Archive for the ‘জিন’ Category

ঘনিষ্ঠতা ও স্বার্থপর জিন

জানুয়ারি 11, 2008

আগের পর্ব

আরো জটিল কিছু উদাহরণের মাঝে ডুব দেওয়ার আগে চট করে একটা তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা সেরে ফেলা যাক। জিন তো হল জীবের বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রক – একেকটি জিন একএকভাবে জীবের প্রকৃতি ও আচরণে প্রভাব আনে। কিন্তু, এই যে লেখার শিরোনামে “স্বার্থপর জিন” বলে একটা খটমটে তত্ত্বের নাম দেখা যাচ্ছে, সেটার মানে কি? সহজ করে বললে, যে জিন জীবগোষ্ঠীর মধ্যে নিজের উপস্থিতি বাড়িয়ে তুলতে সর্বদা সচেষ্ট, তাকেই বলা যায় “স্বার্থপর জিন”। রিচার্ড ডকিন্সের তত্ত্ব অনুসারে, যে জিন যত “স্বার্থপর” হবে – মানে নিজের উপস্থিতি বৃদ্ধিতে যত সচেষ্ট হবে, সেই জিনই জীবজগতে বেশী করে স্থান করে নেবে। কিন্তু জিনের তো নিজস্ব কোনো সচেতনতা নেই, তাহলে সে কিভাবে স্বার্থপর হতে পারে? সমাধানটাও সহজ। যে জিনের প্রভাবে জীব নিজের জিন বৃদ্ধিতে সচেষ্ট হবে, সেই জিনই নির্বাচিত হবে – যেন, জিন চালকের আসনে বসে জীবকে নিয়ন্ত্রণ করে এমনভাবে চালাচ্ছে, যাতে সে জিনের আরো “কপি” তৈরীতে সাহায্য করে – নিজের “স্বার্থে” জীবকে চালনা করছে। “কপি” করার এক পদ্ধতি তো প্রজনন, কিন্তু আরো এক ভাবে জিনের স্বার্থপরতা প্রকাশ পায়। অন্য যে জীবের শরীরে একই জিন উপস্থিত আছে, জীবকে তার প্রতি পক্ষপাতিত্বে প্রলুব্ধ করে। কিন্তু কিভাবে জানা সম্ভব কার দেহে কিসের জিন আছে? প্রকৃতিতে একটাই উপায় আছে এটা অনুমান করার – আত্মীয়তা। একদল নিকটাত্মীয়কে বাঁচানোর জন্য যদি কোনো জীব প্রাণ বিসর্জন দেয়, তাহলে তা হবে কোনো এক এরকম “স্বার্থপর জিন”-এর “প্ররোচনা” বা প্রভাবে – কারণ জীব নিজে মরে গেলেও তার জিনের “কপি” কিন্তু তার নিকটাত্মীয়দের দেহে সুরক্ষিত থাকার সম্ভাবনা খুবই বেশী। বিবর্তনের দৃষ্টিতে দেখলে, যে জিন জীবকে নিকটাত্মীয়দের সাথে ঘনিষ্ঠ করে তোলে বা তাকে নিকটাত্মীয়দের জন্য প্রাণ অবধি দিতে প্ররোচিত করে, সেই জিনের নির্বাচিত হবার সম্ভাবনা বেশী – কারণ, জীবগোষ্ঠীতে এই জিনের “কপি” বেড়েই চলবে। ক্রমে, জীবের বৈশিষ্ট্য হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে এই ঘনিষ্ঠতা – জীবজগতে এর ব্যতিক্রম মেলা দুস্কর। এই একই কারণে জীবের বাবা-মায়ের পক্ষপাতিত্ত্ব পেয়ে বড় হয়। বিজ্ঞানী ফিশার, হ্যালডেন আর সর্বোপরি হ্যামিল্টনের প্রতিষ্ঠিত এই তত্ত্বই জনসমক্ষে এনেছেন রিচার্ড ডকিন্স তার “সেলফিশ জিন” বইতে।

হ্যামিল্টন আরো এক ধাপ এগিয়ে গাণিতিকভাবে হিসাব করার চেষ্টা করেছেন ঠিক কতটা নিকট আত্মীয় হলে তার জন্য জীব প্রাণ দিতেও প্রস্তুত থাকে। তার বক্তব্য হল – এক জীব অপর এক জীবের সাথে যতটা জিন শেয়ার করে, ততটাই তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা। কিন্তু বাস্তবে কেউ জানে না কে কতটা জিন শেয়ার করে, তাই জীব শেয়ার করার সম্ভাবনার ওপর দিয়ে “হিসাব” করে। এই হিসাব মত, সন্তান বাবা-মায়ের ৫০% জিন শেয়ার করার সম্ভাবনা রাখে, তাই সন্তানের সাথে ঘনিষ্ঠতা ৫০% বলা যায়। একই ভাবে সন্তানদের নিজেদের মধ্যে জিন শেয়ার করার সম্ভাবনাও ৫০% – তাই তাদের মধ্যেও ঘনিষ্ঠতা সমান। কিন্তু তুতো ভাই-বোনেদের সাথে জিন শেয়ার করার সম্ভাবনা ১২.৫%, তাই এদের ঘনিষ্ঠতাও তুলনায় কম (চিত্র দ্রষ্টব্য)। এই ঘনিষ্ঠতার কারণটা খুবই সহজাত। স্বার্থপর জিন জীবকে বিবর্তনে এমন পথে নিয়ে চলে যাতে তার জিন-বিস্তারে সে উদ্যোগী হয়। যার সাথে সে বেশী জিন শেয়ার করবে, তার জিন-বিস্তার একরকম তার নিজের জিন-বিস্তারের সমতুল্য – যত ঘনিষ্ঠতা বাড়বে, তত বাড়বে নিজের জিন বিস্তারের সম্ভাবনা। এখন এ থেকে সহজেই অনুমেয় কিভাবে জীব তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের জন্য প্রাণ দিতেও প্রস্তুত হয় – নিজে মরে গেলেও তার জিন-বিস্তারের সম্ভাবনা মরে না। তাই এই পরোপকারী জিন বিস্তৃত হয় – জীবসমাজে স্থান করে নেয়।

এবার অনেকেই প্রশ্ন করবেন কেন অপত্যের তুলনায় বাবা-মায়ের আত্মবিসর্জন দেবার প্রবণতা বেশী দেখা যায় জীবজগতে? কারণ ব্যাখ্যা করা যায় অন্য দৃষ্ঠিভঙ্গী থেকে। অপত্য জীবের বয়স কম বলে তার জিন সঞ্চারের সম্ভাবনাও বেশী বাবা-মায়ের তুলনায়। তাই অপত্যস্নেহের জিন ভারসাম্য রেখে জীবসমাজে স্থান পেয়ে গেছে। উদাহরণ হিসাবে ধরা যায় যে মনে করা যাক এক বাবার মধ্যে এই অপত্য-স্নেহের জিন আছে। তার চার বাচ্চাকে বাঁচাতে গিয়ে সে মারা গেল। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেই অপত্য-স্নেহের জিন তাদের বংশবিস্তারের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে, আর বাড়িয়ে তোলে জিনপুলে নিজের অস্ত্বিত্ত্ব। তাই এই অপত্য-স্নেহের জিন আসলে একটি স্বার্থপর জিন – জিনপুলে নিজের সংখ্যা বাড়াতে সদা-“সচেতন”। অন্যদিকে, স্বার্থপর জিন মোটেও জীবকে স্বার্থপর করে তোলে না, বরং ঘনিষ্ঠদের ক্ষেত্রে পরোপকারী করে তোলে।


Advertisements

স্বার্থপর জিন ও আত্মত্যাগ

জানুয়ারি 11, 2008

শুধুমাত্র আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে থাকিলেই বিবর্তনে সুবিধা পাওয়া যায় – এই ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে আগের পর্বে লিখেছিলাম। আগ্রাসী জীবেদের নিজেদের মধ্যে মারামারি করার প্রবণতা তাদের বিবর্তনগত ভারসাম্যে পৌঁছতে বাধা দেয়, যার ফলে সেই “আগ্রাসী জিন” স্থায়ী হতে পারে না। এবারে লিখছি দলবদ্ধ জীবদের নিয়ে। প্রকৃতিতে এইরকম দলবদ্ধ জীবের সংখ্যাই বেশী। পাখিরা জোট বেঁধে ওড়ে, মাছ দলে দলে সাঁতার কাটে, পোকামাকড় দলবেঁধে বাসা বানায় বা হায়েনারা দল বেঁধে শিকার করে। এখানে আলোচ্য মূল প্রশ্ন হল – এই দলবদ্ধ থাকার সহজাত প্রবণতা কিভাবে স্বার্থপর জিন তত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে? প্রতিটি জীব স্বার্থপর হলে কি তাদের দল গঠিত হতে পারে না? আরো বড় কথা সেই দল বা পরিবারের জন্য সহজাত আত্মত্যাগের কি ব্যাখ্যা হতে পারে? আর একই তত্ত্ব দিয়ে জীব কিভাবে উপকারীর উপকার করতে শেখে তা নিয়েও আলোচনা করছি।

প্রথমেই নজর দেওয়া যায় দলবদ্ধ ভাবে থাকার স্বাভাবিক কিছু সুবিধার দিকে। একসাথে শিকার করায় হায়েনাদের শিকার পাবার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। পেঙ্গুইনেরা নিজেদের মধ্যে জড়াজড়ি করে হাঁটে, যাতে এদের ঠান্ডা কম লাগে। একসাথে সাঁতার কাটলে সামনের মাছের তৈরী প্রবাহের মধ্যে শরীর ভাসিয়ে সাঁতার কাটাও সহজ হয়। আর V-আকৃতির জোট করে পাখিরা দূর-দূরান্তে পাড়ি দেয় একই প্রবাহ-জনিত সুবিধার কারণে। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে হ্যামিল্টনের স্বার্থপর জোটের মডেলে কথা। ভুল বোঝার অবকাশ না রাখার জন্য বলে রাখা ভাল, এখানে স্বার্থপর জোট বলতে স্বার্থপর জীবের জোট বোঝানো হচ্ছে।

ডিসকভারি বা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলে আমরা অনেকবারই দেখেছি বাঘের হরিণ শিকার করার দৃশ্য। মোটামুটি একটা সংক্ষিপ্ত জায়গার মধ্যে হরিণ দলবেঁধে চরে বেড়ায়। বাঘ যখন আক্রমণ করে, কাছাকাছি একটা হরিণকে বেছে নিয়ে তাড়া করে ধরে ফেলে। খুব স্বাভাবিকভাবেই বাঘের নজর থাকে দলের প্রান্তবর্তী হরিণগুলোর দিকে, যাদের ধরতে পারলে বাঘের শক্তিক্ষয় কম হবে। আর একই কারণে, হরিণদের দল গঠনের সময়ে সব হরিণই চাইবে যত পারা যায় দলে মাঝখানে থাকতে যাতে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা কমে যায়। ঘাস খাবার সময়ে হয়ত কিছুটা বিচ্ছিন্ন হবার দরকার পড়ে, কারণ মাঝের অংশে ঘাস দ্রুত কমে যায়। কিন্তু সাধারণভাবে চলাচল করার সময় হরিণেরা (ভাল দেখা যায় ভেড়াদের মধ্যে) যথাসম্ভব গা ঘেঁষাঘেঁষি করে চলতে থাকে। দূর থেকে দেখে এরা দলবদ্ধ বলে মনে হলেও এর পেছনে আছে প্রত্যেকের নিজ-নিজ স্বার্থপর উদ্দেশ্য – বিপদ-এলাকা কম করা আর প্রান্ত ছেড়ে মাঝের দিকে আসার প্রবণতা। এই ধরণের জোটকেই বলা যায় স্বার্থপর জোট – যেখানে সবাই নিজের স্বার্থের জন্যই জোট বেঁধে থাকে।

তবে, প্রকৃতিতে জোট-গঠন ছাড়াও সহমর্মিতার আরো অনেক উদাহরণ আছে যা এই মডেল দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। সবথেকে বড় সমস্যা হয় যেখানে জীব নিজের বিপদ এনেও দলকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। আপাতত সেরকম কয়েকটা উদাহরণ নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। ছোটো অনেক পাখি আছে যারা বাজ বা ঈগলের মত শিকারী পাখি দেখলেই কিচিরমিচির শব্দ করে দলের বাকি পাখিদের সতর্ক করে দেয়। এর ফলে ওই পাখিটার বিপদ কিছুটা বেড়ে যায়, কারণ শিকারী তাকে সহজেই খুঁজে পেতে পারে। সে কিন্তু ইচ্ছা করলেই বিপদ বুঝে সটকে পড়তে পারে, কিন্তু সে তা না করে নিজেকে শিকারীর নিশানায় এনেও দলকে সাহায্য করছে – এই আত্মত্যাগের ব্যাখ্যা কি হতে পারে? এই ঘটনার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের আগে একটা ব্যাপার বলে রাখা ভাল। পাখিদের এই এল্যার্ম কল নিয়ে বিশদ গবেষণা করে শব্দবিজ্ঞানী মার্লার দেখিয়েছেন এই ডাকগুলো এমনভাবে ডাকা হয় যাতে শিকারীরা কিছুতেই ডাক কোথা থেকে আসছে বুঝতে না পারে। স্বাভাবিকভাবে, কোনো এক সময়ে এই এল্যার্ম কল ঠিকঠাক না আসায় অনেক পাখি শিকার হয়েছে। তাই যাদের এল্যার্ম কল ঠিকঠাক, তারা বেঁচে থেকে বেশী বংশবৃদ্ধি করেছে। এল্যার্ম কল দেওয়ায় সুপটু করে তোলার জিনও প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে স্বার্থপরের মত পাখিদের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে।

এবার আসা যাক আত্মত্যাগের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে। সাধারণভাবে দেখা যায় যে একই গোষ্ঠীতে জীবের “কিন” বা আত্মীয় থাকার সম্ভাবনা বেশী। আর আত্মীয়দের মধ্যে একই ধরনের জিন থাকার সম্ভাবনাও বেশী। তাই “কিন সিলেকশন” তত্ত্ব অনুসারে জীব নিজের স্বার্থপর জিনের “কপি” বাঁচানোর জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে। দুটো ভিন্ন প্রেক্ষাপটে দেখা যাক এল্যার্ম কলের গুরুত্ব।

একধরনের পাখি আছে যারা মাটিতে চরে বেড়ায়। শিকারী আক্রমণ করলে তাদের আত্মরক্ষার সহজ উপায় হল আশেপাশের ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে পড়া। ধরা যাক এরকমই একটি পাখির দলে একটি পাখি এক শিকারীকে আগেভাগে দেখে ফেলেছে। যেকোন মুহূর্তে এরপরে শিকারী আঘাত হানবে। এখন তার কাছে দুটো পথ খোলা আছে – প্রথমটি হল নিজের মত চুপচাপ ঝোপে লুকিয়ে পড়া, আরেকটা হল সবাইকে সতর্ক করে দেওয়া। এখানে ভেবে দেখলে বোঝা যায়, পাখিটা যদি একা একা ঝোপে লুকিয়েও পড়ে, শিকারী আক্রমণ করলে গোটা দলই বিপদে পড়বে। শিকারী যদি দলবেঁধে আসে, তাহলে তো কথাই নেই। অন্যদিকে, শিকারী আঘাত হানার আগেই যদি সবাই মিলে লুকিয়ে পড়া যায়, তাহলেই বেঁচে যাওয়া যাবে। এধরনের পাখিরা তাই হিস-হিস শব্দে বাকিদের সতর্ক করে দেয়।

আরেক ধরনের পাখির কথা আসে, যারা আক্রান্ত হলে দলবেঁধে উড়ে পালিয়ে যায়। আগেরবারের মতই ভাবা যাক যে কোনো এক শ্যেনদৃষ্টি পাখি শিকারীকে আগে থেকেই দেখে ফেলেছে। এখন সে একা উড়ে যেতে পারে। কিন্তু শ্বাপদসংকুল পৃথিবীতে একা উড়ে গেলে তার বিপদের সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়া ছাড়া কমে না। শিকারী পাখিরা সাধারণত এরকম একা-হয়ে-যাওয়া পাখিদেরই আক্রমণ করে সহজ শিকার বানিয়ে ফেলে। পড়ে যদি তার আবার দলে ফিরে আসার সম্ভাবনাও থাকে তাও সাময়িকভাবে তাকে একা হয়ে যেতে হবে। তাই এই অবস্থানে সবথেকে ভাল নীতি হল নিজেও উড়ে পালানো, আর সাথে আর সবাই যাতে পালায় সেজন্য কিচিরমিচির শব্দে তাদেরও সতর্ক করে তোলা। হ্যামিলটনের এই তত্ত্ব ঠিক হোক বা না হোক, পাখিদের মধ্যে এই আচরণ বারে বারে একই রকম ভাবে দেখা যায়।

বেঁচে থাকার পথে এই কৌশল খুবই দক্ষ। এই এল্যার্ম কল নিখুঁত না হবার কারণে যেমন অনেক পাখি শিকারে পরিণত হয়েছে, তেমনই এল্যার্ম কল না দেওয়ার কারণে অনেক দলও বিপদ্গ্রস্ত হয়েছে। সবে মিলে এল্যার্ম কল যারা ঠিকঠাক দিতে পেরেছে, সময়ের সাথে সাথে তাদের স্বার্থপর জিন বেশী হারে ছড়িয়ে পড়েছে। জীব নিজে স্বার্থপরের মত এল্যার্ম কল দিতে শিখেছে আর তা দেখে আমরা তাদের আত্মত্যাগের কথা ভেবে বিমোহিত হয়েছি।
(চলবে)

স্বার্থপর জিন ও স্থিতিশীল কৌশল

জানুয়ারি 11, 2008

আগের পর্ব

বিবাদী আর আগ্রাসী নীতি ছাড়াও অনেকরকম কৌশল নিয়ে আলোচনা করেছেন স্মিথ আর প্রাইস। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল প্রতি-আক্রমণের কৌশল। এই কৌশলে জীব প্রথমে বিবাদীর মত আচরণ করে, কিন্তু আক্রান্ত হলে প্রতি-আক্রমণও করে, বিবাদীদের মত পালিয়ে যায় না। এছাড়াও কোনো কোনো জীব শুরুতে আগ্রাসীদের মত ব্যবহার করে আক্রান্ত হলে পালিয়ে যেতে পারে – সেটাও একটা কৌশল। আর আছে শুরুতে পরীক্ষা করে যাচাই করে দেখে নেবার কৌশল। স্মিথ আর প্রাইস দেখিয়েছেন, এসবের মধ্যে প্রতি-আক্রমণের কৌশল বা টিট-ফর-ট্যাটই হল একমাত্র স্থিতিশীল কৌশল, অর্থাৎ, জীবগোষ্ঠীতে শুধু এই কৌশলই চালু থাকলে, বাকি কৌশল অবলম্বন করে জীবেরা অতিরিক্ত সুবিধা আদায় করে উঠতে পারেনা। শুরুতে পরীক্ষা করে নেবার কৌশলও প্রায় স্থিতিশীল, তবে এই কৌশল অবলম্বনকারী জীবগোষ্ঠীর মধ্যেও প্রতি-আক্রমণকারীরা সামান্য সুবিধায় থাকেন। উৎসাহী পাঠকেরা নিজেরা একই পয়েন্ট সিস্টেমে হিসাব করে দেখতে পারেন কোন ক্ষেত্রে কিভাবে কারা সুবিধাপ্রাপ্ত হয়। প্রকৃতিতে এই পয়েন্ট সিস্টেমের কিছু হেরফের হলেও মূলনীতি প্রায় একই থাকে। মেরু অঞ্চলের পাখীদের ক্ষেত্রে দিনের আলো যেটুকু সময় থাকে তা শিকার না করে নিজেদের মধ্যে মারামারি করলে সময় নষ্ট করার জন্য অনেক বেশী খেসারত দিতে হবে, তাই তাদের ক্ষেত্রে সময় নষ্ট করার পেনাল্টি -১০ এর জায়গায় -৩০ ভাবা যেতে পারে। তাই সাধারণ কিছু গাণিতিক হিসাবে সমগ্র প্রকৃতির হিসাবকে মাপতে গেলে অনেক সতর্কভাবে হিসাব করতে হবে।

এবার আসা যাক আরো একধরণের লড়াইতে – যাকে পরিভাষায় বলা যায় “পলায়নের লড়াই”(War of attrition)। এর মানে, যতক্ষণ না একজন পলায়ন করে, ততক্ষণ এই লড়াই চলে। প্রকৃতিতে এধরণের লড়াই বহুল প্রচলিত – সাধারণত খুব সহজে কাবু হয়না এরকম প্রজাতির (যেমন গণ্ডার) মধ্যে চলে। দুটো জীব একে অন্যের দিকে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গী আর তর্জন-গর্জন করতে থাকে, যতক্ষণ না একজন ‘রণক্ষেত্র’ থেকে পালিয়ে যায়। জেতার জন্য শুধু অপরের থেকে বেশী সময় ব্যয় করতে হয়, সময়ই একমাত্র শক্তি এই যুদ্ধে। এটা অনেকটা দুজনের মধ্যে নিলাম, যেখানে সময় হল কারেন্সীর সমতুল্য। উদাহরণ দেখতে হলে আমার মনে হয় কোনো জঙ্গলে যাবার দরকার নেই, মানবসমাজে এই পলায়নের লড়াই সর্বত্র চলে, বিশেষত বিশ্বাসের প্রশ্নে। অরকুটে বা অনেক ফোরামে (সচলায়তনেও) প্রায়ই দেখা যায় দুপক্ষ নিজের নিজের মতামত একতরফা বলে চলেছে। তারা উভয়েই আলাদা আলাদা মাপকাঠি দিয়ে অপরের মত ভুল আর নিজের মত ঠিক বলে দাবী জানাচ্ছে। লড়াই চলে ততক্ষণ, যতক্ষণ না একপক্ষ ময়দান ছেড়ে পালিয়ে যায় বা ভাবে এই বিষয়ে আর সময় ‘নষ্ট’ করা ঠিক হবে না।

ধরা যাক সবাই যদি নিজেদের মধ্যে ঠিক করে নেয় যে তারা একেকটি বিষয়ে সর্বাধিক এতগুলো পোস্ট দেওয়া যাবে। সেক্ষেত্রেও কোনো চালাক ব্যক্তি নিয়ম ভেঙ্গে আরো একটা বেশী পোস্ট দিয়ে বাজিমাত করবে (বাস্তবে থাকলেও প্রকৃতির নিয়মে পোস্টের ঊর্দ্ধসীমা নেই)। তাই এই কৌশল ধোপে টিঁকবে না। আবার যে লড়াইতে হেরে যাচ্ছে, সে যদি আগে থেকেই হিসাব করে নিতে পারে যে সে হেরে যাবে, তাহলে সে ওই বিষয়ে কোনো পোস্টই করবেনা, সময়ের অপব্যবহার থেকে নিজেকে সরিয়ে নেবে। সেক্ষেত্রে আবার যারা শুধু কয়েকটি পোস্ট দিয়ে বাজার ‘যাচাই’ করে নিতে চায় ক’জন তার সাথে থাকতে পারে, তারা সুবিধাপ্রাপ্ত হবে। কারণ তার সমমতে কয়েকটি পোস্ট আসা-মাত্রই সংখ্যালঘুরা আর বিরুদ্ধে পোস্ট দিয়ে সময় নষ্ট না করার কথা ভাববে। গল্প পড়ে আবার মনে হতে পারে যে কিছুদিন পড়ে অন্যেরা এই কৌশল ধরে ফেলবে আর তারা কয়েকটা বেশী পোস্ট অবধি ধৈর্য ধরবে। আবার আমরা ঘুরেফিরে সেই গল্পের শুরুতে হাজির। তাহলে স্থিতিশীলতা আসবে কি করে? গাণিতিক বা তার্কিকভাবে দেখানো যায় যে প্রতি ব্যক্তি তার নিজের নিজের মত করে লড়াইতে তার নিজের লাভ-ক্ষতির মূল্য যা ভাবে, সেই অনুপাতেই সময় ব্যয় করবে। অরকুটে বা ফোরামে যার বিশ্বাস দৃঢ়তর (অবশ্যবিশ্বাস দৃঢ়তর বলে সেই ঠিক এমন কোনো মানে নেই), সেই জেতে – কারণ তার কাছে জেতার ‘মূল্য’ও বেশী। এটাই স্থিতিশীল কৌশল।

এ বিষয়ে কৌশলের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হল প্রতিদ্বন্দীকে বুঝতে না দেওয়া যে সে কখন পলায়ন করতে চায়। অনেকসময়েই, ফোরাম ছেড়ে বেরিয়ে যাবার আগে একপক্ষের লেখার দৈর্ঘ্য ছোটো হতে থাকে, যুক্তির তীব্রতা কমতে থাকে – যা থেকে প্রতিদ্বন্দী বুঝে যায় যে এবার প্রতিপক্ষ হার-স্বীকার করতে চলেছে। হিসাবের থেকে সামান্য বেশী হলেও সে তখন সেই অতিরিক্ত সময় ব্যয় করে লড়াইতে জেতার জন্য। তাই প্রাকৃতিক নির্বাচনের ক্ষেত্রে যাদের পলায়ন আগে থেকেই বোঝা যায়, তারা সুবিধা পায় না। শেষ অবধি যারা একইভাবে লড়াই করতে পারে, তারাই নির্বাচিত হয়, তাই এই কৌশলই স্থিতিশীল।

এখন অবধি যা আলোচনা হয়েছে সব ক্ষেত্রেই ধরে নেওয়া হয়েছে লড়াইতে উভয়পক্ষ সমান বা প্রায় সমমাপের। বাস্তব প্রকৃতিতে কিন্তু তার উল্টোটাও প্রচুর দেখা যায়। মেনার্ড আর প্রাইস এই তত্ত্ব অসম লড়াই-এর ক্ষেত্রেও সফলভাবে প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন সেখানেও স্থিতিশীল কৌশলে পৌঁছন সম্ভব। তাদের হিসাবমত, অসাম্য প্রধানত তিনপ্রকারের –
১) আকার বা গঠনগত (বাঘ বনাম হরিণ)
২) যুদ্ধে প্রাপ্তি অনুসারে (তৃণভূমি নিয়ে মাংসাশী প্রাণী কেন লড়াই করবে?)
৩) অবস্থান নিয়ে (‘হোম গ্রাউন্ড’ বনাম ‘অ্যাওয়ে গ্রাউন্ড’)। এর মানে হল যুযুধান দুই পক্ষের এক পক্ষ আগে থেকেই সেখানকার বাসিন্দা আর অন্যপক্ষ অনুপ্রবেশকারী।
এবার দেখা যাক তৃতীয় প্রকারের অসাম্যের (হোম আর অ্যাওয়ে) সাপেক্ষে স্থিতিশীলতা কিভাবে আসতে পারে। সাধারণ হিসাবে বোঝা যায় যে “বাসিন্দা জেতে আর অনুপ্রবেশকারী পালায়” – এরকম কৌশল স্থিতিশীল। কারণ কোনো এক জীব যদি সর্বদা আক্রমণের কৌশল অবলম্বন করে, তাহলে সে অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে ভাল ফল করলেও বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে লড়াইতে জড়িয়ে পড়ে অর্ধেক লড়াইতে আহত হবার সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলবে। অপরদিকে, জীবগোষ্ঠীর বাকি জীবেরা কোনো লড়াইতেই যাচ্ছেনা, কেউ না কেউ পালিয়েই যাচ্ছে। তাই তারা ওই আগ্রাসী জীবের তুলনায় সুবিধাপ্রাপ্ত হবে। একই ভাবে দেখা যেতে পারে “বাসিন্দা পালায় আর অনুপ্রবেশকারী জেতে” – এটাও একটা স্থিতিশীল কৌশল – যদিও প্রকৃতিতে এর উদাহরণ খুবই কম। কারণ, সাধারণত বাসিন্দারা নিজেদের অবস্থানগত সুবিধার কারণে সেই জায়গা সম্পর্কে বেশী ভাল ধারণা রাখে, যা তাদের লড়াইতে সাহায্য করে। স্মিথের মতে, এই দ্বিতীয়টি একরকম বিভ্রান্তিকর কৌশল। কারণ, এর ফলে, বাসিন্দ বলে আর কিছু থাকে না – যে অনুপ্রবেশ করে সেই অন্যেকে একরকম তাড়িয়ে দেয়। আর প্রথমটি প্রকৃতিতে সর্বত্র দেখা যায় – যাকে বলে আঞ্চলিক আচরণ (Territotorial behaviour)।

এই আঞ্চলিক আচরণের একটা ভাল নিদর্শন দেখা যায় নিকো টিনবার্জেন-এর পরীক্ষায়। তিনি একটি অ্যাকোরিয়ামের দুপাশে দুটো যুদ্ধবাজ মাছ ছেড়ে দিলেন। তারা দুপাশে দুটো বাসাও বানিয়ে ফেলল এবং নিজেদের বাসার প্রতিরক্ষাও করতে থাকল। এবার উনি দুটো টেস্ট-টিউবে মাছদুটোকে আলাদা করলেন। এবার তাদের পাশাপাশি আনলেই দেখা যায় তারা কাঁচের ওপারে থাকা প্রতিদ্বন্দীর সাথে মারামারি করতে উদ্যত হচ্ছে। মজার ব্যাপার হল, যদি টেস্ট-টিউব দুটোকে যদি একজনের বাসার কাছে বসিয়ে পাশাপাশি আনা যায় তাহলে দেখা যাবে যার বাসার কাছে সে মারমুখী, আর অপরজন পালাতে ব্যস্ত। বিবর্তনের পথে “বাসিন্দা জেতে আর অনুপ্রবেশকারী পালায়” – এই স্থিতিশীল কৌশল মাছগুলো আয়ত্ত করে ফেলেছে।

কিন্তু মেক্সিকোর সামাজিক মাকড়সা আচরণে ভিন্ন। কোনো মাকড়সা নিজের জালে বসে আক্রান্ত হলে সে পাথরের অপরদিকে চলে যায়, অনেকসময়ে সেখানকার মাকড়সাটাকে উৎখাত করে। এভাবে চলতে থাকে যতক্ষণ না কোনো এক মাকড়সা নতুন জায়গা পেয়ে যায়। এদের আচরণ দ্বিতীয় স্থিতিশীল কৌশলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এক্ষেত্রে বিবর্তনের পথে “বাসিন্দা পালায় আর অনুপ্রবেশকারী জেতে” – এই স্থিতিশীল কৌশল মাকড়সারা নির্বাচনের মাধ্যমে আয়ত্ত করে ফেলেছে। (চলবে)

স্বার্থপর জিন

জানুয়ারি 11, 2008

স্বার্থপর জিন কথাটা রিচার্ড ডকিন্সের The Selfish Gene এর বাংলা অনুবাদ। জীবের আচরণ কিভাবে বিবর্তনের পথে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে স্বার্থপর জিন দিয়ে – সে বিষয়েই বইটা। এই লেখটা মূলত বইয়ের পঞ্চম চ্যাপ্টার থেকে নেওয়া। বাংলা প্রতিশব্দের ব্যাপারে আমি কিছুটা কাঁচা, তাই জনগণ আমাকে সাহায্য করলে বাধিত হব।

বাংলাভাষায় একটা কথা আছে – “অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী”। আমার ধারণা ডারুইনের “যোগ্যতমের উদ্বর্তন” নিয়েও এরকমই কিছু ভয়ঙ্করী ভুল ধারণা রয়েছে – তাদের মধ্যে একটি হল আগ্রাসী মনোভাবের ব্যাখ্যা। খুব সহজ চিন্তাভাবনা করলে মনে হবে যে যদি যোগ্যতমই সবসময় নির্বাচিত হবে তাহলে সব জীবই তো চাইবে অন্যেকে মেরে ফেলতে আর নিজের বংশবিস্তার করতে। তাহলে সেই প্রাণীদেরই আমাদের এখন চারপাশে দেখতে পাওয়ার কথা যারা হিংস্র, শক্তিশালী ও আগ্রাসী। একটি জীবকে যদি জিনসমষ্টি নিয়ন্ত্রিত একটি স্বার্থপর যন্ত্র (যাকে আমরা বলব সজীব যন্ত্র) বলে মনে করা যায়, তবে সেই জিনগুলোই বেঁচে থাকার কথা, যারা প্রাণীদের মধ্যে এই আগ্রাসী নীতি অবলম্বনে প্রলুব্ধ করে। কিন্তু বাস্তবে আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার ব্যতিক্রম দেখি, কেন?

ব্যাপারটা একটু বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা যাক। একটি সজীব যন্ত্রের কাছে বাকী জীব বা সজীব যন্ত্রেরা হল জল, কাঠ বা পাথরের মত প্রকৃতির আরো কিছু অংশমাত্র। প্রাকৃতিক নির্বাচন সেই জিনগুলোকেই নির্বাচিত করে যারা সজীব যন্ত্রকে তার পারিপার্শ্বিক প্রকৃতির পক্ষে সবথেকে উপযোগী করে গড়ে তোলে। পারিপার্শ্বিক প্রকৃতির মধ্যে অন্যান্য সজীব যন্ত্র বা জীবও অন্তর্ভুক্ত। ভিন্ন প্রজাতির জীবেরা একে অপরকে প্রভাবিত করে – খাদ্য-খাদক সম্পর্ক ছাড়াও পরাগরেণু বাহক প্রজাপতির মত উদাহরণও কম নেই। তবে একই প্রজাতির জীবেদের পারস্পরিক প্রভাব তুলনায় বেশী। কোনো এক জীবের কাছে বাকি সব জীব খাদ্যশৃঙ্খলে তার প্রতিযোগী আবার অর্ধেক (সাধারণভাবে) জীব তার সম্ভাব্য প্রজনন-সঙ্গী, বাকি অর্ধেকের সাথে প্রতিযোগিতা করেই তবে সে বংশবিস্তারে সক্ষম হবে। সাধারণ বিচারে, তাই জীবের পক্ষে তার প্রতিযোগীকে হত্যা করাটা (এবং খেয়ে ফেলাটা) খুবই স্বাভাবিক বলে মনে হয়। বাস্তবে কিন্তু তার উল্টোটাই বেশী করে চোখে পড়ে। শুধু তাই নয়, কনরাড লোরাঞ্জের ‘অন অ্যাগ্রেসন’ বই-এর মতে, নিজেদের মধ্যে এই মারামারিও জীবজগতে বিভিন্নভাবে হয়, এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার ফলে পরাজিত পক্ষের প্রাণসংশয় হয় না। উন্নততর জীবজগতে, বিশেষত মানুষের মধ্যে আবার আগ্রাসনের পরিবর্তে পারস্পরিক সহযোগিতাই বেশী করে চোখে পড়ে। জীবজগতে হানাহানির পরিবর্তে এরকম সহযোগিতা কেন দেখা যায় যদি স্বার্থপর জিন-বিস্তার করাই জীবের লক্ষ্য হয়ে থাকে?

উত্তরটা প্রথমে একটা উদাহরণের সাহায্যে ব্যাখ্যা করা যাক। ধরা যাক হিমু আর বন্যাদি সচলায়তনে আমার প্রতিযোগী দুই ব্লগার। এটা ভাবা খুবই স্বাভাবিক যে আমি এখন হিমুর মুখোমুখী হলেই তাকে মেরে ফেলতে উদ্যত হব। কিন্তু, এমন যদি হয় যে হিমু আবার বন্যাদিরও প্রতিযোগী, তাহলে হিমুকে মারলে আদপে বন্যাদির সুবিধাই হয়ে যাবে। বরং, বন্যাদি আর হিমুর মধ্যে প্রতিযোগিতা তীব্র হলেই আমার লাভ বেশী। তাই, প্রতিযোগিতার জটিল ঘূর্ণাবর্তে প্রতিযোগীদের নির্বিচারে হত্যা করাটা নির্বাচিত হবার জন্য খুব একটা ভাল কৌশল নাও হতে পারে। চাষের ক্ষেতে অনেকসময়েই একটি কীটনাশক ব্যবহার করে কোনো একটি ক্ষতিকর কীট ধ্বংস করে তার প্রতিযোগী আরো ক্ষতিকর কীটের সুবিধা করে দেবার ঘটনা ঘটে – যার ফলাফল ক্ষতিকর। উদাহরণ থেকে বোঝা যাচ্ছে, প্রতিযোগিতা বা লড়াইতে নামার আগে বা রণকৌশল নির্ধারণে সব সজীব যন্ত্রেরই সচেতন বা অবচেতন ভাবে লাভ-ক্ষতির হিসাব করতে হবে। আর এখানেই আসে হ্যামিলটনের “বিবর্তনগত স্থিতিশীল কৌশল”।

“বিবর্তনগত স্থিতিশীল কৌশল” হল এমন একটি কৌশল বা নীতি, যেকোনো জীবগোষ্ঠীর অধিকাংশ জীব তা অবলম্বন করলে অন্য কোনো কৌশল এসে তার স্থান দখল করতে পারবে না। পরিবর্তিত পরিবেশে কৌশল পরিবর্তন হতে পারে, প্রতি জীবের নিজে নির্বাচিত হবার কৌশল একই জীবগোষ্ঠীর অধিকাংশ জীবের কৌশলের ওপর সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। মূল কথা হল, একবার জীবগোষ্ঠীর অধিকাংশ জীব এই কৌশল অবলম্বন করা শুরু করলে এর বিরোধীদের প্রাকৃতিক নির্বাচনের সরাসরি বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হবে।

মেনার্ড স্মিথের কাল্পনিক উদাহরণ দিয়েই ব্যাখ্যা করা যাক। ধরা যাক, একটি জীবগোষ্ঠীর মধ্যে দুধরণের কৌশল অবলম্বনকারী জীব দেখা যায়। প্রথমটি আগ্রাসী নীতি, আরেকটি বিবাদ নীতি। আগ্রাসীরা সবসময় শেষ রক্তবিন্দু অবধি লড়াই করে, মৃতপ্রায় না হলে রণক্ষেত্র থেকে পলায়ন করে না। বিবাদীরা মারামারি না করে অন্য উপায়ে লড়াই করে, ঝগড়া করে, রক্তচক্ষু দেখায়, আক্রমণের ভাব করে কিন্তু রক্তপাত করেনা। এদের পার্থক্যটা অনেকটা অনেকটা ডিপ্লোম্যাট আর আর্মির পার্থক্যের মত। আগ্রাসীর সাথে বিবাদীর লড়াই হয়না, বিবাদী পালিয়ে যায়। কিন্তু দুই আগ্রাসীর লড়াইতে সর্বদা কোনো না কোনো একজন মারা যায় (বা গুরুতর আহত হয়)। প্রথমে, হিসাবের সুবিধার্থে ধরে নেওয়া যাক, কোনো জীবই জীবদ্দশায় তার কৌশল বদলায় না, এবং প্রতিযোগিতার শুরুতে একে অন্যের কৌশল জানে না। আমাদের এই মডেলের কাল্পনিক পয়েন্ট সিস্টেমে ধরা যাক, প্রতিযোগিতায় জিতলে ৫০ পয়েণ্ট, হারলে ০, সময় নষ্টের জন্য -১০, গুরুতর আহত হলে -১০০ পয়েন্ট – জিনের নির্বাচনের সম্ভাবনার সাথে মিল রেখেই এরকম পয়েন্ট সিস্টেম। এখানে মনে রাখতে হবে যে, আমরা লড়াইতে কে জিতবে তা নিয়ে আগ্রহী নই, তা নিয়ে আগেই আলোচনা হয়েছে। আমরা হিসাব করতে চাই যে এদের মধ্যে কোন কৌশলটি (বা এদের কোনো মিশ্রণ) স্থিতিশীল হতে পারে।

মনে করা যাক, জীবগোষ্ঠীর সব জীবই বিবাদী নীতি অবলম্বন করছে। তাহলে প্রতিটি প্রতিযোগিতায়, একজন জেতে (+৫০), একজন হারে (০) আর দুজনেই সময় নষ্ট করে (-১০x২ = -২০)। সমষ্টিগতভাবে লাভ হয় ৩০ পয়েন্ট, প্রত্যেকের ভাগে যায় ১৫ পয়েন্ট করে। এবার ধরা যাক একটা আগ্রাসী জীব এসে হাজির হল এই গোষ্ঠীতে। সে বিবাদীদের সহজেই লড়াইতে হারিয়ে দেবে, প্রতি যুদ্ধে +৫০ পয়েণ্ট হাসিল করবে। তার ফলে আগ্রাসন নিয়ন্ত্রক জিন খুব সহজেই জীবগোষ্ঠীতে বিস্তার লাভ করবে। এবার ধরি, যথেষ্ট সময় পরে, জীবগোষ্ঠীতে সবাই আগ্রাসী হয়ে গেছে। একইভাবে হিসাব করে দেখা যায়, দুটি আগ্রাসী জীবের লড়াইতে গড়ে -২৫ পয়েণ্ট পায় (জেতায় +৫০, সময় নষ্টে -১০x২ = -২০ আর গুরুতর আহত হওয়ায় -১০০)। একটি বিবাদী সেই দলে থাকলে সে সব লড়াইতে হারে, কিন্তু গড়ে সে ০ পয়েণ্ট পায়। ২৫ পয়েন্টের সুবিধা থাকায় সহজেই বিবাদ কৌশল নিয়ন্ত্রক জিন বিস্তার লাভ করবে।

এতদূর পর্যন্ত গল্পটা শুনে মনে হতে পারে যে জীবগোষ্ঠীতে সবসময় এই দুই কৌশলের জীবেদের মধ্যে একটা বাড়াকমা চলবে। আদপে, অংক কষে দেখানো যায় যে বিবাদী আর আগ্রাসী অনুপাত ৫:৭ অনুপাতে পৌঁছলে স্থিতিশীলতা লাভ করে। মানে, ওই অনুপাতে পৌঁছনর পরে প্রতিটি আগ্রাসী আর প্রতিটি বিবাদীর গড়পরতা লাভ-ক্ষতির হিসাব মিলে যায়। নির্বাচনে আর কেউই অন্যের তুলনায় সুবিধা পায় না। যদি কোনোভাবে আগ্রাসীর সংখ্যা এর চেয়ে বেড়ে যায়, তাহলে বিবাদীরা সুবিধা পেতে থাকে, যেভাবে আগ্রাসীদের দলে একটি বিবাদী সুবিধা পেত। একইভাবে দেখানো যায়, মানবসমাজে নারী-পুরুষের স্থিতিশীল অনুপাত ১:১।

মানবসমাজে অনুরূপ নীতি দেখা যায় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে, যা গেম থিয়োরী দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। কোনো ব্যবসায়ী একই দ্রব্য কমদামে বিক্রি শুরু করলে সে সাময়িকভাবে লাভ বাড়িয়ে ফেলতে পারে, কিন্তু তার প্রতিযোগিরাও সাথে সাথেই দাম কমিয়ে প্রত্যুত্তর দিলে তার আদপে লোকসানই হবে। তাই শেষমেষ নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া ছাড়া বাজারে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে লাভ বাড়ানো সম্ভব নয়। (চলবে)

বুদ্ধির ক্রমবিকাশ – ৩

জানুয়ারি 11, 2008

মস্তিষ্ক কিভাবে প্রজাতিভেদে সরল থেকে জটিল ও জটিলতর আকার ধারণ করল, তা বোঝা গেল। কিন্তু মস্তিষ্কের বিবর্তনের আরো একটি মাত্রা আছে। একই জীবের জীবদ্দশায় শিশুবয়স থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স অবধি তার মস্তিষ্ক একইরকম থাকে না – পরিবর্তিত হয়। কিভাবে আপাত সরল শিশুমস্তিষ্ক পরিণত হয় প্রাপ্তবয়স্কের জটিল মস্তিষ্কে, তা বিবর্তনের অন্য এক মাত্রা।

নিউরোন ও সাইন্যাপস

মানবমস্তিষ্কের মূল গঠন-উপাদান হল নিউরোন। মস্তিষ্কে মোট ১১ বিলিয়ন স্নায়ুকোষ বা নিউরোন থাকে। এই কোষগুলো বৈদ্যুতিক সঙ্কেতের আকারে অনুভূতি পরিবহন করতে পারে। এদের দুই প্রান্তে যে শাখাপ্রশাখার মত প্রবর্ধক থাকে তারা হল ডেন্ড্রাইট, আর মূল তন্তুর মত অংশের নাম অ্যাক্সন। ডেন্ড্রাইট হল সঙ্কেতগ্রাহক অ্যান্টেনার মত, যা অন্য নিউরোন থেকে সঙ্কেত গ্রহণ করে। অ্যাক্সন সেই সঙ্কেত পরিবহন করে অপরপ্রান্তের ডেন্ড্রাইটে নিয়ে যায়। দুটি বা ততোধিক নিউরোনের সংযোগস্থলকে বলে সাইন্যাপ্স, যেখানে এদের সঙ্কেত বিনিময় হয়। মানুষের করটেক্সে মোটামুটি ১০,০০০ এর মত সাইন্যাপ্স থাকে। সাইন্যাপসের ‘ওয়ারিং’-এর মাধ্যমেই আমাদের মস্তিষ্ক জটিল থেকে জটিলতর হয়ে ওঠে।

মস্তিষ্ক ও জিন

অনেককাল আগে মস্তিষ্ককে একটি অপরিবর্তনশীল অঙ্গ বলে মনে করা হত। প্রথম সেই ভ্রান্ত ধারনার অবসান ঘটান রজার স্পেরি। পঞ্চাশের দশকে কিছু পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন মস্তিষ্ক গঠনে বংশগতির বাহক জিনের ভূমিকা আছে। মাছের চোখের সাথে মস্তিষ্কের চক্ষুকেন্দ্র সংযোগকারী স্নায়ু-তন্তুগুলোকে মস্তিষ্কের অন্য জায়গায় জুড়ে দিলেন। কিন্তু কিছুদিন পরে দেখা গেল নিজে থেকেই কিছু তন্তু গজিয়ে আবার চক্ষুকেন্দ্রের সাথে সংযোগ সাধন করে ফেলেছে। একই পরীক্ষা ইঁদুরের ওপরেও করে দেখা গেল, যে স্নায়ু-তন্তুগুলো যেন আগে থেকেই জানে কোন পেশীতে তারা আবদ্ধ থাকবে, অন্য জায়গার সরিয়ে দিলেও তারা আগের জায়গার সাথে সংযুক্তির প্রচেষ্টা করে। তিনি এ থেকে ধারণা করেন যে শরীরে স্নায়ু-তন্তুর সংযুক্তি জীবের জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। মস্তিষ্কের আরো বিভিন্ন চিকিৎসাপদ্ধতি আবিষ্কার করার জন্য তিনি ১৯৮১ সালে নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন।
কিন্তু এই ধারণার মধ্যে কিছু গোলমাল ছিল। জিন আবিষ্কারের পর দেখা গেল সাড়ে তিন বিলিয়ন একক তথ্য রাখার ক্ষমতা আছে, যেখানে মস্তিষ্কে স্নায়ু-সংযুক্তি বা সাইন্যাপসের সংখ্যা এক হাজার মিলিয়ন মিলিয়ন (একের পিঠে ১৫টি শূন্য)। কি করে তাহলে জিনের মধ্যে সমস্ত সাইন্যাপসের অবস্থানগত তথ্য সঞ্চিত থাকা সম্ভব?

প্রশ্নটি ভালভাবে বুঝতে গেলে জীবজগতের একটি উদাহরণ দেখা যেতে পারে। Daphnia Magna বলে একধরণের মাছ, অযৌন জননের মাধ্যমে বংশবিস্তার করতে পারে – উৎপন্ন অপত্য ক্লোনের মত মায়ের সম্পূর্ণ জিনগত বৈশিষ্ট্য লাভ করে। এরকম কিছু অপত্যের মধ্যে দেখা গেল, তাদের নিউরোনের সংখ্যা সমান হলেও সাইন্যাপসের অবস্থান ও জটিলতা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। তাহলে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ, যে সাইন্যাপস গঠনে জিনের ভূমিকা নেই, থাকলেও নগন্য।

এখন প্রশ্ন হল যদি জিনের মধ্যেই সংযোগের জন্য কোনো তথ্য না থাকে, তাহলে কিভাবে নিউরোনগুলো ঠিকঠাক চিনে ঠিক জায়গায় লেগে থাকছে? একটা বিড়ালের দুটো চোখ থেকে আসা নিউরোনগুলো মস্তিষ্কের পাশাপাশি অংশে কি ভাবে লেগে যায়? সূত্র খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীদের নজর গেল অনেক আগে প্রকাশিত কিছু তথ্যের ওপর। ১৯০৬ সালে ভিক্টর হামবার্গার দেখেছিলেন যে, মুরগীর ভ্রূণের সুষুম্নাকান্ডের একটি বিশেষ অংশে যেখানে ২০,০০০ নিউরোন থাকে, সেখানে একই জায়গায় প্রাপ্তবয়স্ক মুরগীর থাকে ১২,০০০ নিউরোন। শুধু তাই নয়, দেখা গেল, নিউরোন শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে একটি অঞ্চলের দিকে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। আর এই বৃদ্ধি ওই অঞ্চলে উপস্থিত কোন রাসায়নিক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। নিউরোনের বৃদ্ধি ঘটে রাসায়নিক দ্বারা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে।

কিন্তু এরকম রান্ডমভাবে বেড়ে ওঠা নিউরোনের শাখাপ্রশাখা ও সংযুক্তির সংখ্যা অনেক বেশি হবার কথা। সেই সংযুক্তির সংখ্যা ধীরে ধীরে প্রাপ্তবয়স্ক জীবের মধ্যে কমে আসবে। যেমন ধরা যাক বিড়ালটার কথা। তার জন্মাবস্থায় দুটো চোখের নিউরোনই একই জায়গায় লেগে থাকে। কিন্তু বাঁ চোখ থেকে আসা তন্তু থেকে আসা সংকেত মস্তিষ্কের যে অংশে প্রক্রিয়াকরণ হয়, সেই অংশ ছাড়া আর সমস্ত অংশের সাথে সংযুক্তি আস্তে আস্তে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সে জন্য প্রাপ্তবয়স্ক বেড়ালের চোখে সঠিকভাবে বিভিন্ন অংশের স্নায়ু-তন্তু ঠিক ঠিক পেশী বা অংশে সংযুক্ত থাকে।

এবার প্রশ্ন হল, কিভাবে শরীর নির্ণয় করে কোন কোন সংযুক্তি দরকার আর কোনটি দরকার নেই? উত্তর জানা গেল ডেভিড হুবেল আর টরস্টেন ওয়েসেলের পরীক্ষায়। তারা সদ্যোজাত একটি বিড়ালের একটি চোখ কোনরকম ক্ষতিগ্রস্ত না করে আবরণ দিয়ে বন্ধ করে দিলেন। এক সপ্তাহ পরে, বিড়ালটির দুটো চোখের সাথে মস্তিষ্কের সংযোগের মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্টভাবে বোঝা গেল। যে চোখটি বন্ধ ছিল, তার তুলনায় খোলা চোখের সাথে মস্তিষ্কের সংযুক্তি অনেক ভালভাবে ঘটেছে, তুলনায় বন্ধ চোখের সংযুক্তির সংখ্যা অনেক কম। সিদ্ধান্ত নেওয়া হল – এই নিউরোনগুলো মস্তিষ্কে সংযুক্তির জন্য নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়, যে যত বেশী অনুভূতি বহন করে, প্রতিযোগিতায় তার জেতার সম্ভাবনাও বেশি।এই কারণেই, কারোর শিশুবয়সে চোখ খারাপ হয়ে গেলে, প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যাবার পরে তার চোখের অপারেশন করেও দৃষ্টি ফিরে পাওয়া শক্ত – ততদিনে তার চোখ-মস্তিষ্ক সংযোগকারী স্নায়ুতন্তু বিলুপ্ত হয়েছে। হুবেল আর ওয়েসেল মস্তিষ্কবিজ্ঞানে অবদানের জন্য ১৯৮১ সালে স্পেরির সাথে নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন।

তাহলে বোঝা গেল, যে আমাদের মস্তিষ্ক সহ স্নায়ুতন্ত্র জিন ও পরিবেশের প্রভাবে গঠিত হয়। জিন যেমন সামগ্রিক কাঠামো তৈরীতে ভূমিকা পালন করে, তেমনই নিউরোনগুলোর সংযুক্তি নির্ভর করে পরিবেশ থেকে আসা সংকেতের ওপরে। তাই, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে দেখা যায় তার মস্তিষ্কের ক্ষমতা জিন এবং পরিবেশ – দুয়ের ওপরেই নির্ভর করে।

সাম্প্রতিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, সদ্যোজাত জীবের মস্তিষ্কে প্রয়োজনের প্রায় দ্বিগুণ সংখ্যায় নিউরোন থাকে – আর জন্মানোর পরে ধীরে ধীরে সংকেতের রকমফেরে ‘অতিরিক্ত’ নিউরোনগুলো ‘এলিমিনেট’ (eliminate) হতে থাকে। ভাষাবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে শিশুবয়সে মানুষের দুটো বিভিন্ন ধ্বনির মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা বেশি থাকে, তাই তারা তাড়াতাড়ি নতুন ভাষা শিখতে পারে। জেনি বলে আমেরিকান এক কিশোরী তার জীবনের প্রথম তেরো বছর মানব-সংস্পর্শ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সে বাকি জীবনে আর কোনো ভাষা শিখে উঠতে পারে নি। একই কারণে শিশুবেলার স্মৃতি খুব অস্পষ্ট – সাধারণত মানুষ মনে রাখতে পারে না।

স্মৃতি ও জ্ঞান আহরণ

কিন্তু তাহলে স্মৃতি কি করে কাজ করে? যদি নিউরোন কমেই যায় তাহলে মানুষ কি প্রাপ্তবয়স্ক হলে শিখতে পারত? একজন বাঙালী যখন হিন্দি শেখে তখন সে প্রতিটি বাংলা শব্দের হিন্দি প্রতিশব্দ মনে রাখার চেষ্টা করে। প্রাপ্তবয়স্ক হলে তার মস্তিষ্কে ভাষার জায়গাতে তো আগেই বাংলা শব্দগুলো বসে আছে, প্রতিশব্দগুলো যাবে কোথায়?

জ্য পিয়ের শানগেক্স ধারণা করেন জন্ম থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত নিউরোন শুধু কমে চলে না, সাইন্যাপ্স বা সংযুক্তিগুলো বাড়া কমা চলে। এদের সংখ্যায় বাড়া-কমা নিয়ন্ত্রিত হয় ওই অংশে কতটা সঙ্কেত পরিবাহিত হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে। নিউরোন-সংযোগের এই ধর্মকে ডারউইনের ‘যোগ্যতমের উদ্বর্তন’ তত্ত্বের কথা মাথায় রেখে নাম দেওয়া হয় নিউরাল ডারউইনিসম। প্রতিটি নতুন শিক্ষা বা নতুন জ্ঞান আমাদের মস্তিষ্কে নিউরোনের ও তাদের সংযুক্তিগত বিন্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে জায়গা করে নেয়। শানগেক্স তার এই ধারণার স্বপক্ষে কোন প্রমাণ পেশ করতে পারেননি। সম্প্রতি উইলিয়াম গ্রীনাফ দেখিয়েছেন যে, কঠিন পরিস্থিতিতে পড়লে, প্রাপ্তবয়স্ক ইঁদুরের মস্তিষ্কে নিউরোন-সংযোগের সংখ্যা ২০% অবধি বৃদ্ধি পেতে পারে। তাই এখন বলা হয়, সংযোগ বাড়া-কমার মাধ্যমেই জীব নতুন জিনিস শেখে।

আসলে, প্রতিনিয়ত মস্তিষ্কে সংযোগ তৈরি হয়, বিলুপ্তও হয়। প্রতিকূল পরিবেশে মস্তিষ্কে বেশী অনুভূতি পরিবাহিত হয় বলে বেশীসংখ্যক সংযোগ বেঁচে যায়, কমসংখ্যক বিলুপ্ত হয়। এভাবেই মস্তিষ্ক অভিযোজিত হয় আর নতুন অভিজ্ঞতা ধরে রাখে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে সংযোগ উৎপাদন ও বিলুপ্তি, দুয়েরই হার কমে যায়, তাই প্রাপ্তবয়স্করা শিখতে বেশী সময় নেয়। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে নতুন জ্ঞান, ‘কতটা নতুন’ তার ওপরেও নির্ভর করে সে শিখতে কতটা সময় নেবে, কারণ নিউরোনের বিন্যাস তত বেশি পরিবর্তিত হতে হবে। জীববিজ্ঞানী উইলিয়াম কেলভিনও এই মতের সমর্থক।

সঠিক কি উপায়ে মস্তিষ্ক স্মৃতি সঞ্চয় করে বা নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে, তার স্বপক্ষে এখনো কোনো বাস্তব পরীক্ষা-প্রমাণ নেই। তাই বিষয়গুলো যথেষ্ট বিতর্কিত। একবিংশ শতকে নতুন গবেষণার মাধ্যমে সেই সত্য উদ্ঘাটিত হবে – এরকমই আশা রাখি।

সূত্র –
১) http://faculty.ed.uiuc.edu/g-cziko/wm/05.html
২) http://williamcalvin.com/
৩) http://www.stevenharris.com/theory/085.htm

খোদার ওপর খোদকারী

জানুয়ারি 11, 2008

[ক্রেগ ভেন্টর জেনেটিক্সের জগতে এক পরিচিত নাম। তিনি হলেন ক্রেগ ভেন্টর ইন্সটিটিউট-এর প্রতিষ্ঠাতা, যা জেনেটিক্সের গবেষণায় অগ্রণী এক সংস্থা। নিচের লেখাটা তাঁর একটি বক্তৃতা অবলম্বনে লেখা।]
জেনেটিক কোড হল জীবনের ব্লুপ্রিন্ট। প্রতি জীবকোষে এই কোডই নির্ধারণ করে কোষের কার্যকারিতা – কোষ কোন কোন প্রোটিন তৈরী করবে, কিভাবে করবে। জেনেটিক কোড নিয়ে গবেষণায় মূলত দুটো ভাগ করা যায়। ধাপদুটোকে সাধারণভাবে বলা যায়, একটা জেনেটিক কোড পড়তে শেখা আরেকটা লিখতে শেখা। পড়তে শেখা বলতে জীবের জিনোমে বেসিক ব্লকগুলোর শৃঙ্খলা লিপিবদ্ধ করা। আর লিখতে শেখা বলতে সেই লিপিবদ্ধ শৃঙ্খলা থেকে পৃথকভাবে জীবকোষ তৈরী করা।

প্রায় এক দশক আগে প্রথম যখন আমরা একটি ভাইরাসের জিনোম পড়তে পেরেছিলাম তখন সেটা আমাদের ১৩ বছর পরিশ্রমের ফসল ছিল। আজ আমরা একই কাজ মাত্র ২ থেকে ৮ ঘন্টায় করে দেখাতে পারি। এর পরেও অনেক উদ্ভিদ, সাধারণ প্রাণী এমনকি মানুষের জিনোমও আমরা পড়তে পেরেছি। এ বছরের শেষে আমরা মনে করি আরো তিন থেকে পাঁচটি জীবের জিনোম পড়তে পারব। পরিবেশবাদী একটি সংস্থা এ বছরের মধ্যে ১৩০টি জিনোম পড়ার উদ্যোগ নিয়েছে।

এবারে আসা যাক কৃত্রিম জীবনের কথায় – মানে জিনোম লেখার খেলায়। সবথেকে সরল জীবন ভাইরাস পরীক্ষাগারে তৈরী করা সম্ভব হয়েছে অনেকদিন হল। আমাদের সহকারী এক বিজ্ঞানীর প্রচেষ্টায় এখন মাত্র দু-সপ্তাহে যথেষ্ট জটিল প্রকৃতির ভাইরাস তৈরী করা সম্ভব হচ্ছে, এখনো অবধি পোলিও ভাইরাস সহ দশ হাজার প্রজাতির ভাইরাস তৈরী করা গেছে এই পদ্ধতিতে। মোটামুটিভাবে, এখন যেসব ভাইরাসের জিনোম পড়া গেছে, তাদের কৃত্রিম উপায়ে তৈরী করাও সম্ভব। কিন্তু, নিজেদের পরিকল্পনামত ভাইরাস তৈরী করতে এখনো এক দশক লাগবে। তবে আশার কথা, আগামী দু-বছরের মধ্যে প্রোক্যারিওটিক কোষ আর দশ বছরের মধ্যে আমাদের শরীরের অংশ ইউক্যারিওটিক কোষ বানানো সম্ভব হবে।

জীবকোষ বানানোর পদ্ধতিও বেশ মজার। প্রথমে টুকরো টুকরো অবস্থায় বেস-পেয়ারগুলো তৈরী করা হয় – এগুলো আসলে কিছু রাসায়নিক ছাড়া কিছুই না। সেগুলোকরে জুড়ে তৈরী করা হয় সমগ্র একটি ক্রমোজোম। এই টুকরো জুড়ে গোটা ক্রোমোজম বানানোর কৌশল প্রকৃতি থেকেই শেখা। কয়েকটি বিশেষ প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন বিকিরণের মধ্যেও বেঁচে থাকতে সক্ষম। প্রথমে বিকিরণে এদের ক্রোমোজোম টুকরো টুকরো হয়ে গেলেও বারো থেকে চব্বিশ ঘন্টার মধ্যেআবার এরা তাকে জোড়া লাগাতে সক্ষম। এহেন অদ্ভুত ক্ষমতাধারী ব্যাকটেরিয়াকেই কাজে লাগানো হয় গোটা ক্রোমোজম বানানোর জন্য। বানানো গোটা ক্রোমোজম এর পরে স্থান করে নেয় পুরোনো একটি জীবকোষে, যার মধ্যেকার ক্রোমোজম আগেই সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সংক্ষেপে এই পদ্ধতিই হল জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং।

আমার বিশ্বাস জিনোম পড়া ও কৃত্রিম জীব সৃষ্টি মানুষের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হতে চলেছে। অনেক এমন জীবাণু পাওয়া গেছে যারা কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে, অনেকে বেঁচে থাকে জলের স্ফুটনাঙ্কে। পরিবেশের কার্বন-ডাই-অক্সাইড বা কার্বন-মণো-অক্সাইড নিয়ে অনেকে অন্যান্য বায়ো-পলিমার উতপাদন করে যা তেলের পরিবর্তে ব্যবহার হতে পারে। নরওয়েতে মিথেন থেকে হাইড্রোজেন নিষ্কাশনেও এরকমই এক কৃত্রিম জীবাণু ব্যবহৃত হবে। ভবিষ্যতে রোবট নিজে থেকেই কৃত্রিম জীবাণু তৈরী করতে পারবে। ওষুধ আর রাসায়নিক শিল্পেও ব্যবহার হবে কৃত্রিম জীবাণু, কারণ এরা সহজেই জটিল থেকে জটিলতর রাসায়নিক উতপাদন করতে পারে, অতি সহজে ও কম খরচে। আরো মজার ব্যাপার, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর প্রয়োগে সাইনোব্যাকটেরিয়ার ফটো-সিন্থেসিসে পরিবর্তন এনে উপজাত হিসাবে হাইড্রোজেন পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। ভবিষ্যতে হাইড্রোজেন যদি জ্বালানী হিসাবে ব্যবহৃত হয় তাহলে এই জীবাণুর ভূমিকা বাড়বে, সাথে আসবে আরো নতুন নতুন জীবাণু। এভাবেই আশা করা যাচ্ছে, আগামী কয়েক দশকের মধ্যে আমাদের খাদ্য, শক্তি বা রাসায়নিক শিল্পে অপরিহার্য হয়ে যাবে।

কিন্তু এত সম্ভাবনা সত্ত্বেও সমস্যার শেষ নেই। ১৯৯৯ সালে আমাদের প্রকল্প শুরুর আগে প্রায় দেড় বছর আমরা শুধু এথিকাল রিভিউতেই সময় দিয়েছি। সেও এক মজার ব্যাপার। বিভিন্ন ধর্মগুরুরা এসে তাদের ধর্মগ্রন্থ পড়ে সিদ্ধান্ত নেবার চেষ্টা করলেন যে কৃত্রিম জীবন তৈরী করা ধর্মীয় বিধিসংক্রান্ত কিনা। তারা তাদের ধর্মগ্রন্থে এর বিরোধী কিছু না পাওয়ায় আমাদের কাজ অনেক সহজ হয়ে গেছে। এর পরেও সমস্যা হল বায়ো-টেররিসম। কৃত্রিম জীবাণু বা ভাইরাস যে টেররিস্টদের কাজে ব্যবহার হবে না তা কে বলতে পারে? আর তা হলে পরিণতি হবে ভয়ানক। কিন্তু আমরা এখনো ততটা এগোতে পেরেছি বলে মনে হয়না। তাই আমি আশাবাদী, তার আগেই আমরা এর প্রতিরোধ করার উপায় বের করে ফেলতে পারব। আমি আপাতত স্লোন ফাউণ্ডেশনের সাহায্যে একটি প্রকল্পের সাথে যুক্ত আছি, যাতে এই সমস্যার প্রতিরোধের বিভিন্ন উপায় খতিয়ে দেখছি।

তবুও বলে রাখা ভাল, বিজ্ঞান একটি পদ্ধতি মাত্র – ব্যবহারকারী মানুষ। যদি মানুষ একে ভুল পথে ব্যবহার করতে চায়, বিজ্ঞানের নিজস্ব সত্ত্বা তাকে আটকাতে পারে না। তাই মানুষের সমস্যা মানুষকেই মোকাবিলা করতে হবে। এ বিষয়ে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং আর এটম বোমার খুব একটা তফাত নেই, ব্যবহার যেমন হবে আমাদের ভবিষ্যতও তেমনই এগোবে।

পুরো টক শো দেখতে হলে দেখুন এখানে।

বিবর্তনবাদের কয়েকটি প্রশ্ন

জানুয়ারি 11, 2008

আগেরদিন বিজ্ঞানে কিভাবে তথ্যসংগ্রহ করে প্রমাণ আহরণ করা হয় সে বিষয়ে লিখেছি। কিন্তু তাতে অনেকেই সন্তুষ্ট নন। তারা বিবর্তনবাদের পক্ষে প্রমাণ জানতে চেয়ে কিছু প্রশ্ন করেছেন। আমি একে একে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করলাম।

মানুষ যদি বানরের উত্তরপুরুষ হয় তাহলে কোটি বছরে বানর গুলো কেনো কিছুটা মানুষের মত হলনা?
সহজ উত্তর, আমরা গাছে যে বানর ঝুলে থাকতে দেখি, সেই বানর থেকে আমাদের সৃষ্টি নয়। আমরা শুধু একই পূর্বপুরুষ থেকে তৈরি। ওপরের ছবিটা দেখলে ব্যাপারটা ভাল করে বোঝা সম্ভব। গরিলা, ওরাং ওটাং বা শিম্পাঞ্জী সবাই আনথ্রপয়েড থেকে বিবর্তিত হয়ে তৈরি হয়েছে। সহজ কথায়, আজ থেকে ১২ মিলিয়ন বছর আগে কোনো বানর ছিল না, তবে যারা ছিল তাদের সাথে বানরের সাদৃশ্যই বেশি। তাদের মধ্যে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন দল থেকে গরিলা, শিম্পাঞ্জী বা মানুষ তৈরি হয়েছে। এই দলগুলো মাইগ্রেট করে এক এক অঞ্চলে চলে যাওয়ায় একদলের পরিবর্তন আরেকদলের মধ্যে প্রভাব ফেলেনি – কোনো জিন বিনিময় হয়নি। আর এক এক অঞ্চলে পরিবেশ একেকরকম হওয়ায় তাদের বিবর্তনও একেকরকম ভাবে হয়েছে।

মানুষ আর বানরের অন্তর্বর্তী প্রাণি দেখা যায়না কেন?
বিবর্তনে আমরা সবাই অন্তর্বর্তী – নিজের বৈশিষ্ট্য কমবেশি পরের প্রজন্ম কে দিয়ে চলব। সত্যিকারের এক প্রাণি থেকে আরেক প্রাণিকে আলাদা করার কোনো পদ্ধতি জানা নেই। সাধারণভাবে একেক প্রজাতি আরেক প্রজাতির সাথে প্রজনন করেনা, এই ভিত্তিতে প্রজাতি তৈরি করা হয়। গোষ্ঠী আলাদা হওয়ার পরে মানুষ আর শিম্পাঞ্জী নিজেদের মত করে বিবর্তিত হয়েছে, তাই তাদের মধ্যে লিংক কেটে গেছে। কৃত্রিম উপায়ে মানুষ আর শিম্পাঞ্জীর সংকর ভ্রূণ তৈরি করা হয়েছে, মিল না থাকলে সেটা কি সম্ভব হত?
আরো একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন আন্দামানের উপজাতিরা – তারা আমাদের সাথে প্রজননক্ষম, কিন্তু আমাদের থেকে অনেক আলাদা। কেন? কারণ, আমাদের সাথে তারা ভৌগোলিক ভাবে বিচ্ছিন্ন থাকায় তাদের সাথে আমাদের জিন বিনিময় হয়নি অনেকদিন।

মানুষ আর শিম্পাঞ্জীর ৯৫-৯৯% জিনগত মিল আছে, এ থেকে কি বোঝা যায়?
বোঝা যাওয়ার জন্য বাকি ১-৫% জিন খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই জিনগুলো যে মিউটেশনের ফলে আলাদা হয়েছে তাদের মলেকুলার ক্লক দিয়ে বয়স নির্ধারণ করা সম্ভব। মজার কথা হল, এভাবে প্রাপ্ত বয়স, সংগৃহীত ফসিলের কার্বন ডেটিং-এর মাধ্যমে প্রাপ্ত বয়সের খুব কাছাকাছি। আগেই বলেছি, একাধিক সূত্র থেকে পাওয়া গেছে বিবর্তনবাদের প্রমাণ – এটা সেরকমই একটা উদাহরণ।

এই ১-৫% মানুষ আর শিম্পাঞ্জীর মধ্যে এতটা পার্থক্য কেন করে?
জিন আমাদের জন্মাবস্থা নিয়ন্ত্রন করতে পারে, কিন্তু পরবর্তীতে আমরা কিভাবে চলব সেটা আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের ওপর নির্ভর করে। মানব-সভ্যতার একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল এক প্রজন্মে অর্জিত জ্ঞান আর ইনফ্রাস্ট্রাকচারের ওপর পরের প্রজন্ম কাজ শুরু করে – এটাই মানুষকে অন্যের থেকে আলাদা করেছে। এই ১-৫% জিন-পার্থক্য মানুষের মস্তিষ্ক বিকাশে সাহায্য করেছে যা আমাদের পুরুষানুক্রমে জ্ঞান বহন করতে সাহায্য করেছে। ভাল করে ভেবে দেখলে, আমাদের জ্ঞানের অধিকাংশই পুরুষানুক্রমে পাওয়া মানবসমাজের দান, ঠিক না?