলেও একটা বিষয় বুঝে নেওয়া উচিত যে নদী-অববাহিকার সব সম্পদের সমতা মেনেই ব্যবহার হওয়া উচিত। আর এই সমতার মাধ্যমেই একমাত্র বিবাদ-মীমাংসা হতে পারে। দুঃখের বিষয় এই ব্যাপারে রাষ্ট্রনীতি খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। চিন, তুরস্ক ও রোয়ান্ডার জাতিসংঘে বিরুদ্ধ ভোট থেকেই তা স্পষ্ট। তাছাড়াও, অববাহিকার দুই দেশের বিবাদের সময় প্রায়শই উজানের দেশ নদীবাঁধের সময় নিজ জলসম্পদের ওপর সার্বভৌমত্বের দাবী জানায় আর ভাটির দেশ জলপথ ও বন্দরের ওপর নিজের সার্বভৌমত্বের দাবী ছাড়তে চায় না। শুধু তাই নয়, এই সার্বভৌমত্বের ধারণা জনগণকে বোঝানোও সহজ – দেশের ভৌগোলিক সীমার মধ্যে অবস্থিত সব কিছুর সর্বভৌম অধিকার রাষ্ট্রের। অথচ, ভাটির দেশের জলপথ উজানের দেশ ব্যবহার করলে নিজ-স্বার্থেই সে জলসম্পদের যথেচ্ছাচার করবে না, এই ফর্মুলায় উভয়েরই লাভ, সমতা মেনেই। আন্তর্জাতিক আইন মাত্রেই এক-একটি কম্প্রোমাইজ ফর্মুলা – যা মেনে উভয়পক্ষই কিছুটা করে ক্ষতি স্বীকার করেও বিবাদ-মীমাংসা করা সম্ভব। সেই হিসাবে জলসম্পদ সহ অববাহিকার সকল প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পদের সমতা মেনেই সর্বোত্তম ব্যবহার করা উচিত। এতেই রাষ্ট্রের কাল্পনিক সার্বভৌমত্বের কিছুটা ক্ষতি হলেও অববাহিকার মানুষের সবথেকে বেশী লাভ। ভবিষ্যতে আইনও সেই পথেই চলবে। আর অববাহিকার দেশগুলোও আশা রাখা যায় সমতার পথে চলে নিজেদের মধ্যেই আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিবাদ-মীমাংসা করে নেবে।

** এই তিন দেশ মূলত নদীর ওপর সার্বভৌম ক্ষমতায় বিশ্বাসী। চিনের সব বড় নদীরই উৎপত্তি চিনেই, বরং মেকং ও ইরাবতী সহ কয়েকটি দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার নদীরও উৎসও চিন। তুরস্কের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার – টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর তুরস্কে উৎস হলেও ইরাকে এই দুই নদী জনজীবনে গুরুত্বপূর্ণ। রোয়ান্ডা ও উগান্ডা হল নীলনদের (শুভ্রনীল বা হোয়াইট নীল) উৎস। তাই এরা ভাটির দেশের সাথে সমতা মেনে জলসম্পদ ভাগ করতে উৎসুক নয়।

পারভেজ হুদভয়ের চোখে আজকের পাকিস্তান

ডিসেম্বর 25, 2012

সচলায়াতনে পাকিস্তানী হিউম্যানিস্ট কোনো লেখকের লেখা প্রকাশিত হয় নি। আমি পারভেজ হুদভয়ের একটা সময়পোযোগী সাক্ষাৎকার বাংলায় অনুবাদ করে দিলাম। এম-এই-টি থেকে পি-এইচ-ডি করা পারভেজ হুদভয় ১৯৭৩ সাল থেকে পাকিস্তানের কায়েদে আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক। ইনি পাকিস্তানে মশাল নামে একটি সংগঠনেরও পরিচালক। এই সংগঠনের কাজ হল নারীশিক্ষার প্রসার ও পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি। বিজ্ঞান-সচেতনতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে নির্মিত ওনার ১৩ পর্বের ডকুমেন্টরিও পাকিস্তান টিভিতে প্রচারিত হয়েছে। ২০০৩ সালে বিজ্ঞানশিক্ষা প্রসারের ওপর কাজ করার জন্য ইউনেস্কো থেকে উনি বিশেষ পুরষ্কার পান।

নিচের সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ক্রিশ্চিনা ওটেন, জার্মান ফোকাস পত্রিকার জন্য। এটা প্রকাশিত হয়েছে কাউন্টারকারেন্টসে, গত ১৫ই ডিসেম্বর।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক মুম্বই হামলার পরে ক্রমাগত খারাপ হয়েই চলেছে। যুদ্ধ লাগার সম্ভাবনা কতটা?

জনগণের দাবী সত্ত্বেও মনমোহন সরকার সীমান্ত পেরিয়ে কোনো আক্রমণ করেনি। দেশে অনেকের সমালোচনা সত্ত্বেও পাকিস্তান সরকার লস্কর-ই-তৈবার বিরুদ্ধে কিছু ব্যবস্থা নিচ্ছে। হয়ত এখন আর কিছু হবে না, তবে এখনকার মত কোনো সম্ভাবনা না থাকলেও আরো একবার একই রকমের হামলা হলে ব্যাপারটা যুদ্ধের আকার ধারণ করতেই পারে।

লস্কর-ই-তৈবার সাথে আর সন্ত্রাসী দলগুলোর তফাৎ কোথায়? পাকিস্তান কি সত্যিই এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে?

আজ থেকে বছর পনের আগে আই-এস-আই আর আর্মির হাত ধরে কাশ্মীরে ভারতীয় সেনার বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করার জন্য লস্করের গোড়াপত্তন। আজকের দিনে এরা খুব বিরল প্রজাতির সন্ত্রাসী দল যাদের পাকিস্তানী রাষ্ট্র বা সেনাবাহিনী সম্পর্কে কোনো অভিযোগ নেই, কিন্তু বাকি সকলেই এদের শত্রু হয়ে গেছে। এখন শুনছি পাকিস্তান কিছু লস্কর সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। সময়ই বলে দেবে এটা আন্তর্জাতিক চাপ কমানোর চেষ্টা না সত্যিকারের সন্ত্রাসদমন প্রচেষ্টা। যদি সত্যিকারের প্রচেষ্টা হয়ে থাকে, তাহলে কিছু সময়ের মধ্যেই আর্মি আর আই-এস-আই এর সাথে এদের শত্রুতা দেখা দেবে, যেমনটা হয়েছিল জৈশ-ই-মহম্মদের ক্ষেত্রে।

মুম্বাই গণহত্যা সম্পর্কে পাকিস্তানের জনগণের প্রতিক্রিয়া কি?

৯/১১ এর পরে যেমন আনন্দোৎসব দেখা গিয়েছিল, সে জায়গায় মুম্বই হামলার পরে পাকিস্তানি জনগণ প্রাথমিকভাবে ভারতের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। কিন্তু ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো যখনই পাকিস্তানকে দোষ দেওয়া শুরু করল, তখন প্রথমে ক্রোধ ও পরে অস্বীকারের রাস্তায় হাঁটতে থাকে সবাই। পাকিস্তানের মাটি থেকেই আক্রমণের ছক কষা হয়েছে – এ দাবী তারা মানতে নারাজ। জনপ্রিয় টিভি-নিউজ ব্যক্তিত্বরা সবাই টিভিতে এসে একের পর এক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব খাড়া করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বছর কয়েক আগে এই ব্যক্তিত্বরাই কান্দাহার বিমান ছিনতাই মামলায় র’-এর ছায়া দাঁড় করিয়ে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছিল, যার কোনোটাই ধোপে টেঁকেনি। পাকিস্তান যে কারগিলের ঘটনায় জড়িত, তা-ও এরা হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। সমঝোতা এক্সপ্রেসের বোমা হামলার উল্লেখ করে এখন তারা একে একে হিন্দু জঙ্গী গোষ্ঠী, আমেরিকা বা ইহুদীদের দোষারোপ করে।

পাকিস্তান অনেককাল ধরেই বলে আসছে যে ভারতের দিক থেকে হামলার আশঙ্কা করলে তারাই প্রথম নিউক্লিয়ার হামলা করবে। পাকিস্তানে সেরকম কোনো সম্ভাবনা দেখছেন আপনি?

মুম্বাই হামলার সপ্তাহখানেক আগে জারদারি আশ্বস্ত করেছেন যে পাকিস্তান কখনই প্রথমে নিউক্লিয়ার আক্রমণ করবে না। ভারতও বছর দশেক আগেই এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে জারদারির এই দাবী ভিত্তিহীন কারণ পাকিস্তান আর্মির পক্ষ থেকে এরকম কোনো বক্তব্য রাখা হয় নি। সবাই জানে, পাকিস্তানে আর্মির হাতেই নিউক্লিয়ার বোমা আছে। অনেকদিন ধরেই বিভিন্ন বিশেষজ্ঞরা পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সিমুলেশন করে সিদ্ধান্তে এসেছেন যে কোনোভাবে যুদ্ধ শুরু হলে নিউক্লিয়ার বোমাতে গিয়েই যুদ্ধ শেষ হবে।

সন্ত্রাসীরা আফগানিস্থান আর সেখানের পশ্চিমি সেনাদের ছেড়ে কেন ভারতকে লক্ষ্য হিসাবে বেছে নিল?

লস্করের মূল ঘাঁটি হল লাহোরের কাছে ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে অবস্থিত মুর্দিকে শহরে। এই শহরে এদের আছে একটা বড় ট্রেনিং ক্যাম্প আর সমাজসেবক সংস্থা। লস্করের অধিকাংশ সদস্যই পাঞ্জাবী, তাই এরা আফগানিস্থানে লড়াই করার পক্ষে অনুপযুক্ত, কারণ এরা সহজে পাশতুন বা আফগানদের সাথে মিশে যেতে পারে না। লস্কর হল ভারতমুখী ও কাশ্মীরমুখী একটি সন্ত্রাসী দল। কিন্তু, পাকিস্তানের অন্যান্য জঙ্গীগোষ্ঠীদের মতই এরাও ভারত, আমেরিকা আর ইসরায়েলের মধ্যে বোঝাপড়া আছে বলে মনে করে। তাই, এরা সবাই এই দেশগুলোর শত্রু।

মুম্বই-সন্ত্রাসীদের হামলার দাবী কি ছিল?

সব জিম্মিদের হত্যা করা হয়েছে আর কোনো দাবী সরকারীভাবে প্রকাশিত হয় নি। লস্কর বা সমধর্মী পাকিস্তানি জঙ্গীগোষ্ঠীদের উদ্দেশ্য খুবই পরিষ্কার। এই ক্ষেত্রে, ভারতের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কেন্দ্রস্থল হিসাবে মুম্বইকে আক্রমণ করা হয়েছে, হয়ত ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বাধিয়ে দেওয়াও উদ্দেশ্য ছিল। ভারত-সীমান্তে পাকিস্তানী সেনা সরালে তাদের দলের তালিবানদের সুবিধা হবে। ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিন্দু দক্ষিণপন্থীদের হাত শক্ত করাও এদের লক্ষ্যের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, কারণ এর ফলে এদের দলে আরো নতুন মুখ পাওয়া সোজা হবে। সবেশেষে, অমুসলিমদের বিরুদ্ধে ক্ষোভের উদ্গিরণও ঘটেছে এই আক্রমণে।

পশ্চিমা সাংবাদিকেরা বলছেন আল-কায়দা আর লস্কর-ই-তৈবা এখন যৌথ কার্যক্রম চালাচ্ছে, এ বিষয়ে আপনার মত কি?

এদের উদ্দেশ্য একই রকম হলেও সামান্য কিছু মতাদর্শগত তফাৎ থাকতেই পারে। সন্ত্রাসীদের দুনিয়ায় সামান্য মতাদর্শের পার্থক্যই দুই দলের মিলিত কার্যক্রমের জন্য যথেষ্ট প্রতিবন্ধকতা হয়ে দেখা দিতে পারে। এখনও অবধি এদের যৌথ কার্যক্রমের কোনো পরিচয় পাওয়া যায় নি, তাই এই ধারণাকে আমি এখনও সন্দেহাতীত বলে মনে করি না।

এই সন্ত্রাসে কাশ্মীরের ভূমিকা কতটা?

কাশ্মীরে ১৯৮৭ থেকেই বিপ্লব চলছে। ১৯৮৭ সালের ভোটে ব্যাপক আকারে কারচুপির ফলে এক গণবিক্ষোভ সৃষ্টি হয় যা ভারত সেনা পাঠিয়ে বলপূর্বক দমন করে। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এই সুযোগে এক গোপন যুদ্ধ শুরু করে ভারতের বিরুদ্ধে। ইউনাইটেড জিহাদ কাউন্সিল বলে এক ২২টি পাকিস্তানী সংগঠনের সমবায় সংস্থা সেনা ও আই-এস-আই-এর সহায়তায় তাদের কার্যকলাপ চালিয়ে যায়। এদের সহায়তায় জেনারেল মুশারফ ১৯৯৯ সালে কারগিলে যুদ্ধ শুরু করেন। এতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্ষতি হলেও পাকিস্তানও শেষমেষ সেনা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। জেনারেল মুশারফ যুদ্ধে বিজয়ীর মর্যাদা পান, আর ভীরু বলে চিহ্ণিত হন নওয়াজ শরিফ। এর পরের ঘটনা সবারই জানা।

পাকিস্তানি সমাজের কোন অংশ আল কায়দা আর ওসামা বিন লাদেনকে সমর্থন করে?

বালুচিস্তান আর সিন্ধে ওসামার প্রতি সমর্থন পাঞ্জাব আর উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের তুলনায় অনেক কম। মজার কথা হল পাকিস্তানের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী নিজেরা পশ্চিম-ঘেঁষা জীবনযাপণ করেন আবার ওসামার প্রতি সমর্থন বা পশ্চিম-বিদ্বেষও তাদের মধ্যেই বেশী। আমি খুবই অবাক হই যখন তালিবান আত্মঘাতী ঘাতকেরা দেশের মসজিদ, শোকসভা, হাসপাতাল, মেয়েদের স্কুল আক্রমণ করে বা নিরীহ পুলিশদের মেরে ফেলে অথচ তাদের বিরুদ্ধে কিছু শোনা যায় না। জনগণ এতটাই আমেরিকা-বিরোধী যে এই ঘটনাগুলোও তাদের মনে দাগ কাটে না। অনেক সময় পাকিস্তানী বামপন্থীরাও তালিবানদের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী শক্তি বলে ভুল ভেবে বসে।

এ বিষয়ে আপনার মতামত কি? এই তালিবানদের কি সত্যিই পাকিস্তান-সমাজে কিছু অবদান আছে?

পৃথিবীর সর্বত্র মানুষ যা চায় পাকিস্তানীদেরও তাই দাবী। খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান, চাকরি-বাকরি, উন্নত বিচারব্যবস্থা ও উন্নয়নমুখী সরকার আর সুরক্ষা। এর সাথে আছে শিক্ষা ও চিন্তা ও ধর্মাচরণের স্বাধীনতা যা ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইটস ডিক্লারেশনে আছে। এর পরে আসে দেশের সার্বভৌমত্ব, বিদেশনীতি ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যু। এ কারণে, পাকিস্তানে এই তালিবান-গোত্রীয়রা কোনো অবদান রেখেছে বলে মনে হয় না। তারা পরিবার-পরিকল্পনা-বিরোধী, সংখ্যালঘু-বিরোধী, নারীশিক্ষার বিরোধী। বহির্বিশ্ব সম্পর্কে এদের কোনো জ্ঞান নেই, জানার কোনো ইচ্ছাও নেই। তারা শুধু যুদ্ধের মাধ্যমেই সমাধান খোঁজে। পাকিস্তানে এবারের ভোটে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে জনগণ এদের পছন্দ করে না।

২০০২ এর জানুয়ারীতে পারভেজ মুশারফ ঘোষণা করেছিলেন যে পাকিস্তানের জমি ব্যবহার করে কেউ সীমানা পেরিয়ে আক্রমণ চালাতে পারবে না। সেই প্রতিশ্রুতি কি রাখা হয়েছিল?

এই ঘোষণার পরে সত্যিই সীমানা পেরিয়ে আক্রমণ অনেকটা কমে গিয়েছিল, কিন্তু কোনোভাবেই নির্মূল হয়ে যায় নি। অক্টোবরের ভূমিকম্পের পরে আমি নিজে ত্রাণের কাজে আজাদ কাশ্মীরের বিভিন্ন অংশে ঘুরে এসেছি। দেখেছি – লস্কর-ই-তৈবা, জৈশ-ই-মুহম্মদ বা সিপাহী-ই-সাহেবা আর অন্যান্য নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন ত্রাণ বিলি করছে। এদের ত্রাণ বিতরণের পরিকল্পনা পাকিস্তান সরকার বা আর্মির চেয়ে অনেকগুণ উন্নত – এমনকি আহত সেনাদেরও এরা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করেছে। অথচ, পারভেজ মুশারফকে কয়েক মাস পরে এ কথা বলাতে দেখলাম উনি রেগে যাচ্ছেন, যেন এই দলগুলো নিয়ে আলোচনাও নিষিদ্ধ।

পাকিস্তানে কিছু গোষ্ঠী আছে যারা আমেরিকা-বিরোধী ও কড়া ধর্মীয় আইন প্রবর্তন করার পক্ষে, আর উল্টোদিকে দেশের সরকার আমেরিকার বন্ধুদেশ বলে নিজেদের দাবী জানায়। এই মেরুকরণের কারণ কি? পাকিস্তানে উগ্রবাদের উত্থানে এই মেরুকরণের ভূমিকা কতটা?

পাকিস্তানে মৌলবাদী শক্তির উত্থানের মূলে আছেন আমেরিকা ও রোনাল্ড রেগানের সমর্থিত পাকিস্তানী জেনারেল জিয়া উল হক। আজ থেকে বছর পঁচিশেক আগে, এই দুই নেতা হাত মিলিয়ে আফগানিস্তানে সোভিয়েতদের তাড়ানোর জন্য দেশে উগ্রবাদী শক্তির বীজ বপন করেন। সেই সময়ে মৌলবাদের প্রসারে আমেরিকা খুশীই হত, কারণ সেই প্রসার তাদের লক্ষ্যপূরণের মাধ্যম হিসাবে কাজ করত। সেই একই সময়ে, জেনারেল জিয়ার আমলে সারা দেশে একটা সামাজিক পরিবর্তন দেখা দেয়। সব সরকারি অফিসে নামাজ পড়া বাধ্যতামূলক করা হল, জনসমক্ষে অপরাধীদের বেত্রাঘাত করা শুরু হল, রমজানে উপোস না করলে শাস্তির ব্যবস্থা করা হল, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের সময় ইসলাম সম্পর্কিত জ্ঞানেরও পরীক্ষা নেওয়া শুরু হল এবং সব মুসলিমদের জন্য জিহাদ বাধ্যতামূলক করা হল। কিন্তু আজকে সেই উগ্রবাদীদের সাথেই সরকারের লড়াইতে যেতে হয়েছে, আবার সেই আমেরিকারই নির্দেশে। দেশের আর্মি ও সরকার আমেরিকার সাথে থাকলেও তাই জনগণ স্বাভাবিকভাবেই আমেরিকা বিরোধী।

প্রেসিডেন্ট জারদারি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে উনি উগ্রবাদীদের খুঁজে তাদের ট্রেনিং ক্যাম্প ধ্বংস করবেন। কিন্তু কাজে সেরকম কোনো লক্ষণ দেখছি না। উনি কি এর চেয়ে বেশী কিছু করতে চান না? নাকি এর থেকে বেশী কিছু করার ক্ষমতাই ওনার নেই?

আসল ক্ষমতা পাকিস্তানের আর্মির হাতে। এই উগ্রবাদীদের সাথে লড়াইতে দু’হাজার সেনা মারা পড়েছে। তাও আর্মি ভেতর থেকে নিশ্চিত নয় যে এই উগ্রবাদীরা পাকিস্তান দেশটাকে বাঁচিয়ে রাখার পরিপন্থী। আমি এদের এই দ্বিধার কারণ বুঝি। বছরের পর বছর ধরে আর্মিতে এই বুঝিয়ে লোক নেওয়া হয়েছে যে তারা ভারতের সাথে যুদ্ধ করবে ও ইসলামকে রক্ষা করবে। কার্যত, এখন তারা লড়াই করছে এমন এক দলের সাথে যারা ইসলামের আরো বড় রক্ষক। শুধু তাই নয়, আর্মিকে এখন ভারতের সাথে যুদ্ধও করতে হচ্ছে না। এই ধোঁয়াশা থেকেই তাদের ডিমরালাইজেশন আর তার সাথে যোগ হয়েছে গণসমর্থনের অভাব। উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে পাকিস্তানী সেনাদের অনেকেই তাই যুদ্ধের আগেই আত্মসমর্পণ করে দিচ্ছে।

সরকারের উগ্রবাদ-বিরোধী যুদ্ধ কি আপনি সমর্থন করেন?

জীবনে এই প্রথমবারের মত আমি মনে করি আর্মিকে সমর্থন করা দরকার, যতক্ষণ তারা নিরীহ লোকদের ছেড়ে শুধু উগ্রবাদীদের খুঁজে মারতে পারবে। দুঃখের বিষয়, নিজেদের কাজ কমানোর জন্য আর্মি এখন কোনো গ্রামে কিছু উগ্রবাদী আছে বলে সন্দেহ করলেই গোটা গ্রামশুদ্ধু উড়িয়ে দিচ্ছে। এরকম নিরীহ মানুষ হত্যা করা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।

পাকিস্তান একসময় তালিবানদের অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছে। আল-কায়দার সদস্যদের ধরে দেবার জন্য সদস্যপিছু পাকিস্তানকে সি-আই-এ টাকা দেয়। সেই টাকা নাকি পাকিস্তান উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে তালিবানদের সাহায্য করার জন্য ব্যবহার করে?

আর্মি তালিবানদের হাতে পর্যুদস্ত হলেও তারা এখনও “ভাল” আর “খারাপ” তালিবানদের মধ্যে তফাৎ করে। “ভাল” তালিবানেরা শুধু আমেরিকা, ন্যাটো ও ভারতীয়দের লক্ষ্য করে আক্রমণ চালায়, আর “খারাপ” তালিবানেরা পাকিস্তানের আর্মির বিরুদ্ধেও আক্রমণ চালিয়ে যায়। যখন আমেরিকানরা আফগানিস্তান থেকে চলে যাবে, এই “ভাল” তালিবানেরা তখন আফগানিস্তানের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কে সাহায্য করবে। জালালুদ্দিন হাক্কানি এরকমই এক “ভাল” তালিবান নেতা। আবার মৌলানা ফজলুল্লাহের মত নেতা হলেন “খারাপ” তালিবান কারণ এরা পাকিস্তান আর্মিকেও ছেড়ে কথা বলেন না। আর্মি সাধারণত এদের “ভারতের চর” আখ্যা দিয়ে প্রচার চালায়।

পাকিস্তান নিউক্লিয়ার স্টেট। এই নিউক্লিয়ার বোমা তালিবান বা আল কায়দার হাতে চলে যাবার সম্ভাবনা কতটা?

আমি বেশী চিন্তিত এই ভেবে যদি কোনোভাবে কিছু নিউক্লিয়ার বোমা তৈরীর অন্তর্বর্তী পদার্থ (সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম) তাদের হাতে চলে যায়। মজার কথা পশ্চিমের দেশগুলো আজকাল নিউক্লিয়ার অস্ত্র তৈরীতে ততটা মনযোগী নয়। নিউক্লিয়ার বোমা আজ আর ক্ষমতার মেরুকরণ করে না, কারণ সুস্থচিন্তার কোনো রাষ্ট্র কখনই এই বোমা ব্যবহার করতে পারবে না। এর ফলে আজকে নিউক্লিয়ার বোমা পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকেই সম্পূর্ণ দূর করা সম্ভব। জঙ্গীদের হাত থেকে বোমা বাঁচানোর এই একটা পথই খোলা আছে।

আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষার্থে ভারত কি করতে পারে?

ভারতের কোনোমতেই পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধে যাওয়া উচিত নয়। এমনকি যদি ভারত জেতেও, তাহলেও তাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বিশাল হবে। কোনো ছোটো হামলাও আঞ্চলিক স্বার্থবিরোধী হবে, কারণ এর ফলে জঙ্গীদের সাথে আর্মির আঁতাত আবারও মজবুত হবে। আর কোনো ছোটো হামলার প্রতিক্রিয়া অনেক বড় হয়ে দেখা দিতে পারে। পাকিস্তানে জঙ্গীঘাঁটি বন্ধ করে দেবার দাবী আমি সমর্থন জানাই, কিন্তু সেই কাজটা পাকিস্তানের নিজেরই করা উচিত। আঞ্চলিক ভারসাম্যের জন্য, পাকিস্তান ও ভারত, উভয় দেশেরই উচিত নিজের নিজের দেশ থেকে দক্ষিণপন্থী ও মৌলবাদী শক্তিকে কড়া হাতে উচ্ছেদ করা।

এই লড়াই-এর অন্তিম ফলাফল সম্পর্কে আপনার ভবিষ্যৎবাণী কি? পাকিস্তানে উগ্রবাদীরাই জিতবেন, না পশ্চিমারাই আর্মির সাহায্যে তাদের পরাজিত করতে সক্ষম হবেন?

সমস্যা খুবই গুরুতর কিন্তু সমাধান অসম্ভব কিছু নয়। গত এক দশকে আমেরিকার সাম্রাজবাদী নীতি ও ইরাক আক্রমণের ফলে জনমানসে আমেরিকা বিরোধী এক মনোভাব তৈরী হয়েছে যার ফলে যারাই আমেরিকার বিরোধিতা করছে তাদেরই তারা সমর্থন করতে পিছপা হচ্ছে না। পাকিস্তানীরা তালিবানদের সামাজিক ও আচার-আচরণগত নীতি সমর্থন করে না। অথচ তারা আমেরিকা-বিরোধী বলে গণসমর্থন পায়। আমি আশা রাখছি বারাক ওবামা ক্ষমতায় এলে আমেরিকা পাকিস্তানের যে ক্ষতি করেছে তার কিছু ক্ষতিপূরণ করবে। কিন্তু মূল কথা হল, পাকিস্তানীদের নিজেদেরই এই সমস্যা সমাধান করতে হবে, বুঝতে হবে কোনো সভ্য দেশ হিসাবে দাঁড়াতে গেলে এসব চলে না। পাকিস্তানকে পশ্চিমা সমর্থন কিছুটা গোপন রাখতে হবে হয়ত। একই ভাবে, পাকিস্তানকে আলাদা করে শাস্তি দিলে বা কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে তালিবান বা সমগোত্রীয়রা রাষ্ট্রের আরো বেশী ক্ষমতা দখল করে ফেলবে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এর চেয়ে বড় কোনো দুশ্চিন্তার কারণ নেই।

বাংলাদেশের অ্যাডমিশন টেস্ট নিয়ে আমার কিছু কথা

জানুয়ারি 11, 2008

অনেকদিন ধরেই অরকুটে বিভিন্ন গ্রুপে বিভিন্নজনের প্রোফাইল দেখে আমার ধারণা হয়েছিল যে বাংলাদেশ বুয়েটে অন্তত অর্ধেক ছাত্রই আসে নটরডাম কলেজ থেকে। আরো কিছু সার্চের পরে, আজকেই একটা ফোরামে পড়তে গিয়ে দেখলাম বাংলাদেশের অগ্রণী প্রতিষ্ঠান বুয়েটে প্রবেশিকা পরীক্ষায় সুযোগ পাওয়া প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ ছাত্রই নটরডাম কলেজের। একই রকমের মেয়েদের যে ক’টি প্রোফাইল দেখা যায় বুয়েটের, তারাও অধিকাংশই ভিকারুন্নিসা স্কুলের। বাংলাদেশের এই দুটো স্কুল যথেষ্ট নামকরা, কিন্তু যে হারে এরা ডমিনেট করে পরবর্তী কেরিয়ার – সেটা দেখে আমি বিস্মিত।

এখানে (পশ্চিমবঙ্গে), একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণী সাধারণত ভাল স্কুলেই সবাই পড়তে চায়। গ্রামের ছাত্ররা মূলত নিকটবর্তী শহরের স্কুলে গিয়েই পড়াশোনা করে। এর সাথে সমান্তরালে আছে ইংরেজী মাধ্যম স্কুল। ইংরেজী মাধ্যম স্কুল আবার দুরকম, একদল পড়ে রাজ্যের সিলেবাসে ও আমাদের মতই প্লাস টু হিসাবে উচ্চমাধ্যমিক দেয় প্রথম ভাষা হিসাবে ইংরেজী নিয়ে। আর আরেকদল সরাসরি জাতীয় সিলেবাসে পরীক্ষা দেয়। উচ্চমাধ্যমিকের সাথে সাথেই জয়েন্ট এন্ট্রান্স (এই পরীক্ষার মাধ্যমে সব ইঞ্জিনিয়ারিং ও ডাক্তারী কলেজে প্রবেশ করে) পরীক্ষার র‌্যাঙ্ক অনুসারে ডাক্তারী বা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে সবাই সুযোগ পায়। একই সাথে অনুষ্ঠিত হয় আই-আই-টি প্রবেশিকা পরীক্ষা, আর জাতীয় মেডিকেল প্রবেশিকা। আবার এক রাজ্যের ছেলে অন্য রাজ্যের প্রবেশিকা পরীক্ষাতেও বসতে পারে – যেমন অন্ধ্রের ৮২ হাজার ইঞ্জিনিয়ারিং-এর সিট অনেকটাই আসে বাইরের রাজ্যের থেকেই।

কিন্তু এখানে কয়েকটা স্কুলের এতটা আধিপত্য নেই। যেমন ধরুন আমি পড়েছি শিবপুর বি-ই কলেজ থেকে (মোটামুটি পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয়)। কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগে আমরা ৩২ জন পড়তাম। শুধুমাত্র দুটো স্কুলের দুজন করে ছাত্র ছিল, বাকি সবাই যার যার স্কুলের একমাত্র প্রতিনিধি। সবাই আসে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অংশ থেকে – বিভিন্ন স্কুল থেকে। শহরের স্কুলের আধিপত্য থাকলেও গ্রামের স্কুলের থেকে আসা ছাত্রও কম নয়। যেমন দুর্গাপুর, মেদিনীপুর বা শিলিগুড়ির ছাত্র সংখ্যায় যথেষ্ট বেশীই থাকত। গোটা কলেজে আমাদের একই ব্যাচের চারশ ছাত্রের মধ্যে কোনো স্কুলের কুড়ি-ত্রিশজনের বেশী পাওয়া দুষ্কর বলে আমার ধারণা। সবথেকে বেশী ছাত্র আসে কোলকাতা সাউথ পয়েন্ট হাই স্কুল থেকে – তাও ব্যাচের ১০ শতাংশেরও কম।

