বিবর্তনবাদের কয়েকটি প্রশ্ন

আগেরদিন বিজ্ঞানে কিভাবে তথ্যসংগ্রহ করে প্রমাণ আহরণ করা হয় সে বিষয়ে লিখেছি। কিন্তু তাতে অনেকেই সন্তুষ্ট নন। তারা বিবর্তনবাদের পক্ষে প্রমাণ জানতে চেয়ে কিছু প্রশ্ন করেছেন। আমি একে একে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করলাম।

মানুষ যদি বানরের উত্তরপুরুষ হয় তাহলে কোটি বছরে বানর গুলো কেনো কিছুটা মানুষের মত হলনা?
সহজ উত্তর, আমরা গাছে যে বানর ঝুলে থাকতে দেখি, সেই বানর থেকে আমাদের সৃষ্টি নয়। আমরা শুধু একই পূর্বপুরুষ থেকে তৈরি। ওপরের ছবিটা দেখলে ব্যাপারটা ভাল করে বোঝা সম্ভব। গরিলা, ওরাং ওটাং বা শিম্পাঞ্জী সবাই আনথ্রপয়েড থেকে বিবর্তিত হয়ে তৈরি হয়েছে। সহজ কথায়, আজ থেকে ১২ মিলিয়ন বছর আগে কোনো বানর ছিল না, তবে যারা ছিল তাদের সাথে বানরের সাদৃশ্যই বেশি। তাদের মধ্যে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন দল থেকে গরিলা, শিম্পাঞ্জী বা মানুষ তৈরি হয়েছে। এই দলগুলো মাইগ্রেট করে এক এক অঞ্চলে চলে যাওয়ায় একদলের পরিবর্তন আরেকদলের মধ্যে প্রভাব ফেলেনি – কোনো জিন বিনিময় হয়নি। আর এক এক অঞ্চলে পরিবেশ একেকরকম হওয়ায় তাদের বিবর্তনও একেকরকম ভাবে হয়েছে।

মানুষ আর বানরের অন্তর্বর্তী প্রাণি দেখা যায়না কেন?
বিবর্তনে আমরা সবাই অন্তর্বর্তী – নিজের বৈশিষ্ট্য কমবেশি পরের প্রজন্ম কে দিয়ে চলব। সত্যিকারের এক প্রাণি থেকে আরেক প্রাণিকে আলাদা করার কোনো পদ্ধতি জানা নেই। সাধারণভাবে একেক প্রজাতি আরেক প্রজাতির সাথে প্রজনন করেনা, এই ভিত্তিতে প্রজাতি তৈরি করা হয়। গোষ্ঠী আলাদা হওয়ার পরে মানুষ আর শিম্পাঞ্জী নিজেদের মত করে বিবর্তিত হয়েছে, তাই তাদের মধ্যে লিংক কেটে গেছে। কৃত্রিম উপায়ে মানুষ আর শিম্পাঞ্জীর সংকর ভ্রূণ তৈরি করা হয়েছে, মিল না থাকলে সেটা কি সম্ভব হত?
আরো একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন আন্দামানের উপজাতিরা – তারা আমাদের সাথে প্রজননক্ষম, কিন্তু আমাদের থেকে অনেক আলাদা। কেন? কারণ, আমাদের সাথে তারা ভৌগোলিক ভাবে বিচ্ছিন্ন থাকায় তাদের সাথে আমাদের জিন বিনিময় হয়নি অনেকদিন।

মানুষ আর শিম্পাঞ্জীর ৯৫-৯৯% জিনগত মিল আছে, এ থেকে কি বোঝা যায়?
বোঝা যাওয়ার জন্য বাকি ১-৫% জিন খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই জিনগুলো যে মিউটেশনের ফলে আলাদা হয়েছে তাদের মলেকুলার ক্লক দিয়ে বয়স নির্ধারণ করা সম্ভব। মজার কথা হল, এভাবে প্রাপ্ত বয়স, সংগৃহীত ফসিলের কার্বন ডেটিং-এর মাধ্যমে প্রাপ্ত বয়সের খুব কাছাকাছি। আগেই বলেছি, একাধিক সূত্র থেকে পাওয়া গেছে বিবর্তনবাদের প্রমাণ – এটা সেরকমই একটা উদাহরণ।

এই ১-৫% মানুষ আর শিম্পাঞ্জীর মধ্যে এতটা পার্থক্য কেন করে?
জিন আমাদের জন্মাবস্থা নিয়ন্ত্রন করতে পারে, কিন্তু পরবর্তীতে আমরা কিভাবে চলব সেটা আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের ওপর নির্ভর করে। মানব-সভ্যতার একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল এক প্রজন্মে অর্জিত জ্ঞান আর ইনফ্রাস্ট্রাকচারের ওপর পরের প্রজন্ম কাজ শুরু করে – এটাই মানুষকে অন্যের থেকে আলাদা করেছে। এই ১-৫% জিন-পার্থক্য মানুষের মস্তিষ্ক বিকাশে সাহায্য করেছে যা আমাদের পুরুষানুক্রমে জ্ঞান বহন করতে সাহায্য করেছে। ভাল করে ভেবে দেখলে, আমাদের জ্ঞানের অধিকাংশই পুরুষানুক্রমে পাওয়া মানবসমাজের দান, ঠিক না?

Advertisements

One Response to “বিবর্তনবাদের কয়েকটি প্রশ্ন”

  1. S.M. Mehdi Akram [ROYAL] Says:

    দারুন হয়েছে।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s


%d bloggers like this: