স্বার্থপর জিন

জানুয়ারি 11, 2008 লিখেছেন Diganta

স্বার্থপর জিন কথাটা রিচার্ড ডকিন্সের The Selfish Gene এর বাংলা অনুবাদ। জীবের আচরণ কিভাবে বিবর্তনের পথে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে স্বার্থপর জিন দিয়ে – সে বিষয়েই বইটা। এই লেখটা মূলত বইয়ের পঞ্চম চ্যাপ্টার থেকে নেওয়া। বাংলা প্রতিশব্দের ব্যাপারে আমি কিছুটা কাঁচা, তাই জনগণ আমাকে সাহায্য করলে বাধিত হব।

বাংলাভাষায় একটা কথা আছে – “অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী”। আমার ধারণা ডারুইনের “যোগ্যতমের উদ্বর্তন” নিয়েও এরকমই কিছু ভয়ঙ্করী ভুল ধারণা রয়েছে – তাদের মধ্যে একটি হল আগ্রাসী মনোভাবের ব্যাখ্যা। খুব সহজ চিন্তাভাবনা করলে মনে হবে যে যদি যোগ্যতমই সবসময় নির্বাচিত হবে তাহলে সব জীবই তো চাইবে অন্যেকে মেরে ফেলতে আর নিজের বংশবিস্তার করতে। তাহলে সেই প্রাণীদেরই আমাদের এখন চারপাশে দেখতে পাওয়ার কথা যারা হিংস্র, শক্তিশালী ও আগ্রাসী। একটি জীবকে যদি জিনসমষ্টি নিয়ন্ত্রিত একটি স্বার্থপর যন্ত্র (যাকে আমরা বলব সজীব যন্ত্র) বলে মনে করা যায়, তবে সেই জিনগুলোই বেঁচে থাকার কথা, যারা প্রাণীদের মধ্যে এই আগ্রাসী নীতি অবলম্বনে প্রলুব্ধ করে। কিন্তু বাস্তবে আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার ব্যতিক্রম দেখি, কেন?

ব্যাপারটা একটু বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা যাক। একটি সজীব যন্ত্রের কাছে বাকী জীব বা সজীব যন্ত্রেরা হল জল, কাঠ বা পাথরের মত প্রকৃতির আরো কিছু অংশমাত্র। প্রাকৃতিক নির্বাচন সেই জিনগুলোকেই নির্বাচিত করে যারা সজীব যন্ত্রকে তার পারিপার্শ্বিক প্রকৃতির পক্ষে সবথেকে উপযোগী করে গড়ে তোলে। পারিপার্শ্বিক প্রকৃতির মধ্যে অন্যান্য সজীব যন্ত্র বা জীবও অন্তর্ভুক্ত। ভিন্ন প্রজাতির জীবেরা একে অপরকে প্রভাবিত করে – খাদ্য-খাদক সম্পর্ক ছাড়াও পরাগরেণু বাহক প্রজাপতির মত উদাহরণও কম নেই। তবে একই প্রজাতির জীবেদের পারস্পরিক প্রভাব তুলনায় বেশী। কোনো এক জীবের কাছে বাকি সব জীব খাদ্যশৃঙ্খলে তার প্রতিযোগী আবার অর্ধেক (সাধারণভাবে) জীব তার সম্ভাব্য প্রজনন-সঙ্গী, বাকি অর্ধেকের সাথে প্রতিযোগিতা করেই তবে সে বংশবিস্তারে সক্ষম হবে। সাধারণ বিচারে, তাই জীবের পক্ষে তার প্রতিযোগীকে হত্যা করাটা (এবং খেয়ে ফেলাটা) খুবই স্বাভাবিক বলে মনে হয়। বাস্তবে কিন্তু তার উল্টোটাই বেশী করে চোখে পড়ে। শুধু তাই নয়, কনরাড লোরাঞ্জের ‘অন অ্যাগ্রেসন’ বই-এর মতে, নিজেদের মধ্যে এই মারামারিও জীবজগতে বিভিন্নভাবে হয়, এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার ফলে পরাজিত পক্ষের প্রাণসংশয় হয় না। উন্নততর জীবজগতে, বিশেষত মানুষের মধ্যে আবার আগ্রাসনের পরিবর্তে পারস্পরিক সহযোগিতাই বেশী করে চোখে পড়ে। জীবজগতে হানাহানির পরিবর্তে এরকম সহযোগিতা কেন দেখা যায় যদি স্বার্থপর জিন-বিস্তার করাই জীবের লক্ষ্য হয়ে থাকে?

উত্তরটা প্রথমে একটা উদাহরণের সাহায্যে ব্যাখ্যা করা যাক। ধরা যাক হিমু আর বন্যাদি সচলায়তনে আমার প্রতিযোগী দুই ব্লগার। এটা ভাবা খুবই স্বাভাবিক যে আমি এখন হিমুর মুখোমুখী হলেই তাকে মেরে ফেলতে উদ্যত হব। কিন্তু, এমন যদি হয় যে হিমু আবার বন্যাদিরও প্রতিযোগী, তাহলে হিমুকে মারলে আদপে বন্যাদির সুবিধাই হয়ে যাবে। বরং, বন্যাদি আর হিমুর মধ্যে প্রতিযোগিতা তীব্র হলেই আমার লাভ বেশী। তাই, প্রতিযোগিতার জটিল ঘূর্ণাবর্তে প্রতিযোগীদের নির্বিচারে হত্যা করাটা নির্বাচিত হবার জন্য খুব একটা ভাল কৌশল নাও হতে পারে। চাষের ক্ষেতে অনেকসময়েই একটি কীটনাশক ব্যবহার করে কোনো একটি ক্ষতিকর কীট ধ্বংস করে তার প্রতিযোগী আরো ক্ষতিকর কীটের সুবিধা করে দেবার ঘটনা ঘটে – যার ফলাফল ক্ষতিকর। উদাহরণ থেকে বোঝা যাচ্ছে, প্রতিযোগিতা বা লড়াইতে নামার আগে বা রণকৌশল নির্ধারণে সব সজীব যন্ত্রেরই সচেতন বা অবচেতন ভাবে লাভ-ক্ষতির হিসাব করতে হবে। আর এখানেই আসে হ্যামিলটনের “বিবর্তনগত স্থিতিশীল কৌশল”।

“বিবর্তনগত স্থিতিশীল কৌশল” হল এমন একটি কৌশল বা নীতি, যেকোনো জীবগোষ্ঠীর অধিকাংশ জীব তা অবলম্বন করলে অন্য কোনো কৌশল এসে তার স্থান দখল করতে পারবে না। পরিবর্তিত পরিবেশে কৌশল পরিবর্তন হতে পারে, প্রতি জীবের নিজে নির্বাচিত হবার কৌশল একই জীবগোষ্ঠীর অধিকাংশ জীবের কৌশলের ওপর সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। মূল কথা হল, একবার জীবগোষ্ঠীর অধিকাংশ জীব এই কৌশল অবলম্বন করা শুরু করলে এর বিরোধীদের প্রাকৃতিক নির্বাচনের সরাসরি বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হবে।

মেনার্ড স্মিথের কাল্পনিক উদাহরণ দিয়েই ব্যাখ্যা করা যাক। ধরা যাক, একটি জীবগোষ্ঠীর মধ্যে দুধরণের কৌশল অবলম্বনকারী জীব দেখা যায়। প্রথমটি আগ্রাসী নীতি, আরেকটি বিবাদ নীতি। আগ্রাসীরা সবসময় শেষ রক্তবিন্দু অবধি লড়াই করে, মৃতপ্রায় না হলে রণক্ষেত্র থেকে পলায়ন করে না। বিবাদীরা মারামারি না করে অন্য উপায়ে লড়াই করে, ঝগড়া করে, রক্তচক্ষু দেখায়, আক্রমণের ভাব করে কিন্তু রক্তপাত করেনা। এদের পার্থক্যটা অনেকটা অনেকটা ডিপ্লোম্যাট আর আর্মির পার্থক্যের মত। আগ্রাসীর সাথে বিবাদীর লড়াই হয়না, বিবাদী পালিয়ে যায়। কিন্তু দুই আগ্রাসীর লড়াইতে সর্বদা কোনো না কোনো একজন মারা যায় (বা গুরুতর আহত হয়)। প্রথমে, হিসাবের সুবিধার্থে ধরে নেওয়া যাক, কোনো জীবই জীবদ্দশায় তার কৌশল বদলায় না, এবং প্রতিযোগিতার শুরুতে একে অন্যের কৌশল জানে না। আমাদের এই মডেলের কাল্পনিক পয়েন্ট সিস্টেমে ধরা যাক, প্রতিযোগিতায় জিতলে ৫০ পয়েণ্ট, হারলে ০, সময় নষ্টের জন্য -১০, গুরুতর আহত হলে -১০০ পয়েন্ট – জিনের নির্বাচনের সম্ভাবনার সাথে মিল রেখেই এরকম পয়েন্ট সিস্টেম। এখানে মনে রাখতে হবে যে, আমরা লড়াইতে কে জিতবে তা নিয়ে আগ্রহী নই, তা নিয়ে আগেই আলোচনা হয়েছে। আমরা হিসাব করতে চাই যে এদের মধ্যে কোন কৌশলটি (বা এদের কোনো মিশ্রণ) স্থিতিশীল হতে পারে।

মনে করা যাক, জীবগোষ্ঠীর সব জীবই বিবাদী নীতি অবলম্বন করছে। তাহলে প্রতিটি প্রতিযোগিতায়, একজন জেতে (+৫০), একজন হারে (০) আর দুজনেই সময় নষ্ট করে (-১০x২ = -২০)। সমষ্টিগতভাবে লাভ হয় ৩০ পয়েন্ট, প্রত্যেকের ভাগে যায় ১৫ পয়েন্ট করে। এবার ধরা যাক একটা আগ্রাসী জীব এসে হাজির হল এই গোষ্ঠীতে। সে বিবাদীদের সহজেই লড়াইতে হারিয়ে দেবে, প্রতি যুদ্ধে +৫০ পয়েণ্ট হাসিল করবে। তার ফলে আগ্রাসন নিয়ন্ত্রক জিন খুব সহজেই জীবগোষ্ঠীতে বিস্তার লাভ করবে। এবার ধরি, যথেষ্ট সময় পরে, জীবগোষ্ঠীতে সবাই আগ্রাসী হয়ে গেছে। একইভাবে হিসাব করে দেখা যায়, দুটি আগ্রাসী জীবের লড়াইতে গড়ে -২৫ পয়েণ্ট পায় (জেতায় +৫০, সময় নষ্টে -১০x২ = -২০ আর গুরুতর আহত হওয়ায় -১০০)। একটি বিবাদী সেই দলে থাকলে সে সব লড়াইতে হারে, কিন্তু গড়ে সে ০ পয়েণ্ট পায়। ২৫ পয়েন্টের সুবিধা থাকায় সহজেই বিবাদ কৌশল নিয়ন্ত্রক জিন বিস্তার লাভ করবে।

এতদূর পর্যন্ত গল্পটা শুনে মনে হতে পারে যে জীবগোষ্ঠীতে সবসময় এই দুই কৌশলের জীবেদের মধ্যে একটা বাড়াকমা চলবে। আদপে, অংক কষে দেখানো যায় যে বিবাদী আর আগ্রাসী অনুপাত ৫:৭ অনুপাতে পৌঁছলে স্থিতিশীলতা লাভ করে। মানে, ওই অনুপাতে পৌঁছনর পরে প্রতিটি আগ্রাসী আর প্রতিটি বিবাদীর গড়পরতা লাভ-ক্ষতির হিসাব মিলে যায়। নির্বাচনে আর কেউই অন্যের তুলনায় সুবিধা পায় না। যদি কোনোভাবে আগ্রাসীর সংখ্যা এর চেয়ে বেড়ে যায়, তাহলে বিবাদীরা সুবিধা পেতে থাকে, যেভাবে আগ্রাসীদের দলে একটি বিবাদী সুবিধা পেত। একইভাবে দেখানো যায়, মানবসমাজে নারী-পুরুষের স্থিতিশীল অনুপাত ১:১।

মানবসমাজে অনুরূপ নীতি দেখা যায় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে, যা গেম থিয়োরী দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। কোনো ব্যবসায়ী একই দ্রব্য কমদামে বিক্রি শুরু করলে সে সাময়িকভাবে লাভ বাড়িয়ে ফেলতে পারে, কিন্তু তার প্রতিযোগিরাও সাথে সাথেই দাম কমিয়ে প্রত্যুত্তর দিলে তার আদপে লোকসানই হবে। তাই শেষমেষ নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া ছাড়া বাজারে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে লাভ বাড়ানো সম্ভব নয়। (চলবে)

অন্ধবিশ্বাস না সহজাত তত্ত্বীয়করণ?

জানুয়ারি 11, 2008 লিখেছেন Diganta

অনেককাল হল শুনছি যে অন্ধবিশ্বাস হল বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় শত্রু। অনেকসময় ধর্ম বা ধর্মগ্রন্থকে দায়ী করা হয় অন্ধবিশ্বাস ছড়ানোর জন্য। কিন্তু অন্ধবিশ্বাস ব্যাপারটা ঠিক কি? সাধারণভাবে, পরীক্ষা না করেই বিশ্বাস করাকে সাধারণভাবে অন্ধবিশ্বাস বলা হয়। এই বিষয়ে আমার ছোটোবেলা থেকেই একটা প্রশ্ন ছিল, যা আমি কিছুটা উত্তর পেলাম সম্প্রতি কয়েকটা গবেষণাধর্মী প্রবন্ধে। খুব সহজ একটা প্রশ্ন হল, যদি সবাই নিজের নিজের মত বিশ্বাস করতে থাকেন তাহলে পৃথিবীতে সব মানুষের অন্ধবিশ্বাস আলাদা আলাদা নয় কেন? কিভাবে সারা পৃথিবীর লোক একসময় বিশ্বাস করত পৃথিবী চ্যাপ্টা? যদি অন্ধবিশ্বাস যদি র‌্যান্ডম হয়, তাহলে তো অন্তত, সংখ্যালঘু কিছু গোষ্ঠী পাওয়া যাবার কথা যারা বিশ্বাস করবে পৃথিবী গোল বা নিদেনপক্ষে পৃথিবী ঘনক-আকৃতির। কেন তা হয় না?

আসলে অন্ধবিশ্বাসকে আমরা যতটা অন্ধ ভাবি, ততটা অন্ধ এই বিশ্বাস নয়। এও কিছু একটা ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে ও কোনো নির্দিষ্ট ভাবে গঠিত হয় – যার ফলে সারা পৃথিবীর মানবজাতির বিভিন্ন তথাকথিত অন্ধবিশ্বাসের মধ্যে অদ্ভূত সাদৃশ্য পাওয়া যায়। অন্ধবিশ্বাস কি তাহলে মানবমনে প্রোথিত কিছু নিয়মের থেকে সৃষ্টি? অথবা আমাদের মানসিকতার কোনো দুর্বল প্রান্তে এর উৎপত্তি?

আংশিক উত্তর পাওয়া যায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান-শিক্ষকদের মতামতে। তাদের মতে শিশুদের বিজ্ঞানশিক্ষার পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হল শিশু-মানসিকতা। বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানশিক্ষা পাবার আগেই শিশুরা প্রকৃতি ও সমাজ সম্পর্কে কিছু কিছু ধারণা পেতে শুরু করে। সামাজিক ধারণার মধ্যে পড়ে তাদের বাবা-মা ও নিকটাত্মীয়দের চিনে ফেলা। আর প্রাকৃতিক ধারণার মধ্যে পড়ে সাধারণ অভিজ্ঞতালব্ধ ধারণা – “বস্তু ওপর থেকে নিচে পড়ে” বা “ওপর থেকে নিচে পড়লে ব্যাথা লাগে”। তাই শিশুদের বিজ্ঞান শেখাতে গেলে তারা যা জেনে বসে আছে দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকে, তার বিরুদ্ধে যেতে হয় অনেকসময়। যেমন ধরা যাক, বাচ্চারা দেখেছে যে “বস্তু ওপর থেকে নিচে পড়ে”। তাই তাদের যদি বলা হয় যে পৃথিবী গোল, তাহলে তারা প্রতিবাদ করবে। জিজ্ঞাসা করবে – তাহলে নিচের দিকে থাকা মানুষেরা পড়ে যায়না কেন? স্বভাবতই, সংগঠিত বিজ্ঞানশিক্ষা না পেলে শিশুমস্তিষ্কে চ্যাপ্টা পৃথিবীর ধারণাই স্বাভাবিক বলে মনে হবে।

মাইকেল ম্যাকলস্কি নামে জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কগনিটিভ সায়েন্স-এর অধ্যাপক সম্প্রতি আমেরিকায় সাধারণ ছাত্রদের ওপর কিছু সমীক্ষা চালিয়েছিলেন। তার সমীক্ষার ক্ষেত্র ছিল বস্তুর গতির নিয়মাবলী – যার পর্যবেক্ষণলব্ধ অভিজ্ঞতা সাধারণ সারাজীবন ধরে সংগৃহিত হয় আবার তত্ত্বগত ভাবেও এর সাথে সকলে সাধারণভাবে পরিচিত। তার মূল আগ্রহ ছিল – এই তত্ত্বগত ব্যাখ্যা মানুষ কতটা আত্মস্থ করতে পারে – নাকি তত্ত্বের শিক্ষা বইয়ের পাতাতেই থেকে যায়। তাই তিনি, কিছু ছবি এঁকে বিভিন্ন অবস্থায় বস্তুর গতিরেখা কেমন হবে তা জানতে চাইলেন। যেমন ধরা যাক, গতিশীল একটা উড়োজাহাজ থেকে ফেলা একটা বল কি ভাবে মাটিতে পড়বে? অধিকাংশ ছাত্রের মতে সেটা পড়বে সোজা – সরলরৈখিক গতিতে। একটা চক্রাকারে বাঁকানো নল থেকে একটা গতিশীল বল বেরিয়ে এলে তার গতিরেখা কি হবে? আবার অধিকাংশ ছাত্রের মতে সেটা চক্রাকারে বেরোবে। বলাই বাহুল্য যে সাধারণ ছাত্ররা এই ধরণের গতিপথ দৈনন্দিন জীবনে চোখে দেখেনি। কিন্তু অন্যদিকে, যেখানে সরাসরি পর্যবেক্ষণলব্ধ অভিজ্ঞতা উপস্থিত, সেখানে ছাত্ররা সঠিক উত্তর দিয়েছে। যেমন, একটা চক্রাকারে বাঁকানো হোসপাইপ থেকে জল যে চক্রাকারে বেরোয় না – বেরোয় সরলরৈখিক গতিতে – তা প্রায় সকলেই সঠিকভাবে বলেছে। তাহলে মোটকথা হল, যা আমাদের সরাসরি পর্যবেক্ষণলব্ধ জ্ঞানের মধ্যে আসে তা আমরা স্মৃতির মাধ্যমে ধরে রাখি। আর যা আসে না, সেই ক্ষেত্রেও আমরা আমাদের পর্যবেক্ষণলব্ধ জ্ঞানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সাধারণ তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি। কয়েকটি সাধারণ পর্যবেক্ষণলব্ধ জ্ঞান ও ধারণাকে একত্রিত করে সরলীকরণের প্রচেষ্টা করি। অন্ধবিশ্বাসের উৎপত্তি এই অতি-সরলীকরণের চেষ্টা থেকেই।

সাধারণ মানুষের কাছে দুভাবে কোনো প্রাকৃতিক ঘটনার ব্যাখ্যা আসে – প্রথমত, দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকে, দ্বিতীয়ত বইতে পড়া বিজ্ঞান থেকে। উভয়ের সংমিশ্রণে ও মিলিত প্রচেষ্টায় বিজ্ঞান-মানসিকতার জন্ম মানবমনে। দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব অনেকসময়েই ভুল, তাই বিজ্ঞানশিক্ষার একটা অন্যতম অঙ্গ হল বিভিন্নভাবে ও বিভিন্ন দৃষ্টিকোণে চিন্তা করতে শেখানো। যাতে এই সহজাত তত্ত্ব বিকশিত হবার আগেই তার বিরুদ্ধে অসংখ্য প্রশ্ন জেগে উঠতে পারে ও সঠিক তত্ত্ব মস্তিষ্কে স্থান পেতে পারে। আমাদের অন্ধবিশ্বাস হল একেকটি সহজাত তত্ত্ব। সাধারণভাবে, হোমো সেপিয়েন্সরূপী মানুষে-মানুষে খুব একটা পার্থক্য তো নেই, তাই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের মনে একই ধরণের তত্ত্বের উদ্ভব ঘটেছে – আদি গণতান্ত্রিক সমাজ সেই সহজাত প্রাকৃতিক তত্ত্বকেই গ্রহণ করেছে – সৃষ্টি হয়েছে অন্ধবিশ্বাস।

এতো গেল সহজাত প্রাকৃতিক তত্ত্বের কথা। একইভাবে সহজাত সামাজিক তত্ত্বের সংখ্যা কম নয়। শিশুরা খুব দ্রুত বুঝে নেয় (বা শিশু-মানসিকতায় জিনগতভাবে প্রোথিত থাকে) যে তাদের সমবয়সীদের তুলনায় বড়দের জ্ঞান বেশী। তাই কোনো ক্লাসমেট তাদের যদি নতুন কোনো বিষয়ে তথ্য দেয়, তারা চেষ্টা করে সেটা বড়দের কাছে মিলিয়ে নিয়ে নিশ্চিত হতে। শুধু তাই নয়, বড়দের মধ্যেও তারা শ্রেণীবিভাগ করে নেয় – শিক্ষক বা বাবা-মা তার কাছে যতটা গুরুত্ব পায়, এক নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীও হয়ত ততটা পায় না। আবার স্কুলে যদি বিবর্তনতত্ত্ব পড়ানো হয়, আর বাড়িতে বাবা-মা তার বিরোধিতা করেন, তাহলে অধিকাংশ শিশু বিবর্তনবাদে অবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। এরকম সামাজিক অপরীক্ষিত তত্ত্ব মানবমনে দিনের পর দিন বেড়ে চলে – দখল করে রাজনৈতিক বা দার্শনিক মানসিকতার ক্ষেত্রও। ছোটোবেলায় যেমন তথ্যের উৎস হিসাবে তারা বাবা-মায়ের ওপর ভরসা করে, বড় হলে সংবাদ-পত্র বা টিভি শো-কে সেই একইভাবে বিশ্বাসী উৎস হিসাবে গণ্য করে। এগুলোও একইরকম অন্ধবিশ্বাস। এর পেছনেও আছে আমাদের জটিল সমাজের কার্যকারণের সরলীকরণের প্রচেষ্টা।

মানুষের এই সহজাত সরলীকরণের বা তত্ত্বীয়করণের প্রচেষ্টা ব্যাখ্যা করা যায় মানব-বিবর্তনের ধাপগুলোর সাহায্যে। চিন্তাশক্তি বিকশিত হবার পরে, এই সরলীকরণের ক্ষমতাই মানুষকে অন্য প্রাণীর থেকে আলাদা করেছিল। আর সব প্রাণী যেখানে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ব্যতিরেকে অচল, সেখানে মানুষ প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে তত্ত্ব গঠনে সক্ষম ছিল। মানুষ চিন্তা করতে পারত উচ্চতর মাত্রায়। সাধারণ একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। টোপ ফেলে শিকার ধরা ছিল শিকারী আদিম মানুষের অন্যতম বিশেষত্ব। মানুষ দেখেছে যে পশুরাও তাদের মতই খাবার দেখলে এগিয়ে যায়। তা থেকে তত্ত্বীয়করণ হয়েছে যে – যেকোনো পশুই খাবার দেখলে খাবারের দিকে ছুটে আসবে। তখন শিকার করাও সহজ হবে। সহজাত তত্ত্বীয়করণের ক্ষমতা এক মানুষকে অন্যের থেকে বাঁচার সুবিধা দিয়েছে বেশী করে, তার ফলে এই ক্ষমতা বর্তমান মানবজাতির মধ্যে সর্বজনীন রূপ লাভ করেছে।

দেরীতে হলেও আমার ধারণা মানবসমাজ তত্ত্বীয়করণের সীমাবদ্ধতা বুঝেছে। মূল সীমাবদ্ধতা হল, তত্ত্ব নির্ভর করে পর্যবেক্ষণের বিস্তারের ওপর। তত্ত্বের বিস্তার যে পর্যবেক্ষণের বিস্তারের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল তার খুব ভাল একটা সামাজিক উদাহরণ হল রেসিজম বা জাতিবিদ্দ্বেষ – যার মূলে আছে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি গোষ্ঠীর একে অপরের ক্ষেত্রে অজ্ঞানতা। গত কয়েক শতকে বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতির মূলেও আছে পর্যবেক্ষণের বিস্তারে উন্নতি – একের পরে এক যন্ত্রের আবিষ্কার। আর সেখানেই শুরু হয় অন্ধবিশ্বাসের সাথে বিজ্ঞানের লড়াই। অন্ধবিশ্বাস যেখানে সাধারণ মানুষকে সাধারণ বিস্তারের পর্যবেক্ষণ থেকে প্রাপ্ত সহজাত তত্ত্বে আবিষ্ট রাখে, সেখানে বিজ্ঞান সেই বিস্তার ক্রমাগত বাড়িয়ে চলে। যেহেতু মানব-প্রবৃত্তির মধ্যে এই তত্ত্বীয়করণের প্রবণতা সহজাত, তাই ভবিষ্যতেও এই লড়াই থামার নয়। হয়ত ধর্মের জায়গা নেবে আরো অন্য কোনো সরলীকৃত তত্ত্ব, যার সাথে লড়াই হবে প্রকৃত বিজ্ঞানের। আজকের বিজ্ঞান আর অন্ধবিশ্বাসের লড়াই তাই আসলে সহজাত তত্ত্ব বনাম বিস্তৃত পর্যবেক্ষণলব্ধ তত্ত্বের যুদ্ধ – এর কোনো শেষ নেই।

ষাট বছরে ভারত

জানুয়ারি 11, 2008 লিখেছেন Diganta

ভারতের স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহ সম্প্রতি CNN-IBN চ্যানেলের হয়ে স্বাধীন ভারতের দশটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তুলে ধরেছেন, যেগুলোকে স্বাধীন ভারতের যাত্রাপথে বিভিন্ন মোড় বলে ভাবা যেতে পারে। কোনো ঘটনা ভাল প্রভাব এনেছে তো কোনোটি খারাপ। তবে ভারতীয় জনমানসে এই ঘটনাগুলোর স্মৃতি বা পরিণতি বহুকাল থাকবে। ঘটনাগুলোর মধ্যে আটটি রাজনৈতিক ও বাকিদুটোকে অরাজনৈতিক বলা চলে।

প্রথমটি শুরু হয় কাশ্মীরের ভারত সংযুক্তি নিয়ে। পাকিস্তান কাশ্মীর আক্রমণ করলে, স্বাধীন জম্মু ও কাশ্মীরের রাজা হরি সিং ও নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ আবদুল্লা ভারতের সাথে প্রতিরক্ষার বিনিময়ে ‘Treaty of Accession’-এ সই করেন। চুক্তিমত ভারত পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ করে। এক শান্তিপূর্ণ গণভোটের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে জাতিসংঘ যুদ্ধ থামালেও পরবর্তীকালে ভারত ও পাকিস্তান কেউই গণভোটে কোনোরকম আগ্রহ না দেখিয়ে কাশ্মীর নিয়ে বারবার যুদ্ধে লিপ্ত হয়। অপরদিকে, কাশ্মীরের জনগণ তাদের বলপূর্বক ভারতভুক্তির প্রতিবাদে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করে। কাশ্মীর ছাড়াও আরো কিছু রাজতন্ত্রের বলপূর্বক ভারতভুক্তি নিয়ে আজও প্রশ্নচিহ্ণ থেকে গেছে।

দ্বিতীয়টি হল ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারক সংবিধান রচনা। ১৯৪৯ সালে রচিত এই সংবিধান ১৯৫০ সালে কার্যকর হয়। সংবিধানের সাহায্যে ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের পথ চলা শুরু হলেও পরবর্তীকালে বারবার সংবিধান লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে স্বাধীন ভারতে।

তৃতীয় ঘটনা হল ১৯৫২ সালের প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচন। নির্বাচন চলাকালে লোকজনের উৎসাহ ও উদ্দীপনা ছিল তা আজো দেখা যায় না। ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসেন স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু, কিন্তু ভোটের অঘোষিত নায়ক ছিলেন সুকুমার সেন, ভারতের প্রথম নির্বাচন কমিশনার। তিনি ভোট পরিচালনায় বহু অদ্ভূত পন্থা অবলম্বন করেছিলেন যা সমসাময়িক বিশ্বে নজিরবিহীন। তবে তখনকার মত এখনো ভোটপ্রক্রিয়ায় জনগণের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্নচিহ্ণ রয়েই গেছে। তবে, শুরু থেকেই ভোটে সব ভারতীয়র ভোটাধিকার ছিল, যা তৎকালীন বিশ্বে হাতে গোনা কয়েকটি দেশে পাওয়া যেত, ছিলনা আমেরিকা বা সুইজারল্যান্ডেও।
(আমি এবিষয়ে খুঁজে দেখলাম ভারতেও যৌন প্রতিবন্ধীদের(হিজড়ে) ভোটাধিকার দেওয়া হয় নব্বই-এর দশকে – সুতরাং সবার ভোটাধিকার ছিল না। বর্তমানে লোকসভায় একজন প্রতিনিধিও এই গোষ্ঠিভুক্ত।)

চতুর্থ হল পঞ্চাশের দশকের ভাষাভিত্তিক রাজ্য-পুনর্গঠন। ১৯৫২ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামী পট্টি শ্রীরামালু তেলেগুভাষী অন্ধ্রপ্রদেশের জন্য ৫৮ দিন অনশনের পরে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যু এক আন্দোলনের সুচনা করে যার ফলশ্রুতিতে গঠিত হয় সহায়তা কমিশন। কমিশনের বক্তব্য অনুসারে গঠিত হয় কেরল, অন্ধ্র ও কর্নাটক। পরে বাকি রাজ্যগুলোও পুনর্বিন্যস্ত হয় একই প্রক্রিয়ায়। ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠনের সাথে সাথে সব রাজ্যকে নিজস্ব ভাষায় রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়, যার ফলে আজও হিন্দিকে জাতীয় বা সরকারি ভাষা হিসাবে কেন্দ্র চাপিয়ে দিতে পারেনি।

পঞ্চম ঘটনা হল পোখরাণের পরমাণু বোমা পরীক্ষা। এর মধ্যে নেহেরুর জায়গায় এসে গেছেন ইন্দিরা, নেহেরুর সুযোগ্য কন্যা। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭৪ অবধি গবেষণার ফল হিসাবে ভারত ষষ্ঠ দেশ হিসাবে পরমাণু শক্তিধর হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। রামচন্দ্র গুহর মতে, এই ঘটনার পর থেকে গান্ধীবাদী শান্তিকামী বিদেশনীতি ভারত ধীরে ধীরে বর্জন করে আন্তর্জাতিক সুবিধাবাদী বিদেশনীতি গ্রহণ করে।

ষষ্ঠ হল ১৯৭৪-এর কুখ্যাত জরুরী অবস্থা। ঘটনার সূত্রপাত ঘটে এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ে যখন ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচন অবৈধ ঘোষণা করা হয়। ১৯ মাসের এই জরুরী অবস্থায় এই সময়ে সংবিধান ও লোকসভা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ইন্দিরা গান্ধী স্বৈরাচারী শাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। সারাদেশে কংগ্রেস জনপ্রিয়তা হারায় ও ফলশ্রুতিতে ১৯৭৭-এর নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসেন মোরারজি দেশাই। ইন্দিরা গান্ধী নিজে দুটি নির্বাচন কেন্দ্র থেকে দাঁড়িয়ে দুটিতেই পঞ্চাশ হাজারেরও বেশী ভোটে পরাজিত হন। দেশে কংগ্রেস কেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটে।

সপ্তম হল ১৯৮৯ এর মন্ডল কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করা। প্রধানমন্ত্রী ভিপি সিংহ এই আইন পাশ করিয়ে নিম্নবর্গীয় জাতিদের জন্য অতিরিক্ত ২৭% সংরক্ষণ চালু করেন। এই ঘটনা ভারতের ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত সিদ্ধান্ত যা আজও বিভিন্ন আকারে আত্মপ্রকাশ করে আসছে। সম্প্রতি আই-আই-টি সহ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একই সংরক্ষণ কার্যকর করার সময় একই বিতর্ক উঠে আসে। বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে সংরক্ষণের মাধ্যমে সত্যি কতটা উন্নতি হয় – সেই প্রশ্ন। আর আছে অর্থনৈতিক মাত্রার পরিবর্তে সামাজিক মাত্রায় সংরক্ষণে সমাজের সুস্থিতি নষ্ট হবার সম্ভাবনা।

অষ্টমে আসে ১৯৯২ সালের বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার ঘটনা। এর ফলশ্রুতিতে ভারতে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের অবনতি ঘটে। নেহেরু যে ‘হিন্দু পাকিস্তান’ বর্জন করতে চেয়েছিলেন, ঘুরেফিরে তাই যেন হাতছানি দেয় পরবর্তী নির্বাচনে। এখন অবস্থার উন্নতি হলেও ভারতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিরুদ্ধে এটাই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

এরপরে অরাজনৈতিক ঘটনাদুটো চলে আসে। আসে ১৯৮৩ সালের ক্রিকেট বিশকাপ জয়। এই জয় আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গণে ভারতের প্রথম বিশ্বজয়। তার থেকেও বড় কথা, এর ফলে ক্রিকেট ভারতের নবতম ফ্যাশনে পরিণত হয়। উঠে আসেন একের পর এক ক্রিকেট আইকন – কপিল দেব, গাভাসকার ও শচিন তেন্ডুলকর। ভারতে আয়োজিত পরবর্তী বিশ্বকাপের সময় সেই উন্মাদনা আরো গভীরে প্রোথিত হয়।

সবশেষে আসে ভারতের অর্থনৈতিক সংষ্কার। ১৯৯১ সালে বেকায়দায় পড়ে সরকার যে উদারীকরণের পথে চলা শুরু করেছিল, তা আজকে ভারতের অর্থনৈতিক উন্নতির শুরু বলে পরিগণিত হয়। একদা সমাজতান্ত্রিক অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিংহ যে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছিলেন, তার ফলে ভারতের অর্থনীতি যেমন একদিকে বার্ষিক ৬% হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, ভারতীয় কোম্পানিরা যেমন শূন্য থেকে শুরু করে তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার বাজারে স্থান করে নিয়েছে, তেমনই ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান দিন গেছে বেড়েই চলেছে। তৈরী হয়ছে পুঁজিহীন বনাম পুঁজিবাদীদের এক অদৃশ্য লড়াই। মোটের ওপর আপাতদৃষ্টিতে অর্থনৈতিক সংষ্কারের ফলাফল ভাল বলে মনে হলেও আরো দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হবে এর সঠিক মূল্যায়নের জন্য।

এছাড়াও আলোচনায় আসে ষাটের দশকে আই-আই-টির পত্তন, একাত্তরের ভারত-পাক যুদ্ধ, পরিবেশবাদী চিপকো আন্দোলন, ইনফোসিসের ন্যাসড্যাকে যোগদান ও টাটার কোরাস কিনে নেবার ঘটনাও।

আমি অনুষ্ঠানের মূল বক্তব্যের সাথে সহমত হলেও ১৯৮৩-এর বিশ্বকাপ জয়ের পরিবর্তে চিপকো আন্দোলনকে আগে রাখবো। কারণ ভারতের মত গরিব দেশে যে পরিবেশ রক্ষায় গণ-আন্দোলন হতে পারে, সেটাই প্রমাণ করে দেয় সত্তরের দশকের এই আন্দোলন। পরে নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। তাছাড়া, বর্তমান শিল্পায়নের যুগে পরিবেশ-রক্ষার গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

তবে একটা ব্যাপার অনস্বীকার্য যে ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা দিবসে কেউ হলফ করে বলতে পারেনি যে এই দেশ ষাট বছর অটুট থাকবে। পশ্চিমের রাজনীতিবিদরা মনে করেছিলেন বহুভাষা-ধর্মের দেশে অচিরেই ফাটল ধরবে। অর্থনীতিবিদেরা মনে করেছিলেন ব্রিটিশ পুঁজির প্রস্থান ও প্রযুক্তির অভাবে শিল্পায়ন হবে না। কিন্তু সব সত্ত্বেও ভারতের ষাট বছর পূরণ হল। রামচন্দ্র গুহর মতে এর জন্য সর্বাধিক কৃতিত্ব প্রাপ্য হল ভারতীয় সংবিধানের, তাই শ্রেষ্ঠর শিরোপা যায় সংবিধান প্রণয়নের – স্বাধীন ভারতে এটাই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

অনুষ্ঠানের ভিডিওটি পাবেন এখানে

ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদ

জানুয়ারি 11, 2008 লিখেছেন Diganta

সম্প্রতি একটা লেখায় সঞ্জীব বড়ুয়ার সাক্ষাতকার পড়লাম, তার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিচ্ছিন্নতাবাদ-বিরোধী হিসাবে আমার কিছু বক্তব্য রাখলাম

উত্তর পূর্বে যদি একটা দেশ বানাতে হয় তাহলে সেটা হবে আবার আরেকটা রাষ্ট্রভিত্তিক জাতি। কারণ, ওই অঞ্চলে অসংখ্য ভাষা আর উপজাতি আছে। কুইবেক বা বাস্কের সাথে এটা তুলনীয় নয় – কারণ তাতে একটা নির্দিষ্ট অংশের জনগণ নির্দিষ্ট পরিচিতির ভিত্তিতে আলাদা হতে চান।

দুটো উদাহরণ দেওয়া যাক। প্রথম উদাহরণ – আসাম। আসামে অহমিয়া সম্প্রদায় উলফাকে সমর্থন করেছিল, কিন্তু ২o% বাঙালী বা পশ্চিমের ১০% বড়ো উপজাতিরা সমর্থন করেনি। উলটে বড়োরা আরো একটা পৃথক রাজ্যের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। সেই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের আলাদা স্বশাসিত অঞ্চল দেওয়াও হয়। যদি জাতি-রাষ্ট্র হত, তাহলে বড়োদের আলাদা দেশ দিতে হত, যেটা ওই সংক্ষিপ্ত অঞ্চলে তাদের সমস্যা ছাড়া সমাধান কিছু দিত না।

দ্বিতীয় উদাহরণ, নাগাল্যান্ড। নাগাল্যান্ডে নাগারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও সংখ্যালঘুদের সংখ্যা কম কিছু নয়। যেমন ধরা যাক কুকি দের কথা, তারা নাগাল্যান্ডের আদি বাসিন্দা। এবার যদি নাগা-পরিচালিত স্বাধীন নাগাল্যান্ড গঠিত হয় তাহলে তারা কোথায় যাবে? এখন যেমন নাগাল্যান্ডের রেডিও থেকে ২৫টি (ভেবে দেখুন) ভাষায় সম্প্রচার করা হয় (উপজাতি ১৫টির আলাদা ভাষা আর সাথে আশেপাশের রাজ্যের ভাষায় সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠান), সত্যিকারের জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন করতে হলে তাদের সবাইকে আলাদা রাষ্ট্র দিতে হবে, তাই না? এবার দেখুন নাগাল্যান্ড কতটা জায়গা নিয়ে গঠিত। সেখানে কি ৩-৪টি আলাদা রাষ্ট্রও গঠন করা সম্ভব? না কুকিরা ভুলে যেতে পারবে নাগারা কিভাবে তাদের একের পর এক গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে? আর একসাথে নাগা-পরিচালিত দেশে থাকতে পারবে?

উত্তর-পূর্বে যদি সব রাজ্যের মূল ট্রাইব-গুলোর সাথে কথা বলা যায় তাহলে দেখবেন তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার ভাব আছে। যদি এক লেভেল আগে গিয়ে মাইনরিটিদের সাথে কথা বলেন, তাহলে বুঝবেন তারা এই আলাদা জাতি-রাষ্ট্রকে কতটা ভয় পায়। এত সংক্ষিপ্ত অঞ্চলে যদি এত অসংখ্য ভাষাভাষি মানুষ আর এত উপজাতি থাকে তাদের এই সমস্যা স্বাভাবিক। ভারতের রাজ্যভিত্তিক শাসনব্যাবস্থার কারণে অসুবিধা কিছুটা প্রশমিত হলেও মোটের ওপর সত্যিকারের জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন করা উত্তর-পূর্বে সম্ভব নয়। আমরা সবাইকে দেখতে একইরকম বলে বাইরে থেকে মনে করে থাকি তারা যেন একই জাতি-গোষ্ঠীভুক্ত। যে যুক্তিতে ভারতীয় মূল ভুখন্ডের বাসিন্দা হিসাবে আমি মেজরিটি আর উত্তর-পূর্ব মাইনরিটি, সেই একই যুক্তিতে উত্তর-পূর্বে প্রতিটি রাজ্যেও তো মেজরিটি আর মাইনরিটি আলাদা আছে, সেখানেও একই সমস্যা নতুন আকারে জেগে উঠবে।

আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হল সেনা মোতায়েন। ভারতের সব বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের একটা নির্দিষ্ট সিকোয়েন্স আছে। প্রথমে, বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রস্তাব দেওয়া হয়। তাতে সরকার রাজি হয় না। তখন শুরু হয় সশস্ত্র সংগ্রাম – শুরু হয় অপহরণ, ভয় দেখানো। তখন পাঠানো হয় সেনা। বিচ্ছিন্নতাবাদী দলগুলি সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের সংখ্যালঘুদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করে – যার ফলে আন্দোলন বিচ্ছিন্নতাবাদী থেকে সাম্প্রদায়িক রূপ নেয়। সেনা অত্যাচার শুরু করে – শুরু হয় লক-আপে মৃত্যু, গ্রাম থেকে পুরুষদের ধরে নিয়ে যাওয়া। আর সেনা অত্যাচারের মাধ্যমে ব্যাপারটা পাকাপাকিভাবে সমাজে গেঁথে যায়। উদাহরণ, সম্পূর্ণ উত্তর-পূর্ব ভারত ও কাশ্মীর। সেনা মোতায়েন করলে তার উপজাত হিসাবে আসে অত্যাচার, আর না করলে ওই অংশের মাইনরিটি আর অন্য রাজ্য থেকে আগতদের দুর্গতি। দুটোর মধ্যে কোনটা ভালো সেটা আমি অন্তত জানি না। তবে সেনা অত্যাচার আমি কোনোভাবেই সমর্থন করি না, কারণ আমরা আজকে ভারতের অধিবাসী কোনো এক সময়ে এরকমই সেনা অত্যাচারের কারণেই যা পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দমনে পশ্চিম-পাকিস্তান চালিয়েছিল। আমার মতে, সেনাদের এ বিষয়ে আরো সচেতন করে তুলতে হবে। হয়ত বলা সহজ, কিন্তু সত্যিকারে কিছু নিরীহ মানুষের মাঝে বন্দুকধারীকে ছেড়ে দিলে তার মানসিকতা আর সংযমের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া খুবই শক্ত – শত হোক, সেও মানুষ, মেশিন নয়। বাস্তবে তার কাছ থেকেও সবসময় ‘আদর্শ ব্যবহার’ পাওয়া সম্ভব নয়।

এবার আসা যাক অর্থনৈতিক সমস্যার গভীরে। ভেবে দেখুন ভারতে কাশ্মীর বা উত্তর-পূর্বে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন আছে, কিন্তু তামিলনাডু বা কেরলে নেই। এর মানে কি এই যে এই রাজ্যগুলো দিল্লী-কর্তৃক আনন্দের সাথে শাসিত হয় বা এদের কালচার দিল্লীর কালচারের সাথে খুব মেলে? তা নয়। এদের অর্থনৈতিক ব্যাপারটাকে এরা গুরুত্ব দেয় খুব বেশী। তাই এরা একসাথে দিব্যি আছে। এদের আঞ্চলিক পার্টি আছে, তারাই পর্যায়ক্রমে রাজ্য শাসন করে। দিল্লীর সাথে এদের সম্পর্ক আসে শুধু আক্ষরিক অর্থে দেশের বাইরে গেলে। লেখক বলেছেন পঞ্জাবের বিচ্ছিন্নতাবাদের উদাহরণ। পঞ্জাবের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শুরু হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে। এই আন্দোলন এখন শেষ, কারণ অর্থনৈতিক। পাঞ্জাবীরা বুঝেছে দীর্ঘদিন লড়াই চালালে তাদের অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়বে। তাছাড়া, বিভিন্ন শহরে যে শিখেরা থাকে তারা ক্ষতগ্রস্ত হয়েছিল এই আন্দোলনে, যেমন কোলকাতায় শিখ-অধ্যুষিত অঞ্চলের দোকান থেকে লোকে জিনিস কিনতে যেতে ভয় পেত। আর এই আন্দোলনের কারণে আর্মিতে শিখ বা পাঞ্জাবীদের সংখ্যা কমেনি, এখনো সেনাবাহিনীর ১০% শিখ। তারা সব গুরুত্বপূর্ণ পদে আছে ও দেশকে যথেষ্ট ভালবাসে। বাস্তবে ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন মনমোহন সিং, যিনি শিখ ও পাঞ্জাবী। বাস্তবসম্মত চিন্তাই শিখ আন্দোলন শেষ হওয়ার কারণ।

অর্থনৈতিক কারণ একটা বড় কারণ। ভারত মূলত গরীব দেশ, কিন্তু গরীবদের দেশ নয়। শাসনক্ষমতা সবই প্রধানত ধনীদের কুক্ষিগত। আস্তে আস্তে অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে বটে, কিন্তু এখনো অনেক দিন লাগবে গরীবের শাসন কায়েম হতে। কিন্তু উত্তর-পূর্বের মানুষের অবস্থার খুব-একটা পরিবর্তন ঘটে নি এতবছরেও। তারা চোখের সামনে দেখছে পাশাপাশি রাজ্য-গুলো উন্নতি করে চলেছে, তারা পারছেনা। একটা কারণ যোগাযোগ-ব্যবস্থার অভাব (কাশ্মীরেও তাই)। অন্যটা গুরুত্বপূর্ণ – লোকসভায় জনপ্রতিনিধির সংখ্যা কম (উত্তর-পূর্বের প্রতিনিধি ২৫ জন, লোকসভার ৫৪২ জনের মধ্যে)। তাই এদের হয়ে লবি করার কেউ নেই। আমার মনে হয় এই ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দিয়ে ভেবে অঞ্চলের সিট বাড়ানো উচিত। সেক্ষেত্রে আবার ভারতের ‘লোক-অনুপাতে সিটের’ কন্সেপ্ট ভাঙতে হয়, সেটা তখন সব রাজ্যই দাবী করে বসবে।

তৃতীয় বিশ্বে আরেকটা দেশ এরকম জাতি-ভিত্তিক রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্রভিত্তিক জাতির সমস্যায় ভুগছে – সেটা আরো একটা একইরকম ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন অনে জাতি অধ্যুষিত রাষ্ট্র – ইন্দোনেশিয়া। তাদের অনেক দ্বীপেই নিজস্ব স্বাধীনতা আন্দোলন চলে, যেমন্ সুমাত্রার উত্তরে আকে রাজ্যে, বা সুলেওয়েসিতে চলে আলাদা হবার আন্দোলন। চলত তিমুর দ্বীপে। কেন? একই কারণ – ভারতের মতই।

এবার দেখি উন্নত বিশ্বে। এক-জাতি এক-রাষ্ট্র এই কন্সেপ্ট টা পৃথিবীতে আমদানি করে ইউরোপিয়ানরা। তার আগে ‘জোর-যার-মুলুক-তার’ গোছের দেশ চলত। ইউরোপে বহুজাতিক রাষ্ট্রের ধারণা চলেনি, এই সেদিনও চেক আর শ্লোভাকেরা আলাদা হয়ে গেল। কিন্তু অপরদিকে, একটা শক্তিশালী ইউরোপিয়ান ইউনিয়ানের ধারণাও কিন্তু ইউরোপিয়দেরই। যদিও তা এখনো সদ্যোজাত, কিন্তু তাও ইউরোপ ওই পথেই হাঁটছে – এক ইউরোপিয় পার্লামেন্ট, এক সংবিধান, এক কারেন্সী আর এক পাসপোর্ট। তার সাথে সাথে দেশে নিজস্ব ধারণাকেও সমর্থন জানানো হবে, সংস্কৃতি আলাদা বলেই যে তারা একসাথে থাকবে না, রাষ্ট্রের বেড়া রিজিড হতেই হবে সেটার তো কোনো মানে নেই। পৃথিবী এখন দেশের বেড়াজাল ভেদ করে মানুষে মানুষে সম্পর্ক গঠনে উদ্যোগ নিচ্ছে। ইন্টারনেটে বসে যে আমি এই লেখার মাধ্যমে আপনাদের মতামত জানাচ্ছি – ট্রান্সলেশন টুল দিয়ে চিনা ভাষার সাইট দেখে নিচ্ছি, সবই কিন্তু আস্তে আস্তে মানুষে মানুষে দূরত্ব কমিয়ে দেয়। আবার অপরদিকে ভেবে দেখুন, এই দূরত্ব কমাবার প্রয়াস শুরু করার জন্যও ন্যূনতম অর্থনৈতিক সচ্ছলতা আর শিক্ষা লাগে, ইস্যুটা আবার ঘুরেফিরে অর্থনীতিতে আর বেসিক এডুকেশনে এসে পড়ে।

রিজিডিটির কথা এলে আমার মিজোরামের কথা মনে পড়ে। মিজোরামের মিজোদের অনেকদিনের আন্দোলন যে তাদের সাথে বর্মার মিজোদের সম্পর্ক রক্ষার জন্য সরকারি সমর্থন চাই। ইতিহাস বলে মিজোরা বর্মা ও ভারতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকত। ইংরেজরা কিছুটা অংশ ভারতে আর বাকিটা বর্মাকে দিয়ে যায়। তাতে কি মানুষ কি আর থেমে থাকে? আত্মীয়-স্বজন দুটো আলাদা দেশে ভাগ হয়ে গেলে কে শান্তিতে থাকতে পারে। তার ওপর যোগ হয় বি-এস-এফের উৎপাত, ওপারে যাওয়া যাবে না। ফলশ্রুতি – আন্দোলন, প্রথমে শান্তিপূর্ণ, পরে সশস্ত্র। সমাধান কি? (আমি সমাধান শোনার পরে অবাক হয়ে গেছিলাম) খুবই সহজ। ৮০ কিমি একটা অঞ্চল দেওয়া হয়েছে যেখান দিয়ে মিজোরা দুদেশের মধ্যে যাতায়াত করতে পারবে। তাতেই মিজোরা খুশী। মূল আন্দোলন তাই আজ আর নেই, মিজোরামে এখন দিব্যি ঘুরে-বেড়িয়ে আসা যায়। মিজোরামকে এখন ভারতের ‘দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার’ দ্বার হিসাবে গড়ে তোলা হচ্ছে। কি সহজ সমাধান – কিন্তু এর জন্য কেন সশশ্ত্র আন্দোলন করতে হল?

গত, তিন চার বছর আমি বিভিন্ন মাধ্যমে সব বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি, সরকার আর সেনাবাহিনীর বক্তব্য পড়েছি। ফলাফলে, আমি আমি সমাধান খুঁজে পাইনি খুব একটা। তবে অর্থনৈতিক ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত, আর লেখকের সাথে ভিন্নমত। আর এও বলতে পারি, যে শিক্ষা আর অর্থনীতির সাথে এই সমস্যাও আস্তে আস্তে দূর হবে। কুইবেকে জনগণ তো ভোট দিয়ে কানাডায় অন্তর্ভুক্তির স্বীকৃতি দিয়েছে। এখন, সত্যি কথা বলতে আমি রাষ্ট্র ব্যাপারটাকেই সমর্থন করতে পারি না। ধর্ম আর ভাষার মত মানুষের ওপর আবার এও এক ‘পরিচয়’ চাপিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা। মানুষই আসল, রাষ্ট্র, ধর্ম আর ভাষা সবই ভুল, আরোপিত। রাষ্ট্রনীতি গঠনের সময় সেই ব্যাপারটাতে গুরুত্ব দিলে আমার মনে হয় না সমস্যার কিছু আছে। আমি আশা করব ভবিষ্যতে ভারত-সরকার নীতি নির্ধারণের সময় ‘মেজরিটি’ আর ‘মাইনরিটি’র কথা বা ভেবে শুধু মানুষের কথা ভেবেই চিন্তা-ভাবনা চালাবে।

টাইমে ভারত

জানুয়ারি 11, 2008 লিখেছেন Diganta

টাইম ম্যাগাজিন সম্প্রতি ভারতের স্বাধীনতার ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে অনেকগুলো লেখা বের করেছে। লেখা গুলো পড়ে ভাল লাগল। ভারতের ভাল-খারাপ দিকগুলো তুলে ধরা হয়েছে। আর আছে একটা অসাধারণ ফোটো সিকোয়েন্স – যাতে ৬০ বছরের ইতিহাস সংক্ষেপে প্রতিফলিত হয়েছে।

প্রথম লেখাটায় কিছু সমকালীন ভারতীয় স্লোগানের উল্লেখ আছে। কিভাবে সেগুলো পরিবর্তিত হচ্ছে – “মেরা ভারত মহান” থেকে “মেরা ভারত জওয়ান”। দ্বিতীয় লেখায় আছে দেশ বিভাগের পরে দেশে আসা অসংখ্য রিফিউজির মধ্যে একটি পরিবারের কথা। তারা তিনটে জেনারেশনে কিভাবে আবার দাঁড়িয়ে গেল। তার পরেরটা মূলত পাকিস্তান নিয়ে, কিভাবে লাল মসজিদের ঘটনা আর তার পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান বিভক্ত হয়ে গেছে। তার সাথে আছে পাকিস্তানের ইতিহাস। তার পরে আছে ভারতীয় রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী কুশল পাল সিং এর কথা – যার কোম্পানী ডি-এল-এফ ভারতের সবচেয়ে বড় রিয়েল এস্টেট কোম্পানী। পাঁচে আছে গণতন্ত্র – এম যে আকবর আর রিজভির কথামত যা ভারতের সবচয়ে উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব। ছয়ে আছে ভারতীয় অর্থনীতির পুনরুত্থানের কথা। এখানে একটা ভাল কথা লিখেছে দেখলাম – ভারতকে দীর্ঘ ইতিহাসে কখনই গরীব দেশ বলে মনে করা হত না – মাত্র ২০০ বছরে একটা দেশ কি ভাবে গরিব হয়ে গেল সেটাও বিশ্লেষণ করা হয়েছে এই প্রবন্ধে। সাথে আছে চিরাচরিত সফটওয়ার শিল্পের কথা। শেষে আছে কিছু ব্যক্তির বক্তব্য।

লেখার ধারা বেশ ভাল। আমি মোটামুটি পাকিস্তান সংক্রান্ত অধ্যায়টা ছাড়া বাকি সবই পড়েছি। লেখায় গত ৬০ বছরের সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে – আর আশা ব্যক্ত করা হয়েছে যে ভারত আবার পুরোনো ইতিহাসের মত দিনে ফিরে যাবে।

মূল লেখা
ফোটো ব্লগ
পরিসংখ্যানে ভারত

দক্ষিণ কোরিয়া বনাম দক্ষিণ এশিয়া

জানুয়ারি 11, 2008 লিখেছেন Diganta

দক্ষিণ এশিয়া গত পঞ্চাশ বছরে কতটা পিছিয়ে গেছে তা সবাই মনে রাখে না। কিন্তু কিভাবে অন্যেরা এগিয়ে গেছে তা সত্যিই বিস্ময়কর।

ভারতের অর্থনীতি বর্তমানে ৯% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরকম পঞ্চাশ বছর চলতে পারলে দেশ কোথায় পৌঁছতে পারে তা বোঝা যায় এই তুলনায়। বোঝা যায় কিভাবে আমরা নিজেদের ধোঁকা দিয়ে নিজেদেরই ছোটো করেছি – একটা উদাহরণ দিয়ে। দক্ষিণ কোরিয়া এখন এশিয়ার দ্বিতীয় ধনীতম দেশ (বড় দেশগুলোর মধ্যে)। দেখা যাক তারা কিভাবে এত ধনী হয়ে গেল।

ছবিতে দেখুন নিতান্ত ষাটের দশক অবধি দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে আমাদের বিশেষ একটা পার্থক্য ছিল না। কিন্তু ১৯৬২ থেকে ১৯৮৯ অবধি তাদের অর্থনীতি ৮% হারে বৃদ্ধি পায়। ফলে তাদের মাথাপিছু গড় আয় মাত্র ৮৭ ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৪,৮৩০ ডলারে।

একটা প্রবন্ধে সেদিন পড়লাম ওদের ‘সাক্সেস স্টোরি’। মূল কারণ বলা হয় চারটি -
১) ভাল সরকার, শিক্ষা আর পরিকাঠামোমুখী নীতি।
২) জাপান ও আমেরিকার সাহায্য।
৩) শিল্পক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার
৪) শক্তিশালী প্রাইভেট সেক্টর

আমার এতসব লেখার লক্ষ্য একটাই। যারা মনে করেন পুঁজীবাদী ব্যবস্থা খারাপ আর এই ব্যবস্থায় মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি ঘটে না, তারা কিভাবে এর ব্যাখ্যা দেবেন? মানুষের উন্নতি কি অর্থনৈতিক উন্নতি ছাড়া সম্পূর্ণ হয়?

তাছাড়া আমাদের কলোনিয়াল হ্যাংওভারের কারণে আমরা বিদেশী পুঁজী ভয় পাই। দক্ষিণ কোরিয়া বিদেশ থেকে পুঁজী বা প্রযুক্তি দুই-ই নিয়ে দেশ গঠন করেছে। তাতে তাদের কি সার্বভৌমত্বের ক্ষতি হয়েছে?

মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার একটি মৌলিক অধিকার। আমাদের দেশগুলোর নীতি-নির্ধারকের সেটা মাথায় রেখে নীতি নির্ধারণ করেন না। কবে যে সুদিন আসবে এখানে …

বুদ্ধির ক্রমবিকাশ – ৩

জানুয়ারি 11, 2008 লিখেছেন Diganta

মস্তিষ্ক কিভাবে প্রজাতিভেদে সরল থেকে জটিল ও জটিলতর আকার ধারণ করল, তা বোঝা গেল। কিন্তু মস্তিষ্কের বিবর্তনের আরো একটি মাত্রা আছে। একই জীবের জীবদ্দশায় শিশুবয়স থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স অবধি তার মস্তিষ্ক একইরকম থাকে না – পরিবর্তিত হয়। কিভাবে আপাত সরল শিশুমস্তিষ্ক পরিণত হয় প্রাপ্তবয়স্কের জটিল মস্তিষ্কে, তা বিবর্তনের অন্য এক মাত্রা।

নিউরোন ও সাইন্যাপস

মানবমস্তিষ্কের মূল গঠন-উপাদান হল নিউরোন। মস্তিষ্কে মোট ১১ বিলিয়ন স্নায়ুকোষ বা নিউরোন থাকে। এই কোষগুলো বৈদ্যুতিক সঙ্কেতের আকারে অনুভূতি পরিবহন করতে পারে। এদের দুই প্রান্তে যে শাখাপ্রশাখার মত প্রবর্ধক থাকে তারা হল ডেন্ড্রাইট, আর মূল তন্তুর মত অংশের নাম অ্যাক্সন। ডেন্ড্রাইট হল সঙ্কেতগ্রাহক অ্যান্টেনার মত, যা অন্য নিউরোন থেকে সঙ্কেত গ্রহণ করে। অ্যাক্সন সেই সঙ্কেত পরিবহন করে অপরপ্রান্তের ডেন্ড্রাইটে নিয়ে যায়। দুটি বা ততোধিক নিউরোনের সংযোগস্থলকে বলে সাইন্যাপ্স, যেখানে এদের সঙ্কেত বিনিময় হয়। মানুষের করটেক্সে মোটামুটি ১০,০০০ এর মত সাইন্যাপ্স থাকে। সাইন্যাপসের ‘ওয়ারিং’-এর মাধ্যমেই আমাদের মস্তিষ্ক জটিল থেকে জটিলতর হয়ে ওঠে।

মস্তিষ্ক ও জিন

অনেককাল আগে মস্তিষ্ককে একটি অপরিবর্তনশীল অঙ্গ বলে মনে করা হত। প্রথম সেই ভ্রান্ত ধারনার অবসান ঘটান রজার স্পেরি। পঞ্চাশের দশকে কিছু পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন মস্তিষ্ক গঠনে বংশগতির বাহক জিনের ভূমিকা আছে। মাছের চোখের সাথে মস্তিষ্কের চক্ষুকেন্দ্র সংযোগকারী স্নায়ু-তন্তুগুলোকে মস্তিষ্কের অন্য জায়গায় জুড়ে দিলেন। কিন্তু কিছুদিন পরে দেখা গেল নিজে থেকেই কিছু তন্তু গজিয়ে আবার চক্ষুকেন্দ্রের সাথে সংযোগ সাধন করে ফেলেছে। একই পরীক্ষা ইঁদুরের ওপরেও করে দেখা গেল, যে স্নায়ু-তন্তুগুলো যেন আগে থেকেই জানে কোন পেশীতে তারা আবদ্ধ থাকবে, অন্য জায়গার সরিয়ে দিলেও তারা আগের জায়গার সাথে সংযুক্তির প্রচেষ্টা করে। তিনি এ থেকে ধারণা করেন যে শরীরে স্নায়ু-তন্তুর সংযুক্তি জীবের জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। মস্তিষ্কের আরো বিভিন্ন চিকিৎসাপদ্ধতি আবিষ্কার করার জন্য তিনি ১৯৮১ সালে নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন।
কিন্তু এই ধারণার মধ্যে কিছু গোলমাল ছিল। জিন আবিষ্কারের পর দেখা গেল সাড়ে তিন বিলিয়ন একক তথ্য রাখার ক্ষমতা আছে, যেখানে মস্তিষ্কে স্নায়ু-সংযুক্তি বা সাইন্যাপসের সংখ্যা এক হাজার মিলিয়ন মিলিয়ন (একের পিঠে ১৫টি শূন্য)। কি করে তাহলে জিনের মধ্যে সমস্ত সাইন্যাপসের অবস্থানগত তথ্য সঞ্চিত থাকা সম্ভব?

প্রশ্নটি ভালভাবে বুঝতে গেলে জীবজগতের একটি উদাহরণ দেখা যেতে পারে। Daphnia Magna বলে একধরণের মাছ, অযৌন জননের মাধ্যমে বংশবিস্তার করতে পারে – উৎপন্ন অপত্য ক্লোনের মত মায়ের সম্পূর্ণ জিনগত বৈশিষ্ট্য লাভ করে। এরকম কিছু অপত্যের মধ্যে দেখা গেল, তাদের নিউরোনের সংখ্যা সমান হলেও সাইন্যাপসের অবস্থান ও জটিলতা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। তাহলে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ, যে সাইন্যাপস গঠনে জিনের ভূমিকা নেই, থাকলেও নগন্য।

এখন প্রশ্ন হল যদি জিনের মধ্যেই সংযোগের জন্য কোনো তথ্য না থাকে, তাহলে কিভাবে নিউরোনগুলো ঠিকঠাক চিনে ঠিক জায়গায় লেগে থাকছে? একটা বিড়ালের দুটো চোখ থেকে আসা নিউরোনগুলো মস্তিষ্কের পাশাপাশি অংশে কি ভাবে লেগে যায়? সূত্র খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীদের নজর গেল অনেক আগে প্রকাশিত কিছু তথ্যের ওপর। ১৯০৬ সালে ভিক্টর হামবার্গার দেখেছিলেন যে, মুরগীর ভ্রূণের সুষুম্নাকান্ডের একটি বিশেষ অংশে যেখানে ২০,০০০ নিউরোন থাকে, সেখানে একই জায়গায় প্রাপ্তবয়স্ক মুরগীর থাকে ১২,০০০ নিউরোন। শুধু তাই নয়, দেখা গেল, নিউরোন শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে একটি অঞ্চলের দিকে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। আর এই বৃদ্ধি ওই অঞ্চলে উপস্থিত কোন রাসায়নিক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। নিউরোনের বৃদ্ধি ঘটে রাসায়নিক দ্বারা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে।

কিন্তু এরকম রান্ডমভাবে বেড়ে ওঠা নিউরোনের শাখাপ্রশাখা ও সংযুক্তির সংখ্যা অনেক বেশি হবার কথা। সেই সংযুক্তির সংখ্যা ধীরে ধীরে প্রাপ্তবয়স্ক জীবের মধ্যে কমে আসবে। যেমন ধরা যাক বিড়ালটার কথা। তার জন্মাবস্থায় দুটো চোখের নিউরোনই একই জায়গায় লেগে থাকে। কিন্তু বাঁ চোখ থেকে আসা তন্তু থেকে আসা সংকেত মস্তিষ্কের যে অংশে প্রক্রিয়াকরণ হয়, সেই অংশ ছাড়া আর সমস্ত অংশের সাথে সংযুক্তি আস্তে আস্তে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সে জন্য প্রাপ্তবয়স্ক বেড়ালের চোখে সঠিকভাবে বিভিন্ন অংশের স্নায়ু-তন্তু ঠিক ঠিক পেশী বা অংশে সংযুক্ত থাকে।

এবার প্রশ্ন হল, কিভাবে শরীর নির্ণয় করে কোন কোন সংযুক্তি দরকার আর কোনটি দরকার নেই? উত্তর জানা গেল ডেভিড হুবেল আর টরস্টেন ওয়েসেলের পরীক্ষায়। তারা সদ্যোজাত একটি বিড়ালের একটি চোখ কোনরকম ক্ষতিগ্রস্ত না করে আবরণ দিয়ে বন্ধ করে দিলেন। এক সপ্তাহ পরে, বিড়ালটির দুটো চোখের সাথে মস্তিষ্কের সংযোগের মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্টভাবে বোঝা গেল। যে চোখটি বন্ধ ছিল, তার তুলনায় খোলা চোখের সাথে মস্তিষ্কের সংযুক্তি অনেক ভালভাবে ঘটেছে, তুলনায় বন্ধ চোখের সংযুক্তির সংখ্যা অনেক কম। সিদ্ধান্ত নেওয়া হল – এই নিউরোনগুলো মস্তিষ্কে সংযুক্তির জন্য নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়, যে যত বেশী অনুভূতি বহন করে, প্রতিযোগিতায় তার জেতার সম্ভাবনাও বেশি।এই কারণেই, কারোর শিশুবয়সে চোখ খারাপ হয়ে গেলে, প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যাবার পরে তার চোখের অপারেশন করেও দৃষ্টি ফিরে পাওয়া শক্ত – ততদিনে তার চোখ-মস্তিষ্ক সংযোগকারী স্নায়ুতন্তু বিলুপ্ত হয়েছে। হুবেল আর ওয়েসেল মস্তিষ্কবিজ্ঞানে অবদানের জন্য ১৯৮১ সালে স্পেরির সাথে নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন।

তাহলে বোঝা গেল, যে আমাদের মস্তিষ্ক সহ স্নায়ুতন্ত্র জিন ও পরিবেশের প্রভাবে গঠিত হয়। জিন যেমন সামগ্রিক কাঠামো তৈরীতে ভূমিকা পালন করে, তেমনই নিউরোনগুলোর সংযুক্তি নির্ভর করে পরিবেশ থেকে আসা সংকেতের ওপরে। তাই, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে দেখা যায় তার মস্তিষ্কের ক্ষমতা জিন এবং পরিবেশ – দুয়ের ওপরেই নির্ভর করে।

সাম্প্রতিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, সদ্যোজাত জীবের মস্তিষ্কে প্রয়োজনের প্রায় দ্বিগুণ সংখ্যায় নিউরোন থাকে – আর জন্মানোর পরে ধীরে ধীরে সংকেতের রকমফেরে ‘অতিরিক্ত’ নিউরোনগুলো ‘এলিমিনেট’ (eliminate) হতে থাকে। ভাষাবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে শিশুবয়সে মানুষের দুটো বিভিন্ন ধ্বনির মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা বেশি থাকে, তাই তারা তাড়াতাড়ি নতুন ভাষা শিখতে পারে। জেনি বলে আমেরিকান এক কিশোরী তার জীবনের প্রথম তেরো বছর মানব-সংস্পর্শ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সে বাকি জীবনে আর কোনো ভাষা শিখে উঠতে পারে নি। একই কারণে শিশুবেলার স্মৃতি খুব অস্পষ্ট – সাধারণত মানুষ মনে রাখতে পারে না।

স্মৃতি ও জ্ঞান আহরণ

কিন্তু তাহলে স্মৃতি কি করে কাজ করে? যদি নিউরোন কমেই যায় তাহলে মানুষ কি প্রাপ্তবয়স্ক হলে শিখতে পারত? একজন বাঙালী যখন হিন্দি শেখে তখন সে প্রতিটি বাংলা শব্দের হিন্দি প্রতিশব্দ মনে রাখার চেষ্টা করে। প্রাপ্তবয়স্ক হলে তার মস্তিষ্কে ভাষার জায়গাতে তো আগেই বাংলা শব্দগুলো বসে আছে, প্রতিশব্দগুলো যাবে কোথায়?

জ্য পিয়ের শানগেক্স ধারণা করেন জন্ম থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত নিউরোন শুধু কমে চলে না, সাইন্যাপ্স বা সংযুক্তিগুলো বাড়া কমা চলে। এদের সংখ্যায় বাড়া-কমা নিয়ন্ত্রিত হয় ওই অংশে কতটা সঙ্কেত পরিবাহিত হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে। নিউরোন-সংযোগের এই ধর্মকে ডারউইনের ‘যোগ্যতমের উদ্বর্তন’ তত্ত্বের কথা মাথায় রেখে নাম দেওয়া হয় নিউরাল ডারউইনিসম। প্রতিটি নতুন শিক্ষা বা নতুন জ্ঞান আমাদের মস্তিষ্কে নিউরোনের ও তাদের সংযুক্তিগত বিন্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে জায়গা করে নেয়। শানগেক্স তার এই ধারণার স্বপক্ষে কোন প্রমাণ পেশ করতে পারেননি। সম্প্রতি উইলিয়াম গ্রীনাফ দেখিয়েছেন যে, কঠিন পরিস্থিতিতে পড়লে, প্রাপ্তবয়স্ক ইঁদুরের মস্তিষ্কে নিউরোন-সংযোগের সংখ্যা ২০% অবধি বৃদ্ধি পেতে পারে। তাই এখন বলা হয়, সংযোগ বাড়া-কমার মাধ্যমেই জীব নতুন জিনিস শেখে।

আসলে, প্রতিনিয়ত মস্তিষ্কে সংযোগ তৈরি হয়, বিলুপ্তও হয়। প্রতিকূল পরিবেশে মস্তিষ্কে বেশী অনুভূতি পরিবাহিত হয় বলে বেশীসংখ্যক সংযোগ বেঁচে যায়, কমসংখ্যক বিলুপ্ত হয়। এভাবেই মস্তিষ্ক অভিযোজিত হয় আর নতুন অভিজ্ঞতা ধরে রাখে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে সংযোগ উৎপাদন ও বিলুপ্তি, দুয়েরই হার কমে যায়, তাই প্রাপ্তবয়স্করা শিখতে বেশী সময় নেয়। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে নতুন জ্ঞান, ‘কতটা নতুন’ তার ওপরেও নির্ভর করে সে শিখতে কতটা সময় নেবে, কারণ নিউরোনের বিন্যাস তত বেশি পরিবর্তিত হতে হবে। জীববিজ্ঞানী উইলিয়াম কেলভিনও এই মতের সমর্থক।

সঠিক কি উপায়ে মস্তিষ্ক স্মৃতি সঞ্চয় করে বা নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে, তার স্বপক্ষে এখনো কোনো বাস্তব পরীক্ষা-প্রমাণ নেই। তাই বিষয়গুলো যথেষ্ট বিতর্কিত। একবিংশ শতকে নতুন গবেষণার মাধ্যমে সেই সত্য উদ্ঘাটিত হবে – এরকমই আশা রাখি।

সূত্র –
১) http://faculty.ed.uiuc.edu/g-cziko/wm/05.html
২) http://williamcalvin.com/
৩) http://www.stevenharris.com/theory/085.htm

বুদ্ধির ক্রমবিকাশ – ২

জানুয়ারি 11, 2008 লিখেছেন Diganta

সুতরাং একটা বিষয়ে একমত হওয়া যেতে পারে যে বুদ্ধির ক্রমবিকাশ একরকম মস্তিষ্কের ক্রমবিকাশের মাধ্যমেই ঘটেছে। আর মস্তিষ্ক হল স্নায়ুতন্ত্রের কেন্দ্রস্থল। তাই স্নায়ুতন্ত্র থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে বিবর্তনের পথে মস্তিষ্ক গঠিত হয়েছে। অন্যভাবে ভাবলে বলা যায়, আমাদের বুদ্ধি আমাদের বহির্জগতের সাথে তথ্য আদান-প্রদানে সাহায্য করে। তথ্য আমরা বহির্প্রকৃতি থেকে গ্রহণ করি, প্রক্রিয়াকরণ করি আর শেষে আমাদের আচরণের মাধ্যমে তা প্রতিফলিত হয়।

স্নায়ুতন্ত্রের কাজ হল এই সব প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা।
আদিমতম প্রাণী থেকে আরম্ভ করে মানবপ্রজাতি পর্যন্ত বিবর্তনের ইতিহাসে অন্যতম এক ভূমিকা নিয়েছে এই স্নায়ুতন্ত্র। বিবর্তনের মূলনীতি যদি ভেবে দেখা যায় – যে বৈশিষ্ট্য বাঁচার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়, তাই পরবর্তীকালে ভিন্ন প্রজাতির উৎপত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্নায়ুতন্ত্রের বিবর্তনের ক্ষেত্রে যে মূলনীতি কাজ করে, তা হল – “ভালর কাছে যাওয়া আর খারাপ থেকে দূরে থাকা”। বিবর্তনের পথে, ভাল বলতে বোঝায় যা কিছু বাঁচার বা বংশবিস্তারের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে – যেমন খাদ্যসংগ্রহ, প্রজননের স্থান নির্ণয় বা শিকার করা। আর খারাপ থেকে দূরে থাকা হল ক্ষতিকর রাসায়নিক বা শিকারীর নজর এড়িয়ে যাওয়া।

যদি এককোষী প্রাণীর কথা ভাবা যায়, তারা ক্রমাগত কিছু রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শে আসতে থাকে – কিছু ভাল (খাদ্য) আবার কিছু ক্ষতিকর। স্বাভাবিকভাবেই, সঠিক রাসায়নিক চিনে নেবার আংশিক ক্ষমতাও এধরনের কোষকে বিবর্তনের পথে বেশী সুবিধা প্রদান করে। একটি উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, একটি গোলাকার এককোষী প্রাণী কোনো এক পার্শ্বে ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শে এলে যদি শরীরে কোনো রাসায়নিক উৎপাদনের মাধ্যমে সংকুচিত হয়ে উপবৃত্তাকার ধারণ করতে পারে, তার সেই প্রতিক্রিয়া তাকে বিবর্তনের ক্ষেত্রে সুবিধা দেবে। জীবজগতে এরকম এককোষী প্রাণী প্রচুর দেখা যায়।

এবার আসা যাক বহুকোষী জীবের ক্ষেত্রে। বহুকোষী জীবকে অনেকগুলো এককোষী জীবের সমষ্টি বলে গণ্য করা যায়। এদের মধ্যেও একইরকম প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। জেলিফিসের বহির্ত্বকে অবস্থিত কিছু কোষ স্পর্শ বা আলোর উপস্থিতি অনুভব করতে পারে।

প্রাথমিকভাবে বহুকোষী জীবে অনুভূতি পরিবাহিত হয় আন্তর্কোষীয় রাসায়নিক বিনিময়ের মাধ্যমে। খুব স্বাভাবিকভাবেই, যে কোষগুলো দীর্ঘতর, তারা এ কাজে বেশী পারদর্শী ছিল। তাই মানুষের স্নায়ুকোষ যে সবচেয়ে লম্বা কোষ, এটা কোনো অঘটন নয়।

সাধারণভাবে, যে যে জীববৈশিষ্ট্য জীবনধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তারা সবই বিবর্তনের পথে জীবের এক একটি অঙ্গের বিশিষ্ট কাজ হয়ে দাঁড়ায়। স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম দেখা যায় না। তাই, উন্নততর কীটপতঙ্গের স্নায়ুতন্ত্র কেন্দ্রীভূত হয়ে একটি মস্তিষ্ক গঠিত হয়। কেন্দ্রীয়করণের সুবিধা খুবই সুস্পষ্ট। এর ফলে শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে আসা অনুভূতির একত্রে প্রক্রিয়াকরণ সম্ভবপর হয়। যেমন, কান থেকে আসা শব্দ আর চোখ থেকে আসা দর্শন অনুভূতি একত্রে কেন্দ্রীভূত হলে তাদের সহজে প্রক্রিয়াকরণ বা অনুধাবন করা যায়। তাই কীটপতঙ্গের ক্ষমতাও পূর্ববর্তী জীবের থেকে অনেকটাই উন্নত – বিষ দিয়ে শিকার ধরা, সাঁতার কাটা, বা মৌমাছির নৃত্য এই সাধারণ মস্তিষ্ক দ্বারা পরিচালিত হয়।

মেরুদন্ডীদের ক্ষেত্রে এই স্নায়ুতন্ত্রের মূল পথটি মেরুদন্ড দিয়ে সুরক্ষিত। শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে অনুভূতি বয়ে আনে আর প্রতিক্রিয়া ফিরিয়ে দেওয়ার এক হাইওয়ের মত কাজ করে সুষুম্নাকান্ড। এভাবেই স্নায়ুতন্ত্রে, এমনকি মস্তিষ্কেও আলাদা আলাদা বিশিষ্ট অংশে একেকটি কাজ করার প্রবণতা দেখা দেয়। যেমন, চোখের জন্য একধরণের স্নায়ুতন্ত্র ও তাকে প্রক্রিয়াকরণের জন্য একটি মস্তিষ্কের বিশেষ অংশ কাজ করে। এর সুবিধা হল এরকম একটি জটিল গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের যাতে একটি অংশ খারাপ হয়ে গেলেও অন্যগুলো কাজ চালিয়ে যেতে পারে – আর এই সুবিধার ফলে বিবর্তনের মাধ্যমে এই বৈশিষ্ট্য উন্নততর জীবের মধ্যে প্রতিয়মান হয়।

মস্তিষ্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিবর্তন হল স্মৃতি-সংরক্ষণ। আগেই বলেছি ভাল থেকে খারাপকে আলাদা করার কাজে সমগ্র স্নায়ুতন্ত্রের ভূমিকা আছে। এই কাজে যদি আগের অভিজ্ঞতার সাহায্য পাওয়া যায় তাহলে সুবিধা বেশি – তাই যে অংশ এই কাজে পারদর্শী, তাও নির্বাচনের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজাতির বৈশিষ্ট্য হয়ে যায়। যেমন, আগে কোনো খাবার খারাপ বলে নির্বাচিত হয়ে থাকলে, পূর্ব-অভিজ্ঞতার কারণে জীব সেই ফল আবার খাওয়া থেকে বিরত থাকে। এজন্যে মস্তিষ্কের অবস্থা (state) পরিবর্তিত হতে হবে। এই বৈশিষ্ট্যকে বলে স্থিতিস্থাপকতা। সবশেষে বলা যায় মস্তিষ্কে স্নায়ুকোষের সংখ্যা বা আকার বেড়ে চলেছে যাতে আরো জটিলতর সমস্যার সমাধানে আরো বেশী তথ্য চলাচল করতে পারে আর মস্তিষ্কও আরো পারদর্শী হতে পারে।

তাহলে ভাল আর খারাপের বিভেদ করার জন্য যে সিস্টেমের উদ্ভব, তাই ক্রমে চতুর্মুখীভাবে বিবর্তিত হয়ে মস্তিষ্ক গঠিত হয়। এই চারটি বিবর্তনের অভিমুখ হল – কেন্দ্রীয়করণ (Centralization or Cephalization), অংশীয়করণ বা এককীকরণ (modularization), স্থিতিস্থাপকতা (Plasticity) আর স্নায়ুকোষের সংখ্যা বৃদ্ধি।

জীববিজ্ঞানী উইলিয়াম কেলভিনের মতে, বরফ যুগের তাপমাত্রার আকস্মিক হ্রাস মানুষের মস্তিষ্কের ক্ষমতা একেবারে অনেকটা বৃদ্ধি করেছিল – কারণ আকস্মিক পরিবেশ পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে মস্তিষ্কই ছিল তার একমাত্র হাতিয়ার। তার মতে একসময়, মস্তিষ্কের একেকটি অংশ একাধিক কাজ করত। ধীরে ধীরে কোনো কোনো কাজ যত মানুষকে প্রকৃতিতে সুবিধা দিয়েছে, তত তা বিশিষ্ট অংশের কার্যকারিতায় পরিণত হয়েছে। যেমন, মস্তিষ্কের ভাষাকেন্দ্র আসলে চলন ও গমনে সাহায্যকারী কেন্দ্রের বিবর্তিত রূপ। বিবর্তনের এই ধারা সম্পর্কে মস্তিষ্কের বিবর্তন নিয়ে জীববিজ্ঞানী স্টেফান গাল্ডের ব্যবহৃত পরিভাষা খুবই জনপ্রিয় – এক্সাপটেশন (Exaptation)। জীবজগতের অধিকাংশ জটিল বৈশিষ্ট্য এভাবেই ধাপে ধাপে ক্ষুদ্র পরিবর্তনের মাধ্যমে এবং একই অঙ্গের একাধিক ব্যবহারের মাধ্যমে উদ্ভূত হয়। মস্তিষ্ক তারই একটি আদর্শ উদাহরণ।

মস্তিষ্ক কিভাবে প্রজাতিভেদে সরল থেকে জটিল ও জটিলতর আকার ধারণ করল, তা বোঝা গেল। কিন্তু মস্তিষ্কের বিবর্তনের আরো একটি মাত্রা আছে। একই জীবের জীবদ্দশায় শিশুবয়স থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স অবধি তার মস্তিষ্ক একইরকম থাকে না – পরিবর্তিত হয়। কিভাবে আপাত সরল শিশুমস্তিষ্ক পরিণত হয় প্রাপ্তবয়স্কের জটিল মস্তিষ্কে, তা বিবর্তনের অন্য এক মাত্রা।

বুদ্ধির ক্রমবিকাশ

জানুয়ারি 11, 2008 লিখেছেন Diganta

বুদ্ধিমত্তার ক্রমবিকাশ সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে প্রথমে বুদ্ধিমত্তার সংজ্ঞা নিরুপণ করতে হয়। বুদ্ধি কি? অধিকাংশ মানুষের মতে সমস্যার সঠিক সমাধান করাই বুদ্ধিমত্তার আসল পরিচয়।তবে বারট্রান্ড রাসেলের মতে সমস্যা সমাধানের পদ্ধতিও বুদ্ধি যাচাই করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ – বারবার প্রচেষ্টায় সমস্যার সমাধান করা আর সমস্যার গভীরে গিয়ে মৌলিক সমাধান করার মধ্যে পার্থক্য অনেক। বুদ্ধিমত্তার আরেকটা নিদর্শন পাওয়া যায় দূরদর্শিতার মধ্যে। নিউরোলজিস্ট হোয়ার্স বার্লোর মতে, আপাতদৃষ্টিতে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু ঘটনার মধ্যে নির্দিষ্ট সূত্র খুঁজে বের করার মধ্যেই বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ। আলোচনায় যুক্তিপূর্ণ মতামত জ্ঞাপন, নিখুঁত তুলনা খুঁজে বের করা, ভবিষ্যতবাচ্যতা বা অনুমান করা যা এরপরে কি উত্তর পেতে চলেছে – এ সবই বুদ্ধির বহিঃপ্রকাশ। বুদ্ধিমত্তার সর্বজনীন সংজ্ঞা হয়ত দেওয়া সম্ভব নয়, যেমন চেতনাকে সংজ্ঞায়িত করা যায় না।

যেকোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য হল সে একাধারে একাধিক মতামত নিয়ে চিন্তা করতে পারে, এবং সে দ্রুত প্রত্যেকটি মতামতে অনেকগুলো দিক ভাবতে পারে। বহুমুখী প্রতিভাও বুদ্ধিমত্তার নিদর্শন। খাবার ব্যাপারে জীবজগতে অধিকাংশই একমুখী, কিন্তু সর্বভুক প্রাণীরা সবসময়েই সুবিধা পেয়ে আসে। যেমন প্রকৃতি পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেবার ক্ষমতা সর্বভুক প্রাণীদেরই বেশি, তাই বরফ যুগে (ice age) যখন খাবারের অভাব দেখা দিয়েছিল, তখন সর্বভুক প্রাণীরা বিশেষ অসুবিধা ছাড়াই বেঁচে থাকতে পেরেছিল।

জীবজগতের মধ্যে অনেক বিস্ময়কর কার্যকারিতা দেখা যায় যা তাদের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আপাত ধারণা তৈরি করে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা হয় কোনো প্রোটিন, উৎসেচক বা হরমোন নিয়ন্ত্রিত। খুব সহজেই তাদের বোকা বানানো সম্ভব। কাঠবেড়ালি শীত পড়ার আগেই খাবারদাবার সঞ্চয় করে রাখে। কাঠবেড়ালির ক্ষেত্রে মেলাটোমিন নামে এক হরমোন রাতে ক্ষরিত হয়, তাই রাতের দৈর্ঘ্য বাড়ার সাথে সাথে সেই হরমোনের প্রভাবে তারা বুঝে নেয় যে শীত আসন্ন। তাই, পরিকল্পনার নিদর্শন হলেও এটা কাঠবেড়ালির বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক নয়।

পরিকল্পনা বুদ্ধিমত্তার এক অন্যতম নিদর্শন। আর এই পরিকল্পনা যত দূরদর্শী, জীব তত বেশী বুদ্ধিমান। ধাপে ধাপে পরিকল্পনা করার ক্ষমতা তাই জীবজগতে শুধুমাত্র উন্নততর প্রাণীদের মধ্যেই দেখা যায়। ধরা যাক একটা শিম্পাঞ্জী বনে এক জায়গায় খাবারের সন্ধান পেল। সে তখন অন্য কোনো জায়গায় সরে গিয়ে চিৎকার করে তার সঙ্গীদের ডাকবে। অন্য শিম্পাঞ্জীরা যতক্ষণে ভুল গন্তব্যে পৌঁছবে, ততক্ষণে সে খাবার নিয়ে সটকে পড়বে, অন্যেদের ভাগ না দিয়েই। সন্দেহ নেই, পরবর্তী কয়েকটি ধাপে চিন্তা করার ক্ষমতার জন্যেই শিম্পাঞ্জীরা এরকম পরিকল্পনা করতে সক্ষম।

ভাল করে ভেবে দেখলে বোঝা যায় যে উপরোক্ত ক্ষেত্রে একই কাজ বারবার করতে থাকলে বাকিরা তো বুঝে যাবে, তাহলে এটা কিভাবে বুদ্ধিমত্তা বলা যায়? তাই আসল বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায় অনন্য পরিস্থিতিতে – যে অবস্থায় জীব আগে কখনও আসে নি। আর এখানেই মানুষের জয়জয়কার। উপরোক্ত ক্ষেত্রে মানুষ যদি তার সঙ্গীদের এভাবে ধোঁকা দিত, তাহলে প্রতারক মানুষটিকে বারবার নতুন নতুন পন্থার সাহায্য নিতে হবে – উদ্ভাবনী ক্ষমতার সাহায্যে। এই উদ্ভাবনী ক্ষমতাই মানুষের সাথে অন্যেদের তফাৎ গড়ে দেয়।

জীবজগতে বুদ্ধির আরেক নিদর্শন পাওয়া যায় নকল করার ক্ষমতার মধ্যে। এই ক্ষমতা বিশেষত দেখা যায় কুকুর আর বানরের মধ্যে। কুকুর আসলে সামাজিক জীব, মানুষের শারীরিক ভাষা (body language) থেকে বুঝে নেয় হাবভাব। তাই, খবরের কাগজের দিকে তাকিয়ে খবর পড়ার মত করে কুকুরকে বল আনতে বললে কুকুর বল আনার প্রচেষ্টাও দেখাবে না। কুকুরের স্বাধীন ভাবে বোঝার ক্ষমতা খুবই সীমিত, তাই একটা কুকুরকে তালিম দিয়ে দশ-বারোটা বিভিন্ন কাজ করানো খুবই শক্ত কাজ।

মানুষের বুদ্ধিমত্তার অন্যতম প্রমাণ হল ভাষা – ধ্বনি বা শব্দ থেকে নির্দিষ্ট ব্যাকরণ সম্মত ভাবে বাক্য গঠন করা। জীবজগতে অনেক প্রাণীও বিভিন্ন ধ্বনি ব্যবহার করে, কিন্তু ব্যাকরণ ব্যবহার করার নিদর্শন অনন্য। শিম্পাঞ্জীরা প্রায় বারো ধরণের ধ্বনি ব্যবহার করে তথ্য আদানপ্রদানের জন্য – প্রতিটি ধ্বনি আবার বিভিন্ন প্রাবল্যে উচ্চারণ করে তাদের অনুভূতিও জানিয়ে দেয়। মানুষও মাত্র ত্রিশ-চল্লিশটি বিভিন্ন মৌলিক ধ্বনি ব্যবহার করেই ভাষা গঠন করেছে। কিন্তু মানুষ একই ধ্বনি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার করতে পারে, এভাবেই সে তার ভাষার পরিধি বিস্তৃত করেছে। একই ধ্বনি দুটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন অর্থ বহন করেছে বা পরের পর এরকম ধ্বনি বা শব্দ জুড়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ভাব প্রকাশের নিদর্শন শিম্পাঞ্জীর মধ্যে নেই, যা আছে মৌমাছিদের মধ্যে।


একই ইঙ্গিত যে বিভিন্ন অর্থবহ হতে পারে, তা জীবজগতে মৌমাছিদের মধ্যে দেখা যায়। কিছু মৌমাছি যখন খাবার খুঁজে পায়, তারা তাদের মৌচাকে ফিরে এক অদ্ভূত নৃত্যে যোগদান করে। তারা লেজ ও পাখা শৃঙ্খলাবদ্ধ করে শেকলের (পরপর কয়েকটি বাংলা সংখ্যা ‘৪’-এর মত শেকল) মত আকার ধারণ করে। সেই শেকলের নির্দিষ্ট কোণ বলে দেয় খাবারের উৎস কোন অভিমুখে, আর শেকলের বলয়ের সংখ্যা নির্ধারিত হয় দূরত্ব অনুসারে। সাধারণভাবে দেখা গেছে, জার্মান মৌমাছিরা তিনটি বলয়ের মাধ্যমে ১৫০ মিটার বোঝায় আর ইটালিয়ান মৌমাছিরা বোঝায় ৬০ মিটার। তবে ভাষাতত্ত্ববিদেরা একে আলাদা গুরুত্ব দিতে নারাজ। আসলে, মৌমাছিদের বেঁচে থাকার একটি অভিন্ন অঙ্গ হল তাদের এই খাদ্যসংগ্রহের প্রক্রিয়া। তাদের অনন্য প্রক্রিয়া তাদের প্রাকৃতিক নির্বাচনে অন্য জীবের তুলনায় সুবিধা প্রদান করে, তাই জিনগত ভাবে এই প্রক্রিয়া এখন তাদের বৈশিষ্ট্য হয়ে গেছে। কিন্তু একই ঘটনা মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় – মানুষ ভাষা ব্যবহার করে যেকোনো কাজে, যেকোনো অনুভূতিতে – যা তাদের বেঁচে থাকতে সাহায্য করতেও পারে, নাও পারে।

আমাদের এই বুদ্ধির রহস্য কি? বিজ্ঞানীদের মতে – আমাদের মস্তিষ্ক। আরো সঠিক ভাবে বলতে গেলে – আমাদের সেরিব্রাল করটেক্স। ভাঁজ হয়ে থাকা আমাদের সেরিব্রাল করটেক্স চারটে A4 সাইজের পেপারের সমান আকার নিতে পারে। শিম্পাঞ্জীর ক্ষেত্রে এই আকার একটি সাইজের পেপারের মত, বানরের ক্ষেত্রে একটা পোস্টকার্ডের আকার আর ইঁদুরের ক্ষেত্রে এটার আকার মাত্র একটা স্ট্যাম্পের সমান। মস্তিষ্কের অনন্য বৈশিষ্ট্যই মানুষকে জীবজগতের চালকের আসনে বসিয়েছে – নিয়ে গেছে আন্টার্কটিকা থেকে হিমালয়ের চূড়ায়। কিভাবে বিবর্তনের মাধ্যমে তৈরি হল এই মস্তিষ্ক। কিভাবেই বা শিশুর সাধারণ বুদ্ধিমত্তা প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে বিকশিত হয়ে পরিণতি লাভ করে?

একটি ধর্মের উতস সন্ধানে

জানুয়ারি 11, 2008 লিখেছেন Diganta

ধর্মের উত্স নিয়ে রিচার্ড ডকিন্সের লেখা অনুবাদ করেছি। তার মধ্যে একটি অংশ খুব মজার – যেখানে ডকিন্স একটি নতুন ধর্মমত কিভাবে তৈরি হয় তা নিয়ে একটি কেস স্টাডি করছেন। কেস স্টাডি হল কার্গো কাল্ট নিয়ে।কার্গো কাল্ট হল প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জগুলোতে প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসগুলোর একটি সম্মিলিত নাম। এরা মনে করত কার্গো জাহাজ গুলো আসলে স্বর্গীয় দূতের প্রেরিত – আর সব সামগ্রী তাদের জন্য ঈশ্বর-প্রদত্ত। জাহাজের ইউরোপিয় নাবিকরা কিভাবে রেডিও শোনে, কিভাবে রাতে আলো জ্বালায় – সবই ছিল এই আদিবাসীদের বিস্ময়ের বিষয়। আসলে উন্নত টেকনলজির সাথে ম্যাজিকের খুব একটা তফাত নেই। পরবর্তীকালে তাদের ধর্মবিশ্বাসেও এইসব ‘ম্যাজিক’ প্রবেশ করে, গঠিত হয় মিশ্র ধর্ম।

ভানুয়াটুর তান্না দ্বীপে আমেরিকান নাবিকদের রীতিমত পূজো করা হত। তান্নায় একটি কাল্ট এখনও আছে – যার কেন্দ্রে আছে জন ফ্রাম নামে এক নাবিক। যদিও নিশ্চিতভাবে কেউ বলতে পারেনা এই নামে সত্যি কেউ ছিল কিনা, সরকারি নথি আনুসারে, ফ্রাম দ্বীপে এসেছিলেন ১৯৪০ সালে। তিনি অনেকগুলো ভবিষ্যতবাণী করে গিয়েছিলেন। তার বক্তব্য আনুসারে, তিনি আবার দ্বীপে ফিরে আসবেন, জাহাজ ভর্তি সামগ্রী নিয়ে, আর সাদা আমেরিকান ও মিশনারীদের দ্বীপ থেকে তাড়িয়ে দেবেন। এমনকি, তার পুনরাগমনের সময় তিনি প্রচলিত ঔপনিবেশিক মুদ্রার পরিবর্তে নতুন ধরণের মুদ্রার প্রচলন করবেন। সেই প্রভাবে ১৯৪১ সালে আদিবাসীরা কাজ বন্ধ করে দিল। যা টাকাপয়সা ছিল তা দিয়ে জিনিসপত্র কিনতে শুরু করল। দ্বীপের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হল। কিছুদিন পরে, যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকান বাহিনী দ্বীপে পদার্পণ করল, আদিবাসীরা মনে করল জন আসবে এবার। জনের বিমান যাতে দ্বীপে নামতে পারে, সেজন্য দ্বীপে রানওয়ে তৈরি হল, বাঁশের কন্ট্রোল টাওয়ার, হেডফোন বানানো হল।

পঞ্চাশের দশকে চিত্রপরিচালক ডেভিড অ্যাটেনবরো দ্বীপে যান তথ্যচিত্র তৈরির জন্য। দেখেন, নাম্বাস নামে এক স্বঘোষিত পুরোহিত নবগঠিত কাল্টের দায়িত্বে আছেন। তিনি জনের সাথে নিয়মিত ‘যোগাযোগ’ রেখে চলেন। জনের রেডিও-র সাথে যোগাযোগের পন্থাও অদ্ভূত। এক বৃদ্ধা, কোমরে বৈদ্যুতিক তার জড়ানো, মাঝে মাঝে অজ্ঞান হয়ে অস্ফুটস্বরে কথা বলতে থাকে। নাম্বাস সেটা বুঝে সবাইকে জানায় – এটাই হল জনের বার্তা। স্বাভাবিকভাবেই, তাদের সমাজে নাম্বাসের কদরই অন্যরকম। নাম্বাসের বক্তব্য অনুসারে কোনো এক বছর ১৫ই ফেব্রুয়ারী জন ফিরে আসবে। তাই, ঐ দিনে ধর্মীয় উৎসব পালন হয়, সবাই একটা খোলা জায়গায় একত্রিত হয়ে জনের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা জানায়।

সব দেখে অ্যাটেনবরো তার বন্ধু স্যামকে জিজ্ঞেস করেন যে কেন জনের পুনরাগমনের প্রতিশ্রুতির ঊনিশ বছর পরেও এরা একইভাবে জনের অপেক্ষায় বসে থাকে? স্যামের উত্তর, যদি আমরা দুহাজার বছর ধরে খ্রীষ্টের পুনরাগমনের প্রতীক্ষা করে যেতে পারি – তবে এরাই বা কেন মাত্র ঊনিশ বছর জনের জন্য প্রতীক্ষা করতে পারে না?
সম্পূর্ণ অনুবাদ :
ধর্মের উত্স সন্ধানে