অ্যাডাম স্মিথের দৃষ্টিতে উপনিবেশ-অর্থনীতি

ঔপনিবেশিকতা নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে দেখলাম বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথের বই দ্য ওয়েলথ অব নেশনশে (১৭৭৬) ঔপনিবেশিকতা ও তার অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা আছে। অ্যাডাম স্মিথের লেখা বইটিকে আধুনিক অর্থনীতির জনক বলা যায়। বইতে কলো্নী সংক্রান্ত অর্থনীতি নিয়ে আলোচনার সময় মাথায় রাখা দরকার যে অ্যাডাম স্মিথ ঔপনিবেশিকতার তীব্র বিরোধী ছিলেন। কিন্তু তার বিরোধিতা মানবিকতা বা অধিকারের প্রশ্নে নয়, নিতান্তই অর্থনীতির প্রশ্নে। যদিও তার বইতে তিনি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীকে বরাবর দায়ী করেছেন বাংলার দুরাবস্থার জন্য, কিন্তু তার অর্থনীতির ফোকাস থেকে সরে যান নি। তিনি বইতে দেখানোর চেষ্টা করেছেন ঔপনিবেশিকের জন্যও কলোনী-ব্যবস্থা লাভজনক নয় ও দীর্ঘমেয়াদে যে দেশগুলো ঔপনিবেশিক হবে না, তারা অন্যেদের থেকে অর্থনৈতিকভাবে অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে।

উপনিবেশের সাথে ইউরোপের ব্যবসা দু’ভাবে দেখছেন স্মিথ। প্রথমটা শুধুমাত্র ব্যবসার সম্পর্ক – যাতে ইউরোপীয়রা লাভ করছে। বর্তমান উপনিবেশেরা কেউই খুব একটা শিল্পোন্নত নয়, তাই সেই দেশগুলো থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করা ও শিল্পজাত পণ্য বিক্রি করার কাজটা ইউরোপীয়রা ভাল-ভাবেই করছে। এই ব্যবসায় লাভ এতটাই হচ্ছে যে তার ফলে মুদ্রার অপর পিঠ দেখা হচ্ছে না। মুদ্রার অপর পিঠ ক্ষতিকর – সেটা হল একচেটিয়া বাণিজ্য। একচেটিয়া বাণিজ্য ঔপনিবেশিকের জন্য ক্ষতিকর। কারণ কি?

স্মিথের মতে ঔপনিবেশিকেরা একে অপরের সাথে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এই একচেটিয়া বাণিজ্যের সুবিধাটুকু হারিয়ে ফেলে। ইংল্যন্ডের পক্ষে তুলো আনা সহজ বলে ইংল্যান্ড টেক্সটাইলের ক্ষেত্রে বেশী দাম চাইতে যেমন পারে, তেমন ইন্দোনেশিয়ার মালিক ডাচেরা মশলার জন্য বেশী দাম চাইছে। উভয়ের কারও সকল সম্পত্তির ওপর যেহেতু অধিকার নেই, তাই স্থানীয় ভোগের ক্ষেত্রে ছাড়া ইউরোপে রপ্তানীর ক্ষেত্রে লাভ-লোকসান মোটের ওপর শূন্যে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। এ তো গেল প্রথম সমস্যা। এর পরের সমস্যা হল শিফট অব ক্যাপিটাল বা মূলধনের সরণ। স্মিথের মতে মূলধনের স্বভাবই হল কম লাভজনক ব্যবসা থেকে সরে বেশী লাভজনক ব্যবসায় চলে যাওয়া। ঔপনিবেশিকের ঘরোয়া বাজারের মূলধন ইউরোপীয় বাণিজ্য থেকে সরে কলোনী বাণিজ্যে চলে যাবে – যা দীর্ঘমেয়াদে দেশকে ইউরোপীয় বাণিজ্যে দুর্বল করে দেবে। যদি ভবিষ্যতে কখনো কলোনী-বাণিজ্য অনিশ্চিত হয়ে পড়ে তাহলে ঔপনিবেশিকের অনেক পরিশ্রম করে গড়ে তোলা কলোনী বাণিজ্য থেকে মূলধন আবার সরিয়ে আনা শক্ত হবে। এই একচেটিয়া বাণিজ্য বিষয়ে স্মিথের একটা পর্যবেক্ষণ ও একটা ভবিষ্যতবাণীর উল্লেখ না করে পারছি না। স্মিথের মতে ইউরোপে নৌশক্তি ও ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে অগ্রণী ছিল স্পেন ও পর্তুগাল। সেইমত তারাই প্রথম কলোনী-বাণিজ্যে নামে। কিন্তু স্মিথের মতে, দক্ষিণ আমেরিকাকে কলোনী বানাবার পরে এই দুই দেশের বাণিজ্য এদের উপনিবেশের পথ ধরে মূলত কৃষিভিত্তিক হয়ে পড়ে। তাই ধীরে ধীরে তাদের ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প মার খাবে ও ফলশ্রুতিতে নৌশক্তিও দুর্বল হয়ে পড়বে। অন্যদিকে গরিব ডেনমার্ক (তৎকালীন ডেনমার্ক ও নরওয়ে) বা সুইডেন (বর্তমানের সুইডেন ও ফিনল্যান্ড) – যাদের অর্থনীতি বাকিদের তুলনায় দুর্বল বা জার্মানী – যার নৌশক্তি সীমিত – তারা তাদের মূলধনের সর্বোত্তম ব্যবহারে (ইউরোপমুখী বাণিজ্য) মনোযোগ দেবে ও কখনও কলোনী বাণিজ্য বিপন্ন হলে এরা ঔপনিবেশিকদের তুলনায় অনেক দ্রুত উন্নতি করবে।

আমি ১৮৭০ সালে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মাথাপিছু গড় আয়ের সাথে বর্তমানের বিভিন্ন দেশের গড় আয়ের একটা তুলনা দিলাম। তালিকা (ব্র্যাকেটে র‌্যাঙ্ক) থেকে স্পষ্ট, স্পেন ও পর্তুগাল তাদের প্রাথমিক ঔপনিবেশিক সুবিধা হারিয়েছে সেই উনিশ শতকের গোড়ায় লাতিন আমেরিকার ওপর থেকে দখল উঠে যাওয়ায়। ব্রিটেন, ফ্রান্স ও হল্যান্ড আছে মাঝে আর ওপরে আছে সুইডেন, নরওয়ে ও ডেনমার্ক – ঠিক যেমনটা বলেছিলেন স্মিথ। জার্মানীর ক্ষেত্রে বিষয়টা ততটা খাটে নি, হয়ত পূর্ব-জার্মানীর কারণে। ১৭৭৬ সালে বসে উপনিবেশ-উত্তর পৃথিবীর অর্থনীতি সম্পর্কে ভবিষ্যতবাণী করার মত একটা শক্ত পরীক্ষায় স্মিথ উত্তীর্ণ। আগের লেখায় আমি দেখিয়েছিলাম উপনিবেশ-উত্তর যুগে উপনিবেশগুলোর তুলনায় ঔপনিবেশিকেরা অনেক দ্রুত উন্নতি করেছে। আসলে, যারা উপনিবেশ-ব্যবসায় নামে নি অথচ মুক্ত-বাণিজ্যে নাম লিখিয়েছে, তারা আরও তাড়াতাড়ি উন্নতি করেছে।

ব্রিটেন – ৩১৯০(১), ৩৭৭৮০(৭)
স্পেন – ১২০৭(৭), ৩০৯০০(৮)
পর্তুগাল – ৯৭৫(৯), ২১২৫০(৯)
ডেনমার্ক – ২০০৩(৩), ৬০৩৯০(২)
নরওয়ে – ১৩৬০(৬), ৮৮৮৯০(১)
সুইডেন – ১৬৬২(৫), ৫৩২৩০(৩)
নেদারল্যান্ডস – ২৭৫৭(২), ৪৯৭৩০(৪)
ফিনল্যান্ড – ১১৪০(৮), ৪৮৪২০(৫)
জার্মানী – ১৮৩৯(৪), ৪৩৯৮০(৬)

তবে এ সব সত্ত্বেও স্মিথ বলেছেন, একচেটিয়া বাণিজ্যের ফলে আপেক্ষিক ক্ষতির তুলনায় হয়ত বর্তমান কলোনী-বাণিজ্য বস্তুটা বেশী লাভজনক। কিন্তু আসল লোকসান অন্যখানে। এই একচেটিয়া বাণিজ্য চালিয়ে যেতে গেলে যে সামরিক শক্তিতে যে পরিমাণ বিনিয়োগ করতে হয় সেই খরচা একচেটিয়া বাণিজ্য থেকে আসা লাভের তুলনায় অনেক বেশী। ১৭৩৯ সালে শুরু হওয়া ইঙ্গ-স্প্যানিশ যুদ্ধের উদাহরণ টেনে বলেছেন – এটা যেন গুপ্তধনের সন্ধান পাওয়া দুইদল দস্যুর লড়াই। লড়াই শেষে উভয়েই ভাগ-বাঁটোয়ারায় সম্মত হল বটে – কিন্তু ততক্ষণে তাদের অনেক শক্তিক্ষয় হয়েই গেছে। মুক্ত-বাণিজ্যের পরিবর্তে একচেটিয়া বাণিজ্যে যে বাড়তি লাভ হচ্ছে তার থেকে অনেক বেশীই ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে সাম্রাজ্য বজায় রাখতে। এরপরে উপনিবেশগুলো চিরকাল ঔপনিবেশিক শাসন মেনে নেবে এমনটা ভাবারও কোনো কারণ নেই, তাদের স্বাধীনতা ঘোষণার সাথেই ঔপনিবেশিকদের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হবে। শুধু এখানেই শেষ না, এই বাড়তি সামরিক শক্তি ও সাম্রাজ্য বজায় রাখতে যে দক্ষ মানব-সম্পদ ব্যবহার হচ্ছে তারা অন্য কোনো অধিকতর উৎপাদনশীল খাতে (স্মিথের মতে ম্যানুফ্যাকচারিং) সময় বিনিয়োগ করতে পারত। সবশেষে, একচেটিয়া বাণিজ্য ও তার নিমিত্ত সামরিক শক্তি – এই দুই খাতে বেশী মনোযোগী হওয়ায় সরকারের পক্ষে নাগরিকদের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার দিকে নজর দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না। লবি অব শপ-কিপার্স কার্যত সরকার চালাচ্ছে – দেশের অন্যান্য শ্রেণীর মানুষ সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

ঔপনিবেশিকতার ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরার পরেও স্মিথের ব্যাখ্যা থেমে থাকে নি। ইংল্যান্ড কি তাহলে উপনিবেশগুলোকে স্বাধীন করে দেবে? স্মিথ বলেছেন – ব্যাপারটা অত সহজ না। কার্যত এটাই আদর্শ হলেও ইতিহাসে কোনো দেশই স্বেচ্ছায় কোনো দেশই সূচ্যাগ্র মেদিনীও ছেড়ে দেয় নি, তার জন্য যত ক্ষতি বা কষ্টই স্বীকার করতে হোক না কেন। কারণ এই বিষয়টা দেশের গৌরবের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত আছে, আর সাধারণ মানুষ চাইলেও দেশের শাসক শ্রেণীর কাছে দেশের গৌরব বিষয়টার মূল্য অপরিসীম। আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধিতেও বুঝেছি যে সাম্রাজ্যবাদের মূলকথা আসলে এইখানেই। নিজের অধীনস্থ মানুষ বা অঞ্চলের পরিমাপের মাধ্যমে মানুষের শূন্য আত্মগৌরবের জন্ম, যা বিবর্তনীয় ইতিহাসের পথে অন্যান্য জীবের মধ্যেও পরিলক্ষিত হয়। এর সন্ধানেই সাম্রাজ্যবাদের পেছনে ছোটে দেশ, শাসক বা রাষ্ট্র – তাতে দেশের লাভ হতে পারে, লোকসানও হতে পারে।

মুক্তবাণিজ্যের সমর্থক স্মিথ এরপরে বর্ণনা দিয়েছেন কি ভাবে উপনিবেশের সাথে সুসম্পর্ক রেখে শুধু মুক্ত-বাণিজ্য চালানোই দেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত। ট্যাক্স-অনুপাতে ভোটাধিকার দিয়ে একটা আন্তর্জাতিক পার্লামেন্ট তৈরীর প্রস্তাবও আছে। সবেমিলে, স্মিথের লেখায় আমি এমন অনেক সামগ্রী পেলাম যা ১৭৭৬ সালে লেখা কোনো বইতে পাব বলে ভেবে দেখিনি। আগ্রহী পাঠকেরা বইটার ফ্রি-পিডিএফ ভার্সান, সংক্ষেপিত যে কোনো ভার্সান বা ওই সংক্রান্ত আর্টিকেল পড়ে দেখতে পারেন। অর্থনীতি নিয়ে বিন্দুমাত্র আগ্রহ থাকলে বলেই দিতে পারি – হতাশ হবেন না।

পড়ে দেখতে পারেন –
১) বইটার পিডিএফ
২) সাম্রাজ্যবাদ দিয়ে লেখার সংক্ষেপ
৩) ইউরোপের কিছু দেশের মাথাপিছু আয়ের গুগল-চার্ট

Advertisements

ট্যাগ সমুহঃ , , ,

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s


%d bloggers like this: