স্বার্থপর জিন কথাটা রিচার্ড ডকিন্সের The Selfish Gene এর বাংলা অনুবাদ। জীবের আচরণ কিভাবে বিবর্তনের পথে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে স্বার্থপর জিন দিয়ে – সে বিষয়েই বইটা। এই লেখটা মূলত বইয়ের পঞ্চম চ্যাপ্টার থেকে নেওয়া। বাংলা প্রতিশব্দের ব্যাপারে আমি কিছুটা কাঁচা, তাই জনগণ আমাকে সাহায্য করলে বাধিত হব।
বাংলাভাষায় একটা কথা আছে – “অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী”। আমার ধারণা ডারুইনের “যোগ্যতমের উদ্বর্তন” নিয়েও এরকমই কিছু ভয়ঙ্করী ভুল ধারণা রয়েছে – তাদের মধ্যে একটি হল আগ্রাসী মনোভাবের ব্যাখ্যা। খুব সহজ চিন্তাভাবনা করলে মনে হবে যে যদি যোগ্যতমই সবসময় নির্বাচিত হবে তাহলে সব জীবই তো চাইবে অন্যেকে মেরে ফেলতে আর নিজের বংশবিস্তার করতে। তাহলে সেই প্রাণীদেরই আমাদের এখন চারপাশে দেখতে পাওয়ার কথা যারা হিংস্র, শক্তিশালী ও আগ্রাসী। একটি জীবকে যদি জিনসমষ্টি নিয়ন্ত্রিত একটি স্বার্থপর যন্ত্র (যাকে আমরা বলব সজীব যন্ত্র) বলে মনে করা যায়, তবে সেই জিনগুলোই বেঁচে থাকার কথা, যারা প্রাণীদের মধ্যে এই আগ্রাসী নীতি অবলম্বনে প্রলুব্ধ করে। কিন্তু বাস্তবে আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার ব্যতিক্রম দেখি, কেন?
ব্যাপারটা একটু বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা যাক। একটি সজীব যন্ত্রের কাছে বাকী জীব বা সজীব যন্ত্রেরা হল জল, কাঠ বা পাথরের মত প্রকৃতির আরো কিছু অংশমাত্র। প্রাকৃতিক নির্বাচন সেই জিনগুলোকেই নির্বাচিত করে যারা সজীব যন্ত্রকে তার পারিপার্শ্বিক প্রকৃতির পক্ষে সবথেকে উপযোগী করে গড়ে তোলে। পারিপার্শ্বিক প্রকৃতির মধ্যে অন্যান্য সজীব যন্ত্র বা জীবও অন্তর্ভুক্ত। ভিন্ন প্রজাতির জীবেরা একে অপরকে প্রভাবিত করে – খাদ্য-খাদক সম্পর্ক ছাড়াও পরাগরেণু বাহক প্রজাপতির মত উদাহরণও কম নেই। তবে একই প্রজাতির জীবেদের পারস্পরিক প্রভাব তুলনায় বেশী। কোনো এক জীবের কাছে বাকি সব জীব খাদ্যশৃঙ্খলে তার প্রতিযোগী আবার অর্ধেক (সাধারণভাবে) জীব তার সম্ভাব্য প্রজনন-সঙ্গী, বাকি অর্ধেকের সাথে প্রতিযোগিতা করেই তবে সে বংশবিস্তারে সক্ষম হবে। সাধারণ বিচারে, তাই জীবের পক্ষে তার প্রতিযোগীকে হত্যা করাটা (এবং খেয়ে ফেলাটা) খুবই স্বাভাবিক বলে মনে হয়। বাস্তবে কিন্তু তার উল্টোটাই বেশী করে চোখে পড়ে। শুধু তাই নয়, কনরাড লোরাঞ্জের ‘অন অ্যাগ্রেসন’ বই-এর মতে, নিজেদের মধ্যে এই মারামারিও জীবজগতে বিভিন্নভাবে হয়, এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার ফলে পরাজিত পক্ষের প্রাণসংশয় হয় না। উন্নততর জীবজগতে, বিশেষত মানুষের মধ্যে আবার আগ্রাসনের পরিবর্তে পারস্পরিক সহযোগিতাই বেশী করে চোখে পড়ে। জীবজগতে হানাহানির পরিবর্তে এরকম সহযোগিতা কেন দেখা যায় যদি স্বার্থপর জিন-বিস্তার করাই জীবের লক্ষ্য হয়ে থাকে?
উত্তরটা প্রথমে একটা উদাহরণের সাহায্যে ব্যাখ্যা করা যাক। ধরা যাক হিমু আর বন্যাদি সচলায়তনে আমার প্রতিযোগী দুই ব্লগার। এটা ভাবা খুবই স্বাভাবিক যে আমি এখন হিমুর মুখোমুখী হলেই তাকে মেরে ফেলতে উদ্যত হব। কিন্তু, এমন যদি হয় যে হিমু আবার বন্যাদিরও প্রতিযোগী, তাহলে হিমুকে মারলে আদপে বন্যাদির সুবিধাই হয়ে যাবে। বরং, বন্যাদি আর হিমুর মধ্যে প্রতিযোগিতা তীব্র হলেই আমার লাভ বেশী। তাই, প্রতিযোগিতার জটিল ঘূর্ণাবর্তে প্রতিযোগীদের নির্বিচারে হত্যা করাটা নির্বাচিত হবার জন্য খুব একটা ভাল কৌশল নাও হতে পারে। চাষের ক্ষেতে অনেকসময়েই একটি কীটনাশক ব্যবহার করে কোনো একটি ক্ষতিকর কীট ধ্বংস করে তার প্রতিযোগী আরো ক্ষতিকর কীটের সুবিধা করে দেবার ঘটনা ঘটে – যার ফলাফল ক্ষতিকর। উদাহরণ থেকে বোঝা যাচ্ছে, প্রতিযোগিতা বা লড়াইতে নামার আগে বা রণকৌশল নির্ধারণে সব সজীব যন্ত্রেরই সচেতন বা অবচেতন ভাবে লাভ-ক্ষতির হিসাব করতে হবে। আর এখানেই আসে হ্যামিলটনের “বিবর্তনগত স্থিতিশীল কৌশল”।
“বিবর্তনগত স্থিতিশীল কৌশল” হল এমন একটি কৌশল বা নীতি, যেকোনো জীবগোষ্ঠীর অধিকাংশ জীব তা অবলম্বন করলে অন্য কোনো কৌশল এসে তার স্থান দখল করতে পারবে না। পরিবর্তিত পরিবেশে কৌশল পরিবর্তন হতে পারে, প্রতি জীবের নিজে নির্বাচিত হবার কৌশল একই জীবগোষ্ঠীর অধিকাংশ জীবের কৌশলের ওপর সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। মূল কথা হল, একবার জীবগোষ্ঠীর অধিকাংশ জীব এই কৌশল অবলম্বন করা শুরু করলে এর বিরোধীদের প্রাকৃতিক নির্বাচনের সরাসরি বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হবে।
মেনার্ড স্মিথের কাল্পনিক উদাহরণ দিয়েই ব্যাখ্যা করা যাক। ধরা যাক, একটি জীবগোষ্ঠীর মধ্যে দুধরণের কৌশল অবলম্বনকারী জীব দেখা যায়। প্রথমটি আগ্রাসী নীতি, আরেকটি বিবাদ নীতি। আগ্রাসীরা সবসময় শেষ রক্তবিন্দু অবধি লড়াই করে, মৃতপ্রায় না হলে রণক্ষেত্র থেকে পলায়ন করে না। বিবাদীরা মারামারি না করে অন্য উপায়ে লড়াই করে, ঝগড়া করে, রক্তচক্ষু দেখায়, আক্রমণের ভাব করে কিন্তু রক্তপাত করেনা। এদের পার্থক্যটা অনেকটা অনেকটা ডিপ্লোম্যাট আর আর্মির পার্থক্যের মত। আগ্রাসীর সাথে বিবাদীর লড়াই হয়না, বিবাদী পালিয়ে যায়। কিন্তু দুই আগ্রাসীর লড়াইতে সর্বদা কোনো না কোনো একজন মারা যায় (বা গুরুতর আহত হয়)। প্রথমে, হিসাবের সুবিধার্থে ধরে নেওয়া যাক, কোনো জীবই জীবদ্দশায় তার কৌশল বদলায় না, এবং প্রতিযোগিতার শুরুতে একে অন্যের কৌশল জানে না। আমাদের এই মডেলের কাল্পনিক পয়েন্ট সিস্টেমে ধরা যাক, প্রতিযোগিতায় জিতলে ৫০ পয়েণ্ট, হারলে ০, সময় নষ্টের জন্য -১০, গুরুতর আহত হলে -১০০ পয়েন্ট – জিনের নির্বাচনের সম্ভাবনার সাথে মিল রেখেই এরকম পয়েন্ট সিস্টেম। এখানে মনে রাখতে হবে যে, আমরা লড়াইতে কে জিতবে তা নিয়ে আগ্রহী নই, তা নিয়ে আগেই আলোচনা হয়েছে। আমরা হিসাব করতে চাই যে এদের মধ্যে কোন কৌশলটি (বা এদের কোনো মিশ্রণ) স্থিতিশীল হতে পারে।
মনে করা যাক, জীবগোষ্ঠীর সব জীবই বিবাদী নীতি অবলম্বন করছে। তাহলে প্রতিটি প্রতিযোগিতায়, একজন জেতে (+৫০), একজন হারে (০) আর দুজনেই সময় নষ্ট করে (-১০x২ = -২০)। সমষ্টিগতভাবে লাভ হয় ৩০ পয়েন্ট, প্রত্যেকের ভাগে যায় ১৫ পয়েন্ট করে। এবার ধরা যাক একটা আগ্রাসী জীব এসে হাজির হল এই গোষ্ঠীতে। সে বিবাদীদের সহজেই লড়াইতে হারিয়ে দেবে, প্রতি যুদ্ধে +৫০ পয়েণ্ট হাসিল করবে। তার ফলে আগ্রাসন নিয়ন্ত্রক জিন খুব সহজেই জীবগোষ্ঠীতে বিস্তার লাভ করবে। এবার ধরি, যথেষ্ট সময় পরে, জীবগোষ্ঠীতে সবাই আগ্রাসী হয়ে গেছে। একইভাবে হিসাব করে দেখা যায়, দুটি আগ্রাসী জীবের লড়াইতে গড়ে -২৫ পয়েণ্ট পায় (জেতায় +৫০, সময় নষ্টে -১০x২ = -২০ আর গুরুতর আহত হওয়ায় -১০০)। একটি বিবাদী সেই দলে থাকলে সে সব লড়াইতে হারে, কিন্তু গড়ে সে ০ পয়েণ্ট পায়। ২৫ পয়েন্টের সুবিধা থাকায় সহজেই বিবাদ কৌশল নিয়ন্ত্রক জিন বিস্তার লাভ করবে।
এতদূর পর্যন্ত গল্পটা শুনে মনে হতে পারে যে জীবগোষ্ঠীতে সবসময় এই দুই কৌশলের জীবেদের মধ্যে একটা বাড়াকমা চলবে। আদপে, অংক কষে দেখানো যায় যে বিবাদী আর আগ্রাসী অনুপাত ৫:৭ অনুপাতে পৌঁছলে স্থিতিশীলতা লাভ করে। মানে, ওই অনুপাতে পৌঁছনর পরে প্রতিটি আগ্রাসী আর প্রতিটি বিবাদীর গড়পরতা লাভ-ক্ষতির হিসাব মিলে যায়। নির্বাচনে আর কেউই অন্যের তুলনায় সুবিধা পায় না। যদি কোনোভাবে আগ্রাসীর সংখ্যা এর চেয়ে বেড়ে যায়, তাহলে বিবাদীরা সুবিধা পেতে থাকে, যেভাবে আগ্রাসীদের দলে একটি বিবাদী সুবিধা পেত। একইভাবে দেখানো যায়, মানবসমাজে নারী-পুরুষের স্থিতিশীল অনুপাত ১:১।
মানবসমাজে অনুরূপ নীতি দেখা যায় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে, যা গেম থিয়োরী দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। কোনো ব্যবসায়ী একই দ্রব্য কমদামে বিক্রি শুরু করলে সে সাময়িকভাবে লাভ বাড়িয়ে ফেলতে পারে, কিন্তু তার প্রতিযোগিরাও সাথে সাথেই দাম কমিয়ে প্রত্যুত্তর দিলে তার আদপে লোকসানই হবে। তাই শেষমেষ নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া ছাড়া বাজারে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে লাভ বাড়ানো সম্ভব নয়। (চলবে)