এবার আমার প্রশ্নে আসা যাক। একই স্কুল থেকে এত ছাত্র আসছে কি ভাবে? ধরে নেওয়া যাক সব ভাল ছাত্রই নটরডামে ভর্তি হয়। কিন্তু তার মানে কি এই নয় যে বাকি মফস্বলের কলেজগুলোয় কেউ পড়াশোনা করতে উতসাহী নয় নাকি তাতে ভাল পড়াশোনা হয় না। আমাদের এখানের মত আশা করি বাংলাদেশেও প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রস্তুতি প্রাইভেট টিউশন আর ব্যক্তিগত প্রস্তুতি-নির্ভর। সেক্ষেত্রে, কলেজ কি ভাবে এতটা পার্থক্য তৈরী করতে পারে? আর সরকার কি কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে একই স্কুলের এতটা আধিপত্য খর্ব করার জন্য?

এখানে একটা সময় পর্যন্ত কলকাতার ছাত্ররাই আধিপত্য বজায় রেখেছিল। কিন্তু আশির দশকে সরকারি হস্তক্ষেপে কয়েকটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে সেই চাকা ঘুরিয়ে দেওয়া। গবেষণা করে দেখা গেল গ্রামের দিকে ইংরেজী আর অংকেই ছাত্র-ছাত্রীরা বেশী কাঁচা। তাদের সুবিধার্থে সিলেবাসে ওই দুটি সাবজেক্ট সোজা করে দেওয়া হল – যাতে সবার পড়াশোনায় কিছুটা হলেও আগ্রহ থাকে। এর ফলে পাশের হার বাড়তে থাকে আর আস্তে আস্তে উতসাহ পেয়ে কিছুটা গ্রামের পাশের হার বাড়তে থাকে। অপরদিকে শিক্ষার মান পড়ে যায়, আগের মাধ্যমিক পাশ আর পরের মাধ্যমিক পাশের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত দেখা দেয়। নব্বই-দশকের শেষের দিকে জয়েন্ট-এন্ট্রান্সেও একই পদ্ধতি অবলম্বন করে গ্রামের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু মনে করা হয় সর্বভারতীয় পরীক্ষায় পশ্চিমবঙ্গের স্থান ক্রমাগতই পিছিয়ে গেছে। প্রথম দশে এখন একজনও আসে না সবসময়।

আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন হল মফস্বলের ছাত্ররা তাহলে কি ভাবে নটরডামে আসে? আমার তো অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ঢাকার ছাত্ররা এতে অনেকটা সুবিধা পেয়ে যায়, কারণ তারা হোমগ্রাউন্ডে বসে পড়াশোনার সুবিধা পায় বেশীদূর পর্যন্ত। তাছাড়া, মফস্বলের ছাত্ররা শুনলাম ঢাকায় আসে প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রস্তুতির কোচিং-এর জন্য। সেটাও তো সমস্যার বিষয়। এ নিয়ে সরকারের কোনো প্ল্যান আছে কি?

আমার ব্যক্তিগত ধারণায় বাংলাদেশের পড়াশোনা এখনো ঢাকা-নির্ভর। এখনো স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবারই ডমিনেট করে আর কয়েকটা নামী-দামী স্কুলেই ভাল ফলাফল করে। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে কিন্তু সংখ্যায় বড় কম বলেই মনে হচ্ছে। আমি এই বিষয়ে পুরো জানিনা, তাই পাঠকেরা আলোকপাত করলে খুশী হব। আর প্লিজ কেউ মাইন্ড খাবেন না।

বিজয় দিবসে ভারতীয় শুভেচ্ছা

জানুয়ারি 11, 2008

বিজয় দিবস নিয়ে সবাই লিখছে বলে ভারতীয় হিসাবে আমারো কিছু লিখতে ইচ্ছা করছে। স্বাধীনতা সংগ্রামে, কিছু ভারতীয়র অবদান বাংলাদেশের আপামর জনগণের জানা উচিত বলেই আমি মনে করি। বিজয় দিবসে বাংলাদেশের মত ভারতেও বেশ কিছু শহিদের কথা স্মরণ করা হয় – বিশেষত যারা ১৯৭১এর যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছিলেন। ১৯৭১ এর যুদ্ধ শুধু বাংলাদেশ প্রান্তরেই হয়নি, হয়েছিল কাশ্মীর আর পাঞ্জাব সীমান্তেও। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পাশাপাশি কাশ্মীরেও অনেক অংশ হস্তান্তরিত হয়ে ভারতের নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। তারই মধ্যে একটি শহর হল কারগিল – যা নিয়ে পাকিস্তানের সাথে ১৯৯৯ সালে আবার একটি যুদ্ধ হয়।

যাহোক, আসা যাক প্রথম শহিদ এলবার্ট এক্কার কথায়। এক্কা রাঁচির আদিবাসী খ্রীষ্টান পরিবারের সন্তান। ২০ বছর বয়সে উনি যোগদান করেন ভারতীয় সেনার বিহার রেজিমেন্টে ১৪ গার্ডস সেকশনে। ১৯৭১ এর যুদ্ধের সময়ে উনি গঙ্গাসাগর (আগরতলা থেকে সাড়ে ৬ কিমি দূরে) সীমান্তে প্রহরারত ছিলেন। চৌথা ডিসেম্বর অর্ডার আসে শত্রুবাহিনীর বাংকার দখল করতে হবে। ভোর চারটের সময় শুরু হয় যুদ্ধ। উলটো দিকে পাকিস্তানী সৈন্যরা গুলিগোলা চালাতে শুরু করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুসারে, সাথে বন্দুক থাকলেও বন্দুকের ব্যবহার ছিল সীমিত, কারণ বন্দুক চালালে সব বাংকারের লোক একসাথে জেনে যাবে কোথা থাকে শত্রু আক্রমণ করছে। বুকে ভর দিয়ে মাটিতে ঘষটে ঘষটে দেড় কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে একের পর এক বাংকারে শত্রুকে উনি বেয়নেটবিদ্ধ করেন। শেষে, যখন অধিকাংশ বাংকার করায়ত্ত, তখন পাশের একটি বড় বিল্ডিং থেকে শুরু হয় লাইট মেশিন-গানের বোমাবর্ষণ। গুরুতর রক্ম আহত হন এক্কা। উনি বাধ্য হয়ে গ্রেনেড ছুঁড়ে শত্রুকে ঘায়েল করেন এবং অসীম সাহসের সাথে দেওয়াল ডিঙিয়ে বিল্ডিং-এ ঢুকে তার মেশিন-গান চুপ করিয়ে দেন। আর তার কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রাণ হারা এক্কা।

গঙ্গাসাগরের পতনের ফলে ভারতীয় সেনারা ওই পথে দ্রুত ঢুকে পড়ে যা বিজয় ত্বরাণ্বিত করেছে। পরে, মরণোত্তর পরম বীর চক্র দিয়ে এক্কাকে সম্মান দেওয়া হয়। রাঁচী শহরের কেন্দ্রস্থলের নাম রাখা হয় এক্কা চৌক।

পরম বীর চক্র ভারতের সৈনিকদের সর্বোচ্চ সম্মান। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে চারজন এই সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে এক্কা একজন। বাকি দুজন পাঞ্জাবে (অরুণ ক্ষেত্রপাল আর হুঁশিয়ার সিং) আর একজন (নির্মলজিত সিং শেখোঁ) কাশ্মীরে যুদ্ধের সময় বীরত্ব প্রদর্শন করেছিলেন।

এতো গেল সাহসিকতার কথা, এরপরে আসা যাক যুদ্ধের পরিকল্পনা ও কৌশলের কথায়। মুক্তিযোদ্ধাদের গরিলা কায়দায় যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণ দেবার কৌশল যার – তিনি হলেন জেনারেল জ্যাকব। কোলকাতার ইহুদী পরিবারে জন্ম এই সেনানায়কের। ভারতীয়রা তখন গেরিলা কায়দায় যুদ্ধের কৌশলের সাথে পরিচিত ছিল না। ইনিই ভারত সরকার আর সেনাপ্রধানকে বুঝিয়ে রাজী করিয়েছিলেন ট্রেনিং ক্যাম্প বানাতে। যুদ্ধোত্তর ভারতে ১৯৭১ এর বিজয়ের জন্য একেই সবথেকে বেশী কৃতিত্ব দেওয়া হয়। ইনি পরবর্তীকালে বিজেপি তে যোগদান করেন ও ইজরায়েল-ভারত সম্পর্ক স্থাপনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন।

আর ছিলেন ফিল্ড মার্শাল স্যাম মানেকশ। পাঞ্জাবী পার্সী পরিবারে জন্ম নেওয়া এই সেনানায়কও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্তন সেনানী। যুদ্ধের সঠিক দিনক্ষণ নির্ধারণে মানেকশর জুড়ি মেলা ভার ছিল। যুদ্ধের স্থায়ীত্ব কমিয়ে আনার জন্য এবং পাকিস্তানী বাহিনীর দ্রুত আত্মসমর্পণের কৃতিত্ব অনেকটাই এর প্রাপ্য।

আর যার কথা না বললেই নয়, তিনি হলেন জেনারেল অরোরা, সেনাপ্রধান। এর ছবি দেখে অনেকেই অভ্যস্ত, আত্মসমর্পণরত নিয়াজীর সাথে। মজার কথা হল, এই জগজিত সিং অরোরার জন্ম হল অধুনা পাকিস্তানের ঝীলমে – এক ধার্মিক শিখ পরিবারে। ১৯৭১ এর যুদ্ধশেষে এঁকেও বাংলাদেশ সরকার বীরপ্রতিক উপাধীতে ভূষিত করেন। অরোরা ছিলেন কম কথার কিন্তু ক্ষুরধার বুদ্ধির ধর্মভীরু মানুষ। পরবর্তীকালে অমৃতসরে স্বর্ণমন্দিরে সেনা হামলার পরে তিনি ইন্দিরা গান্ধীর সমালোচনা করতেও দ্বিধাগ্রস্ত হননি। অরোরা অকালি দলের হয়ে ভারতে রাজ্যসভায় প্রতিনিধিও ছিলেন। গত ২০০৫ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশ ও ভারত – উভয়েই তার মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করে।

স্বাধীনতা যুদ্ধের ৩৫ বছর পার হয়ে গেল, কিন্তু আমার মনে হয় এখনও ভারতে এই যুদ্ধ ভারত-পাক যুদ্ধ বলেই বেশী খ্যাত আর যুদ্ধে স্মরণীয় হয় সৈন্যরাই। মনে রাখা হয়না বীর বাঙ্গালী মুক্তিযোদ্ধাদের বা গণহত্যার শিকার ৩০ লক্ষ বাঙালীকে। আর বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণ হলেও মৃত ভারতীয়দের জন্য কোনো অনুষ্ঠান হয় না। অথচ উভয় দেশের জন্যই স্বাধীনতা সংগ্রাম ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল, যা হয়ত একে অপরের সাহায্য ছাড়া অর্জন করা অনেক কঠিন হত।

বাজার নেই তাই সাহায্য আবার কি?

জানুয়ারি 11, 2008

আমাদের দেশের বাড়ি ছিল পটুয়াখালি জেলার কাছিপাড়া গ্রামে। গ্রামের সাথে আমাদের সম্পর্ক শেষ হয়ে যায় ১৯৭৮ সালে, আমার জন্মেরও আগে। গ্রামের অনেক গল্প শুনেছি, ভেবেছি একবার ঘুরে আসব। ঢাকা গেলেও গ্রামের দিকে আর যাব যাব করেও আর যাওয়া হয় না। এখন মনে হচ্ছে আর গিয়ে কি হবে, আছে কি কিছু বেঁচে? আমার এখানে বসে সমবেদনা জানানো ছাড়া কিছু করার নেই মনে হয়।

কিন্তু আজকে সকালে খবরের কাগজে একটা খবর পড়ে মনে হল আমাদেরও অনেক কিছু করার ছিল হয়ত। ভারত সরকার প্রাথমিক ত্রাণের জন্য মাত্র ৪ কোটি টাকা বা ১ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে। সাথে কোনো প্রতিশ্রুতি নেই চপারের, নেই জাহাজ পাঠানোর উদ্যোগ। প্রণব মুখার্জি পার্লামেন্টে সমবেদনা জানিয়েছেন। সাহায্যের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। কিছু শুকনো কথায় কি চিঁড়ে ভেজে?

সোজা কথায় বললে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী হিসাবে, এবছরের সবথেকে বড় আঞ্চলিক বিপর্যয়ে অনেক কিছুই করা সম্ভব ভারতের পক্ষে। মিলিটারি হেলিকপ্টার পাঠানো সম্ভব দূর প্রান্তবর্তী গ্রামগুলোতে। বড় জাহাজভর্তি ত্রাণসামগ্রী পৌছে দেওয়া সম্ভব উপকূলবর্তী অঞ্চলে।

এর পাশে দেখা যাক আগে ২০০৫ এ পাকিস্তানে ভূমিকম্পের পরে ভারত সরকার কিভাবে সাহায্য করেছিল। ততক্ষণাত ২৫ মিলিয়ন ডলার ত্রাণের ব্যবস্থা ছাড়াও মিলিটারি চপার আর উদ্ধারকারী বাহিনীও পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। পরে গিয়েছিল আটা, শুকনো খাবার আর টিনের চালা। মজার কথা তখন ভারতীয় কাশ্মীরেও ভূমিকম্প হয়েছিল। ওই একি বছরে হারিকেন ক্যাটরিনার জন্য ভারত সরকার ৫ মিলিয়ন ডলারের সাহায্য আমেরিকায় (যাদের মাথাপিছু আয় ৩০ হাজার ডলারেরও বেশী) গিয়েছিল দুটো বড় ক্যারিয়ার বিমান সহ। আমেরিকা থেকে ত্রাণ বিতরণের জন্য জাহাজ আসবে এক সপ্তাহ পরে। এদিকে ভারতীয় যে জাহাজগুলো বঙ্গোপসাগরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, হয়ত এক দিনের মধ্যে তারা ত্রাণ বিতরণে যোগদান করতে পারত।

আরো আগে সুনামির সময়েও ভারত ক্ষতিগ্রস্ত ছিল। তা সত্ত্বেও শ্রীলংকা আর ইন্দোনেশিয়াতে ত্রাণ পাঠানো হয়েছিল। শ্রীলংকায় তো বটেই, এমনকি ইন্দোনেশিয়াতেও ভারতীয় যুদ্ধজাহাজ আর চপার হেলিকপ্টার ত্রাণের কাজ করেছিল।

আর এ বছরেই শুধুমাত্র বন্যাদুর্গত উগান্ডার জন্য ভারত সরকার ১০ মিলিয়ন ডলারের ত্রাণ পাঠিয়েছে। পাঠিয়েছে জাহাজ আর লোকবল। হয়ত উগান্ডার মার্কেটে ভারতীয় আগ্রহের কথা ভেবেই এই সাহায্য।

পুঁজীবাদী দুনিয়ায় সাহায্য হল একরকম বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপন মানে, অলিখিত ভাবে বলা – “দেখ, আমরা তোমাদের বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছি, তাই তোমরা আমাদের জিনিস আরো বেশী করে কিনবে।” এই সিস্টেমে সাহায্য তাদেরই পাঠানো উচিত, যাদের ভবিষ্যতে ক্রয়ক্ষমতা হবে এবং একই ব্র্যান্ডের জিনিস আরও বেশী করে কিনতে আগ্রহী হবে। আর বাজার না থাকলে সাহায্য করে কি লাভ? তাই সাহায্য যাবে বড়লোকেদের কাছে, গরিবদের কাছে নয়। চিনের পথে হেঁটে বাজার ধরতে গিয়ে এখন ভারতও একই নীতিতে চলছে। তাই এটা কোনো আক্সিডেন্ট নয় যে ভারতের মত এশিয়ার আরেক উন্নয়নশীল দেশ চিনও মাত্র ১ মিলিয়ন ডলারের সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

টাইমস অফ ইন্ডিয়াকে ধন্যবাদ ব্যাপারটাকে ভারতীয়দের দৃষ্টিগোচর করার জন্য। তবে, ধ্বংসস্তুপে বসে থাকা বাংলাদেশের দিকে শুকনো মুখে বন্ধুত্ত্বের ঠান্ডা হাত বাড়িয়ে দেওয়া দেখে মনে হয় কোথাও একটা ভুল হচ্ছে যেন। ঠিক কোনখানে আমি জানি না, কিন্তু ভুল নিশ্চয় হচ্ছে। সময় গেলে এই ভুলের খেসারত না দিতে হয়। সাহায্য যাওয়া উচিত মানবিকতার খাতিরে, বাজারের খাতিরে নয়। প্রাচ্যের সভ্যতার দীর্ঘদিনের এই নীতির উলটো পথে হেঁটে কতদিন চলতে পারা যায় – দেখা যাক।
(ছবি – সি-এন-এন/এ-পি)

টাইম ম্যাগাজিনে বাংলাদেশ ও ৭১

জানুয়ারি 11, 2008

একাত্তরে দুবার বাংলাদেশ টাইমের শিরোনামে এসেছিল। দুটো প্রবন্ধই পড়ার মত। পড়ে দেখুন আরো একবার।

একটা ব্যাপারে বেশ ভাল লাগে, টাইম বাংলাদেশের জনগণের কথা ভেবে লেখাগুলো লিখেছে। মনে রাখা দরকার যুদ্ধের সময় আমেরিকা সরকার পাকিস্তানের পাশেই ছিল। কিন্তু টাইমের রিপোর্টে তার কোন প্রতিফলন পাই না। সময় নিয়ে পড়ুন কারণ দুটি প্রবন্ধই খুব বড়।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে

যুদ্ধের পরে, স্বাধীন বাংলাদেশ আর যুদ্ধের বর্ণনা