Archive for the ‘আমেরিকা’ Category

ফুরান্তিস বনাম অফুরান্তিস

ডিসেম্বর 25, 2012

পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে – এরকম প্রেডিকশন বোধহয় একমাত্র মায়া-সভ্যতার অবদান নয়। আদি-অনন্তকাল ধরেই ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় বিভিন্ন সভ্যতায় এই ভবিষ্যতবাণী ব্যবহার হয়ে আসছে। মানব-সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবার কথা আসে ঐ হাত ধরেই। তবে আজকাল বিজ্ঞানীরাও মাঝে মাঝে বলেন অমুক সালে অমুক জায়গায় দু’চারটে উল্কা পড়ে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। কিন্তু যখন একজন অর্থনীতিবিদ বা সমাজ-বিজ্ঞানী বলেন সভ্যতার শেষের কথা তখন তিনি ঠিক কি বোঝাতে চান?

পৃথিবীর সম্পদ সীমিত অথচ মানুষের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। এর ওপর ভিত্তি করে এক শ্রেণীর অর্থনীতিবিদ অনেকদিন ধরেই বলে আসছেন যে একটা সময় আসন্ন যখন অর্থনীতির “গ্রোথ” ঋণাত্ত্বক হয়ে যাবে – অর্থাৎ জীবনযাত্রার মান আর বাড়বে না। এই যেমন এখন চারদিকে নতুন নতুন বাড়ি-ব্রিজ-রাস্তা হচ্ছে – তেমনটা আর থাকবে না। আমি এই অর্থনীতিবিদদের দলটাকে নাম দিই ফুরান্তিস – মানে সবকিছু ফুরিয়ে যাবে, এরকমটাই তাদের মত।

অন্য আরেকটা দল আছে যাদের বক্তব্য মানব-সভ্যতার এই ক্রমোন্নতি অবশ্যম্ভাবী। স্বাভাবিক পৃথিবীতে মানুষ ঠিকই তার উন্নতির পথ খুঁজে নেবে। যদি কিছু ফুরিয়ে যায় তার বিকল্প বের করবে, বিকল্প দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়লে অন্য কোনো পথে সেই সামগ্রীর ব্যবহার বন্ধ করে দেবে, তাও আদম্য মানুষ ফিরে তাকাবে না। মানবসভ্যতার ইতিহাস থেকে আজ অবধি দেখলে এই কর্নুকোপিয়ানদের মতামতই সঠিক বলে মনে হয়। এদের নাম দিই অফুরান্তিস – মানে কিছুই ফুরাবার নয়, ভাবখানা এমন।

ফুরান্তিস দলের কর্ণধার হলেন ম্যালথাস। ম্যালথাস সেই ১৭৯৮ সালেই একটা মারাত্মক বই লিখে তখনকার সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাতে তিনি দেখিয়েছিলেন জনসংখ্যার বৃদ্ধির প্রবণতা এক্সপোনেন্সিয়াল অথচ খাদ্য ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের সরবরাহ কেবলমাত্র লিনিয়ার-গ্রোথ পেতে পারে। অর্থাৎ, কোনো সমৃদ্ধির সময়ে জনসংখ্যা কিছুদিন বাড়ার পরেই খাদ্যে ঘাটতি দেখা যাবে – সমৃদ্ধির সময়ের পরেই আসবে দুর্ভিক্ষ, বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধ আর মোটের ওপর ঋণাত্ত্বক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। ম্যালথাসের নাম থেকে এই বিশেষ সময়ের নাম দেওয়া হয় ম্যালথাসিয়ান ক্যাটাস্ট্রফি

ফুরান্তিসদের বিশেষ বাড়বাড়ন্ত শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে। এই সময়ে জন্মহার কমলেও মৃত্যুর হার তার থেকেও বেশী হারে কমে যাওয়ায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বাড়তে থাকে। পল এল্রিচ ও তার সহযোগী সিয়েরা ক্লাব ছিলেন এই দলের মানুষ। তার বইতে তিনি দাবী জানান যে সত্তরের দশকেই উন্নয়নশীল বিশ্ব দুর্ভিক্ষের পর দুর্ভিক্ষে উজার হয়ে যাবে , কারণ ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সাথে তাল মিলিয়ে সম্পদের জোগান দেওয়া ধরিত্রীর পক্ষে অসম্ভব। এই অবস্থার উন্নতির জন্য তিনি আবার কিছু নীতি-প্রবর্তনের দাবীও জানিয়েছিলেন। তবে বলাই বাহুল্য তার এইসব ভবিষ্যতবাণীর কোনোটাই ফলে নি। ২০০৯ সালে একটি সাক্ষাতকারে তাকে যখন প্রশ্ন করা হয়, উনি বলেন ওনার উদ্দেশ্য ছিল মানবজাতিকে সতর্ক করে দেওয়া এবং উনি তাতে সফল। বর্ধিত সতর্কতার কারণেই এই যাত্রায় প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করে সভ্যতা গণ-মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়ে গেছে।

তবে ফুরান্তিসদের মধ্যে সবথেকে স্টার হলেন ক্লাব অফ রোম। চার গবেষকের একটি দল ১৯৭২ সালে এম আই টি-র ল্যাবে পাঁচ প্যারামিটারের সিমুলেশন চালিয়ে দাবী জানান ২০১২-২০২০ সাল নাগাদ কোনো এক সময়ে আমাদের অর্থনৈতিক স্থিতি একটা এমন অবস্থায় পৌঁছবে যেখান থেকে আর বৃদ্ধি সম্ভব না। যে পাঁচটি প্যারামিটার এই ক্লাব অব রোম তাদের সিমুলেশনের জন্য ব্যবহার করেছিলেন সেগুলো হল – জনসংখ্যা, শিল্পায়ণ, দূষণ, খাদ্য উৎপাদন ও প্রাকৃতিক সম্পদের আহরণ মাত্রা। সিমুলেশনে দেখা যায় প্রাথমিকভাবে এই সব প্যারামিটারই ক্রমবর্ধমান কারণ একে অন্যের সাথে সম্পর্কিত। এইভাবে, একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় পৌঁছনর পরেই শুরু হয় ভাঙণ। ক্লাব অব রোম এই বিষয়ে প্রথম জনসমক্ষে প্রকাশ করেন লিমিটস-টু-গ্রোথ নামে একটি বইয়ে। । ২০০৩ সালে প্রকাশিত একটি আপডেটে দেখা যায় ১৯৭২-২০০২ অবধি এই পাঁচটি প্যারামিটারের পরিবর্তন হয়েছে ১৯৭২ সালে তাদের ভবিষ্যতবাণী যেমন হয়েছিল – ঠিক সেইভাবে। অর্থাৎ আমরা এগিয়ে যাচ্ছি হয়ত সেই ভাঙণের পথেই। তবে তারা এও যুক্ত করেন যে প্রযুক্তির অভূতপূর্ব বিকাশের ফলে তাদের সিমুলেশনে বর্ণিত ভাঙণ হয়ত আরেকটু দেরীতে (২১ শতকের শেষের দিকে) আসবে।

অনেক তো বললাম ফুরান্তিসদের কথা, এখন বলা যাক অফুরান্তিসদের কথা। আরবানা-শ্যাম্পেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জুলিয়ান সাইমন আবার বলেন যে জনসংখ্যাকে বোঝা হিসাবে দেখার ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভুল। বাড়তি জনসংখ্যা আদপে প্রযুক্তিগত উন্নয়নে সাহায্য করে। আর বাজার অর্থনীতি এমনভাবে চলে যাতে কোনো দামী জিনিসের বিকল্প সস্তা কিছু বের করতে পারলে দুয়ের দামই পড়ে যায়। ব্যাখ্যাটা অনেকটা এরকম –

“জনসংখ্যা ও আয়ের বৃদ্ধি সীমিত সময়ের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদের চাহিদা বৃদ্ধি করে দাম বাড়িয়ে দেয়। এই বাড়তি দাম ব্যবসায়ী আর আবিষ্কারকদের কাছে ইনসেন্টিভ হিসাবে কাজ করে। তারা সবাই সমাধান খোঁজার কাজে সময় ও অর্থ বিনিয়োগ করে। এদের অধিকাংশই ব্যর্থ হলেও, শেষমেষ কেউ না কেউ বিকল্প কিছু একটা বের করে ফেলে। দীর্ঘমেয়াদে বিকল্প আসায় দাম আবার আগের স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে যায়।” 

 

শেষ করার আগে এই সাইমন আর এল্রিচের একটা বিবাদের কথা না বলে পারছি না। এল্রিচের দাবী প্রাকৃতিক সম্পদের দাম বাড়তেই থাকবে, কারণ বর্ধিত জনসংখ্যার চাপ। সাইমনের বক্তব্য দাম বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে তা স্থিতিশীল হয়ে যাবে। এই নিয়ে ১৯৮০ সালে সাইমন আর এল্রিচ একটা বেটিং করেন। এল্রিচের পছন্দমত পাঁচটি খনিজ দ্রব্যের (ক্রোমিয়াম, কপার, নিকেল, টিন ও টাংস্টেন) দাম দশ বছর পরে কত দাঁড়ায় তা দেখা হবে। এই দশ বছরে যদি দাম বেড়ে যায় তাহলে সাইমন এল্রিচকে বর্ধিত দামের সমানুপাতে “ক্ষতিপূরণ” দেবেন। উলটো হলে এল্রিচ দেবেন সাইমনকে। দশকের শেষে দেখা গেল সবাইকে অবাক করে শেষ হাসি হেসেছেন সাইমন, উনি পকেটস্থ করলেন ৫৭৬ ডলার। ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ এর মধ্যে পৃথিবীর জনসংখ্যা বেড়েছিল ৮০০ মিলিয়ন। অথচ পাঁচটি অবশ্য প্রয়োজনীয় খনিজের দাম গড়ে বাড়ল না। পাঁচটির প্রত্যেকটিই দামে কমে গেল। এবং সাইমনের কথাই সত্যি হল। ১৯৮০ সালে বসে যে কেউ হয়ত বলে দিতে পারত কপারের দাম এক দশক পরে বেড়ে যাবে, কারণ তখন কমিউনিকেশন নেট-ওয়ার্কের জন্য অবশ্য-প্রয়োজনীয় ছিল কপার। কিন্তু সেই দশকের মাঝে একবার অপটিক ফাইবার নেটওয়ার্ক বাজারে চলে আসার পরে আর কপারের প্রয়োজনীয়তা আগের মত রইল না। বাজারের চাহিদার সাথে দামও ঝটপট পড়ে গেল।

জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিষয়ক প্যানেলের মতে ২১ শতকে জনসংখ্যা “পিক” করবে, অর্থাৎ পরের শতাব্দীতে জনসংখ্যা কমতে থাকবে। তাছাড়া জনসংখ্যাকে এখন আর কেউ সেরকমভাবে “থ্রেট” বলে মনে করে না। এখন যখন খবরে মাঝে মাঝে পড়ি খনিজ তেল অর্থাৎ পেট্রোলিয়াম আর কত বছর পরে ফুরিয়ে যাবে তখন মনে হয় আমি কি জীবদ্দশায় পেট্রোলিয়াম-উত্তর যুগ দেখে যেতে পারব? ফুরান্তিস না অফুরান্তিস – কে হবেন জয়ী? খেয়াল রাখুন, ফুরান্তিসদের কিন্তু একবার জয়ই যথেষ্ট আর অন্যদিকে অফুরান্তিসদের জয়ী হতে হবে বারে বারে, মানবসভ্যতার উন্নয়নের পতাকা তুলে রাখতে।

Advertisements

অপরাধী কে? সন্ত্রাসী না সমব্যাথী?

ডিসেম্বর 25, 2012

ঘটনার সূত্রপাত গতকাল। ব্রেকিং নিউজ হিসাবে সব টিভি চ্যানেল প্রচার করা শুরু করে এক বাংলাদেশী তরুণ ফেডারেল রিজার্ভে বোমা রাখতে গিয়ে ধরা পড়েছে। আরো সময় গেলে বের হয়ে আসে পুরো ব্যাপারটাই একটা স্টিং অপারেশনের ফসল। রেজয়ানুল নাফিস মার্কিন দেশে এসেছে মাত্র নয় মাস আগে। গত জুলাই মাসে ফেসবুকে তার কমেন্টের সূত্র ধরে তার ওপর নজরদারি শুরু হয়। এই অবস্থায় নাফিস মার্কিন দেশে বোমা হামলা চালানোর উদ্যোগ নিলে এফ বি আই-এর এজেন্ট তাকে নিষ্ক্রিয় বোমা সরবরাহ করে। নাফিস সেই ১০০০ পাউন্ড বোমা ফেডারেল রিজার্ভ (বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক ও ভারতের রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার সমতুল্য) -এর সামনে রেখে পাশের একটি হোটেলে বসে তাকে দুর-নিয়ন্ত্রকের সাহায্যে সক্রিয় করার চেষ্টা করে। এই পর্যায়ে বোমাটি ফাটে না এবং মার্কিন এজেন্ট তাকে গ্রেফতার করে মার্কিন আদালতে পেশ করে (গুয়ান্তানামো বে তে পাঠায় নি)।

এই পর্যন্ত ঘটনা কাল অবধি জানা ছিল। যেহেতু নাফিস স্টুডেন্ট ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিল, তার পরেই আমেরিকায় প্রশ্ন উঠতে থাকে স্টুডেন্ট ভিসা এত সহজে পেল। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ও ছাত্র-ছাত্রীরা শংকিত হয়ে ওঠে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০০১ এ টুইন টাওয়ারে হামলা পর থেকে ২০০৫ অবধি আমেরিকায় বাংলাদেশী ছাত্র-ছাত্রীদের বিশেষ সিকিউরিটি চেকের মধ্যে দিয়ে যেতে হত। অনেকেই মনে করছেন সেই অবস্থা আবার ফিরে আসতেই পারে, স্টুডেন্ট ভিসা সহ অন্যান্য ভিসা পাওয়াও এর ফলে শক্ত হয়ে যাবে। সমস্যা শুধু আমেরিকাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না ভিন্ন ভিন্ন দেশেও বাংলাদেশী নাগরিকদের যাওয়ার সময় অতিরিক্ত স্ক্রুটিনির সম্মুখীন হতে হবে তাও এখনও পরিষ্কার নয়।

অন্যদিকে, নাফিসের পরিবারবর্গ স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনায় ব্যথিত এবং মানতে নারাজ যে তাদের ঘরের ছেলে এ ধরনের নাশকতামূলক কাজকর্মের সাথে জড়িয়ে থাকতে পারে। আমেরিকাতেও অনেকেই স্টিং অপারেশনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন – তাদের বক্তব্য হল নাফিসের উদ্দেশ্য জানামাত্র তাকে ডিপোর্ট করা উচিত ছিল, তাহলে ঘটনা এতদূর এগোত না, সাজানো ঘটনায় টেররিস্ট ধরে মার্কিন নিরাপত্তার কোনও উন্নতি হবে না।

আজ এসে দেখতে পেলাম পুরোদমে দুই শ্রেণীর মতামত ফেসবুকে চলছে। দুই শ্রেণীর মূল বক্তব্য একই – আমাদের দোষ না, যত দোষ আমেরিকার। প্রথম শ্রেণীর বক্তব্য পুরো ঘটনা সাজানো হয়েছে যাতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত আরো জোরদার করা যায়। আরেকশ্রেণীর বক্তব্য পুরো ঘটনাই সাজানো হয়েছে ইসলামের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে – বিশ্ববাসীর কাছে ইসলামের নামে সন্ত্রাসের ছবি তুলে ধরার জন্যই এই ছক। সবশেষে জানা গেল বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মতামতরেখেছেন যে নাফিসের পরিচিতি নিয়ে উনি নিশ্চিত নন, নাফিস বাংলাদেশে বসবাসকারী অবৈধ রোহিঙ্গাদের মধ্যে একজন হতেও পারেন (যদিও নাফিসের বাবা কি ভাবে ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের ভাইস-প্রেসিডেন্ট হয়েছেন সে প্রশ্ন ওনাকে করাই অবান্তর)।

দুই ধরনের যুক্তিই আমার কাছে অন্তঃসারশূন্য লেগেছে। প্রথম কথা স্টিং অপারেশন আমেরিকায় অনেকদিন ধরেই চলে আসছে। এমনকি ভারতেও স্টিং অপারেশনে অনেক মন্ত্রী-আমলা ইতিপূর্বে ধরা পড়েছে। এই ধরনের অপারেশনে অপরাধের “ইন্টেন্ট” বা ইচ্ছা/চেষ্টা আছে এরকম যে কোনও ব্যক্তিকে তার অপরাধ সংঘটনে ছদ্ম-সাহায্য করা হয় যাতে সে কতদূর অবধি অপরাধ করতে পারে সেটা দেখে তাকে হাতে-নাতে ধরা হয়। অনেকেই প্রশ্ন করবেন বাংলাদেশে এ ধরনের স্টিং-অপারেশন কি চলে? এই উত্তরটা আমার সঠিক জানা নেই কিন্তু তৃতীয় বিশ্বে অপরাধের ইন্টেন্ট থাকলে অনেক সময়েই তাকে লক-আপে ঢুকিয়ে পিটিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয় যার থেকে স্টিং অপারেশন শতগুণে ভাল। দ্বিতীয় কথা, নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অব ল এন্ড সিকিউরিটির পরিসংখ্যান মতে, সেপ্টেম্বর ১১-র ঘটনার পরে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ১৫৬ টি কেসের মধ্যে ৯৭টিতেই এজেন্টদের ব্যবহার করা হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ডিফেন্স ল’ইয়ার চেষ্টা করেছে “আসামীকে ট্র্যাপ করা হয়েছে” – এই যুক্তি ব্যবহার করতে, কিন্তু কোনও ক্ষেত্রেই সফল হয়নি। এর থেকে প্রমাণিত যে শুধুমাত্র নির্বাচন আসন্ন বলেই এই অপারেশন চলছে তা নয়, সবসময়েই স্টিং অপারেশন চলছে – তার কনভিকশন রেট ১০০%।

স্টিং অপারেশন যে শুধু “মুসলিমদের সন্ত্রাসী বানানো”-র কাজে ব্যবহার হয়েছে তাও না। কখনও ড্রাগ-পেডলারদের ট্র্যাপে ফেলা হয়েছে, তারা যখন ড্রাগ ডেলিভারি করতে গেছে – পুলিশ হাতেনাতে ধরেছে তাদের। ফেসবুকে অপ্রাপ্তবয়স্ক সেজে বসে থাকা এফ-বি-আই এজেন্ট-এর সাথে যৌণ-সম্পর্কে লিপ্ত হবার প্রচেষ্টার কারণে জাভা প্রোগ্রামিং ল্যানগুয়েজের অন্যতম প্রণেতা প্যাট্রিক নটন (যার লেখা বই আমাদের অনেকেই পড়েছে) ধরা পড়ে শাস্তিও পেয়েছেন। অপরাধ লঘু হবার কারণে অনেক কম সাজা পেয়ে উনি ছাড়া পেয়ে গেছেন বটে কিন্তু স্টিং অপারেশন চালানোর কারণে তার অপরাধ লঘূতর করে দেখানোর প্রচেষ্টা সফল হয় নি। এবং এই ঘটনা ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার হামলার আগেই ঘটেছে। সব স্টিং-অপারেশনেই যে “মুসলিমদের সন্ত্রাসী বানানো”-র সফল অপারেশন ঘটে তাও না। দক্ষিণ ক্যালিফোর্ণিয়ার একটি মসজিদে এক প্রাক্তন ড্রাগ-পেডলারকে এজেন্ট হিসাবে নিয়োগ দেয় এফ বি আই। তার কিছুদিনের মধ্যেই মসজিদের অন্য কিছু ব্যক্তি সেই এজেন্টের আচরণ “সন্দেহজনক” বুঝে উল্টে এফ বি আই-কেরিপোর্ট করে। বাধ্য হয়ে ও সমস্যা নেই বুঝে তদন্ত বন্ধ করে দেয় এফ বি আই। আমি আমেরিকান হলে স্পষ্টতই স্টিং অপারেশনের সমর্থন করতাম, কারণ এই ধরনের অপারেশন শুধু বড় জোট গঠন হবার আগেই তাকে ভেঙে দিচ্ছে তাই না, আল-কায়দা সহ জঙ্গী গোষ্ঠীদের মধ্যেও যথেষ্ট “ডাউট” তৈরী করছে, যার ফলে “নিউ রিক্রুট” করার আগে তারা দশবার ভাবছে।

কিছুদিন আগেই মালালা ইউসুফজাই নামে পাকিস্তানী এক বালিকাকে তালেবানী “শিক্ষাব্যবস্থার” সমালোচনা করার কারণে গুলি খেতে হয়েছে। তালিবানী মুখপাত্র ঘটনা স্বীকার করে তার স্বপক্ষে যুক্তিও উপস্থাপন করেছেন। পাকিস্তানী সমাজেও ঘটনাটার বেশ নিন্দা শোনা যায়। কিন্তু ওই পর্যন্তই, কিছুদিনের মধ্যেই অসংখ্য ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হাজির হয় বাজারে ও পাকিস্তানী মধ্যবিত্ত নির্দ্বিধায় সব দোষ তালেবানের জায়গায় মার্কিন যড়যন্ত্রের ওপর চাপিয়ে দেয়। পাকিস্তানের সমস্যা অশিক্ষিত তালিবানেরা যত, তার থেকে ঢের বেশী গুণে এই সব অর্ধ-শিক্ষিতরা – যারা নিজের দোষ ঢাকতে সব-সময়ে ষড়যন্ত্রের কথা বলে বেড়ান। একই ঘটনা এখন বাংলাদেশেও ঘটছে – যদিও পাকিস্তানের দশায় যেতে অনেক দেরী আছে, কিন্তু অংকুরেই এসব বিনাশ করার প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

শুরুতেই বলেছি এফ বি আই আজকাল ফেসবুক সহ সোসাল মিডিয়ার ওপর কড়া নজরদারী করছে। সুতরাং এই ধরনের মতামত প্রচার করে বেড়ালে তাদের এই ধারণা বদ্ধমূল হবে যে এই নাফিসের পেছনে অসংখ্যা সমব্যাথী আছে যাদের অনেককেই হাতে বোমা তুলে দিলে তা মার্কিণ দূতাবাসে বা স্টক-এক্সচেঞ্জে আক্রমণ চালাতে দ্বিধা করবে না। নাফিস একা যতটা ভাবমুর্তির ক্ষতি করেছে, তার সমব্যাথীরা সমষ্টিগতভাবে তার বহুগুণ ক্ষতি বয়ে আনবে দেশের ওপর।

শেষটা করার আগে একটা উপায় নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করে যাই। রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচারের বদলা হিসাবে রামু-উখিয়াতে যারা বৌদ্ধ-হিন্দু মন্দিরে আক্রমণ চালিয়েছিলেন, সেই কয়েকশ’ উৎসাহীদের সবাইকে হাতে বোমা ধরিয়ে দিলে তাদের মধ্যে কিছু লোক থাকতেই পারে যারা এই বোমা জাপানী বা থাই বৌদ্ধদের মারার কাজে ব্যবহার করতে পারেন। আবার তাদের মধ্যে দু-একজন এমনও পাওয়া যাবে যারা সত্যি অর্থেই থাইল্যান্ড বা জাপানে যেতে সক্ষম। এই দুইয়ের মিল হয়ে গেলেই কিন্তু সর্বনাশ – বিদেশে গিয়ে বোমা ফাটিয়ে কেউ না কেউ দেশের নাম উজ্জ্বল করে আসবে। সুতরাং, এই ধরনের অপরাধীদের দেশেই জেলে পুরে ফেলা ভাল যাতে বিদেশে গিয়ে তারা ধরা না পড়ে। এদেরকে ধরিয়ে দিন – দেশের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখুন। বিদেশে ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে গেলে দেশের বিচার ও আইন-ব্যবস্থা ভাল করতেই হবে। আইনের শাসনের কোনও বিকল্প নেই।

নাফিসের ওপর অভিযোগ – সরকারী সূত্র

পারভেজ হুদভয়ের চোখে আজকের পাকিস্তান

ডিসেম্বর 25, 2012

সচলায়াতনে পাকিস্তানী হিউম্যানিস্ট কোনো লেখকের লেখা প্রকাশিত হয় নি। আমি পারভেজ হুদভয়ের একটা সময়পোযোগী সাক্ষাৎকার বাংলায় অনুবাদ করে দিলাম। এম-এই-টি থেকে পি-এইচ-ডি করা পারভেজ হুদভয় ১৯৭৩ সাল থেকে পাকিস্তানের কায়েদে আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক। ইনি পাকিস্তানে মশাল নামে একটি সংগঠনেরও পরিচালক। এই সংগঠনের কাজ হল নারীশিক্ষার প্রসার ও পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি। বিজ্ঞান-সচেতনতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে নির্মিত ওনার ১৩ পর্বের ডকুমেন্টরিও পাকিস্তান টিভিতে প্রচারিত হয়েছে। ২০০৩ সালে বিজ্ঞানশিক্ষা প্রসারের ওপর কাজ করার জন্য ইউনেস্কো থেকে উনি বিশেষ পুরষ্কার পান।

নিচের সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ক্রিশ্চিনা ওটেন, জার্মান ফোকাস পত্রিকার জন্য। এটা প্রকাশিত হয়েছে কাউন্টারকারেন্টসে, গত ১৫ই ডিসেম্বর।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক মুম্বই হামলার পরে ক্রমাগত খারাপ হয়েই চলেছে। যুদ্ধ লাগার সম্ভাবনা কতটা?

জনগণের দাবী সত্ত্বেও মনমোহন সরকার সীমান্ত পেরিয়ে কোনো আক্রমণ করেনি। দেশে অনেকের সমালোচনা সত্ত্বেও পাকিস্তান সরকার লস্কর-ই-তৈবার বিরুদ্ধে কিছু ব্যবস্থা নিচ্ছে। হয়ত এখন আর কিছু হবে না, তবে এখনকার মত কোনো সম্ভাবনা না থাকলেও আরো একবার একই রকমের হামলা হলে ব্যাপারটা যুদ্ধের আকার ধারণ করতেই পারে।

লস্কর-ই-তৈবার সাথে আর সন্ত্রাসী দলগুলোর তফাৎ কোথায়? পাকিস্তান কি সত্যিই এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে?

আজ থেকে বছর পনের আগে আই-এস-আই আর আর্মির হাত ধরে কাশ্মীরে ভারতীয় সেনার বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করার জন্য লস্করের গোড়াপত্তন। আজকের দিনে এরা খুব বিরল প্রজাতির সন্ত্রাসী দল যাদের পাকিস্তানী রাষ্ট্র বা সেনাবাহিনী সম্পর্কে কোনো অভিযোগ নেই, কিন্তু বাকি সকলেই এদের শত্রু হয়ে গেছে। এখন শুনছি পাকিস্তান কিছু লস্কর সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। সময়ই বলে দেবে এটা আন্তর্জাতিক চাপ কমানোর চেষ্টা না সত্যিকারের সন্ত্রাসদমন প্রচেষ্টা। যদি সত্যিকারের প্রচেষ্টা হয়ে থাকে, তাহলে কিছু সময়ের মধ্যেই আর্মি আর আই-এস-আই এর সাথে এদের শত্রুতা দেখা দেবে, যেমনটা হয়েছিল জৈশ-ই-মহম্মদের ক্ষেত্রে।

মুম্বাই গণহত্যা সম্পর্কে পাকিস্তানের জনগণের প্রতিক্রিয়া কি?

৯/১১ এর পরে যেমন আনন্দোৎসব দেখা গিয়েছিল, সে জায়গায় মুম্বই হামলার পরে পাকিস্তানি জনগণ প্রাথমিকভাবে ভারতের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। কিন্তু ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো যখনই পাকিস্তানকে দোষ দেওয়া শুরু করল, তখন প্রথমে ক্রোধ ও পরে অস্বীকারের রাস্তায় হাঁটতে থাকে সবাই। পাকিস্তানের মাটি থেকেই আক্রমণের ছক কষা হয়েছে – এ দাবী তারা মানতে নারাজ। জনপ্রিয় টিভি-নিউজ ব্যক্তিত্বরা সবাই টিভিতে এসে একের পর এক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব খাড়া করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বছর কয়েক আগে এই ব্যক্তিত্বরাই কান্দাহার বিমান ছিনতাই মামলায় র’-এর ছায়া দাঁড় করিয়ে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছিল, যার কোনোটাই ধোপে টেঁকেনি। পাকিস্তান যে কারগিলের ঘটনায় জড়িত, তা-ও এরা হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। সমঝোতা এক্সপ্রেসের বোমা হামলার উল্লেখ করে এখন তারা একে একে হিন্দু জঙ্গী গোষ্ঠী, আমেরিকা বা ইহুদীদের দোষারোপ করে।

পাকিস্তান অনেককাল ধরেই বলে আসছে যে ভারতের দিক থেকে হামলার আশঙ্কা করলে তারাই প্রথম নিউক্লিয়ার হামলা করবে। পাকিস্তানে সেরকম কোনো সম্ভাবনা দেখছেন আপনি?

মুম্বাই হামলার সপ্তাহখানেক আগে জারদারি আশ্বস্ত করেছেন যে পাকিস্তান কখনই প্রথমে নিউক্লিয়ার আক্রমণ করবে না। ভারতও বছর দশেক আগেই এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে জারদারির এই দাবী ভিত্তিহীন কারণ পাকিস্তান আর্মির পক্ষ থেকে এরকম কোনো বক্তব্য রাখা হয় নি। সবাই জানে, পাকিস্তানে আর্মির হাতেই নিউক্লিয়ার বোমা আছে। অনেকদিন ধরেই বিভিন্ন বিশেষজ্ঞরা পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সিমুলেশন করে সিদ্ধান্তে এসেছেন যে কোনোভাবে যুদ্ধ শুরু হলে নিউক্লিয়ার বোমাতে গিয়েই যুদ্ধ শেষ হবে।

সন্ত্রাসীরা আফগানিস্থান আর সেখানের পশ্চিমি সেনাদের ছেড়ে কেন ভারতকে লক্ষ্য হিসাবে বেছে নিল?

লস্করের মূল ঘাঁটি হল লাহোরের কাছে ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে অবস্থিত মুর্দিকে শহরে। এই শহরে এদের আছে একটা বড় ট্রেনিং ক্যাম্প আর সমাজসেবক সংস্থা। লস্করের অধিকাংশ সদস্যই পাঞ্জাবী, তাই এরা আফগানিস্থানে লড়াই করার পক্ষে অনুপযুক্ত, কারণ এরা সহজে পাশতুন বা আফগানদের সাথে মিশে যেতে পারে না। লস্কর হল ভারতমুখী ও কাশ্মীরমুখী একটি সন্ত্রাসী দল। কিন্তু, পাকিস্তানের অন্যান্য জঙ্গীগোষ্ঠীদের মতই এরাও ভারত, আমেরিকা আর ইসরায়েলের মধ্যে বোঝাপড়া আছে বলে মনে করে। তাই, এরা সবাই এই দেশগুলোর শত্রু।

মুম্বই-সন্ত্রাসীদের হামলার দাবী কি ছিল?

সব জিম্মিদের হত্যা করা হয়েছে আর কোনো দাবী সরকারীভাবে প্রকাশিত হয় নি। লস্কর বা সমধর্মী পাকিস্তানি জঙ্গীগোষ্ঠীদের উদ্দেশ্য খুবই পরিষ্কার। এই ক্ষেত্রে, ভারতের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কেন্দ্রস্থল হিসাবে মুম্বইকে আক্রমণ করা হয়েছে, হয়ত ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বাধিয়ে দেওয়াও উদ্দেশ্য ছিল। ভারত-সীমান্তে পাকিস্তানী সেনা সরালে তাদের দলের তালিবানদের সুবিধা হবে। ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিন্দু দক্ষিণপন্থীদের হাত শক্ত করাও এদের লক্ষ্যের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, কারণ এর ফলে এদের দলে আরো নতুন মুখ পাওয়া সোজা হবে। সবেশেষে, অমুসলিমদের বিরুদ্ধে ক্ষোভের উদ্গিরণও ঘটেছে এই আক্রমণে।

পশ্চিমা সাংবাদিকেরা বলছেন আল-কায়দা আর লস্কর-ই-তৈবা এখন যৌথ কার্যক্রম চালাচ্ছে, এ বিষয়ে আপনার মত কি?

এদের উদ্দেশ্য একই রকম হলেও সামান্য কিছু মতাদর্শগত তফাৎ থাকতেই পারে। সন্ত্রাসীদের দুনিয়ায় সামান্য মতাদর্শের পার্থক্যই দুই দলের মিলিত কার্যক্রমের জন্য যথেষ্ট প্রতিবন্ধকতা হয়ে দেখা দিতে পারে। এখনও অবধি এদের যৌথ কার্যক্রমের কোনো পরিচয় পাওয়া যায় নি, তাই এই ধারণাকে আমি এখনও সন্দেহাতীত বলে মনে করি না।

এই সন্ত্রাসে কাশ্মীরের ভূমিকা কতটা?

কাশ্মীরে ১৯৮৭ থেকেই বিপ্লব চলছে। ১৯৮৭ সালের ভোটে ব্যাপক আকারে কারচুপির ফলে এক গণবিক্ষোভ সৃষ্টি হয় যা ভারত সেনা পাঠিয়ে বলপূর্বক দমন করে। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এই সুযোগে এক গোপন যুদ্ধ শুরু করে ভারতের বিরুদ্ধে। ইউনাইটেড জিহাদ কাউন্সিল বলে এক ২২টি পাকিস্তানী সংগঠনের সমবায় সংস্থা সেনা ও আই-এস-আই-এর সহায়তায় তাদের কার্যকলাপ চালিয়ে যায়। এদের সহায়তায় জেনারেল মুশারফ ১৯৯৯ সালে কারগিলে যুদ্ধ শুরু করেন। এতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্ষতি হলেও পাকিস্তানও শেষমেষ সেনা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। জেনারেল মুশারফ যুদ্ধে বিজয়ীর মর্যাদা পান, আর ভীরু বলে চিহ্ণিত হন নওয়াজ শরিফ। এর পরের ঘটনা সবারই জানা।

পাকিস্তানি সমাজের কোন অংশ আল কায়দা আর ওসামা বিন লাদেনকে সমর্থন করে?

বালুচিস্তান আর সিন্ধে ওসামার প্রতি সমর্থন পাঞ্জাব আর উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের তুলনায় অনেক কম। মজার কথা হল পাকিস্তানের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী নিজেরা পশ্চিম-ঘেঁষা জীবনযাপণ করেন আবার ওসামার প্রতি সমর্থন বা পশ্চিম-বিদ্বেষও তাদের মধ্যেই বেশী। আমি খুবই অবাক হই যখন তালিবান আত্মঘাতী ঘাতকেরা দেশের মসজিদ, শোকসভা, হাসপাতাল, মেয়েদের স্কুল আক্রমণ করে বা নিরীহ পুলিশদের মেরে ফেলে অথচ তাদের বিরুদ্ধে কিছু শোনা যায় না। জনগণ এতটাই আমেরিকা-বিরোধী যে এই ঘটনাগুলোও তাদের মনে দাগ কাটে না। অনেক সময় পাকিস্তানী বামপন্থীরাও তালিবানদের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী শক্তি বলে ভুল ভেবে বসে।

এ বিষয়ে আপনার মতামত কি? এই তালিবানদের কি সত্যিই পাকিস্তান-সমাজে কিছু অবদান আছে?

পৃথিবীর সর্বত্র মানুষ যা চায় পাকিস্তানীদেরও তাই দাবী। খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান, চাকরি-বাকরি, উন্নত বিচারব্যবস্থা ও উন্নয়নমুখী সরকার আর সুরক্ষা। এর সাথে আছে শিক্ষা ও চিন্তা ও ধর্মাচরণের স্বাধীনতা যা ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইটস ডিক্লারেশনে আছে। এর পরে আসে দেশের সার্বভৌমত্ব, বিদেশনীতি ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যু। এ কারণে, পাকিস্তানে এই তালিবান-গোত্রীয়রা কোনো অবদান রেখেছে বলে মনে হয় না। তারা পরিবার-পরিকল্পনা-বিরোধী, সংখ্যালঘু-বিরোধী, নারীশিক্ষার বিরোধী। বহির্বিশ্ব সম্পর্কে এদের কোনো জ্ঞান নেই, জানার কোনো ইচ্ছাও নেই। তারা শুধু যুদ্ধের মাধ্যমেই সমাধান খোঁজে। পাকিস্তানে এবারের ভোটে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে জনগণ এদের পছন্দ করে না।

২০০২ এর জানুয়ারীতে পারভেজ মুশারফ ঘোষণা করেছিলেন যে পাকিস্তানের জমি ব্যবহার করে কেউ সীমানা পেরিয়ে আক্রমণ চালাতে পারবে না। সেই প্রতিশ্রুতি কি রাখা হয়েছিল?

এই ঘোষণার পরে সত্যিই সীমানা পেরিয়ে আক্রমণ অনেকটা কমে গিয়েছিল, কিন্তু কোনোভাবেই নির্মূল হয়ে যায় নি। অক্টোবরের ভূমিকম্পের পরে আমি নিজে ত্রাণের কাজে আজাদ কাশ্মীরের বিভিন্ন অংশে ঘুরে এসেছি। দেখেছি – লস্কর-ই-তৈবা, জৈশ-ই-মুহম্মদ বা সিপাহী-ই-সাহেবা আর অন্যান্য নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন ত্রাণ বিলি করছে। এদের ত্রাণ বিতরণের পরিকল্পনা পাকিস্তান সরকার বা আর্মির চেয়ে অনেকগুণ উন্নত – এমনকি আহত সেনাদেরও এরা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করেছে। অথচ, পারভেজ মুশারফকে কয়েক মাস পরে এ কথা বলাতে দেখলাম উনি রেগে যাচ্ছেন, যেন এই দলগুলো নিয়ে আলোচনাও নিষিদ্ধ।

পাকিস্তানে কিছু গোষ্ঠী আছে যারা আমেরিকা-বিরোধী ও কড়া ধর্মীয় আইন প্রবর্তন করার পক্ষে, আর উল্টোদিকে দেশের সরকার আমেরিকার বন্ধুদেশ বলে নিজেদের দাবী জানায়। এই মেরুকরণের কারণ কি? পাকিস্তানে উগ্রবাদের উত্থানে এই মেরুকরণের ভূমিকা কতটা?

পাকিস্তানে মৌলবাদী শক্তির উত্থানের মূলে আছেন আমেরিকা ও রোনাল্ড রেগানের সমর্থিত পাকিস্তানী জেনারেল জিয়া উল হক। আজ থেকে বছর পঁচিশেক আগে, এই দুই নেতা হাত মিলিয়ে আফগানিস্তানে সোভিয়েতদের তাড়ানোর জন্য দেশে উগ্রবাদী শক্তির বীজ বপন করেন। সেই সময়ে মৌলবাদের প্রসারে আমেরিকা খুশীই হত, কারণ সেই প্রসার তাদের লক্ষ্যপূরণের মাধ্যম হিসাবে কাজ করত। সেই একই সময়ে, জেনারেল জিয়ার আমলে সারা দেশে একটা সামাজিক পরিবর্তন দেখা দেয়। সব সরকারি অফিসে নামাজ পড়া বাধ্যতামূলক করা হল, জনসমক্ষে অপরাধীদের বেত্রাঘাত করা শুরু হল, রমজানে উপোস না করলে শাস্তির ব্যবস্থা করা হল, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের সময় ইসলাম সম্পর্কিত জ্ঞানেরও পরীক্ষা নেওয়া শুরু হল এবং সব মুসলিমদের জন্য জিহাদ বাধ্যতামূলক করা হল। কিন্তু আজকে সেই উগ্রবাদীদের সাথেই সরকারের লড়াইতে যেতে হয়েছে, আবার সেই আমেরিকারই নির্দেশে। দেশের আর্মি ও সরকার আমেরিকার সাথে থাকলেও তাই জনগণ স্বাভাবিকভাবেই আমেরিকা বিরোধী।

প্রেসিডেন্ট জারদারি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে উনি উগ্রবাদীদের খুঁজে তাদের ট্রেনিং ক্যাম্প ধ্বংস করবেন। কিন্তু কাজে সেরকম কোনো লক্ষণ দেখছি না। উনি কি এর চেয়ে বেশী কিছু করতে চান না? নাকি এর থেকে বেশী কিছু করার ক্ষমতাই ওনার নেই?

আসল ক্ষমতা পাকিস্তানের আর্মির হাতে। এই উগ্রবাদীদের সাথে লড়াইতে দু’হাজার সেনা মারা পড়েছে। তাও আর্মি ভেতর থেকে নিশ্চিত নয় যে এই উগ্রবাদীরা পাকিস্তান দেশটাকে বাঁচিয়ে রাখার পরিপন্থী। আমি এদের এই দ্বিধার কারণ বুঝি। বছরের পর বছর ধরে আর্মিতে এই বুঝিয়ে লোক নেওয়া হয়েছে যে তারা ভারতের সাথে যুদ্ধ করবে ও ইসলামকে রক্ষা করবে। কার্যত, এখন তারা লড়াই করছে এমন এক দলের সাথে যারা ইসলামের আরো বড় রক্ষক। শুধু তাই নয়, আর্মিকে এখন ভারতের সাথে যুদ্ধও করতে হচ্ছে না। এই ধোঁয়াশা থেকেই তাদের ডিমরালাইজেশন আর তার সাথে যোগ হয়েছে গণসমর্থনের অভাব। উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে পাকিস্তানী সেনাদের অনেকেই তাই যুদ্ধের আগেই আত্মসমর্পণ করে দিচ্ছে।

সরকারের উগ্রবাদ-বিরোধী যুদ্ধ কি আপনি সমর্থন করেন?

জীবনে এই প্রথমবারের মত আমি মনে করি আর্মিকে সমর্থন করা দরকার, যতক্ষণ তারা নিরীহ লোকদের ছেড়ে শুধু উগ্রবাদীদের খুঁজে মারতে পারবে। দুঃখের বিষয়, নিজেদের কাজ কমানোর জন্য আর্মি এখন কোনো গ্রামে কিছু উগ্রবাদী আছে বলে সন্দেহ করলেই গোটা গ্রামশুদ্ধু উড়িয়ে দিচ্ছে। এরকম নিরীহ মানুষ হত্যা করা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।

পাকিস্তান একসময় তালিবানদের অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছে। আল-কায়দার সদস্যদের ধরে দেবার জন্য সদস্যপিছু পাকিস্তানকে সি-আই-এ টাকা দেয়। সেই টাকা নাকি পাকিস্তান উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে তালিবানদের সাহায্য করার জন্য ব্যবহার করে?

আর্মি তালিবানদের হাতে পর্যুদস্ত হলেও তারা এখনও “ভাল” আর “খারাপ” তালিবানদের মধ্যে তফাৎ করে। “ভাল” তালিবানেরা শুধু আমেরিকা, ন্যাটো ও ভারতীয়দের লক্ষ্য করে আক্রমণ চালায়, আর “খারাপ” তালিবানেরা পাকিস্তানের আর্মির বিরুদ্ধেও আক্রমণ চালিয়ে যায়। যখন আমেরিকানরা আফগানিস্তান থেকে চলে যাবে, এই “ভাল” তালিবানেরা তখন আফগানিস্তানের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কে সাহায্য করবে। জালালুদ্দিন হাক্কানি এরকমই এক “ভাল” তালিবান নেতা। আবার মৌলানা ফজলুল্লাহের মত নেতা হলেন “খারাপ” তালিবান কারণ এরা পাকিস্তান আর্মিকেও ছেড়ে কথা বলেন না। আর্মি সাধারণত এদের “ভারতের চর” আখ্যা দিয়ে প্রচার চালায়।

পাকিস্তান নিউক্লিয়ার স্টেট। এই নিউক্লিয়ার বোমা তালিবান বা আল কায়দার হাতে চলে যাবার সম্ভাবনা কতটা?

আমি বেশী চিন্তিত এই ভেবে যদি কোনোভাবে কিছু নিউক্লিয়ার বোমা তৈরীর অন্তর্বর্তী পদার্থ (সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম) তাদের হাতে চলে যায়। মজার কথা পশ্চিমের দেশগুলো আজকাল নিউক্লিয়ার অস্ত্র তৈরীতে ততটা মনযোগী নয়। নিউক্লিয়ার বোমা আজ আর ক্ষমতার মেরুকরণ করে না, কারণ সুস্থচিন্তার কোনো রাষ্ট্র কখনই এই বোমা ব্যবহার করতে পারবে না। এর ফলে আজকে নিউক্লিয়ার বোমা পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকেই সম্পূর্ণ দূর করা সম্ভব। জঙ্গীদের হাত থেকে বোমা বাঁচানোর এই একটা পথই খোলা আছে।

আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষার্থে ভারত কি করতে পারে?

ভারতের কোনোমতেই পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধে যাওয়া উচিত নয়। এমনকি যদি ভারত জেতেও, তাহলেও তাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বিশাল হবে। কোনো ছোটো হামলাও আঞ্চলিক স্বার্থবিরোধী হবে, কারণ এর ফলে জঙ্গীদের সাথে আর্মির আঁতাত আবারও মজবুত হবে। আর কোনো ছোটো হামলার প্রতিক্রিয়া অনেক বড় হয়ে দেখা দিতে পারে। পাকিস্তানে জঙ্গীঘাঁটি বন্ধ করে দেবার দাবী আমি সমর্থন জানাই, কিন্তু সেই কাজটা পাকিস্তানের নিজেরই করা উচিত। আঞ্চলিক ভারসাম্যের জন্য, পাকিস্তান ও ভারত, উভয় দেশেরই উচিত নিজের নিজের দেশ থেকে দক্ষিণপন্থী ও মৌলবাদী শক্তিকে কড়া হাতে উচ্ছেদ করা।

এই লড়াই-এর অন্তিম ফলাফল সম্পর্কে আপনার ভবিষ্যৎবাণী কি? পাকিস্তানে উগ্রবাদীরাই জিতবেন, না পশ্চিমারাই আর্মির সাহায্যে তাদের পরাজিত করতে সক্ষম হবেন?

সমস্যা খুবই গুরুতর কিন্তু সমাধান অসম্ভব কিছু নয়। গত এক দশকে আমেরিকার সাম্রাজবাদী নীতি ও ইরাক আক্রমণের ফলে জনমানসে আমেরিকা বিরোধী এক মনোভাব তৈরী হয়েছে যার ফলে যারাই আমেরিকার বিরোধিতা করছে তাদেরই তারা সমর্থন করতে পিছপা হচ্ছে না। পাকিস্তানীরা তালিবানদের সামাজিক ও আচার-আচরণগত নীতি সমর্থন করে না। অথচ তারা আমেরিকা-বিরোধী বলে গণসমর্থন পায়। আমি আশা রাখছি বারাক ওবামা ক্ষমতায় এলে আমেরিকা পাকিস্তানের যে ক্ষতি করেছে তার কিছু ক্ষতিপূরণ করবে। কিন্তু মূল কথা হল, পাকিস্তানীদের নিজেদেরই এই সমস্যা সমাধান করতে হবে, বুঝতে হবে কোনো সভ্য দেশ হিসাবে দাঁড়াতে গেলে এসব চলে না। পাকিস্তানকে পশ্চিমা সমর্থন কিছুটা গোপন রাখতে হবে হয়ত। একই ভাবে, পাকিস্তানকে আলাদা করে শাস্তি দিলে বা কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে তালিবান বা সমগোত্রীয়রা রাষ্ট্রের আরো বেশী ক্ষমতা দখল করে ফেলবে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এর চেয়ে বড় কোনো দুশ্চিন্তার কারণ নেই।

নতুন দেশে এসে

মার্চ 17, 2008

গত সপ্তাহেই আমেরিকায় এসে পৌঁছে গেছি। ব্যাপারটা হল ইন্টারনাল ট্রান্সফার নিয়ে পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্ত – আপাতত এটাই। আমাদের কোম্পানীর নিয়মমত দুবছর কোম্পানীতে থাকলে সেখান থেকে যেকোনো প্রান্তে কাজ করতে যেতে পারে। আর তার জন্য দায়িত্ব সবই কোম্পানীর। তা এরকমই ঝোঁকের বশে চলেই এলাম। আপাতত একাই এসেছি, বৌ পড়ে আছে হায়দ্রাবাদে। তবে কোম্পানী আমার স্থানান্তরনের জন্য অনেক সুবিধা দিচ্ছে। প্রথমত আমার ভিসার, বিমানে আসার ও আমার মালপত্র আনার খরচা (এমনকি আসবাবপত্র) দিচ্ছে। তারপরে, প্রথম দুমাস থাকার জায়গা, এক মাস গাড়িগাড়ি চালানো আমাকে আর আমার বৌকে শেখানোও কোম্পানীর দায়িত্ব। আর আমাকে সবসময় সাহায্য করার জন্য লোকও আছে কোম্পানীতে। আর বন্ধুবান্ধবের সংখ্যাও নেহাত কম কিছু নয়।তাও চলে এসে কেমন একটা একা একা লাগছে। একটা বড় দুই বেডরুমের ঘর পেয়েছি, যাতে একা থাকাটা দুঃসহ মনে হয়। আশেপাশে লোকজনও বিশেষ একটা নেই। ঠান্ডা প্রচন্ড … একটা বড় জোব্বামত জ্যাকেট পড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। পায়ে জুতো পরার অভ্যাস আমার কোনোকালেই ছিল না, কিন্তু জুতো না পরলেই জমে যাবো। তাই উপায় নেই। এর ওপর আমি গাড়ি চালাতেও জানি না। এখানে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট আছে ভালই কিন্তু আমাদের অফিসের দিকে কিছু নেই। এখনো মোবাইল আর বাস-পাস পেয়ে উঠিনি। SSN টা না পেলে ক্রেডিট কার্ডও আসবে না – তাই একটা কিছুও কিনতে পারছি না। বাড়িতে ফিরে কাজ কিছু থাকে না, বসে বসে ডিসকভারি চ্যানেল দেখতে হয়।

এরই মধ্যে একটু আধটু করে আমেরিকা চিনছি। পাশাপাশি দুটো দোকান – মানে রিটেল শপ আরকি। দুটোতে দুরকম দাম। আমি প্রথমে আধঘন্টা সার্ভে চালিয়ে তারপরে কিছু কাঁচা সব্জী কিনেই ফেললাম। একটা ইন্ডিয়ান দোকানে গিয়েছিলাম – তা আমার চেনা জিনিসপত্রই কি দামী লাগছে। গড়ে সব জিনিসের দামই অনেকগুণ। আর আমার ওই দামটাকে চল্লিশ দিয়ে গুণ করার বদভ্যাস না যাওয়া অবধি আমাকে মনে হয় মনকে অর্ধভুক্ত করেই রাখতে হবে। একটা জিনিস সস্তা এখানে – সেটা হল দুধ। সুতরাং দুবেলা অনেকটা করে দুধ খাচ্ছি। অনেকটা ভিখারীদের মত মানসিক অবস্থা – দাম কম পরিমাণে বেশী যে কোনো কিছুই কিনে ফেলছি। এই যেমন কালও জল কিনতে গিয়ে শেষে কোল্ড-ড্রিঙ্কস কিনেই ফিরলাম। অফিসে খাবারের দাম বেশ বেশী – তাই বাড়িতে বেশী বেশী করে খেয়ে আসছি। আর অফিসে এসে হ্যামবার্গার খাচ্ছি। এই তো চলছে।মজার ব্যাপার হল এখানে মাসে দুবার মাইনে হয়। এটার জন্য আশা করছি আমি পরের সপ্তাহ থেকে কিছুটা স্বস্তিতে থাকব। কিছু না হোক, পকেটে টাকাকড়ি তো থাকবে। এখন তো দেশ থেকে আনা ডলারে চালাতে হচ্ছে।

ওদিকে ডলারের দাম বাড়ছে, আমি আসার সময় ৩৯ টাকার কম ছিল, এখন আবার ৪০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এটা বেশ স্বস্তির খবর। এরপরে শুরু হবে বাড়ি খোঁজা, তারপরে গাড়ি কেনা। সব কিছুই কেমন একটা সুতোয় গেঁথে করে ফেলতে হচ্ছে, কোনোটা বাদ ফেলার কোনো সম্ভাবনাই নেই। অগত্যা … চলছে।

আবার কবে দেশে ফিরব সেটাও ঠিক নেই কিছু – কিন্তু ফিরতে তো হবেই। তাই সে দিকেও একটু আধটু নজর রাখতে হচ্ছে। এখন ছটা বাইশ বেজে গেছে, এতক্ষণে এখানে লোকজনে ফাঁকা হয়ে যায় – লোকে এখানে সকাল ৮টায় এসে ৫টায় বেরিয়ে যায়। এরই মাঝে ৯ই মার্চ এখানে ডে-লাইট সেভিং চালু হওয়ায় ১ ঘন্টা সময় এগিয়ে দিতে হল। তার পর থেকে আমার শারীরবৃত্তীয় ঘড়ি আমাকে ৯টার আগে অফিসে ঢুকতে দেয় না। আবহাওয়া ভাল যেদিন রোদ ওঠে। তবে অর্ধেক দিনেই বৃষ্টিই হয়ে চলে। রোদ উঠলে এখানে থেকে দূরের পাহাড় দেখা যায় – ভিউটা খুব সুন্দর (ক্যামেরা না থাকায় ছবি দিতে পারলাম না)। রাস্তাঘাট ঝকঝকে তকতকে – যেমনটা হওয়া উচিত আরকি। কিন্তু ট্রাফিকের ভয়ে নির্দিষ্ট জায়গা দিয়ে রাস্তা পার হতে গিয়ে আমাকে অন্তত আধ মাইল ঘুরে আসতে হয়। মাইলের কথায় বলা ভাল – এখানে সবই মাইল, গ্যালন আর ফারেনহাইট। মনে মনে কনভার্সন না করে শান্তি হয় না, মাইলটা নাহয় দু কিলোমিটার ধরে নিই, কিন্তু ফারেনহাইট স্কেলটা খুবই গোলমেলে। আর গ্যালনের জ্বালা তো এখনো সহ্য করতে হচ্ছে না। আমার একটা বন্ধু নতুন হন্ডা সিভিক কিনেছে – সেদিন বলে ২৫ দিচ্ছে মাইলেজ। তা ভাল, আমি মনে মনে হিসাব করতে বসলাম ২৫ মাইল প্রতি গ্যালন হলে সেটা কত কিলোমিটার প্রতি লিটার হবে। এক গ্যালন আবার ৩.৭৮ লিটার। বুঝে দেখুন হিসাবটা কত গোলমেলে।

এর মাঝে একদিন মেল পেলাম বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে কিছু অনুষ্ঠান হবে – যাব বলে মেলও করলাম – এখনো কোনো উত্তর নেই। দেখা যাক, যেতে পারলে আমি এটার একটা আপডেট দেব। তা এভাবেই চালিয়ে যাচ্ছি। দেখা যাক এখানে আরো কতদিন চালিয়ে দেওয়া যায়। আর না পারলে তো দেশে ফেরার পথ খোলাই আছে। লড়াই হল বেঁচে থাকার আরেক নাম …