আইন্সটাইনের ধর্মচিন্তা

মানুষের আধ্ম্যাত্বিকতার ইতিহাস জানতে গেলে মনে রাখতে হবে যে আমরা মুলত আমাদের প্রয়োজনের বশেই কাজ করে এসেছি। আমাদের অগ্রগতির পেছনে দুটি মূল চালিকাশক্তি ছিল আমাদের অনুভূতি আর আকাঙ্খা। কিন্তু কোন অনুভূতি আর আকাঙ্খা মানুষকে ধর্মচিন্তার দিকে নিয়ে গেল? একটু চিন্তা করলেই বোঝা সম্ভব, যে আদিম মানুষের ভয়ই এই প্রাথমিক ধর্মচিন্তার মূলে – এই ভয় কখনও ক্ষুধার ভয়, কখনও আগ্রাসী জন্তুর ভয় আবার কখনও প্রকৃতির তাণ্ডবের ভয়। দুর্বল মানবচিত্তে এইসব কার্যকারণের পারস্পরিক কাকতালীয় যোগসূত্রের মাধ্যমে এক কাল্পনিক চরিত্রের উদ্ভব হয় – যার ইচ্ছা ও চিন্তার ওপরেই ভীতিকর এইসব ঘটনা পরিচালিত হয়। আর এই কাল্পনিক চরিত্রের বা চরিত্রগুলোর করুণা বা কৃপালাভের উদ্দেশ্যে সৃষ্ট অসংখ্য যাগযজ্ঞ ও আচার-বিচার যুগ-যুগ ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে হস্তান্তরিত হতে হতে মূল ধর্মের আকার ধারণ করেছে। আমি এই ভীতিসর্বস্ব ধর্মের কথাই বলছি। এই ধর্মের উপজাত হিসাবে তৈরী হয়েছে এক পুরোহিত-শ্রেণী, যারা সাধারণ মানুষের সাথে এই কাল্পনিক ভীতিকর চরিত্রটির মেলবন্ধন ঘটিয়ে দেন। এই পুরোহিত শ্রেণী নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে শাসকশ্রেণীর সাথে আঁতাত গড়ে নিজ-নিজ স্বার্থসিদ্ধি করে গেছে।

ধর্মের উদ্ভবের পেছনে সামাজিক কারণও কম ছিল না। পরামর্শ, ভালবাসা আর সান্ত্বনা পাবার আশায়ও মানুষ ঈশ্বরে বিশ্বাসী হয়েছে। এই ঈশ্বর আবার এক পরম-জ্ঞানী নীতিনিষ্ট ঈশ্বর, যিনি বিচার করেন – শাস্তি ও পুরস্কার দেন। ইনিই মৃতের আত্মাকে সংরক্ষণ করেন, বিশ্বাসীকে পদে পদে সাহায্য করেন, মানবজাতিকে পথ দেখান। এই ঈশ্বর এক নীতিনিষ্ট বিবেকবান ঈশ্বর।

ঈহুদীধর্মে এই ভীতিকর ধর্ম আর নৈতিকতা বা বিবেকের ধর্ম – এক থেকে অন্যে উত্তরণের কিছু কিছু নিদর্শন পাওয়া যায় – ওল্ড থেকে নিউ টেস্টামেন্টে। শুধু ঈহুদী ধর্মে নয়, যা কোনো ধর্মেই আদপে এই দুই শ্রেণীর বিশ্বাসের মিশ্রণ পাওয়া যায়। আর ভয়ের ধর্ম থেকে বিবেকের ধর্মে উত্তরণই মানুষের জীবনে একটা বড় পদক্ষেপ।

তবে এই দুই প্রকার ঈশ্বর-বিশ্বাসের মধ্যে একটি ব্যাপার লক্ষ্য করা যায় – ঈশ্বরের মধ্যে মানবিক গুণাবলী আরোপের প্রচেষ্টা। কিন্তু আমার বিশ্বাস তৃতীয় আরেক ধরণের ধর্মবিশ্বাস আছে যাতে ঈশ্বরের মানবীকরণ করা হয় নি। এই ধরণের মহাজাগতিক ধর্ম কাউকে ব্যাখ্যা করে বোঝানো কষ্টকর। নিজের আকাঙ্খা বা বাসনার তুচ্ছতা অনুভব করতে শিখে আর বিশ্বব্রম্ভাণ্ডের বিশালতা আর শৃঙ্খলাবদ্ধতায় বিমোহিত হয়ে মানুষ সমগ্র মহাবিশ্বের অভিজ্ঞতা নিজের ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করতে চায়। স্কোপেনহাওয়ার লেখা থেকে জানা যায় যে বৌদ্ধধর্মে এই ধরনের মহাজাগতিক একাত্মতার কথা বলা আছে। সর্বকালের সেরা ধর্মগুরুরা কিন্তু এই ধরণের ব্যক্তি-ঈশ্বর-বিহীন ও নিয়মকানুন-বিহীন মহাজাগতিক ধর্মের প্রচারই করে গেছেন। তাদের কেউ কেউ সমসাময়িকদের মধ্যে সাধুসন্ত হিসাবে আখ্যায়িত হয়েছেন আর নাহলে নাস্তিক বলে পরিগণিত হয়েছেন। এদের মধ্যে যেমন আছেন গৌতম বুদ্ধ, তেমনই আছেন ডেমোক্রিটাস, স্পিনোজা আর ফ্রান্সিস অব আসিসি

কিন্তু কি ভাবে এই মহাজাগতিক ধর্ম মানুষের মধ্যে প্রচার লাভ করতে পারে? এর মধ্যে তো কোনো ঈশ্বরবিশ্বাসে বালাই নেই, নেই কোনো নিয়মকানুন, আচার-আড়ম্বর। আমার ধারণা বিজ্ঞান আর চারুকলাই পারে একে মানুষের কাছে পৌছে দিতে।

এইভাবে দেখা যাচ্ছে, ধর্ম আর বিজ্ঞানের আলোচনা এক ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এসে দাঁড়িয়েছে। অথচ ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে মনে হবে এরা যেন একে অপরের প্রতিদ্বন্দী। আর মনে হওয়াই স্বাভাবিক। যে ব্যক্তি কার্যকারণ সম্পর্কে সম্পূর্ণ ধারণা আর আস্থা রাখে, যে ওই কার্যকারণের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখে সে কিছুতেই তার মধ্যে এক কাল্পনিক চরিত্রের অদৃশ্য হস্তক্ষেপের গল্প মেনে নিতে পারে না। এই ব্যক্তির কাছে কোনো ঈশ্বরের শাস্তি দেওয়া আর পুরস্কারের ধারণা পুরো গল্পকথার মত লাগবে। কারণ সে জানে সব মানুষই বাহ্যিক বা আন্তরিক প্রয়োজনের বশেই কাজ করে, সে কাজ আপাতদৃষ্টিতে আমাদের কাছে ভাল লাগুক বা না লাগুক। তাই এক পরম-জ্ঞানীর চোখে সে কখনই অপরাধী হতে পারে না। এই মতবাদ প্রসারের মূল ভিত্তি যুক্তি আর বিজ্ঞান, তাই অভিযোগ করা হয় যে বিজ্ঞান নাকি নৈতিকতার শত্রু। এই কারণেই ধর্মপ্রতিষ্ঠান যুগে যুগে বিজ্ঞানের সাথে লড়াইতে নেমেছে – যাতে তাদের ধর্মের অনুসারীরা তাদের ছেড়ে না চলে যায়। অথচ এই অভিযোগ অত্যন্ত হাস্যকর। মানুষের নৈতিকতার জন্য তো ধর্মের কোনো দরকারই নেই, দরকার মানবিকতা, সহমর্মিতা, শিক্ষা আর সামাজিকতার। মানুষ যদি পরকালের শাস্তির কথা ভেবে নৈতিক হয়, সেই নৈতিকতার মধ্যে মহত্ত্ব কোথায় থাকে?

বিজ্ঞানসাধনায় এই বিশ্বজগতের সাথে একাত্মতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। কেপলার বা নিউটন কত যুক্তি চিন্তা আর সাধনার মধ্যে দিয়ে মহাজাগতিক বস্তুর গতিবিধি সম্পর্কে সঠিক সূত্রে পৌঁছেছিলেন – তা এই মহাজাগতিক ধর্মের প্রভাব ব্যতিরেকে সম্ভব হত কি? যারা কিছু বিজ্ঞানের সূত্র পড়ে বিজ্ঞানীদের সম্পর্কে ধারণা করেন যে এরা চারদিকের জগত সম্পর্কে সদা-সন্দিহান, অসামাজিক আর সর্বদা কিছু সূত্র আবিস্কারে মগ্ন থাকেন – তাদের পক্ষে কোনোভাবেই বোঝা সম্ভব হবে না একজন বিজ্ঞানীর প্রচেষ্টার মর্ম। যারা নিজেরা এরূপ গবেষণায় নিজেরা সময় কাটিয়েছেন তারাই বুঝতে পারবেন যে সত্য উদ্ঘাটনের জন্য আজীবন প্রচেষ্টা চালিয়ে বারবার বিফল হওয়া সত্ত্বেও কি এক অপার্থিব চালিকাশক্তি এই বিজ্ঞানীদের মধ্যে শক্তি সঞ্চার করে গেছে। মহাজাগতিক ধর্মই এই শক্তি প্রদান করে – সূত্র আবিষ্কারের শক্তি, সত্য উদ্ঘাটনের শক্তি। আমার এক সমকালীন বিজ্ঞানী বলেছেন যে আজকের যুগে যুক্তিনিষ্ঠ বিজ্ঞানীরাই একমাত্র ধার্মিক বলে নিজেকে দাবী করতে পারেন – আমার তো মনে হয় উনি ঠিকই বলেছেন। [লেখাটা আইন্সটাইনের ধর্ম ও বিজ্ঞান নিয়ে লেখা হাতে গোনা কয়েকটি লেখার মধ্যে একটি থেকে অনূদিত। লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩০ সালের ৯ই নভেম্বর, নিউ ইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিনে। আইডিয়াস অ্যান্ড ওপিনিয়ন্স আর দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যাস আই সি ইট – এই দুটো বইতেও এই লেখাটা পরে প্রকাশিত হয়েছে।]

Advertisements

3 Responses to “আইন্সটাইনের ধর্মচিন্তা”

  1. সুশান্ত বর্মন Says:

    এই লেখাটা আগেই সচলায়তনে পড়েছি। মুক্তমনায় আপনার প্রধান আগ্রহ সম্ভবত রিচার্ড ডকিন্স। আমার প্রশ্ন হল রিচার্ড ডকিন্সই কি বিশ্বে এই মুহূর্তে একমাত্র নাস্তিক বিজ্ঞানী নাকি আরও কেউ আছেন? আমরা মফস্বলে বসে তো সবাইকে চিনিনা। তাই তাদের সম্পর্কেও যদি কিছু লিখতেন তাহলে আমাদের জানাশোনার পরিধিটা আরও বড় হত।
    লেখাটির জন্য আবারও ধন্যবাদ।

  2. Diganta Says:

    না, আমি মুক্ত-মনায় এখন স্টিভেন ওয়েইনবার্গকে নিয়ে লিখছি। নাস্তিক বিজ্ঞানীদের মধ্যে আমার আরো দুজন আছে পছন্দের – জেমস ওয়াটসন আর ফ্রান্সিস ক্রিক। তবে রিচার্ড ডকিন্সের চেয়ে বিজ্ঞানী হিসাবে এদের অবদান অনেক বেশী – এরা সবাই নোবেল প্রাইজ বিজেতা।

  3. tribunal Says:

    Tribunal says : I absolutely agree with this !

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s


%d bloggers like this: