Archive for the ‘ধর্ম’ Category

অপরাধী কে? সন্ত্রাসী না সমব্যাথী?

ডিসেম্বর 25, 2012

ঘটনার সূত্রপাত গতকাল। ব্রেকিং নিউজ হিসাবে সব টিভি চ্যানেল প্রচার করা শুরু করে এক বাংলাদেশী তরুণ ফেডারেল রিজার্ভে বোমা রাখতে গিয়ে ধরা পড়েছে। আরো সময় গেলে বের হয়ে আসে পুরো ব্যাপারটাই একটা স্টিং অপারেশনের ফসল। রেজয়ানুল নাফিস মার্কিন দেশে এসেছে মাত্র নয় মাস আগে। গত জুলাই মাসে ফেসবুকে তার কমেন্টের সূত্র ধরে তার ওপর নজরদারি শুরু হয়। এই অবস্থায় নাফিস মার্কিন দেশে বোমা হামলা চালানোর উদ্যোগ নিলে এফ বি আই-এর এজেন্ট তাকে নিষ্ক্রিয় বোমা সরবরাহ করে। নাফিস সেই ১০০০ পাউন্ড বোমা ফেডারেল রিজার্ভ (বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক ও ভারতের রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার সমতুল্য) -এর সামনে রেখে পাশের একটি হোটেলে বসে তাকে দুর-নিয়ন্ত্রকের সাহায্যে সক্রিয় করার চেষ্টা করে। এই পর্যায়ে বোমাটি ফাটে না এবং মার্কিন এজেন্ট তাকে গ্রেফতার করে মার্কিন আদালতে পেশ করে (গুয়ান্তানামো বে তে পাঠায় নি)।

এই পর্যন্ত ঘটনা কাল অবধি জানা ছিল। যেহেতু নাফিস স্টুডেন্ট ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিল, তার পরেই আমেরিকায় প্রশ্ন উঠতে থাকে স্টুডেন্ট ভিসা এত সহজে পেল। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ও ছাত্র-ছাত্রীরা শংকিত হয়ে ওঠে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০০১ এ টুইন টাওয়ারে হামলা পর থেকে ২০০৫ অবধি আমেরিকায় বাংলাদেশী ছাত্র-ছাত্রীদের বিশেষ সিকিউরিটি চেকের মধ্যে দিয়ে যেতে হত। অনেকেই মনে করছেন সেই অবস্থা আবার ফিরে আসতেই পারে, স্টুডেন্ট ভিসা সহ অন্যান্য ভিসা পাওয়াও এর ফলে শক্ত হয়ে যাবে। সমস্যা শুধু আমেরিকাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না ভিন্ন ভিন্ন দেশেও বাংলাদেশী নাগরিকদের যাওয়ার সময় অতিরিক্ত স্ক্রুটিনির সম্মুখীন হতে হবে তাও এখনও পরিষ্কার নয়।

অন্যদিকে, নাফিসের পরিবারবর্গ স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনায় ব্যথিত এবং মানতে নারাজ যে তাদের ঘরের ছেলে এ ধরনের নাশকতামূলক কাজকর্মের সাথে জড়িয়ে থাকতে পারে। আমেরিকাতেও অনেকেই স্টিং অপারেশনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন – তাদের বক্তব্য হল নাফিসের উদ্দেশ্য জানামাত্র তাকে ডিপোর্ট করা উচিত ছিল, তাহলে ঘটনা এতদূর এগোত না, সাজানো ঘটনায় টেররিস্ট ধরে মার্কিন নিরাপত্তার কোনও উন্নতি হবে না।

আজ এসে দেখতে পেলাম পুরোদমে দুই শ্রেণীর মতামত ফেসবুকে চলছে। দুই শ্রেণীর মূল বক্তব্য একই – আমাদের দোষ না, যত দোষ আমেরিকার। প্রথম শ্রেণীর বক্তব্য পুরো ঘটনা সাজানো হয়েছে যাতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত আরো জোরদার করা যায়। আরেকশ্রেণীর বক্তব্য পুরো ঘটনাই সাজানো হয়েছে ইসলামের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে – বিশ্ববাসীর কাছে ইসলামের নামে সন্ত্রাসের ছবি তুলে ধরার জন্যই এই ছক। সবশেষে জানা গেল বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মতামতরেখেছেন যে নাফিসের পরিচিতি নিয়ে উনি নিশ্চিত নন, নাফিস বাংলাদেশে বসবাসকারী অবৈধ রোহিঙ্গাদের মধ্যে একজন হতেও পারেন (যদিও নাফিসের বাবা কি ভাবে ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের ভাইস-প্রেসিডেন্ট হয়েছেন সে প্রশ্ন ওনাকে করাই অবান্তর)।

দুই ধরনের যুক্তিই আমার কাছে অন্তঃসারশূন্য লেগেছে। প্রথম কথা স্টিং অপারেশন আমেরিকায় অনেকদিন ধরেই চলে আসছে। এমনকি ভারতেও স্টিং অপারেশনে অনেক মন্ত্রী-আমলা ইতিপূর্বে ধরা পড়েছে। এই ধরনের অপারেশনে অপরাধের “ইন্টেন্ট” বা ইচ্ছা/চেষ্টা আছে এরকম যে কোনও ব্যক্তিকে তার অপরাধ সংঘটনে ছদ্ম-সাহায্য করা হয় যাতে সে কতদূর অবধি অপরাধ করতে পারে সেটা দেখে তাকে হাতে-নাতে ধরা হয়। অনেকেই প্রশ্ন করবেন বাংলাদেশে এ ধরনের স্টিং-অপারেশন কি চলে? এই উত্তরটা আমার সঠিক জানা নেই কিন্তু তৃতীয় বিশ্বে অপরাধের ইন্টেন্ট থাকলে অনেক সময়েই তাকে লক-আপে ঢুকিয়ে পিটিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয় যার থেকে স্টিং অপারেশন শতগুণে ভাল। দ্বিতীয় কথা, নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অব ল এন্ড সিকিউরিটির পরিসংখ্যান মতে, সেপ্টেম্বর ১১-র ঘটনার পরে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ১৫৬ টি কেসের মধ্যে ৯৭টিতেই এজেন্টদের ব্যবহার করা হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ডিফেন্স ল’ইয়ার চেষ্টা করেছে “আসামীকে ট্র্যাপ করা হয়েছে” – এই যুক্তি ব্যবহার করতে, কিন্তু কোনও ক্ষেত্রেই সফল হয়নি। এর থেকে প্রমাণিত যে শুধুমাত্র নির্বাচন আসন্ন বলেই এই অপারেশন চলছে তা নয়, সবসময়েই স্টিং অপারেশন চলছে – তার কনভিকশন রেট ১০০%।

স্টিং অপারেশন যে শুধু “মুসলিমদের সন্ত্রাসী বানানো”-র কাজে ব্যবহার হয়েছে তাও না। কখনও ড্রাগ-পেডলারদের ট্র্যাপে ফেলা হয়েছে, তারা যখন ড্রাগ ডেলিভারি করতে গেছে – পুলিশ হাতেনাতে ধরেছে তাদের। ফেসবুকে অপ্রাপ্তবয়স্ক সেজে বসে থাকা এফ-বি-আই এজেন্ট-এর সাথে যৌণ-সম্পর্কে লিপ্ত হবার প্রচেষ্টার কারণে জাভা প্রোগ্রামিং ল্যানগুয়েজের অন্যতম প্রণেতা প্যাট্রিক নটন (যার লেখা বই আমাদের অনেকেই পড়েছে) ধরা পড়ে শাস্তিও পেয়েছেন। অপরাধ লঘু হবার কারণে অনেক কম সাজা পেয়ে উনি ছাড়া পেয়ে গেছেন বটে কিন্তু স্টিং অপারেশন চালানোর কারণে তার অপরাধ লঘূতর করে দেখানোর প্রচেষ্টা সফল হয় নি। এবং এই ঘটনা ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার হামলার আগেই ঘটেছে। সব স্টিং-অপারেশনেই যে “মুসলিমদের সন্ত্রাসী বানানো”-র সফল অপারেশন ঘটে তাও না। দক্ষিণ ক্যালিফোর্ণিয়ার একটি মসজিদে এক প্রাক্তন ড্রাগ-পেডলারকে এজেন্ট হিসাবে নিয়োগ দেয় এফ বি আই। তার কিছুদিনের মধ্যেই মসজিদের অন্য কিছু ব্যক্তি সেই এজেন্টের আচরণ “সন্দেহজনক” বুঝে উল্টে এফ বি আই-কেরিপোর্ট করে। বাধ্য হয়ে ও সমস্যা নেই বুঝে তদন্ত বন্ধ করে দেয় এফ বি আই। আমি আমেরিকান হলে স্পষ্টতই স্টিং অপারেশনের সমর্থন করতাম, কারণ এই ধরনের অপারেশন শুধু বড় জোট গঠন হবার আগেই তাকে ভেঙে দিচ্ছে তাই না, আল-কায়দা সহ জঙ্গী গোষ্ঠীদের মধ্যেও যথেষ্ট “ডাউট” তৈরী করছে, যার ফলে “নিউ রিক্রুট” করার আগে তারা দশবার ভাবছে।

কিছুদিন আগেই মালালা ইউসুফজাই নামে পাকিস্তানী এক বালিকাকে তালেবানী “শিক্ষাব্যবস্থার” সমালোচনা করার কারণে গুলি খেতে হয়েছে। তালিবানী মুখপাত্র ঘটনা স্বীকার করে তার স্বপক্ষে যুক্তিও উপস্থাপন করেছেন। পাকিস্তানী সমাজেও ঘটনাটার বেশ নিন্দা শোনা যায়। কিন্তু ওই পর্যন্তই, কিছুদিনের মধ্যেই অসংখ্য ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হাজির হয় বাজারে ও পাকিস্তানী মধ্যবিত্ত নির্দ্বিধায় সব দোষ তালেবানের জায়গায় মার্কিন যড়যন্ত্রের ওপর চাপিয়ে দেয়। পাকিস্তানের সমস্যা অশিক্ষিত তালিবানেরা যত, তার থেকে ঢের বেশী গুণে এই সব অর্ধ-শিক্ষিতরা – যারা নিজের দোষ ঢাকতে সব-সময়ে ষড়যন্ত্রের কথা বলে বেড়ান। একই ঘটনা এখন বাংলাদেশেও ঘটছে – যদিও পাকিস্তানের দশায় যেতে অনেক দেরী আছে, কিন্তু অংকুরেই এসব বিনাশ করার প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

শুরুতেই বলেছি এফ বি আই আজকাল ফেসবুক সহ সোসাল মিডিয়ার ওপর কড়া নজরদারী করছে। সুতরাং এই ধরনের মতামত প্রচার করে বেড়ালে তাদের এই ধারণা বদ্ধমূল হবে যে এই নাফিসের পেছনে অসংখ্যা সমব্যাথী আছে যাদের অনেককেই হাতে বোমা তুলে দিলে তা মার্কিণ দূতাবাসে বা স্টক-এক্সচেঞ্জে আক্রমণ চালাতে দ্বিধা করবে না। নাফিস একা যতটা ভাবমুর্তির ক্ষতি করেছে, তার সমব্যাথীরা সমষ্টিগতভাবে তার বহুগুণ ক্ষতি বয়ে আনবে দেশের ওপর।

শেষটা করার আগে একটা উপায় নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করে যাই। রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচারের বদলা হিসাবে রামু-উখিয়াতে যারা বৌদ্ধ-হিন্দু মন্দিরে আক্রমণ চালিয়েছিলেন, সেই কয়েকশ’ উৎসাহীদের সবাইকে হাতে বোমা ধরিয়ে দিলে তাদের মধ্যে কিছু লোক থাকতেই পারে যারা এই বোমা জাপানী বা থাই বৌদ্ধদের মারার কাজে ব্যবহার করতে পারেন। আবার তাদের মধ্যে দু-একজন এমনও পাওয়া যাবে যারা সত্যি অর্থেই থাইল্যান্ড বা জাপানে যেতে সক্ষম। এই দুইয়ের মিল হয়ে গেলেই কিন্তু সর্বনাশ – বিদেশে গিয়ে বোমা ফাটিয়ে কেউ না কেউ দেশের নাম উজ্জ্বল করে আসবে। সুতরাং, এই ধরনের অপরাধীদের দেশেই জেলে পুরে ফেলা ভাল যাতে বিদেশে গিয়ে তারা ধরা না পড়ে। এদেরকে ধরিয়ে দিন – দেশের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখুন। বিদেশে ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে গেলে দেশের বিচার ও আইন-ব্যবস্থা ভাল করতেই হবে। আইনের শাসনের কোনও বিকল্প নেই।

নাফিসের ওপর অভিযোগ – সরকারী সূত্র

Advertisements

আইন্সটাইনের ধর্মচিন্তা

মার্চ 17, 2008

মানুষের আধ্ম্যাত্বিকতার ইতিহাস জানতে গেলে মনে রাখতে হবে যে আমরা মুলত আমাদের প্রয়োজনের বশেই কাজ করে এসেছি। আমাদের অগ্রগতির পেছনে দুটি মূল চালিকাশক্তি ছিল আমাদের অনুভূতি আর আকাঙ্খা। কিন্তু কোন অনুভূতি আর আকাঙ্খা মানুষকে ধর্মচিন্তার দিকে নিয়ে গেল? একটু চিন্তা করলেই বোঝা সম্ভব, যে আদিম মানুষের ভয়ই এই প্রাথমিক ধর্মচিন্তার মূলে – এই ভয় কখনও ক্ষুধার ভয়, কখনও আগ্রাসী জন্তুর ভয় আবার কখনও প্রকৃতির তাণ্ডবের ভয়। দুর্বল মানবচিত্তে এইসব কার্যকারণের পারস্পরিক কাকতালীয় যোগসূত্রের মাধ্যমে এক কাল্পনিক চরিত্রের উদ্ভব হয় – যার ইচ্ছা ও চিন্তার ওপরেই ভীতিকর এইসব ঘটনা পরিচালিত হয়। আর এই কাল্পনিক চরিত্রের বা চরিত্রগুলোর করুণা বা কৃপালাভের উদ্দেশ্যে সৃষ্ট অসংখ্য যাগযজ্ঞ ও আচার-বিচার যুগ-যুগ ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে হস্তান্তরিত হতে হতে মূল ধর্মের আকার ধারণ করেছে। আমি এই ভীতিসর্বস্ব ধর্মের কথাই বলছি। এই ধর্মের উপজাত হিসাবে তৈরী হয়েছে এক পুরোহিত-শ্রেণী, যারা সাধারণ মানুষের সাথে এই কাল্পনিক ভীতিকর চরিত্রটির মেলবন্ধন ঘটিয়ে দেন। এই পুরোহিত শ্রেণী নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে শাসকশ্রেণীর সাথে আঁতাত গড়ে নিজ-নিজ স্বার্থসিদ্ধি করে গেছে।

ধর্মের উদ্ভবের পেছনে সামাজিক কারণও কম ছিল না। পরামর্শ, ভালবাসা আর সান্ত্বনা পাবার আশায়ও মানুষ ঈশ্বরে বিশ্বাসী হয়েছে। এই ঈশ্বর আবার এক পরম-জ্ঞানী নীতিনিষ্ট ঈশ্বর, যিনি বিচার করেন – শাস্তি ও পুরস্কার দেন। ইনিই মৃতের আত্মাকে সংরক্ষণ করেন, বিশ্বাসীকে পদে পদে সাহায্য করেন, মানবজাতিকে পথ দেখান। এই ঈশ্বর এক নীতিনিষ্ট বিবেকবান ঈশ্বর।

ঈহুদীধর্মে এই ভীতিকর ধর্ম আর নৈতিকতা বা বিবেকের ধর্ম – এক থেকে অন্যে উত্তরণের কিছু কিছু নিদর্শন পাওয়া যায় – ওল্ড থেকে নিউ টেস্টামেন্টে। শুধু ঈহুদী ধর্মে নয়, যা কোনো ধর্মেই আদপে এই দুই শ্রেণীর বিশ্বাসের মিশ্রণ পাওয়া যায়। আর ভয়ের ধর্ম থেকে বিবেকের ধর্মে উত্তরণই মানুষের জীবনে একটা বড় পদক্ষেপ।

তবে এই দুই প্রকার ঈশ্বর-বিশ্বাসের মধ্যে একটি ব্যাপার লক্ষ্য করা যায় – ঈশ্বরের মধ্যে মানবিক গুণাবলী আরোপের প্রচেষ্টা। কিন্তু আমার বিশ্বাস তৃতীয় আরেক ধরণের ধর্মবিশ্বাস আছে যাতে ঈশ্বরের মানবীকরণ করা হয় নি। এই ধরণের মহাজাগতিক ধর্ম কাউকে ব্যাখ্যা করে বোঝানো কষ্টকর। নিজের আকাঙ্খা বা বাসনার তুচ্ছতা অনুভব করতে শিখে আর বিশ্বব্রম্ভাণ্ডের বিশালতা আর শৃঙ্খলাবদ্ধতায় বিমোহিত হয়ে মানুষ সমগ্র মহাবিশ্বের অভিজ্ঞতা নিজের ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করতে চায়। স্কোপেনহাওয়ার লেখা থেকে জানা যায় যে বৌদ্ধধর্মে এই ধরনের মহাজাগতিক একাত্মতার কথা বলা আছে। সর্বকালের সেরা ধর্মগুরুরা কিন্তু এই ধরণের ব্যক্তি-ঈশ্বর-বিহীন ও নিয়মকানুন-বিহীন মহাজাগতিক ধর্মের প্রচারই করে গেছেন। তাদের কেউ কেউ সমসাময়িকদের মধ্যে সাধুসন্ত হিসাবে আখ্যায়িত হয়েছেন আর নাহলে নাস্তিক বলে পরিগণিত হয়েছেন। এদের মধ্যে যেমন আছেন গৌতম বুদ্ধ, তেমনই আছেন ডেমোক্রিটাস, স্পিনোজা আর ফ্রান্সিস অব আসিসি

কিন্তু কি ভাবে এই মহাজাগতিক ধর্ম মানুষের মধ্যে প্রচার লাভ করতে পারে? এর মধ্যে তো কোনো ঈশ্বরবিশ্বাসে বালাই নেই, নেই কোনো নিয়মকানুন, আচার-আড়ম্বর। আমার ধারণা বিজ্ঞান আর চারুকলাই পারে একে মানুষের কাছে পৌছে দিতে।

এইভাবে দেখা যাচ্ছে, ধর্ম আর বিজ্ঞানের আলোচনা এক ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এসে দাঁড়িয়েছে। অথচ ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে মনে হবে এরা যেন একে অপরের প্রতিদ্বন্দী। আর মনে হওয়াই স্বাভাবিক। যে ব্যক্তি কার্যকারণ সম্পর্কে সম্পূর্ণ ধারণা আর আস্থা রাখে, যে ওই কার্যকারণের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখে সে কিছুতেই তার মধ্যে এক কাল্পনিক চরিত্রের অদৃশ্য হস্তক্ষেপের গল্প মেনে নিতে পারে না। এই ব্যক্তির কাছে কোনো ঈশ্বরের শাস্তি দেওয়া আর পুরস্কারের ধারণা পুরো গল্পকথার মত লাগবে। কারণ সে জানে সব মানুষই বাহ্যিক বা আন্তরিক প্রয়োজনের বশেই কাজ করে, সে কাজ আপাতদৃষ্টিতে আমাদের কাছে ভাল লাগুক বা না লাগুক। তাই এক পরম-জ্ঞানীর চোখে সে কখনই অপরাধী হতে পারে না। এই মতবাদ প্রসারের মূল ভিত্তি যুক্তি আর বিজ্ঞান, তাই অভিযোগ করা হয় যে বিজ্ঞান নাকি নৈতিকতার শত্রু। এই কারণেই ধর্মপ্রতিষ্ঠান যুগে যুগে বিজ্ঞানের সাথে লড়াইতে নেমেছে – যাতে তাদের ধর্মের অনুসারীরা তাদের ছেড়ে না চলে যায়। অথচ এই অভিযোগ অত্যন্ত হাস্যকর। মানুষের নৈতিকতার জন্য তো ধর্মের কোনো দরকারই নেই, দরকার মানবিকতা, সহমর্মিতা, শিক্ষা আর সামাজিকতার। মানুষ যদি পরকালের শাস্তির কথা ভেবে নৈতিক হয়, সেই নৈতিকতার মধ্যে মহত্ত্ব কোথায় থাকে?

বিজ্ঞানসাধনায় এই বিশ্বজগতের সাথে একাত্মতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। কেপলার বা নিউটন কত যুক্তি চিন্তা আর সাধনার মধ্যে দিয়ে মহাজাগতিক বস্তুর গতিবিধি সম্পর্কে সঠিক সূত্রে পৌঁছেছিলেন – তা এই মহাজাগতিক ধর্মের প্রভাব ব্যতিরেকে সম্ভব হত কি? যারা কিছু বিজ্ঞানের সূত্র পড়ে বিজ্ঞানীদের সম্পর্কে ধারণা করেন যে এরা চারদিকের জগত সম্পর্কে সদা-সন্দিহান, অসামাজিক আর সর্বদা কিছু সূত্র আবিস্কারে মগ্ন থাকেন – তাদের পক্ষে কোনোভাবেই বোঝা সম্ভব হবে না একজন বিজ্ঞানীর প্রচেষ্টার মর্ম। যারা নিজেরা এরূপ গবেষণায় নিজেরা সময় কাটিয়েছেন তারাই বুঝতে পারবেন যে সত্য উদ্ঘাটনের জন্য আজীবন প্রচেষ্টা চালিয়ে বারবার বিফল হওয়া সত্ত্বেও কি এক অপার্থিব চালিকাশক্তি এই বিজ্ঞানীদের মধ্যে শক্তি সঞ্চার করে গেছে। মহাজাগতিক ধর্মই এই শক্তি প্রদান করে – সূত্র আবিষ্কারের শক্তি, সত্য উদ্ঘাটনের শক্তি। আমার এক সমকালীন বিজ্ঞানী বলেছেন যে আজকের যুগে যুক্তিনিষ্ঠ বিজ্ঞানীরাই একমাত্র ধার্মিক বলে নিজেকে দাবী করতে পারেন – আমার তো মনে হয় উনি ঠিকই বলেছেন। [লেখাটা আইন্সটাইনের ধর্ম ও বিজ্ঞান নিয়ে লেখা হাতে গোনা কয়েকটি লেখার মধ্যে একটি থেকে অনূদিত। লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩০ সালের ৯ই নভেম্বর, নিউ ইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিনে। আইডিয়াস অ্যান্ড ওপিনিয়ন্স আর দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যাস আই সি ইট – এই দুটো বইতেও এই লেখাটা পরে প্রকাশিত হয়েছে।]

অন্ধবিশ্বাস না সহজাত তত্ত্বীয়করণ?

জানুয়ারি 11, 2008

অনেককাল হল শুনছি যে অন্ধবিশ্বাস হল বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় শত্রু। অনেকসময় ধর্ম বা ধর্মগ্রন্থকে দায়ী করা হয় অন্ধবিশ্বাস ছড়ানোর জন্য। কিন্তু অন্ধবিশ্বাস ব্যাপারটা ঠিক কি? সাধারণভাবে, পরীক্ষা না করেই বিশ্বাস করাকে সাধারণভাবে অন্ধবিশ্বাস বলা হয়। এই বিষয়ে আমার ছোটোবেলা থেকেই একটা প্রশ্ন ছিল, যা আমি কিছুটা উত্তর পেলাম সম্প্রতি কয়েকটা গবেষণাধর্মী প্রবন্ধে। খুব সহজ একটা প্রশ্ন হল, যদি সবাই নিজের নিজের মত বিশ্বাস করতে থাকেন তাহলে পৃথিবীতে সব মানুষের অন্ধবিশ্বাস আলাদা আলাদা নয় কেন? কিভাবে সারা পৃথিবীর লোক একসময় বিশ্বাস করত পৃথিবী চ্যাপ্টা? যদি অন্ধবিশ্বাস যদি র‌্যান্ডম হয়, তাহলে তো অন্তত, সংখ্যালঘু কিছু গোষ্ঠী পাওয়া যাবার কথা যারা বিশ্বাস করবে পৃথিবী গোল বা নিদেনপক্ষে পৃথিবী ঘনক-আকৃতির। কেন তা হয় না?

আসলে অন্ধবিশ্বাসকে আমরা যতটা অন্ধ ভাবি, ততটা অন্ধ এই বিশ্বাস নয়। এও কিছু একটা ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে ও কোনো নির্দিষ্ট ভাবে গঠিত হয় – যার ফলে সারা পৃথিবীর মানবজাতির বিভিন্ন তথাকথিত অন্ধবিশ্বাসের মধ্যে অদ্ভূত সাদৃশ্য পাওয়া যায়। অন্ধবিশ্বাস কি তাহলে মানবমনে প্রোথিত কিছু নিয়মের থেকে সৃষ্টি? অথবা আমাদের মানসিকতার কোনো দুর্বল প্রান্তে এর উৎপত্তি?

আংশিক উত্তর পাওয়া যায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান-শিক্ষকদের মতামতে। তাদের মতে শিশুদের বিজ্ঞানশিক্ষার পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হল শিশু-মানসিকতা। বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানশিক্ষা পাবার আগেই শিশুরা প্রকৃতি ও সমাজ সম্পর্কে কিছু কিছু ধারণা পেতে শুরু করে। সামাজিক ধারণার মধ্যে পড়ে তাদের বাবা-মা ও নিকটাত্মীয়দের চিনে ফেলা। আর প্রাকৃতিক ধারণার মধ্যে পড়ে সাধারণ অভিজ্ঞতালব্ধ ধারণা – “বস্তু ওপর থেকে নিচে পড়ে” বা “ওপর থেকে নিচে পড়লে ব্যাথা লাগে”। তাই শিশুদের বিজ্ঞান শেখাতে গেলে তারা যা জেনে বসে আছে দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকে, তার বিরুদ্ধে যেতে হয় অনেকসময়। যেমন ধরা যাক, বাচ্চারা দেখেছে যে “বস্তু ওপর থেকে নিচে পড়ে”। তাই তাদের যদি বলা হয় যে পৃথিবী গোল, তাহলে তারা প্রতিবাদ করবে। জিজ্ঞাসা করবে – তাহলে নিচের দিকে থাকা মানুষেরা পড়ে যায়না কেন? স্বভাবতই, সংগঠিত বিজ্ঞানশিক্ষা না পেলে শিশুমস্তিষ্কে চ্যাপ্টা পৃথিবীর ধারণাই স্বাভাবিক বলে মনে হবে।

মাইকেল ম্যাকলস্কি নামে জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কগনিটিভ সায়েন্স-এর অধ্যাপক সম্প্রতি আমেরিকায় সাধারণ ছাত্রদের ওপর কিছু সমীক্ষা চালিয়েছিলেন। তার সমীক্ষার ক্ষেত্র ছিল বস্তুর গতির নিয়মাবলী – যার পর্যবেক্ষণলব্ধ অভিজ্ঞতা সাধারণ সারাজীবন ধরে সংগৃহিত হয় আবার তত্ত্বগত ভাবেও এর সাথে সকলে সাধারণভাবে পরিচিত। তার মূল আগ্রহ ছিল – এই তত্ত্বগত ব্যাখ্যা মানুষ কতটা আত্মস্থ করতে পারে – নাকি তত্ত্বের শিক্ষা বইয়ের পাতাতেই থেকে যায়। তাই তিনি, কিছু ছবি এঁকে বিভিন্ন অবস্থায় বস্তুর গতিরেখা কেমন হবে তা জানতে চাইলেন। যেমন ধরা যাক, গতিশীল একটা উড়োজাহাজ থেকে ফেলা একটা বল কি ভাবে মাটিতে পড়বে? অধিকাংশ ছাত্রের মতে সেটা পড়বে সোজা – সরলরৈখিক গতিতে। একটা চক্রাকারে বাঁকানো নল থেকে একটা গতিশীল বল বেরিয়ে এলে তার গতিরেখা কি হবে? আবার অধিকাংশ ছাত্রের মতে সেটা চক্রাকারে বেরোবে। বলাই বাহুল্য যে সাধারণ ছাত্ররা এই ধরণের গতিপথ দৈনন্দিন জীবনে চোখে দেখেনি। কিন্তু অন্যদিকে, যেখানে সরাসরি পর্যবেক্ষণলব্ধ অভিজ্ঞতা উপস্থিত, সেখানে ছাত্ররা সঠিক উত্তর দিয়েছে। যেমন, একটা চক্রাকারে বাঁকানো হোসপাইপ থেকে জল যে চক্রাকারে বেরোয় না – বেরোয় সরলরৈখিক গতিতে – তা প্রায় সকলেই সঠিকভাবে বলেছে। তাহলে মোটকথা হল, যা আমাদের সরাসরি পর্যবেক্ষণলব্ধ জ্ঞানের মধ্যে আসে তা আমরা স্মৃতির মাধ্যমে ধরে রাখি। আর যা আসে না, সেই ক্ষেত্রেও আমরা আমাদের পর্যবেক্ষণলব্ধ জ্ঞানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সাধারণ তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি। কয়েকটি সাধারণ পর্যবেক্ষণলব্ধ জ্ঞান ও ধারণাকে একত্রিত করে সরলীকরণের প্রচেষ্টা করি। অন্ধবিশ্বাসের উৎপত্তি এই অতি-সরলীকরণের চেষ্টা থেকেই।

সাধারণ মানুষের কাছে দুভাবে কোনো প্রাকৃতিক ঘটনার ব্যাখ্যা আসে – প্রথমত, দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকে, দ্বিতীয়ত বইতে পড়া বিজ্ঞান থেকে। উভয়ের সংমিশ্রণে ও মিলিত প্রচেষ্টায় বিজ্ঞান-মানসিকতার জন্ম মানবমনে। দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব অনেকসময়েই ভুল, তাই বিজ্ঞানশিক্ষার একটা অন্যতম অঙ্গ হল বিভিন্নভাবে ও বিভিন্ন দৃষ্টিকোণে চিন্তা করতে শেখানো। যাতে এই সহজাত তত্ত্ব বিকশিত হবার আগেই তার বিরুদ্ধে অসংখ্য প্রশ্ন জেগে উঠতে পারে ও সঠিক তত্ত্ব মস্তিষ্কে স্থান পেতে পারে। আমাদের অন্ধবিশ্বাস হল একেকটি সহজাত তত্ত্ব। সাধারণভাবে, হোমো সেপিয়েন্সরূপী মানুষে-মানুষে খুব একটা পার্থক্য তো নেই, তাই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের মনে একই ধরণের তত্ত্বের উদ্ভব ঘটেছে – আদি গণতান্ত্রিক সমাজ সেই সহজাত প্রাকৃতিক তত্ত্বকেই গ্রহণ করেছে – সৃষ্টি হয়েছে অন্ধবিশ্বাস।

এতো গেল সহজাত প্রাকৃতিক তত্ত্বের কথা। একইভাবে সহজাত সামাজিক তত্ত্বের সংখ্যা কম নয়। শিশুরা খুব দ্রুত বুঝে নেয় (বা শিশু-মানসিকতায় জিনগতভাবে প্রোথিত থাকে) যে তাদের সমবয়সীদের তুলনায় বড়দের জ্ঞান বেশী। তাই কোনো ক্লাসমেট তাদের যদি নতুন কোনো বিষয়ে তথ্য দেয়, তারা চেষ্টা করে সেটা বড়দের কাছে মিলিয়ে নিয়ে নিশ্চিত হতে। শুধু তাই নয়, বড়দের মধ্যেও তারা শ্রেণীবিভাগ করে নেয় – শিক্ষক বা বাবা-মা তার কাছে যতটা গুরুত্ব পায়, এক নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীও হয়ত ততটা পায় না। আবার স্কুলে যদি বিবর্তনতত্ত্ব পড়ানো হয়, আর বাড়িতে বাবা-মা তার বিরোধিতা করেন, তাহলে অধিকাংশ শিশু বিবর্তনবাদে অবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। এরকম সামাজিক অপরীক্ষিত তত্ত্ব মানবমনে দিনের পর দিন বেড়ে চলে – দখল করে রাজনৈতিক বা দার্শনিক মানসিকতার ক্ষেত্রও। ছোটোবেলায় যেমন তথ্যের উৎস হিসাবে তারা বাবা-মায়ের ওপর ভরসা করে, বড় হলে সংবাদ-পত্র বা টিভি শো-কে সেই একইভাবে বিশ্বাসী উৎস হিসাবে গণ্য করে। এগুলোও একইরকম অন্ধবিশ্বাস। এর পেছনেও আছে আমাদের জটিল সমাজের কার্যকারণের সরলীকরণের প্রচেষ্টা।

মানুষের এই সহজাত সরলীকরণের বা তত্ত্বীয়করণের প্রচেষ্টা ব্যাখ্যা করা যায় মানব-বিবর্তনের ধাপগুলোর সাহায্যে। চিন্তাশক্তি বিকশিত হবার পরে, এই সরলীকরণের ক্ষমতাই মানুষকে অন্য প্রাণীর থেকে আলাদা করেছিল। আর সব প্রাণী যেখানে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ব্যতিরেকে অচল, সেখানে মানুষ প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে তত্ত্ব গঠনে সক্ষম ছিল। মানুষ চিন্তা করতে পারত উচ্চতর মাত্রায়। সাধারণ একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। টোপ ফেলে শিকার ধরা ছিল শিকারী আদিম মানুষের অন্যতম বিশেষত্ব। মানুষ দেখেছে যে পশুরাও তাদের মতই খাবার দেখলে এগিয়ে যায়। তা থেকে তত্ত্বীয়করণ হয়েছে যে – যেকোনো পশুই খাবার দেখলে খাবারের দিকে ছুটে আসবে। তখন শিকার করাও সহজ হবে। সহজাত তত্ত্বীয়করণের ক্ষমতা এক মানুষকে অন্যের থেকে বাঁচার সুবিধা দিয়েছে বেশী করে, তার ফলে এই ক্ষমতা বর্তমান মানবজাতির মধ্যে সর্বজনীন রূপ লাভ করেছে।

দেরীতে হলেও আমার ধারণা মানবসমাজ তত্ত্বীয়করণের সীমাবদ্ধতা বুঝেছে। মূল সীমাবদ্ধতা হল, তত্ত্ব নির্ভর করে পর্যবেক্ষণের বিস্তারের ওপর। তত্ত্বের বিস্তার যে পর্যবেক্ষণের বিস্তারের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল তার খুব ভাল একটা সামাজিক উদাহরণ হল রেসিজম বা জাতিবিদ্দ্বেষ – যার মূলে আছে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি গোষ্ঠীর একে অপরের ক্ষেত্রে অজ্ঞানতা। গত কয়েক শতকে বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতির মূলেও আছে পর্যবেক্ষণের বিস্তারে উন্নতি – একের পরে এক যন্ত্রের আবিষ্কার। আর সেখানেই শুরু হয় অন্ধবিশ্বাসের সাথে বিজ্ঞানের লড়াই। অন্ধবিশ্বাস যেখানে সাধারণ মানুষকে সাধারণ বিস্তারের পর্যবেক্ষণ থেকে প্রাপ্ত সহজাত তত্ত্বে আবিষ্ট রাখে, সেখানে বিজ্ঞান সেই বিস্তার ক্রমাগত বাড়িয়ে চলে। যেহেতু মানব-প্রবৃত্তির মধ্যে এই তত্ত্বীয়করণের প্রবণতা সহজাত, তাই ভবিষ্যতেও এই লড়াই থামার নয়। হয়ত ধর্মের জায়গা নেবে আরো অন্য কোনো সরলীকৃত তত্ত্ব, যার সাথে লড়াই হবে প্রকৃত বিজ্ঞানের। আজকের বিজ্ঞান আর অন্ধবিশ্বাসের লড়াই তাই আসলে সহজাত তত্ত্ব বনাম বিস্তৃত পর্যবেক্ষণলব্ধ তত্ত্বের যুদ্ধ – এর কোনো শেষ নেই।

একটি ধর্মের উতস সন্ধানে

জানুয়ারি 11, 2008

ধর্মের উত্স নিয়ে রিচার্ড ডকিন্সের লেখা অনুবাদ করেছি। তার মধ্যে একটি অংশ খুব মজার – যেখানে ডকিন্স একটি নতুন ধর্মমত কিভাবে তৈরি হয় তা নিয়ে একটি কেস স্টাডি করছেন। কেস স্টাডি হল কার্গো কাল্ট নিয়ে।কার্গো কাল্ট হল প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জগুলোতে প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসগুলোর একটি সম্মিলিত নাম। এরা মনে করত কার্গো জাহাজ গুলো আসলে স্বর্গীয় দূতের প্রেরিত – আর সব সামগ্রী তাদের জন্য ঈশ্বর-প্রদত্ত। জাহাজের ইউরোপিয় নাবিকরা কিভাবে রেডিও শোনে, কিভাবে রাতে আলো জ্বালায় – সবই ছিল এই আদিবাসীদের বিস্ময়ের বিষয়। আসলে উন্নত টেকনলজির সাথে ম্যাজিকের খুব একটা তফাত নেই। পরবর্তীকালে তাদের ধর্মবিশ্বাসেও এইসব ‘ম্যাজিক’ প্রবেশ করে, গঠিত হয় মিশ্র ধর্ম।

ভানুয়াটুর তান্না দ্বীপে আমেরিকান নাবিকদের রীতিমত পূজো করা হত। তান্নায় একটি কাল্ট এখনও আছে – যার কেন্দ্রে আছে জন ফ্রাম নামে এক নাবিক। যদিও নিশ্চিতভাবে কেউ বলতে পারেনা এই নামে সত্যি কেউ ছিল কিনা, সরকারি নথি আনুসারে, ফ্রাম দ্বীপে এসেছিলেন ১৯৪০ সালে। তিনি অনেকগুলো ভবিষ্যতবাণী করে গিয়েছিলেন। তার বক্তব্য আনুসারে, তিনি আবার দ্বীপে ফিরে আসবেন, জাহাজ ভর্তি সামগ্রী নিয়ে, আর সাদা আমেরিকান ও মিশনারীদের দ্বীপ থেকে তাড়িয়ে দেবেন। এমনকি, তার পুনরাগমনের সময় তিনি প্রচলিত ঔপনিবেশিক মুদ্রার পরিবর্তে নতুন ধরণের মুদ্রার প্রচলন করবেন। সেই প্রভাবে ১৯৪১ সালে আদিবাসীরা কাজ বন্ধ করে দিল। যা টাকাপয়সা ছিল তা দিয়ে জিনিসপত্র কিনতে শুরু করল। দ্বীপের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হল। কিছুদিন পরে, যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকান বাহিনী দ্বীপে পদার্পণ করল, আদিবাসীরা মনে করল জন আসবে এবার। জনের বিমান যাতে দ্বীপে নামতে পারে, সেজন্য দ্বীপে রানওয়ে তৈরি হল, বাঁশের কন্ট্রোল টাওয়ার, হেডফোন বানানো হল।

পঞ্চাশের দশকে চিত্রপরিচালক ডেভিড অ্যাটেনবরো দ্বীপে যান তথ্যচিত্র তৈরির জন্য। দেখেন, নাম্বাস নামে এক স্বঘোষিত পুরোহিত নবগঠিত কাল্টের দায়িত্বে আছেন। তিনি জনের সাথে নিয়মিত ‘যোগাযোগ’ রেখে চলেন। জনের রেডিও-র সাথে যোগাযোগের পন্থাও অদ্ভূত। এক বৃদ্ধা, কোমরে বৈদ্যুতিক তার জড়ানো, মাঝে মাঝে অজ্ঞান হয়ে অস্ফুটস্বরে কথা বলতে থাকে। নাম্বাস সেটা বুঝে সবাইকে জানায় – এটাই হল জনের বার্তা। স্বাভাবিকভাবেই, তাদের সমাজে নাম্বাসের কদরই অন্যরকম। নাম্বাসের বক্তব্য অনুসারে কোনো এক বছর ১৫ই ফেব্রুয়ারী জন ফিরে আসবে। তাই, ঐ দিনে ধর্মীয় উৎসব পালন হয়, সবাই একটা খোলা জায়গায় একত্রিত হয়ে জনের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা জানায়।

সব দেখে অ্যাটেনবরো তার বন্ধু স্যামকে জিজ্ঞেস করেন যে কেন জনের পুনরাগমনের প্রতিশ্রুতির ঊনিশ বছর পরেও এরা একইভাবে জনের অপেক্ষায় বসে থাকে? স্যামের উত্তর, যদি আমরা দুহাজার বছর ধরে খ্রীষ্টের পুনরাগমনের প্রতীক্ষা করে যেতে পারি – তবে এরাই বা কেন মাত্র ঊনিশ বছর জনের জন্য প্রতীক্ষা করতে পারে না?
সম্পূর্ণ অনুবাদ :
ধর্মের উত্স সন্ধানে

কৃত্রিম মাংস

জানুয়ারি 11, 2008

আমি কয়েক দিন ধরে বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লিখে আসছি। আজকে কি লিখব ভাবতে ভাবতে পুরোনো একটা আর্টিকলে চোখ গেল। লিখে ফেললাম সেটাই।

ইন-ভিট্রো মাংস হল কৃত্রিম মাংস, যা ল্যাবরেটরিতে তৈরি হয়। মাংস আসলে অনেক ফাইবারের মত দেখতে কোষ নিয়ে গঠিত। প্রতিটি কোষের মধ্যে আবার একাধিক নিউক্লিয়াস থাকে। এই কোষগুলো নিজেরা বিভাজিত হয়না, এরা তৈরি হয় অনেকগুলো একি রকম দেখতে কোষ জোড়া লেগে। এই মূল কোষগুলোকে বলা হয় স্টেম সেল।

কৃত্রিম মাংস তৈরি করার জন্য প্রথমে কিছু প্রকৃত পশু-মাংস নিয়ে শুরু করা হয়। তাদের থেকে স্টেম সেল বের করে একটি কৃত্রিম বৃদ্ধি-সহায়ক পরিবেশে রাখা হয়। এই পরিবেশে নাইট্রোজেন, গ্লুকোজ, আমিনো এসিড বা অন্যান্য বৃদ্ধির উপাদান যথেষ্ট পরিমানে মজুদ থাকে। এই কৃত্রিম বৃদ্ধি-সহায়ক পরিবেশে স্টেম সেলগুলো বেড়ে এবং জোড়া লেগে বড় বড় মাংসের তন্তুতে পরিনত হয়। এই তন্তুগুলোকে জোড়া লাগিয়েই পাওয়া যায় কৃত্রিম মাংস।

হল্যান্ড ও আমেরিকায় নাসার বিজ্ঞানীরা এ নিয়ে গবেষনা করছেন। হল্যান্ডের কিছু বিজ্ঞানীতো পেটেন্টও নিয়ে ফেলেছেন এর ওপরে। আশা করা যাচ্ছে আগামী ২০ বছরের মধ্যে কৃত্রিম মাংস বাজারজাত হবে এবং বাজারে ভালোই জায়গা করে নেবে।
পশুপ্রেমীরা এর মধ্যেই এর সমর্থনে নেমে পড়েছেন। তাছাড়া এই মাংসকে স্বাস্থ্যসম্মত করা সহজ, জীবানুর আক্রমণের সম্ভাবনাও কম। তবে বেশ কিছু হেলথ ট্রায়ালের আগে বাজারে এর জায়গা পাও্য়া শক্ত। স্বাদে গন্ধে কতটা মূল মাংসের মত হবে, সেটাও দেখার বিষয়।

এর মধ্যেও আছে ধার্মিকদের প্রবলেম। নিরামিষশী সম্প্রদায়ের এই মাংস না খাওয়ার কোনো কারণ নেই। তাদের মূল যুক্তি পশুপ্রেমের কথা এই মাংসের ক্ষেত্রে খাটে না। ইহূদি বা মুসলিম সম্প্রদায়ে যারা পশুর মাংস খেয়ে অভ্যস্ত তারাও ঠিক করে উঠতে পারছেন না খাওয়া উচিত হবে কিনা। আমি সম্প্রতি কয়েকজন নিরামিষাশী ও কয়েকজন মুসলিম বন্ধুকে ব্যাপারটা নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম। কেউই সঠিক বলতে পারেনি এই মাংস খাওয়াটা বিধি-বিরোধী হবে কিনা, বলেছে বিষয়টা তর্কসাপেক্ষ।

বিজ্ঞান আর অনেক কিছুই এরকম তৈরী করবে যাতে ধর্মীয় বিধি ওলটপালট হয়ে যাবে। বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর …

বিবর্তনবাদ ও ধর্ম

জানুয়ারি 11, 2008

ডারউইনের বিখ্যাত বিবর্তনবাদের সাথে কোনও ধর্ম কি খাপ খায়? বিবর্তনবাদ অনুসারে, মানুষ এবং সব প্রজাতি ধীরে ধীরে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে পৃথিবীতে এসেছে। এই অবস্থান পৃথিবীর সকল ধর্মে বর্ণিত সৃষ্টি প্রক্রিয়ার থেকে আলাদা। গরিলা থেকে মানুষের সৃষ্টি – এটা কোনও ধর্মই মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।
আসলে বিজ্ঞান আর ধর্ম কিছুতেই একসাথে মিশে যেতে পারে না। বিজ্ঞানের মতে ধর্ম প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফলে সৃষ্ট মানব চরিত্রের একটি বৈশিষ্ট্য মাত্র।
জীববিজ্ঞানীদের মধ্যে বিবর্তনবাদ নিয়ে ঐক্যমত্য হলেও সাধারণ মানুষ এখনও তা মেনে নেয়না। আমেরিকাতেই শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ বিবর্তনবাদে বিশ্বাস করেনা, অথচ, একই দেশে অধিকাংশ এলিট বিজ্ঞানীরা তা মানেন। অনেক দেশে ধর্মের অজুহাতে বিবর্তনবাদ পড়ানোই হ্য়না।
আজকে বিজ্ঞানের জগতে যারা বিজ্ঞানে অগ্রগণ্য তারাই দুনি্য়াকে শাসন করছে। জীববিজ্ঞানের প্রয়োগে রোগব্যাধি দূর হয়। কিন্তু আমরা কতকাল জীববিজ্ঞানের এই অমূল্য শাখা বিবর্তনবাদকে অস্বীকার করে চলব?
বিবর্তনবাদ নিয়ে বিশদ জানার জন্য এই সাইটে দেখুন – সুন্দর বাংলায় লেখা বই – পিডিএফ আকারে প্রকাশিত।[wjsK=http://www.mukto-mona.com/Articles/bonna/book/index.htm]