আমার অরকুটপ্রীতি নিয়ে

সচলায়তনে অরকুটের কমিউনিটি ভোটের মত ভোটের ব্যবস্থার অভাব আমি খুব অনুভব করি। অবশ্য সেক্ষেত্রেও অনেকেই ভোটে বিরত থেকে ভোট বিফল করে দিতে পারেন, তাও। এমনকি খবরের কাগজগুলোর মত রোজকার বা এমনকি সাপ্তাহিক ভোটের ব্যবস্থা থাকলে আরো ভাল হত। আর ভোটের সাথে সাথে মন্তব্য করার ব্যবস্থা থাকলে তো সোনায় সোহাগা। ব্লগ তখন আর ব্লগ না থেকে পুরোদস্তুর সামাজিক মায়াজালে পরিণত হত।

যাহোক, অরকুট নিয়ে কথা শুরু করেছিলাম অরকুটেই ফিরে যাই। অরকুট করা শুরু করি আমি বছর দুয়েক আগে। সোসাল নেটওয়ার্কিং বলে বস্তুটা যে কি, তা বিশেষ একটা টের পাইনি তখনো। যাহোক, অরকুটের দৌলতে প্রথম দিকে আমি কলেজের পরিচিত, আর অল্প-পরিচিতদের সাথে পরিচিতিটা ঝালিয়ে নেবার জন্যই ব্যবহার করতাম। পরিচিতি শুধু বললে ভুল হবে, পরিচিতির সাথে সাথে কে কি করছে, কোথায় আছে – কেমন আছে, সবই টের পাওয়া যেত। বুঝলাম, ইন্টারনেট মানুষকে কাছে এনে দেবার যে উদ্যোগ নিয়েছে, সোসাল নেটওয়ার্কিং হল তার একটা অঙ্গ।

দিন গেছে, আমার অরকুটপ্রীতি বেড়েছে বই কমে নি কিছু। এখন মাঝে মাঝে লোকজনের স্ক্র্যাপ ঘেঁটে দেখি কে কি করছে। কি করছের মধ্যে অনেক কিছু আছে। কেউ চাকরি পরিবর্তন করলে সে খবর আসে অরকুট মারফত। কারো প্রেম ফাঁকি দিয়ে গেছে – অরকুট থেকেই বোঝা যাচ্ছে – কারণ বন্ধুতালিকায় প্রেমিকার অনুপস্থিতি। এমনকি, অ্যালবাম থেকে দেখা গেল, পুরোনো প্রেমিকার সাথে বিচ্ছেদের পরে আবার জোড়া লেগে বিয়ে – এ ঘটনাও অরকুটেই দেখলাম। লোকজনের সাথে আর যেচে আড্ডা মেরে জানতে হয় না কেমন আছে, অরকুটের পাতায় চোখ লাগলেই হয়। সবাই সবার অ্যালবাম দেখতে পায় আর স্ক্র্যাপ পড়তে পারে বলে পরনিন্দা-পরচর্চার একটা ভাল উতস হয়ে গেছে এটা। কয়েকজন বন্ধু মিলে বসলে দিব্যি কয়েকঘন্টা কেটে যাবে এর পেছনে।

আমার এই সামাজিক মায়াজালের সবথেকে বড় লাভ হল আমার ছোট্টবেলার স্কুলের বন্ধুদের সাথে আবার যোগাযোগ। সেটা ১৯৮৯ সালের কথা। আমি ক্লাস ফোর পাস করে কল্যাণী ছেড়ে চলে এলাম বর্ধমানে। তারপরে আর তাদের সাথে যোগাযোগ নেই। অরকুট পেতেই, আমার স্কুলের নাম দিয়ে কমিউনিটি দেখে তাতে যোগদান করেছি, কিছুদিন পরে দেখলাম তাতে সুদীপ বরণ দে বলে একটা ছেলে যোগ দিল। আমি মনে করলাম সেই আমার ছোটবেলার প্রিয় বন্ধু সুমিতের ভাই নয় তো? নামটা তো একই রকম – সুমিত বরণ দে আর সুদীপ বরণ দে। সটাসট স্ক্র্যাপ আর তার উত্তরও আসে জলদি। আমিই ঠিক, সুদীপ সুমিত বরণের ভাই। সেই সুমিত আর আমার মধ্যে বন্ধুত্বও ছিল যেমন তেমন ছিল ক্লাসে প্রতিযোগিতাও। তার সাথে ১৮ বছর পরে সাথে ফোনে যোগাযোগ। সে এখন কবি হয়ে গেছে, পুরোদস্তুর সাহিত্যিক। আমার সাথে এতদিন পরে যোগাযোগ পেয়ে সেই স্মৃতিতে একটা কবিতাই লিখে ফেলল। ভাবা যায়!! আমি কোথায় কর্পোরেট জীবনে কম্পিউটার টিপে জীবন চালাচ্ছি, সেই আমার কবি বন্ধু? আরো একে একে আমার বাকি বন্ধুদের সাথেও যোগাযোগ হল। আমার ছোটবেলার খেলার সাথীদের সাথে ভার্চুয়াল দেখা করতে যে কি ভাল লাগল … ক’দিন আগেই এক বন্ধুর সাথে স্ক্র্যাপালোচনা হল, ১৯৮৬র বিশ্বকাপে আমি কেমন প্লাতিনির সমর্থক ছিলাম আর ও মারাদোনার। শেষ হাসি আমি হাসতে পারিনি বলে আমার কেমন দুঃখ ছিল … ইত্যাদি।

আমার আরেকটা নিজের চোখে দেখা বিষয় হল প্রোপাগান্ডা। অরকূটে যথেচ্ছভাবে যে যার খুশীমত নিজের মত লিখে চলে আর দাবী করে সে-ই একমাত্র সত্যের পূজারী। সাথে থাকে কিছু সমগোত্রীয় নিউজপেপার রেফারেন্স, যেগুলো কিছু বিশেষ মতের লোকজন ছাড়া কেউ পড়েই না। প্রোপাগান্ডার মধ্যে ধর্মই দেখি প্রাধান্য পায় – একবিংশ শতাব্দীতে এসেও এরকম ধর্মকেন্দ্রিক ধারণা দেখে আমি যারপরনাই বিস্মিত। আর বুঝলাম মানুষের এখনো শিক্ষিত হতে আরো অনেক দেরি আছে – প্রোপাগান্ডা মোটামুটি সবাইকে কিছু না কিছু প্রভাবিত করে, এত নিউজ-সোর্স থাকা সত্ত্বেও। অনেক কাল ভারত-পাকিস্তান বন্ধুত্ব কমিউনিটির সদস্য হিসাবে বুঝেছিলাম যে কেউ কারোর মতাদর্শ থেকে একচুলও সরতে রাজী নয় – বন্ধুত্ব আসবে কি ভাবে? সবাই তো শত্রুতার ইতিহাস আলোচনাতেই ব্যস্ত।

অরকুটের পরে আসি লিঙ্কড-ইন, হাই-ফাইভ আর ফেসবুকে। প্রথমটা একটা অন্যধরনের লোকজনের জন্য, মানে যারা কর্পোরেট শুধু কর্পোরেটই থাকতে চায় – তাদের জন্য। পরের দুটো অরকুটের সমগোত্রীয়। তার মধ্যে ফেসবুকটাকে আমার খুব একটা পছন্দ হল না, সবকিছুইই বড় জটিল মনে হয়। সাধারণ মানুষ যে কিভাবে ব্যবহার করে এগুলো – বুঝে পেলাম না। এরপরে আমার তো মনে হয় একই জিনিস মোবাইলে চলে আসবে – খুব দ্রুত। এস-এম-এসের মাধ্যমে স্ক্র্যাপিং তো এখনই চলছে …

আর কি দুনিয়া এগিয়ে চলেছে বনবন করে ঘুরতে ঘুরতে, আর আমরাও তার চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছি। নেট খুলে আজকাল আমি আনন্দবাজারের সম্পাদকীয়, টাইমস অব ইন্ডিয়া আর নিজের ই-মেল চেক করার মত অরকুটের পাতাতেও ঢুঁ দিয়ে যাই – যদি দেখা হয়ে যায় আমার পুরোনো কোনো বন্ধুর সাথে।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s


%d bloggers like this: