ডিজিটাল ডিভাইড আর শিক্ষানীতি

লেখাটার কথা ভেবেছিলাম অনেক আগেই – যখন সচলে ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে লেখা হচ্ছিল। আমার ধারণা সমস্যা অনেক গোড়ায়, তাই গোড়া থেকেই সমাধান শুরু হওয়া উচিত।

অনেক বছর আগের কথা। আমি তখন সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। স্কুলে নতুন কম্পিউটার এসেছে, ঘরের দরজাও খোলা। দেখি ভেতরে বেশ কয়েকজনে বসে কম্পিউটারে কিছু কাজ করার চেষ্টা করছে। টাইপরাইটার আগে দেখেছি, কম্পিউটারে টাইপ করতে অন্তত পারব, এটুকু বিশ্বাস নিয়ে বসে পড়লাম। আমার এক বন্ধু কিছুটা কম্পিউটার লিটারেট হয়েছে, সে ক’দিন হল ওই ঘরে আসা-যাওয়া করছে। সে আমাকে দেখাল কিভাবে বেসিক প্রোগ্রাম লিখতে হয়। সে আবার কোনো এক স্যারের কাজ করা দেখে দেখে শিখেছে। হেল্প ফাইল দেখে দেখে দুজনে মিলে বেসিক ব্যবহার করে ছবি আঁকা শিখলাম। নিজে শেখার মজাই আলাদা। শেষে যখন বুঝলাম মোটামুটি যেকোনো জ্যামিতিক ছবি আঁকতে পারছি তখনই ঘটল বিপর্যয়। স্কুলের শিক্ষকেরা সিদ্ধান্ত নিলেন যে ওই ঘরটা তালাবন্ধ থাকবে, কারণ কম্পিউটার “দামী জিনিস”, বাচ্চারা তা নিয়ে “খেলাধূলা করলে” তা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে কম্পিউটার শিখেছি, কিন্তু শিক্ষকদের ওই মানসিকতার কোনো পরিবর্তন দেখিনি। তারা মনে করেন, ছাত্রদের কম্পিউটার আর ইন্টারনেট নিয়ে ছেড়ে দিলে তারা কোনো কাজের কাজ করে না। আমি এখনও মনে করি, এটাই আমার ছাত্রাবস্থায় শিক্ষার অপূর্ণতার সবথেকে বড় কারণ। রিসোর্স থাকতেও আমি সব রিসোর্সে ঠিকমত অধিকার পেতাম না।

****

আমাদের দেশে এখন এক অদ্ভূত অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। দেশের সফটওয়ার শিল্পের কল্যাণে একশ্রেণীর লোক সৃষ্টি হয়েছে যারা কম্পিউটার তথা ইন্টারনেটে যথেষ্ট সময় কাটায়। তারা এর উপযোগিতাও বোঝে। তাই তারা তাদের আশেপাশে সবাইকে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে উৎসাহও দেয়। আরেকটা বিরাট দল আছে যারা এখনও কম্পিউটার বা ইন্টারনেট দেখেনি, তাই তারা এর গুরুত্বও বোঝে না। দিনে দিনে যত ইন্টারনেটের আকার, দক্ষতা ও উপযোগিতা বাড়বে, তত প্রথম শ্রেণীর লোকজনে সহজে তথ্য ও জ্ঞান আহরণ করতে পারবে। অপরদিকে, দ্বিতীয় দলে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়বে। যেহেতু আমাদের সমাজ আস্তে আস্তে শিল্পভিত্তিক থেকে পরিবর্তিত হয়ে জ্ঞানভিত্তিক হয়ে যাবে তাই তখন আমাদের সমাজের একটা বড় অংশ চির-অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে, যেমনটা ঘটেছিল শিল্পবিপ্লবের ইউরোপে কৃষকদের ক্ষেত্রে। কিন্তু এই অবশ্যম্ভাবী পরিণতি থেকে মুক্তি কোথায়?

****

এই ডিজিটাল ডিভাইড নিয়ে ভেবেছিলেন সুগত মিত্রও। ১৯৯৯ সালে দিল্লীতে তিনি একটি সফটওয়্যার বহুজাতিকের অফিসের শিক্ষানীতি নিয়ে গবেষণা করার সময় দেখেন তার বহুতল অফিসের বাইরে এক বিশাল বস্তি এলাকার শিশুরা প্রায় কোনো শিক্ষার সুযোগই পায় না। আর স্কুলের জন্য কম্পিউটার বরাদ্দ করলে সেই কম্পিউটার তালাবন্ধ ঘরেই পড়ে থাকবে। সরকারকে দিলে পুলিশ স্টেশনের মত করে কম্পিউটার নিয়ন্ত্রণ করা হবে। তাই ব্যতিক্রমী কিছু ভাবতে হত। তিনি নিজে স্বপরিকল্পিত শিক্ষানীতির প্রবক্তা ছিলেন। এই নীতি বাস্তবে রূপায়িত করার জন্য উনি একটা নতুন প্রোজেক্ট উদ্ভাবন করলেন – যার নাম দিলেন হোল ইন দ্য ওয়াল (Hole in the wall) প্রোজেক্ট। তিনি অফিসের দেওয়ালে একটা গর্ত করে তাতে একটা কম্পিউটার কিয়স্ক (kiosk) রেখে দিলেন। সাথে রাখলেন ওয়েবক্যাম – বাচ্চাদের আচার-আচরণ লক্ষ্য করার জন্য। বড়রা যাতে এতে অধিকার স্থাপন না করতে পারে সেজন্য এগুলো বাচ্চাদের মত উচ্চতায় রাখা হল। মাউসটা একটা খোপের মধ্যে এমনভাবে রাখা হল যাতে বাচ্চাদের হাতই সেখানে ঢুকতে পারে। স্বভাবতই সেটা নিয়ে বস্তিবাসী বাচ্চারা খেলতে শুরু করল। খেলতে খেলতে তারা খুব দ্রুত কম্পিউটার ব্যবহার করতে শিখে গেল। উনি এরপরে কম্পিউটারের সাথে জুড়ে দিলেন হাই-স্পিড ইন্টারনেট। বস্তিবাসী ছেলেরা দ্রুত শিখতে শুরু করল, তাদের ক্লাসের পড়াতেও দ্রুত উন্নতি শুরু হল – বিশেষত ইংরেজী, অঙ্ক আর বিজ্ঞানে। এরপরেও এই পরীক্ষা অনেকবার ভারতের (পরে কম্বোডিয়াতেও) অনেক গ্রামে ও বস্তিতে চালানো হয়েছে। সব ক্ষেত্রেই দেখা গেছে বাচ্চারা কয়েক ঘন্টায় কম্পিউটার চালানো শিখে ফেলছে। তার পরে ইন্টারনেট – আরও পরে গুগল। তার পরে জ্ঞানের ভান্ডার হাতের সামনে পেয়ে যাচ্ছে। অনেকে প্রচুর গেমও খেলছে, গুগলের পাশাপাশি ডিসনি ডট কম তাদের প্রিয় সাইট। তার বক্তব্যে –

“হঠাৎ করে দেখা গেল তারা তাদের শিক্ষকদের থেকে বেশী জেনে ফেলেছে। শিক্ষকদের ক্লাসে এমন কিছু প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে যার উত্তর তারা নিজেরা জানেন না। কয়েকমাস আগে আমি নিজেকে একরকম চ্যালেঞ্জ করে তামিলনাডুর একটা গ্রামে কম্পিউটার কিয়স্কে ডি-এন-এ সম্পর্কিত অনেক ডকুমেন্ট রেখে দিলাম। আমার ধারণা ছিল ৬-১২ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে উচ্চতর শিক্ষার ডকুমেন্ট অপ্রয়োজনীয় মনে হবে ও তারা এর কিছুই বুঝবে না। কিন্তু তিন মাস পরে, তাদের ওই ডকুমেন্ট-সংক্রান্ত বিষয়ে পরীক্ষা নিয়ে দেখলাম অন্তত ৩০% বিষয়ে তারা জ্ঞান অর্জন করেছে। আর তাও সব ইংরেজীতে পড়েই। “

 

মজার কথা, দিল্লীর বস্তির বাচ্চারা কিন্তু কম্পিউটারের টার্মগুলোই তখনও শেখে নি, তারা বরং নিজেদের মত কিছু কিছু নাম দিয়ে এগুলোকে চিহ্নিত করেছে। মাউসের নাম দিয়েছে “সুই” (সূচ) আর আওয়ারগ্লাসের নাম দিয়েছে ডম্বরু (ডুগডুগি)। তাদের বক্তব্য হল –

“যখন কম্পিউটার কোনো কাজে ব্যস্ত হয় তখন “সুই” থাকে না, তা “ডম্বরু” হয়ে যায়।”

 

পরীক্ষার কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ ও চমকপ্রদ পর্যবেক্ষণ ছিল। প্রথমত, ইংরেজী বা অন্য বিজাতীয় ভাষা কোনোভাবেই শিক্ষার প্রতিবন্ধকতা হয় না – যদি বাচ্চাদের মধ্যে যথেষ্ট আগ্রহ তৈরী করা যায়। প্রথমদিকে উনি হিন্দিতে কিছু লেখা ও লিঙ্ক বানিয়ে ডেস্কটপে রেখে দিতেন, যাতে থাকত কিছু হিন্দি ওয়েবসাইটের লিঙ্ক। দেখা গেল বাচ্চারা সেসব পাত্তাই দেয়নি, তারা সরাসরি ইংরেজীতেই ইন্টারনেট সার্ফ করে গেছে। সব ইংরেজী শব্দের মানেও তারা বোঝে নি, কিন্তু ধীরে ধীরে কার্যকরী শিক্ষা পেয়ে গেছে তা থেকে। যেসব অঞ্চলের বাচ্চারা কিছুটা স্কুলশিক্ষা পেয়েছে, তারা ডিকশানারিও বের করে ফেলেছে ইন্টারনেট থেকে।

দ্বিতীয়ত, এদের শিক্ষাগ্রহণের পদ্ধতিটাও অন্যরকম। প্রথম কয়েক ঘন্টার মধ্যেই কার্যত কিছু লিডার তৈরী হয়ে যায় ভিড়ের মধ্যে থেকে। কেউ কেউ তাড়াতাড়ি শিখতে পারে, তারা কাজ করে যায়। কেউ কেউ ব্যাপারটা ভাল বোঝাতে পারে, তারা ভিড়ের উৎসুক জনতাকে বুঝিয়ে চলে। কেউ বা আবার দেখাশোনা করে যাতে সবাই কিছুক্ষনের জন্য বস্তুটা ছুঁতে-ধরতে পারে। দল-বেঁধে শিক্ষাগ্রহণের এই পদ্ধতি স্কুলেও আছে – কিন্তু স্কুলে তা বাইরে থেকে শেখানো হয়। এখানে একই পদ্ধতি নিজে থেকেই বাচ্চারা তৈরী করে নেয়।

এই পরীক্ষাগুলোর ভিত্তিতে উনি প্রস্তাব করেন যে একবিংশ শতকে উন্নয়নশীল বিশ্বে যেহেতু গ্রামাঞ্চলে ও বস্তি এলাকায় উপযুক্ত শিক্ষকের ও বইপত্রের অভাব বড় হয়ে দেখা যেতে পারে, তাই কম্পিউটারের মাধ্যমে কার্যকর শিক্ষা দিয়ে সম্পূর্ণ স্কুল-সিস্টেমের বাইরেও শিক্ষিত জনসাধারণ গড়ে তোলা যায়। অনেকেই মনে করেন শিক্ষকের ও স্কুলের অভাব কম্পিউটার দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। সুগত মিত্রের দাবী –

“যদি কোনো শিক্ষককে কম্পিউটার দিয়ে প্রতিস্থাপিত করাই যায় – তাহলে করাই শ্রেয়। ন্যূনতম শিক্ষার অধিকার পেতে যেখানে বছরের পর বছর লেগে যায়, সেখানে কোনো লাল-ফিতে ছাড়াই কম খরচে যদি তার ৩০% শিক্ষাও সাধারণ জনগণের মধ্যে আনা যায়, তাহলে তা-ই কেন নয়? শুধু তাই নয়, ছাত্ররা ঝটপট শিখতে শুরু করলে দ্রুত শিক্ষকেরাও শিখতে বাধ্য হবেন – শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে”।

 

বর্তমানে দিল্লীতে চল্লিশ জায়গায় এরকম “হোল” বসানো হয়েছে। হায়দ্রাবাদে বসানো হয়েছে গোটা দশেক। পরের পদক্ষেপ – প্রত্যন্ত গ্রামে একে নিয়ে যাওয়া ওয়্যারলেস প্রযুক্তি ব্যবহার করে।

আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয় এই ডিজিটাল ডিভাইড দূর করার পথে এই মুক্ত ও দলবদ্ধ স্বপরিচালিত শিক্ষাই প্রথম অস্ত্র হতে পারে উন্নয়নশীল যেকোনো দেশে। আর এই ডিভাইড দূর না করতে পারলে ই-কমার্স বা ইন্টারনেট-ভিত্তিক সেলফ-লার্নিংও দেশে আনা সম্ভব নয়। যে কোনো মূল্যে এখন কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে কার্যকরী শিক্ষা প্রণয়ন না করতে পারলে ভবিষ্যতে তার জন্য বড় ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে।

একটা ট্রিভিয়া – সম্প্রতি স্লামডগ মিলিয়নিয়ারের লেখক বিকাশ স্বরূপ বলেছেন তার লেখার অনুপ্রেরণা ছিল সুগত মিত্রের এই হোল ইন দ্য ওয়াল প্রোজেক্ট। প্রত্যুত্তরে সুগত মিত্রের দাবী – উনি নিজে লিখলে বইটার নাম দিতেন স্লামডগ নোবেল লরিয়েট – কারণ তার প্রোজেক্টের মূল লক্ষ্য ছিল বাচ্চাদের শিক্ষা দেওয়া – বড়লোক বানানো নয়।

সূত্র – টেড টক

সংক্ষেপে আরেকটা ভিডিও হোল ইন দ্য ওয়াল ও স্লামডগ মিলিয়নেয়ার নিয়ে নিয়ে।

সাক্ষাতকার – প্রথম ও দ্বিতীয় লিঙ্ক। স্লামডগ মিলিয়নেয়ার নিয়ে এখানে

Advertisements

ট্যাগ সমুহঃ , , ,

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s


%d bloggers like this: