Archive for the ‘ভারত’ Category

উপনিবেশের পরে

ডিসেম্বর 25, 2012

দেশ থেকে বাইরে কাটিয়ে দিলাম দীর্ঘ সাড়ে চার বছর। মাঝে দেশে গেছি বার-দুয়েক। দেশেও উন্নতি হচ্ছে, বড় বড় বিল্ডিং হচ্ছে, চাকরি হচ্ছে রাস্তাঘাট হচ্ছে – দিনে দিনে দিন-বদলের ছোঁয়া দেখা যায়। ধানক্ষেত জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে হাউসিং ডেভেলপমেন্ট জোনের জন্য। কিছু পরিবর্তন আমেরিকাতেও হচ্ছে। মন্দার পরবর্তী রাস্তাঘাট মেরামতের কাজ এখন কমে আসছে, যত মন্দা কাটছে ততই বোঝা যাচ্ছে মন্দার পরবর্তী রিকভারি হয়ত তত চাকরি আনবে না বাজারে। হাউসিং বাবল বার্স্ট করার পরে দাম আবার বাড়া শুরু হয়েছে বটে কিন্তু বাবলের সময়ের দামের কাছাকাছি পর্যায়ে যেতেও এখনও অন্তত বছর পাঁচেক বাকি। তাও তফাৎ চোখে পড়ে। প্রথম বিশ্ব আর তৃতীয় বিশ্ব নামগুলো ঠিক কে কিভাবে দিয়েছিল জানি না, দেশে গেলেই দুই বিশ্বের তফাতের কথা ভালভাবে বোঝা যায়। একটা বছর তিনেকের শিশু দুয়েক দিনেই হয়ত বুঝে যায় পার্থক্যটা।

ছোটবেলায় ইতিহাস-সাহিত্য বা সমাজ-বিজ্ঞানের ক্লাসে একটা ব্যাপার আমাদের মাথায় খুব ভালভাবে গেঁথে দেবার একটা চেষ্টা করা হয়েছে। আমাদের, মানে যারা একদা উপনিবেশ ছিলাম, সেই দেশগুলোর স্বাধীনতার সময় থেকেই এই বিষয়ে সকলে একমত – অন্যের উপনিবেশে পরিণত না হলে হয়ত আমরাও এমন উন্নত দেশই হতাম। ইতিহাসে পড়েছি, ইউরোপিয়ান ঔপনিবেশিকদের আসার আগে আমরা যথেষ্ট ধনীই ছিলাম – ইউরোপীয়রা দেশে আসার জন্য ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্র পার হত। শ’-দুয়েক বছরের ঔপনিবেশিক ইতিহাস সব বদলে দিয়ে গেছে। উপনিবেশকালে আমাদের দেশগুলো থেকে কাঁচামাল নিয়ে গিয়ে ইউরোপে শিল্প-কারখানায় ব্যবহার করা হত, আমাদের ন্যায্য মূল্য দেওয়া হত না। আমাদের গর্বের ক্ষুদ্র-কুটীর শিল্প ধ্বংস হয়ে গেছে উপনিবেশ অবস্থায়, দেশের বাজার ছেয়ে গেছে বিদেশী পণ্য-সামগ্রীতে। ঔপনিবেশিক প্রভুদের কৃষি বা কৃষকের বিষয়ে গুরুত্ব ছিল না – তাই আমাদের একের পর এক দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে স্বাধীনতার পরে আমরা দ্রুত উন্নতি করা শুরু করি। খাদ্য-বিষয়ক নিরাপত্তা এসেছে, স্বাস্থ্য-শিক্ষা সবকিছুতেই ভুরিভুরি উন্নয়নের নিদর্শন আসে স্বাধীনতার পরে। আসলে জাতি হিসাবে আমরা উন্নতই, পুরোনো ট্র্যাকে ফিরে যেতে কিছু সময় লাগছে আর কি। এমনকি অমর্ত্য সেনের লেখা পড়েও সেইরকম মনে হয়।

ইতিহাস মিথ্যা বলে। ইতিহাস বইতে ইচ্ছামত লিখে পাবলিশ করে দেওয়া যায়। কিন্তু পরিসংখ্যান মিথ্যা বলে না। তাই আমি পরিসংখ্যান দিয়েই দেখার চেষ্টা করলাম সত্যি কি ঘটেছে উপনিবেশ আর ঔপনিবেশিকদের মধ্যে। সহজ সূত্রে যদি ধরেই নেওয়া যায় যে উপনিবেশের কাঁচামালের পয়সায় ঔপনিবেশিকদের এত রমরমা, তাহলে ধরেই নেওয়া যায় যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যখন উপনিবেশগুলো এক-ধাক্কায় স্বাধীনতা পেয়ে গেল, তখন ঔপনিবেশিকদের সর্বনাশ আর উপনিবেশদের রমরমা।

কিন্তু এই গ্রাফ থেকে দেখি পুরো তার উল্টোটাই ঘটে চলেছে। মাথাপিছু গড় আয় – যা কিনা ব্যবহারিক জীবনে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের অন্যতম নির্ণায়ক, তা ঔপনিবেশিক দেশগুলোতে ঊর্ধ্বমুখী। ক্রমাগত মাটি ঘেঁষে চলার পরে এই শতকের পরে উপনিবেশগুলোতে কিছুটা হলেও গড় আয়ে কিছুটা উন্নতি দেখা যায়। দুইয়ের মধ্যে ব্যবধান বেড়েই চলেছে – এমনকি গত দশকেও এই ব্যবধান প্রায় দেড়গুণ বেড়েছে। যদিও আমরা অনেক আন্দোলনের মাধ্যমে ঔপনিবেশিকদের কাছ থেকে স্বাধীনতা আদায় করেছি, কিন্তু ব্যর্থতার গ্রাফ দেখে মনে হয় ওদেরই আমাদের স্বাধীনতা যেচে দিয়ে দেওয়া উচিত ছিল।

তাহলে এবার আসা যাক আসল প্রশ্নটাতে। কেন এই গ্যাপ? কেন বছরের পর বছর এই গ্যাপ বেড়েই চলেছে। প্রথম বিশ্ব কেন প্রথম থেকে যাচ্ছে আর তৃতীয় কেন আরো বেশী করে তৃতীয় থেকে যাচ্ছে? কবে থেকে এই তফাৎ কমবে? আমার কাছে কিছু কিছু ভাসা ভাসা উত্তর আছে – কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই। কিছু ধারণা করা যায় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী প্রথম বিশ্বের রাজনৈতিক পটভূমিকা থেকে। ইউরোপীয়দের কাছে আর উপনিবেশ নেই, তাই গত কয়েক দশকের উপনিবেশ নিয়ে যুদ্ধের বাতাবরণও নেই। জার্মানী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দ্রুত উন্নতি করে, কিন্তু এবারে আর তা নিয়ে বাকি দেশগুলোর সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হয় নি। সার্বিকভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর প্রথম বিশ্বে দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্কের বহুল উন্নতি ঘটে, আগের অর্ধশতকের বৈরিতার ইতিহাস মাথায় রাখলে তা অভাবনীয় ধরে নেওয়া যায়। এর কিছুটা কারণ ঠান্ডা যুদ্ধ – অন্যটা পুঁজীর বিকাশ। সম্পর্কোন্নয়ন যদি প্রথম কারণ হয়ে থাকে, দ্বিতীয় কারণ অবশ্যই অর্থনীতির ধারা। কাঁচামালের ওপর নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ায় প্রথম বিশ্বের অর্থনীতি আরো বেশী করে টার্শিয়ারী খাতে (সার্ভিস, ব্যাঙ্কিং, অটোমেশন, গাড়ি – ইত্যাদি সেক্টর) নির্ভর করতে থাকে, যার ভিত্তি হিসাবে তাদের শিক্ষাব্যবস্থা আর উদ্ভাবনী ক্ষমতার কথা মাথায় আসে।

অন্যদিকে প্রাক্তন উপনিবেশগুলোতে শক্তিশালী জাতীয়তাবাদের যে ধাক্কায় স্বাধীনতা এসেছিল, তার হাত ধরে দেশগুলো ব্যবসা-অবান্ধব হয়ে ওঠে। সময়ের উপযোগি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার জায়গায় কৃষি বা ক্ষুদ্রশিল্পের পেছনে বিনিয়োগ করা হয় রাষ্ট্রিয় সম্পদ। বিদেশী বিনিয়োগ থেকে দক্ষতা – অনেক কিছুই বর্জন করা হয়। এর ওপর তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর নিজেরদের মধ্যেও সম্পর্কও ভাল ছিল না। সবের ফলে সার্বিকভাবেই পিছিয়ে পড়তে থাকে তৃতীয় বিশ্ব – এবার আর পরাধীনতার কারণে নয়, নিজেদের ব্যর্থতায়। তবে সামাজিক পরিকাঠামোর উন্নয়নের ফলে ও বিজ্ঞানের সার্বিক অগ্রগতির কারণে স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মানে উন্নতি ঘটে – যার কিছুটা হলেও ফল উন্নয়নশীল দেশগুলো ভোগ করছে শেষ দশকে।

ইতিহাসে ফিরে গেলে কি মনে হয় আরো আগে স্বাধীনতা পেলে বা একেবারেই পরাধীন না হলে কি আমরা আরো ভাল থাকতাম? আমি এ নিয়ে সংশয়বাদী। আজ থেকে প্রায় শ’দেড়েক বছর আগে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের দিকে ফিরে তাকালে দেখি ভারতীয়রা তখন মুঘল বা মারাঠা রাজাদের পুনরায় মসনদে বসানোর জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু এর পেছনে কোনও আধুনিক রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নেই। মুঘল বাদশা’র ফরমান বা নানাসাহেবের বক্তব্যে যতটা ইংরেজ বিতাড়নের চেষ্টা আছে তার সিকিভাগও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা বা সংবিধান লেখার প্রচেষ্টা নেই। এর সাথে প্রায় আট দশক আগের আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণা দেখলে মনে হয় ১৮৫৭ সালেও ভারত বা ভারতীয়রা প্রস্তরযুগেই পড়ে ছিল। ওই সমসামিয়িক মার্কিণ কোর্ট তখন পেটেন্টের নন-অবভিয়াসনেস নিয়ে আলোচনা করছে। চার্লস ডারউইন বিবর্তন নিয়ে মানব-সমাজের গঠনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। আরও পিছিয়ে ভারতীয় ঐতিহাসিকদের প্রিয় মুঘল বাদশা আকবরের আমলে যদি ফিরে যাই তাহলে দেখা যায় বাদশা কিছুটা হলেও সমাজ-সংষ্কারের প্রচেষ্টা করেছেন বটে, কিন্তু সমসাময়িক ইউরোপের তুলনায় তা যথারীতি প্রস্তরযুগের। তার সমসাময়িক ইউরোপে গ্যালিলিও বা কেপলার গবেষণা করছেন অথচ আকবরের আমলে কোনও বিজ্ঞান-চর্চায় উৎসাহ দেবার লক্ষণ দেখা যায় না। শিল্প ও বাণিজ্য সম্পর্কে বাদশাহদের জ্ঞানও কোন অংশে বাড়তি পরে না। ব্রিটিশদের মুক্ত-বাণিজ্যের অধিকার দেবার সময় তারা কতটুকু লাভ-লোকসানের হিসাব করেছিলেন তা নিয়ে সন্দেহ আছে। আকবরের এক শতক আগেই ষষ্ঠ হেনরী ইংল্যান্ডে ২০ বছরের পেটেন্ট-ব্যবস্থা চালু করেছিলেন যা আজও চালু আছে। মেধা – তার আবার সত্ত্ব ও তার সংরক্ষণ – এই ব্যাপারটা এখনও দেশের অধিকাংশ মানুষ বোঝে বলে মনে হয় না। খোদ বাদশা আকবরের হাল দেখে মনে হয় ভারতের কোনও দেশীয় শাসক আধুনিক রাষ্ট্রের চিন্তা মাথায় আনতে সক্ষম ছিলেন না।

সংক্ষেপে বললে, আমাদের যা প্রাপ্য ছিল সেটাই আমরা হয়ত ভোগ করছি। ঔপনিবেশিকতা (যা আমার স্বাভাবিক ঘটনা বলেই মনে হয়) বলে কোনও বস্তু আদৌ না থাকলেও কি আমরা সত্যি উন্নত জীবন-যাপণ করতাম? তিনটের জায়গায় হয়ত গোটা কুড়ি দেশ থাকত উপমহাদেশে, যাদের কিছু কিছু তুলনামূলক-ভাবে ভাল হত অন্যের তুলনায়। এর বেশী খুব কিছু আশাবাদী হওয়ার কোনও সম্ভাবনা দেখি না। মুঘল-মারাঠা রাজা বা তাদের অধীনের সামন্তবর্গ আমাদের এর থেকে উন্নত জীবনযাত্রা এনে নিতে পারত বলে মনে হয় না।

ভবিষ্যতে কি এর আমূল পরিবর্তন হতে পারে? আমি খুব একটা আশাবাদী নই। ঔপনিবেশিকদের মধ্যে সবথেকে খারাপ পারফর্মার হল পর্তুগাল। আর আমাদের উন্নয়নশীল বিশ্বে স্টার পারফর্মার হল মালয়েশিয়া। দুয়ের মধ্যে তুলনা করলে দেখি মালয়েশিয়ার সাথে ১৯৬০-এর দশকে পর্তুগালের মাথাপিছু আয়ের পার্থক্য ছিল মাত্র ১১০ ডলারের। তা এখন বেড়ে ১২,০০০ ডলারে চলে গেছে। অর্থাৎ ব্যবধান দশগুণ বেড়েছে। যেখানে আমাদের স্টার পারফর্মারের এই হাল, সেখানে আমরাই বা কিভাবে আশা রাখতে পারি?

তথ্য সূত্র – গুগলের তথ্যভাণ্ডার যা বিশ্বব্যাঙ্কের থেকে নেওয়া। এখানে আমি ডলার-জিডিপি দিয়ে মেপেছি যা কিছুটা বিতর্কিত। তবে আন্তর্দেশীয় তুলনার জন্য আমার ওটাই বেশী নিখুঁত বলে মনে হয়েছে।

ইউরোর চাবিকাঠি জার্মানীর হাতে

ডিসেম্বর 25, 2012

ইংল্যান্ডের উত্তরের গ্রামগুলোতে গবাদি পশু চরে বেড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট স্থান থাকত – যা ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত – অর্থাৎ কমন প্রপার্টি। নিজের স্বার্থের কথা ভেবে সব মালিকই চাইত আরও বেশী করে গবাদি পশু চারণ করে বেশী লাভের টাকা ঘরে তুলতে, স্বভাবতই নিজেদের জমি ব্যবহার না করে ওই কমন-প্রপার্টিই ব্যবহৃত হত চারণের জন্য। কিন্তু একসময় দেখা দিল বিপর্যয়, ঘাস গজানোর তুলনায় গবাদি পশুর খেয়ে ফেলার হার বেড়ে গেল, ফলে গবাদি পশুর খাওয়ার জায়গা ফুরোলো। এই থট-এক্সারসাইজ থেকেই একটা সুন্দর তত্ত্বের উদ্ভব। ট্র্যাজেডি অব কমনস শেক্সপিয়ারের লেখা আরেকটি উপন্যাস নয়, বরং একটি তত্ত্ব যার প্রভাব বর্তমান পৃথিবীতে হরহামেশাই চোখে পড়ে।

গ্যারেট হার্ডিন নামে এক বিজ্ঞানী সায়েন্স পত্রিকায় প্রথম প্রকাশ করেন এই নামটা, কিন্তু এর প্রভাব চলে আসছে এর অনেক আগে থেকেই। মূল বক্তব্য হল, যে সম্পদ সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত, সকলেই তার সর্বাধিক ব্যবহারের চেষ্টা করে। আর এই ধরণের সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহার খুব দ্রুত সামগ্রিক বিপদ ডেকে আনতে পারে। সেই “সম্পদ” কখনও বঙ্গোপসাগরের মাছ, কখনও রাস্তা (একটা কার্টুন দেখে বুঝতে পারেন), কখনো সামগ্রিক পরিবেশ। আরও উদাহরণ দিলে গণতান্ত্রিক দেশে সরকারী সম্পত্তি একইভাবে ট্র্যাজেডি অব কমনসের শিকার, রাষ্ট্রায়াত্ত শিল্পের পতনের পেছনে অনেকাংশেই একই তত্ত্ব কাজ করে। অর্থনীতিও ব্যতিক্রম নয়। আর সাম্প্রতিক ইউরোপীয় অর্থনীতির পতনে আমি এই ট্র্যাজেডি অব কমনসের ছায়া দেখতে পাই।

ষাটের দশকে ইউরোপের ছয়টি দেশ মিলেজুলে নিজেদের অর্থনীতি থেকে সীমারেখা মুছে দিতে চেয়েছিল। তাদের সেই প্রচেষ্টার সফল রূপায়ণ ঘটে ১৯৯৩ সালে, যখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন তৈরী হয়। আরো বছর দশেকের মধ্যেই ইউনিয়নের সদস্য বেড়ে দাঁড়ায় ২৭-এ। ইউনিয়ন গঠনের কেন্দ্রীয় চালক ছিল অভিন্ন মুদ্রা ইউরোর প্রবর্তন – যার ফলে এক ছাতার তলায় আসতে পেরেছিল ইউরোপের ছোটো-বড় দেশগুলো। স্বাভাবিক ভাবেই এক ছাতার তলায় আসায় গ্রীসের মত দেশে বিনিয়োগের ঝুঁকি কমে যায়, যার ফলে ঋণ-সংগ্রহে সুদের হারও কমে যায়। এইটা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। আপনি যদি কোনও ব্যক্তিকে ঋণ দিতে চান তাহলে যা ঝুঁকি, একটা গোষ্ঠীকে দিতে চাইলে স্বাভাবিকভাবেই তার চেয়ে কম ঝুঁকি – কারণ আপনি স্বাভাবিকভাবেই আশা করবেন গোষ্ঠীর মধ্যে কিছু লোক থাকবেই যারা ঋণ ঠিকঠাক কাজে লাগাবে ও শেষমেষ আপনার টাকা শোধ করে দেবে। অর্থনীতির প্রথম ধাপে, এভাবেই গ্রীস, ইতালী, পর্তুগাল বা স্পেনের মত দেশ অনেক ঋণ নিয়ে দেশে বিনিয়োগ করল – স্থানীয় অর্থনীতিতে জোয়ার এল।

উল্টোদিকে, ফ্রান্স বা জার্মানীর মত দেশও লাভবান হল। তাদের রপ্তানী বাজার রাতারাতি বড় হয়ে গেল। এদের মধ্যে বিশেষত জার্মানীর জিডিপি সম্পূর্ণ রপ্তানীমুখী। রপ্তানী বাড়ায় উৎপাদন বাড়ল, তাছাড়া বিশেষত চিনে জার্মান মেশিনারীর বিশেষ চাহিদা দেখা দেওয়ায় জার্মানীর অর্থনীতি ফুলে-ফেঁপে উঠল। জার্মানীর বাণিজ্য-উদ্বৃত্ত বাড়তে থাকল। এই উদ্বৃত্ত টাকা ঋণের মাধ্যমে জমা হতে থাকল ওই দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলোতে। জার্মানী ইউরোর পূর্ণ সদব্যবহার করল – একদিকে তাদের ঋণের টাকায় দক্ষিণ ইউরোপের ক্রেতারা জিনিস কিনতে থাকল, অন্যদিকে সময় গেলে তাদের অর্থনীতি আরও বেশী দক্ষ হয়ে উঠতে থাকল।

এদিকে ঋণের টাকা একেক-দেশ একেক-ভাবে ব্যবহার করেছে। স্পেনে আমেরিকার মত রিয়েল এস্টেট বুদবুদ তৈরী হয়েছে, গ্রীসে সরকারী কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ। গ্রীসের ঋণ এতটাই বেড়ে গেল যে ইউরো শুরুর সময় মাস্ট্রিক্ট চুক্তিও(৩%-এর কম ঘাটতি) বছরের পর বছর অগ্রাহ্য করতে থাকল। গ্রীসের সাথে তুরস্কের দীর্ঘ-বিবাদের ফলে গ্রীস আয়ের বড় অংশ খরচা করেছে মারণাস্ত্রের পেছনেও। মজার কথা, এই আমদানীর বড় অংশই এসেছিল জার্মানী থেকেই। মূলধন হাতে পেয়ে দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলোর লেবার-কস্ট বাড়তে থাকল, অর্থাৎ তাদের রপ্তানী বাড়ার সম্ভাবনা কমে যেতে থাকল।

যে আশা নিয়ে এক-ইউরোর যাত্রা শুরু হয়েছেল, বছর দশেকের মধ্যেই তার মধ্যে পরিষ্কার ফাটল দেখা দিল। যে কমন-পুল-অব-রিসোর্স ছিল, তার অদক্ষ ব্যবহার শুরু হল। জার্মানী যতই বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বাড়ালো গ্রীস, ইতালী ও স্পেনের ঘাটতি বাড়তে থাকল। এই অবস্থায় গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়ে এল আমেরিকায় অর্থনৈতিক দুর্যোগ – যার শুরু হল রিয়েল এস্টেট বাবলের হাত ধরে। দুর্যোগের মূল কারণ যেহেতু ছিল অত্যাধিক ও সহজলভ্য ঋণ, বিপর্যয়ের পরে সব ব্যাঙ্কই ঋণ দেওয়ার আগে দশবার ভাবতে শুরু করল। যে অর্থনীতিগুলোর অবস্থা ততটা ভাল ছিল না, অর্থাৎ যারা সামর্থ্যের বেশী ঋণ নিয়ে রেখেছিল – তাদের কপাল পুড়ল। তবে বলে রাখা ভাল, গ্রীসের ক্ষেত্রে অত্যধিক ঋণের জন্য দায়ী যেমন সরকার – স্পেনের ক্ষেত্রে কিন্তু মর্টগেজ আর রিয়েল এস্টেট বাবল মূল ঋণ-গ্রহীতা। অর্থাৎ স্পেন সরকার চুক্তি মেনে চলেও ঋণের বোঝায় ডুবে গেছে। এই অবস্থায় ব্যাঙ্ক সব জায়গায় ঋণে সুদের হার আর সমান রাখল না – দুর্বলতর অর্থনীতিতে ঝুঁকি যতই বাড়তে থাকল, সুদের হারও তেমন চড়চড় করে উঠতে শুরু করল। স্পেনে যারা বাড়ি কিনেছিল – তাদের ধার শোধ করা আরও শক্ত হয়ে গেল।

এই অবস্থায় সোজাসাপটা পথ দুটো – প্রথমটা হল খরচা কমিয়ে দেওয়া। খরচা কমানোর মানে বাজার কমে যাওয়া, মানে মন্দা – এদিকে মন্দা তো ২০০৮ থেকেই চলছে। যার মানে মন্দা আরো জাঁকিয়ে বসবে। এর মানে স্পেন, ইতালী, পর্তুগাল বা গ্রীসে আরো বেশী লোকে ধার শোধ করতে পারবে না। মন্দার মানে রাজনৈতিক অশান্তি – মানে বাজার থেকে আরও বিনিয়োগ বেরিয়ে যাবে, অর্থাৎ আরও মন্দা। অন্য পথটা হল খরচা না কমানো। কিন্তু এর মানে হল আরো বড় সমস্যার দিকে এগিয়ে যাওয়া। সব দেশেরই ঋণভার বেড়ে চলেছে – এভাবে চললে আরও ঋণভার বাড়বে, কারণ ঋণ কমানোর কোনও দায় থাকবে না। আস্তে আস্তে সবাই মিলে ডুববে একই সমুদ্রে। অনেকেরই মনে হতে পারে, জার্মানীই সবথেকে সুবিধাজনক অবস্থায় আছে ইউরোপীয় অর্থনীতিতে। কথাটা সত্যি হলেও তাদেরও হাত-পা বাঁধা। হঠাৎ করে তাদের মুখ্য বাজারে মন্দা দেখা দিলে তাদের অর্থনীতিতে আরও বড় ধাক্কা দেখা দেবে – তা নিয়ে কারও দ্বিমত থাকার কারণ নেই। তাছাড়া, এককালীন ঋণ-ডিফল্টে তাদের দুই ট্রিলিয়ন ডলার গচ্চা যাবে বলেও মনে করা হচ্ছে। তাই চাইলেও জার্মানী ডিভোর্স পাচ্ছে না – নিজের লাভের কথা ভেবেই শুধু বুলি আউড়েই শান্ত থাকতে হচ্ছে। অবশ্য তারা সুযোগ বুঝে তর্জন-গর্জন করা কমাচ্ছে না। তাদের বক্তব্য – গ্রীসসহ দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলোর অর্থনীতির রাশ আরও কড়া হাতে ধরতে হবে। বিশেষত গ্রীসের ওপর সকলেই বিশেষভাবে খাপ্পা – কারণ গ্রীসের ঋণগ্রহীতা সরকার। তাই সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন শর্ত, যার মধ্যে আছে সরকারী কর্মচারীদের বেতন-হ্রাস বা শিক্ষা-স্বাস্থ্য-খাতে টাকা কমানোর শর্তও। সম্প্রতি গ্রীসের ভোটের ফলাফলে মনে হয়েছে – গ্রীসের জনগণও সেটা মেনে নিয়েছে। আপাতত মনে হয় আগামী বছর কয়েক ইউরোপ খরচ কমানোর পথেই হাঁটবে। আর ইউরোপের ওপর জার্মানীর কর্তৃত্ব আরও জোরদার হবে।

ইউরোপের এই দুর্যোগের মধ্যে একটা কথা কেউ বলছে না – সেটা হল এশিয়ার কথা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন তৈরীর সময় বলা হয়েছিল গাড়ি-শিল্পের কথা। জার্মান গাড়ি শিল্পের জন্য যন্ত্রপাতি তৈরীর শিল্প ইতালি বা স্পেনে তৈরী হবার কথা ছিল। তার জায়গায় সেই যন্ত্রপাতি এখন আসছে চিন, জাপান বা থাইল্যান্ড থেকে। অর্থাৎ, ইউরোপের ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পের নিচের দিকটা (Low value added parts) নিয়ে নিয়েছে এশিয়া। জার্মানী থেকে আসা ঋণের টাকায় ইতালী বা স্পেন শিল্পের পরিকাঠামো বানায় নি – বিনিয়োগ করে গেছে রিয়েল এস্টেট বাবলে। খেসারত দিতে হচ্ছে তাদের।

পর্তুগালের অর্থনীতির সমস্যার একটা দিক বেশ মজার। বছরের পর বছর যেই অ্যাঙ্গোলাকে শোষণ করে পর্তুগালের সম্পদ এসেছিল, আজকে সেই অ্যাঙ্গোলাই পর্তুগালের অর্থনীতির ভরসা। উপনিবেশিকতার সূত্রে অ্যাঙ্গোলার সরকারী ভাষা পর্তুগীজ। আর তাদের অর্থনীতিতে এখন বুম চলছে – তেলের আবিষ্কারের হাত ধরে। স্বভাবতই দলে দলে পর্তুগীজ ইঞ্জিনিয়ার-ডাক্তার দেশের ২৫% বেকারী এড়িয়ে চাকরি জোটাতে পাড়ি দিচ্ছে অ্যাঙ্গোলার দিকে। না – এবারে আর রাইফেল হাতে নয় – হাতে রেসিউমে – লক্ষ্য ভালো চাকরি, ক্ষমতা দখল নয়। পর্তুগাল এখন অ্যাঙ্গোলা থেকে যা রেমিট্যান্স আনে, তার থেকে কম আনে ব্রিটেন থেকে। নিয়তির পরিহাসে অ্যাঙ্গোলা এখন আর পর্তুগাল থেকে বিশেষ একটা রেমিট্যান্স পায় না।

ইউরোর সমস্যা দেখে ট্র্যাজেডি অব কমনসের কথাই বারবার মনে হয়। মৌলিক-ভাবে ভিন্ন ধারার কয়েকটি অর্থনীতি যদি একসাথে চলতে চায় তাহলে তাদের মধ্যে “কমন-পুল-অব-মানি” সবাই নিজের দিকে টেনে নিতে চাইবে। সবাই বেশী বেশী করে ধার করবে, কারণ পতন ঠেকানোর দায় তাদের একার নয় – বাকিদেরও। উলটোপথে হেঁটে বরং জার্মানী এখন দুই ট্রিলিয়ন ডলার গচ্চা দেওয়ার মুখে। তাই প্রথম থেকেই রেগুলেশন ব্যাপারটা জোরেসোরে না কাজে লাগালে এইরকম অর্থনৈতিক গাঁটছড়া টিকবে না – ভবিষ্যতেও না। তবে এটাও জেনে রাখা ভাল – জাপান, চিন বা জার্মানীর মত রপ্তানী-নির্ভর দেশ সব দেশের পক্ষে হওয়া সম্ভব না – পুরোনো পাটিগণিতের নিয়মেই সম্ভব না। বিক্রেতা বা উৎপাদক আছে বলেই ভোক্তা আছে – এটাও যেমন ঠিক, এর উল্টো-টাও তেমনভাবেই সত্য। তাই জার্মানীর মত দেশকেও নিজের উৎপাদন যাতে ভোগের তুলনায় খুব বেশী না হয়ে যায় – তার দিকে নজর রাখতে হবে।

জার্মানী এর আগে দু-বার ইউরোপের কর্তৃত্ব নিতে চেয়েছিল। দুবারেই যুদ্ধের হাত ধরে। আর দুবারেই পরিণতি হয়েছিল করুণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমস্ত অর্থনৈতিক দায় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল জার্মানীর ওপর – যার পরিণতিতে জার্মান মুদ্রায় এতটা মুদ্রাস্ফীতি হয়েছিল যে ১৯২৩ সালে এক মার্কিণ ডলারের বিরুদ্ধে ৪ ট্রিলিয়ণ জার্মান মার্ক পাওয়া যেত (১৯১৪ সালে ১ ডলার ছিল ৪ মার্ক)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পরে ভেঙে তাদের দু-টুকরো করে দেওয়া হল, যা জোড়া লাগতে দীর্ঘ ৪৫ বছর সময় লাগল। যদি গ্রীসের মত ইতালী, স্পেন আর পর্তুগালকেও জার্মানী নিজের “প্যাকেজে” রাজী করিয়ে ফেলতে পারে – তাহলে দীর্ঘদিনের জন্য অর্ধেক ইউরোপ জার্মানীর কার্যত উপনিবেশে পরিণত হবে। ঋণের বোঝা থেকে চট করে মুক্তি মিলবে না, অথচ জার্মান পণ্য তাদের কিনে যেতে হবে – মানে দেশে শিল্প সম্ভাবনা কম। হিটলার যে কাজটা সমরাস্ত্র দিয়ে করে দেখাতে পারেননি, কর্মঠ জার্মানরা অর্থনীতির হাত ধরে তাই করে দেখিয়ে দিচ্ছে – এভাবেও ফিরে আসা যায়।

আরো কিছু সহজপাঠ্য -
১) তিন ধাপে ইউরোপের ক্রাইসিস
২) বিবিসি থেকে
৩) গ্যারেট হার্ডিনের পেপার
৪) বিবিসির ডকুমেন্টরি

প্রথম ছবিটি এন-পি-আর ব্লগ থেকে, দ্বিতীয় ও তৃতীয়টি উইকি থেকে ও চতুর্থটি নিউ-ইয়র্ক টাইমস ব্লগ থেকে নেওয়া।

ডিজিটাল ডিভাইড আর শিক্ষানীতি

ডিসেম্বর 25, 2012

লেখাটার কথা ভেবেছিলাম অনেক আগেই – যখন সচলে ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে লেখা হচ্ছিল। আমার ধারণা সমস্যা অনেক গোড়ায়, তাই গোড়া থেকেই সমাধান শুরু হওয়া উচিত।

অনেক বছর আগের কথা। আমি তখন সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। স্কুলে নতুন কম্পিউটার এসেছে, ঘরের দরজাও খোলা। দেখি ভেতরে বেশ কয়েকজনে বসে কম্পিউটারে কিছু কাজ করার চেষ্টা করছে। টাইপরাইটার আগে দেখেছি, কম্পিউটারে টাইপ করতে অন্তত পারব, এটুকু বিশ্বাস নিয়ে বসে পড়লাম। আমার এক বন্ধু কিছুটা কম্পিউটার লিটারেট হয়েছে, সে ক’দিন হল ওই ঘরে আসা-যাওয়া করছে। সে আমাকে দেখাল কিভাবে বেসিক প্রোগ্রাম লিখতে হয়। সে আবার কোনো এক স্যারের কাজ করা দেখে দেখে শিখেছে। হেল্প ফাইল দেখে দেখে দুজনে মিলে বেসিক ব্যবহার করে ছবি আঁকা শিখলাম। নিজে শেখার মজাই আলাদা। শেষে যখন বুঝলাম মোটামুটি যেকোনো জ্যামিতিক ছবি আঁকতে পারছি তখনই ঘটল বিপর্যয়। স্কুলের শিক্ষকেরা সিদ্ধান্ত নিলেন যে ওই ঘরটা তালাবন্ধ থাকবে, কারণ কম্পিউটার “দামী জিনিস”, বাচ্চারা তা নিয়ে “খেলাধূলা করলে” তা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে কম্পিউটার শিখেছি, কিন্তু শিক্ষকদের ওই মানসিকতার কোনো পরিবর্তন দেখিনি। তারা মনে করেন, ছাত্রদের কম্পিউটার আর ইন্টারনেট নিয়ে ছেড়ে দিলে তারা কোনো কাজের কাজ করে না। আমি এখনও মনে করি, এটাই আমার ছাত্রাবস্থায় শিক্ষার অপূর্ণতার সবথেকে বড় কারণ। রিসোর্স থাকতেও আমি সব রিসোর্সে ঠিকমত অধিকার পেতাম না।

****

আমাদের দেশে এখন এক অদ্ভূত অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। দেশের সফটওয়ার শিল্পের কল্যাণে একশ্রেণীর লোক সৃষ্টি হয়েছে যারা কম্পিউটার তথা ইন্টারনেটে যথেষ্ট সময় কাটায়। তারা এর উপযোগিতাও বোঝে। তাই তারা তাদের আশেপাশে সবাইকে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে উৎসাহও দেয়। আরেকটা বিরাট দল আছে যারা এখনও কম্পিউটার বা ইন্টারনেট দেখেনি, তাই তারা এর গুরুত্বও বোঝে না। দিনে দিনে যত ইন্টারনেটের আকার, দক্ষতা ও উপযোগিতা বাড়বে, তত প্রথম শ্রেণীর লোকজনে সহজে তথ্য ও জ্ঞান আহরণ করতে পারবে। অপরদিকে, দ্বিতীয় দলে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়বে। যেহেতু আমাদের সমাজ আস্তে আস্তে শিল্পভিত্তিক থেকে পরিবর্তিত হয়ে জ্ঞানভিত্তিক হয়ে যাবে তাই তখন আমাদের সমাজের একটা বড় অংশ চির-অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে, যেমনটা ঘটেছিল শিল্পবিপ্লবের ইউরোপে কৃষকদের ক্ষেত্রে। কিন্তু এই অবশ্যম্ভাবী পরিণতি থেকে মুক্তি কোথায়?

****

এই ডিজিটাল ডিভাইড নিয়ে ভেবেছিলেন সুগত মিত্রও। ১৯৯৯ সালে দিল্লীতে তিনি একটি সফটওয়্যার বহুজাতিকের অফিসের শিক্ষানীতি নিয়ে গবেষণা করার সময় দেখেন তার বহুতল অফিসের বাইরে এক বিশাল বস্তি এলাকার শিশুরা প্রায় কোনো শিক্ষার সুযোগই পায় না। আর স্কুলের জন্য কম্পিউটার বরাদ্দ করলে সেই কম্পিউটার তালাবন্ধ ঘরেই পড়ে থাকবে। সরকারকে দিলে পুলিশ স্টেশনের মত করে কম্পিউটার নিয়ন্ত্রণ করা হবে। তাই ব্যতিক্রমী কিছু ভাবতে হত। তিনি নিজে স্বপরিকল্পিত শিক্ষানীতির প্রবক্তা ছিলেন। এই নীতি বাস্তবে রূপায়িত করার জন্য উনি একটা নতুন প্রোজেক্ট উদ্ভাবন করলেন – যার নাম দিলেন হোল ইন দ্য ওয়াল (Hole in the wall) প্রোজেক্ট। তিনি অফিসের দেওয়ালে একটা গর্ত করে তাতে একটা কম্পিউটার কিয়স্ক (kiosk) রেখে দিলেন। সাথে রাখলেন ওয়েবক্যাম – বাচ্চাদের আচার-আচরণ লক্ষ্য করার জন্য। বড়রা যাতে এতে অধিকার স্থাপন না করতে পারে সেজন্য এগুলো বাচ্চাদের মত উচ্চতায় রাখা হল। মাউসটা একটা খোপের মধ্যে এমনভাবে রাখা হল যাতে বাচ্চাদের হাতই সেখানে ঢুকতে পারে। স্বভাবতই সেটা নিয়ে বস্তিবাসী বাচ্চারা খেলতে শুরু করল। খেলতে খেলতে তারা খুব দ্রুত কম্পিউটার ব্যবহার করতে শিখে গেল। উনি এরপরে কম্পিউটারের সাথে জুড়ে দিলেন হাই-স্পিড ইন্টারনেট। বস্তিবাসী ছেলেরা দ্রুত শিখতে শুরু করল, তাদের ক্লাসের পড়াতেও দ্রুত উন্নতি শুরু হল – বিশেষত ইংরেজী, অঙ্ক আর বিজ্ঞানে। এরপরেও এই পরীক্ষা অনেকবার ভারতের (পরে কম্বোডিয়াতেও) অনেক গ্রামে ও বস্তিতে চালানো হয়েছে। সব ক্ষেত্রেই দেখা গেছে বাচ্চারা কয়েক ঘন্টায় কম্পিউটার চালানো শিখে ফেলছে। তার পরে ইন্টারনেট – আরও পরে গুগল। তার পরে জ্ঞানের ভান্ডার হাতের সামনে পেয়ে যাচ্ছে। অনেকে প্রচুর গেমও খেলছে, গুগলের পাশাপাশি ডিসনি ডট কম তাদের প্রিয় সাইট। তার বক্তব্যে -

“হঠাৎ করে দেখা গেল তারা তাদের শিক্ষকদের থেকে বেশী জেনে ফেলেছে। শিক্ষকদের ক্লাসে এমন কিছু প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে যার উত্তর তারা নিজেরা জানেন না। কয়েকমাস আগে আমি নিজেকে একরকম চ্যালেঞ্জ করে তামিলনাডুর একটা গ্রামে কম্পিউটার কিয়স্কে ডি-এন-এ সম্পর্কিত অনেক ডকুমেন্ট রেখে দিলাম। আমার ধারণা ছিল ৬-১২ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে উচ্চতর শিক্ষার ডকুমেন্ট অপ্রয়োজনীয় মনে হবে ও তারা এর কিছুই বুঝবে না। কিন্তু তিন মাস পরে, তাদের ওই ডকুমেন্ট-সংক্রান্ত বিষয়ে পরীক্ষা নিয়ে দেখলাম অন্তত ৩০% বিষয়ে তারা জ্ঞান অর্জন করেছে। আর তাও সব ইংরেজীতে পড়েই। “

 

মজার কথা, দিল্লীর বস্তির বাচ্চারা কিন্তু কম্পিউটারের টার্মগুলোই তখনও শেখে নি, তারা বরং নিজেদের মত কিছু কিছু নাম দিয়ে এগুলোকে চিহ্নিত করেছে। মাউসের নাম দিয়েছে “সুই” (সূচ) আর আওয়ারগ্লাসের নাম দিয়েছে ডম্বরু (ডুগডুগি)। তাদের বক্তব্য হল -

“যখন কম্পিউটার কোনো কাজে ব্যস্ত হয় তখন “সুই” থাকে না, তা “ডম্বরু” হয়ে যায়।”

 

পরীক্ষার কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ ও চমকপ্রদ পর্যবেক্ষণ ছিল। প্রথমত, ইংরেজী বা অন্য বিজাতীয় ভাষা কোনোভাবেই শিক্ষার প্রতিবন্ধকতা হয় না – যদি বাচ্চাদের মধ্যে যথেষ্ট আগ্রহ তৈরী করা যায়। প্রথমদিকে উনি হিন্দিতে কিছু লেখা ও লিঙ্ক বানিয়ে ডেস্কটপে রেখে দিতেন, যাতে থাকত কিছু হিন্দি ওয়েবসাইটের লিঙ্ক। দেখা গেল বাচ্চারা সেসব পাত্তাই দেয়নি, তারা সরাসরি ইংরেজীতেই ইন্টারনেট সার্ফ করে গেছে। সব ইংরেজী শব্দের মানেও তারা বোঝে নি, কিন্তু ধীরে ধীরে কার্যকরী শিক্ষা পেয়ে গেছে তা থেকে। যেসব অঞ্চলের বাচ্চারা কিছুটা স্কুলশিক্ষা পেয়েছে, তারা ডিকশানারিও বের করে ফেলেছে ইন্টারনেট থেকে।

দ্বিতীয়ত, এদের শিক্ষাগ্রহণের পদ্ধতিটাও অন্যরকম। প্রথম কয়েক ঘন্টার মধ্যেই কার্যত কিছু লিডার তৈরী হয়ে যায় ভিড়ের মধ্যে থেকে। কেউ কেউ তাড়াতাড়ি শিখতে পারে, তারা কাজ করে যায়। কেউ কেউ ব্যাপারটা ভাল বোঝাতে পারে, তারা ভিড়ের উৎসুক জনতাকে বুঝিয়ে চলে। কেউ বা আবার দেখাশোনা করে যাতে সবাই কিছুক্ষনের জন্য বস্তুটা ছুঁতে-ধরতে পারে। দল-বেঁধে শিক্ষাগ্রহণের এই পদ্ধতি স্কুলেও আছে – কিন্তু স্কুলে তা বাইরে থেকে শেখানো হয়। এখানে একই পদ্ধতি নিজে থেকেই বাচ্চারা তৈরী করে নেয়।

এই পরীক্ষাগুলোর ভিত্তিতে উনি প্রস্তাব করেন যে একবিংশ শতকে উন্নয়নশীল বিশ্বে যেহেতু গ্রামাঞ্চলে ও বস্তি এলাকায় উপযুক্ত শিক্ষকের ও বইপত্রের অভাব বড় হয়ে দেখা যেতে পারে, তাই কম্পিউটারের মাধ্যমে কার্যকর শিক্ষা দিয়ে সম্পূর্ণ স্কুল-সিস্টেমের বাইরেও শিক্ষিত জনসাধারণ গড়ে তোলা যায়। অনেকেই মনে করেন শিক্ষকের ও স্কুলের অভাব কম্পিউটার দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। সুগত মিত্রের দাবী -

“যদি কোনো শিক্ষককে কম্পিউটার দিয়ে প্রতিস্থাপিত করাই যায় – তাহলে করাই শ্রেয়। ন্যূনতম শিক্ষার অধিকার পেতে যেখানে বছরের পর বছর লেগে যায়, সেখানে কোনো লাল-ফিতে ছাড়াই কম খরচে যদি তার ৩০% শিক্ষাও সাধারণ জনগণের মধ্যে আনা যায়, তাহলে তা-ই কেন নয়? শুধু তাই নয়, ছাত্ররা ঝটপট শিখতে শুরু করলে দ্রুত শিক্ষকেরাও শিখতে বাধ্য হবেন – শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে”।

 

বর্তমানে দিল্লীতে চল্লিশ জায়গায় এরকম “হোল” বসানো হয়েছে। হায়দ্রাবাদে বসানো হয়েছে গোটা দশেক। পরের পদক্ষেপ – প্রত্যন্ত গ্রামে একে নিয়ে যাওয়া ওয়্যারলেস প্রযুক্তি ব্যবহার করে।

আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয় এই ডিজিটাল ডিভাইড দূর করার পথে এই মুক্ত ও দলবদ্ধ স্বপরিচালিত শিক্ষাই প্রথম অস্ত্র হতে পারে উন্নয়নশীল যেকোনো দেশে। আর এই ডিভাইড দূর না করতে পারলে ই-কমার্স বা ইন্টারনেট-ভিত্তিক সেলফ-লার্নিংও দেশে আনা সম্ভব নয়। যে কোনো মূল্যে এখন কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে কার্যকরী শিক্ষা প্রণয়ন না করতে পারলে ভবিষ্যতে তার জন্য বড় ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে।

একটা ট্রিভিয়া – সম্প্রতি স্লামডগ মিলিয়নিয়ারের লেখক বিকাশ স্বরূপ বলেছেন তার লেখার অনুপ্রেরণা ছিল সুগত মিত্রের এই হোল ইন দ্য ওয়াল প্রোজেক্ট। প্রত্যুত্তরে সুগত মিত্রের দাবী – উনি নিজে লিখলে বইটার নাম দিতেন স্লামডগ নোবেল লরিয়েট – কারণ তার প্রোজেক্টের মূল লক্ষ্য ছিল বাচ্চাদের শিক্ষা দেওয়া – বড়লোক বানানো নয়।

সূত্র – টেড টক

সংক্ষেপে আরেকটা ভিডিও হোল ইন দ্য ওয়াল ও স্লামডগ মিলিয়নেয়ার নিয়ে নিয়ে।

সাক্ষাতকার – প্রথম ও দ্বিতীয় লিঙ্ক। স্লামডগ মিলিয়নেয়ার নিয়ে এখানে

নদী অববাহিকা ও আন্তর্জাতিক আইন

ডিসেম্বর 25, 2012

জলসম্পদ নিয়ে দেশে দেশে বিবাদ বহুবছরের পুরোনো, কারণ জল মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান উপাদান। মধ্যপ্রাচ্যের মত অঞ্চলে যেখানে পৃথিবীর জলসম্পদের মাত্র ১% পাওয়া যায় অথচ জনসংখ্যা ক্রমবর্ধমান, সেখানে এই বিবাদ বাকী অংশের থেকে বেশী জোরালো। সাম্প্রতিককালে জলসম্পদের ক্রমাগত দুষ্প্রাপ্যতার কারণে বিবাদের সংখ্যাও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু জল-সম্পদের ভাগাভাগি নিয়ে আইনি সহায়তায় বিবাদ-মীমাংসা আধুনিক যুগে শুরু হয়েছিল ইউরোপ আর আমেরিকাতে। প্রথমদিকে মনে করা হত যে দেশ বা অঞ্চলে নদী বা কোনো জলসম্পদের অবস্থান, সেই দেশের সার্বভৌম অধিকার থাকবে সেই সম্পদের ওপর (Harmon Doctrine)। কিন্তু প্রযুক্তিগত উন্নতির পর বড় বড় বাঁধ তৈরীর ফলে বোঝা গেল এরকম অধিকারের ফলে অববাহিকার উজানের দেশ বেশী সুবিধা পেয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে অন্য বিকল্প হিসাবে মোহানার নিকটবর্তী দেশের প্রয়োজন ছিল নদীর জলের পরিমাণ ও গুণাবলীর ওপর সম্পূর্ণ অধিকার যাতে উজানের দেশ কোনোভাবেই সেই জল নিতে (বা দূষিত করতে) না পারে। উভয় নীতিই পক্ষপাত দোষে দুষ্ট, তাই এই দুই নীতি থেকে সরে এসে সমতার (Equity) নীতি অনুসারে জলসম্পদের বন্টন করার আইন চালু হল। সমতা অর্থাৎ সকল বিষয় ও প্রভাব ভেবে নিয়েই জলসম্পদ বন্টন হবে।

autoআন্তর্জাতিকভাবে প্রথম এই জলসম্পদ-আইন প্রস্তাব করা হল হেলসিঙ্কিতে। প্রাথমিকভাবে এই খসড়া প্রস্তাবনা বা গাইডলাইন শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক নদীগুলো জন্য প্রযোজ্য ছিল। এর পরে জাতিসংঘের উদ্যোগে ১৯৭০ সালে এ নিয়ে একটি বহুপাক্ষিক চুক্তির প্রস্তাবনা হয়। এর নাম দেওয়া হয় নৌচলাচল ব্যতিরেকে আন্তর্জাতিক নদীসম্পদ ব্যবহারের আইন (সংক্ষিপ্তপূর্ণাঙ্গ)। ১৯৯৭ সালে এই সনদের প্রস্তাবিত বয়ানের ওপর ভোটাভুটি হয় ও ১০৩-৩ ভোটে তা গৃহীত হয়। একে আইন হিসাবে গ্রাহ্য হবার জন্য সব দেশকে আভ্যন্তরীণ পার্লামেন্টে তার গ্রহণযোগ্যতা স্বীকার করতে হবে। সনদটির মূল সমস্যা দেখা দেয় চিন (তুরস্ক, চিন আর রোয়ান্ডা বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল **) এর বিরোধিতা করায়। এই চুক্তির ভবিষ্যত অনিশ্চিত তাই এখনও অবধি মাত্র ১৬টি দেশ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। (ছবিতে – স্বাক্ষরকারী দেশ, পক্ষের-বিপক্ষের দেশ)

আশার কথা, আন্তর্জাতিক আইন সংঘ (International Law Association) নামে একটি সংস্থা – যারা জাতিসংঘকে আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ক সাহায্য করে – তাদের প্রস্তাবিত আইনসমূহ নিয়ে বার্লিনে আলোচনার পরে ২০০৪ সালে জলসম্পদ আইনের প্রস্তাবনা (সংক্ষিপ্ত ,পূর্ণাঙ্গ) হয়। এই আইন আদপে জাতিসংঘের আইনের পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত রূপ, যাতে নৌচলাচল সম্পর্কিত আইনও অন্তর্ভুক্তি পেয়েছে এবং হেলসিঙ্কি আইনের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। এই আইন কমিটিতে ভারত ও বাংলাদেশের সদস্যরাও অংশগ্রহণ করেছে ও উভয় দেশই আইন নিজদেশে স্থানীয় আইনের মাধ্যমে একে গ্রহণ করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

autoআগের আইনগুলোর মত এক্ষেত্রেও আইনের মূলনীতি হল সমতা। তবে আগের তুলনায় বার্লিন কনভেনশনে অনেক স্পষ্টভাবে তা উল্লিখিত আছে। সমতার নীতি অনুসারে যে যে মাত্রা অনুসারে অববাহিকার একাধিক দেশের মধ্যে জলসম্পদ বন্টন হওয়া উচিত সেগুলো হল (আর্টিকেল ১২, ১৩) -
১) ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক অবস্থা
২) সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজন,
৩) জনসংখ্যা,
৪) এক দেশের ব্যবহার অন্য দেশকে প্রভাবিত করে,
৫) বর্তমান, ভবিষ্যত ও সম্ভাব্য ব্যবহার
৬) জলসম্পদ সংরক্ষণের ও উন্নয়নের খরচা
৭) বিকল্পের সুযোগ
৮) প্রস্তাবের সময়কাল
৯) পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব
১০) প্রাসঙ্গিক অন্য যে কোনো মাত্রা
এ বিষয়ে উল্লেখ্য যে এখানে জলসম্পদের মধ্যে পানীয় ও রান্নার জন্য ব্যবহৃত জলকে ধরা হচ্ছে না (ধরা হচ্ছে না খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত ন্যূনতম প্রয়োজনীয় জলকেও)। সমতার মাধ্যমে বন্টনের সময় জনসাধারণের জীবনধারণের জন্য অবশ্য-প্রয়োজনীয় জলের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে আর এজন্য প্রয়োজনীয় জল বরাদ্দ রাখতে হবে। (আর্টিকেল ১৪)

autoজলসম্পদ বন্টনের মত নৌচলাচলের ক্ষেত্রেও অববাহিকার সব দেশই একে অপরকে সমতার ভিত্তিতে স্বাধীনভাবে জলপথ ব্যবহার করতে দেবার কথা বলা আছে। নৌচলাচলের স্বাধীনতার মধ্যে পড়ে জলপথ ব্যবহারের, অববাহিকার বন্দর ও ডক ব্যবহারের এবং নদীপথে মালপত্র পরিবহনের স্বাধীনতা (অস্ত্রবাহী বা নৌবাহিনীর জাহাজ এই চুক্তির আওতায় আসে না) – অবশ্য সেজন্য ব্যবহারকারী দেশের ওপর নন-ডিস্ক্রিকিমিনেটরি কিছু শুল্ক আরোপ করা যেতে পারে। (আর্টিকেল ৪৩-৪৯)

এছাড়াও এই আইনে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি, অববাহিকার অবস্থা পর্যালোচনার কমিটি গঠন, ভৌমজল ব্যবহার, খরা-বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ দূষণ, জৈববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, বিবাদ-মীমাংসা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে মোট ৭৩টি অনুচ্ছেদ আছে। তবে এদের সকলেরই মূলভিত্তি একই – সমতা। কোনো অবস্থাতেই অববাহিকার সম্পদের সার্বভৌম অধিকারের কথা বলা নেই।

কিন্তু এই সমতার আইনটা নিয়ে বিশেষজ্ঞ ম্যাকেফ্রি প্রশ্ন তুলেছেন ও বলেছেন যে এই সমতার সংজ্ঞায়িতকরণের জন্য পরের বিশেষজ্ঞরা যে দ্বন্দে পড়বেন। একটা প্রশ্ন রেখেছেন উনি। ধরা যাক তিনটি দেশ (বা অঞ্চল) ক, খ আর গ একই নদী অববাহিকায় অবস্থিত(তুলনীয় বলে যথাক্রমে নেপাল, ভারত আর বাংলাদেশ ভাবতে পারেন)। ধরা যাক পর্বতসঙ্কুল “ক” অঞ্চলে কোনো চাষাবাদ হয়না কিন্তু সমতল “খ” ও “গ” দেশে হাজার হাজার বছর ধরেই চাষ হয়ে আসছে। এখন, প্রযুক্তির উন্নতির ফলে দেখা গেল “ক”-তেও চাষ করা সম্ভব হবে। তাই, ক সিদ্ধান্ত নিল যে তারও জল লাগবে। কিন্তু এর ফলে খ ও গ দেশে জলের যোগাণ কমতে বাধ্য। এখন সমতা এখানে কি ভাবে আনা সম্ভব হবে? যদি, ক-কে কিছু জল দিতেই হয় তাহলে খ আর গ বলবে আমাদের কৃষকেরা না খেয়ে মারা যাবে। আবার ক বলবে সমতা অনুসারে চাষ করার অধিকার আমার আছে, নদী অববাহিকার জলের ভাগ আমারও প্রাপ্য।

জটিলতা থাকলেও একটা বিষয় বুঝে নেওয়া উচিত যে নদী-অববাহিকার সব সম্পদের সমতা মেনেই ব্যবহার হওয়া উচিত। আর এই সমতার মাধ্যমেই একমাত্র বিবাদ-মীমাংসা হতে পারে। দুঃখের বিষয় এই ব্যাপারে রাষ্ট্রনীতি খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। চিন, তুরস্ক ও রোয়ান্ডার জাতিসংঘে বিরুদ্ধ ভোট থেকেই তা স্পষ্ট। তাছাড়াও, অববাহিকার দুই দেশের বিবাদের সময় প্রায়শই উজানের দেশ নদীবাঁধের সময় নিজ জলসম্পদের ওপর সার্বভৌমত্বের দাবী জানায় আর ভাটির দেশ জলপথ ও বন্দরের ওপর নিজের সার্বভৌমত্বের দাবী ছাড়তে চায় না। শুধু তাই নয়, এই সার্বভৌমত্বের ধারণা জনগণকে বোঝানোও সহজ – দেশের ভৌগোলিক সীমার মধ্যে অবস্থিত সব কিছুর সর্বভৌম অধিকার রাষ্ট্রের। অথচ, ভাটির দেশের জলপথ উজানের দেশ ব্যবহার করলে নিজ-স্বার্থেই সে জলসম্পদের যথেচ্ছাচার করবে না, এই ফর্মুলায় উভয়েরই লাভ, সমতা মেনেই। আন্তর্জাতিক আইন মাত্রেই এক-একটি কম্প্রোমাইজ ফর্মুলা – যা মেনে উভয়পক্ষই কিছুটা করে ক্ষতি স্বীকার করেও বিবাদ-মীমাংসা করা সম্ভব। সেই হিসাবে জলসম্পদ সহ অববাহিকার সকল প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পদের সমতা মেনেই সর্বোত্তম ব্যবহার করা উচিত। এতেই রাষ্ট্রের কাল্পনিক সার্বভৌমত্বের কিছুটা ক্ষতি হলেও অববাহিকার মানুষের সবথেকে বেশী লাভ। ভবিষ্যতে আইনও সেই পথেই চলবে। আর অববাহিকার দেশগুলোও আশা রাখা যায় সমতার পথে চলে নিজেদের মধ্যেই আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিবাদ-মীমাংসা করে নেবে।

** এই তিন দেশ মূলত নদীর ওপর সার্বভৌম ক্ষমতায় বিশ্বাসী। চিনের সব বড় নদীরই উৎপত্তি চিনেই, বরং মেকং ও ইরাবতী সহ কয়েকটি দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার নদীরও উৎসও চিন। তুরস্কের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার – টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর তুরস্কে উৎস হলেও ইরাকে এই দুই নদী জনজীবনে গুরুত্বপূর্ণ। রোয়ান্ডা ও উগান্ডা হল নীলনদের (শুভ্রনীল বা হোয়াইট নীল) উৎস। তাই এরা ভাটির দেশের সাথে সমতা মেনে জলসম্পদ ভাগ করতে উৎসুক নয়।

পারভেজ হুদভয়ের চোখে আজকের পাকিস্তান

ডিসেম্বর 25, 2012

সচলায়াতনে পাকিস্তানী হিউম্যানিস্ট কোনো লেখকের লেখা প্রকাশিত হয় নি। আমি পারভেজ হুদভয়ের একটা সময়পোযোগী সাক্ষাৎকার বাংলায় অনুবাদ করে দিলাম। এম-এই-টি থেকে পি-এইচ-ডি করা পারভেজ হুদভয় ১৯৭৩ সাল থেকে পাকিস্তানের কায়েদে আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক। ইনি পাকিস্তানে মশাল নামে একটি সংগঠনেরও পরিচালক। এই সংগঠনের কাজ হল নারীশিক্ষার প্রসার ও পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি। বিজ্ঞান-সচেতনতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে নির্মিত ওনার ১৩ পর্বের ডকুমেন্টরিও পাকিস্তান টিভিতে প্রচারিত হয়েছে। ২০০৩ সালে বিজ্ঞানশিক্ষা প্রসারের ওপর কাজ করার জন্য ইউনেস্কো থেকে উনি বিশেষ পুরষ্কার পান।

নিচের সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ক্রিশ্চিনা ওটেন, জার্মান ফোকাস পত্রিকার জন্য। এটা প্রকাশিত হয়েছে কাউন্টারকারেন্টসে, গত ১৫ই ডিসেম্বর।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক মুম্বই হামলার পরে ক্রমাগত খারাপ হয়েই চলেছে। যুদ্ধ লাগার সম্ভাবনা কতটা?

জনগণের দাবী সত্ত্বেও মনমোহন সরকার সীমান্ত পেরিয়ে কোনো আক্রমণ করেনি। দেশে অনেকের সমালোচনা সত্ত্বেও পাকিস্তান সরকার লস্কর-ই-তৈবার বিরুদ্ধে কিছু ব্যবস্থা নিচ্ছে। হয়ত এখন আর কিছু হবে না, তবে এখনকার মত কোনো সম্ভাবনা না থাকলেও আরো একবার একই রকমের হামলা হলে ব্যাপারটা যুদ্ধের আকার ধারণ করতেই পারে।

লস্কর-ই-তৈবার সাথে আর সন্ত্রাসী দলগুলোর তফাৎ কোথায়? পাকিস্তান কি সত্যিই এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে?

আজ থেকে বছর পনের আগে আই-এস-আই আর আর্মির হাত ধরে কাশ্মীরে ভারতীয় সেনার বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করার জন্য লস্করের গোড়াপত্তন। আজকের দিনে এরা খুব বিরল প্রজাতির সন্ত্রাসী দল যাদের পাকিস্তানী রাষ্ট্র বা সেনাবাহিনী সম্পর্কে কোনো অভিযোগ নেই, কিন্তু বাকি সকলেই এদের শত্রু হয়ে গেছে। এখন শুনছি পাকিস্তান কিছু লস্কর সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। সময়ই বলে দেবে এটা আন্তর্জাতিক চাপ কমানোর চেষ্টা না সত্যিকারের সন্ত্রাসদমন প্রচেষ্টা। যদি সত্যিকারের প্রচেষ্টা হয়ে থাকে, তাহলে কিছু সময়ের মধ্যেই আর্মি আর আই-এস-আই এর সাথে এদের শত্রুতা দেখা দেবে, যেমনটা হয়েছিল জৈশ-ই-মহম্মদের ক্ষেত্রে।

মুম্বাই গণহত্যা সম্পর্কে পাকিস্তানের জনগণের প্রতিক্রিয়া কি?

৯/১১ এর পরে যেমন আনন্দোৎসব দেখা গিয়েছিল, সে জায়গায় মুম্বই হামলার পরে পাকিস্তানি জনগণ প্রাথমিকভাবে ভারতের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। কিন্তু ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো যখনই পাকিস্তানকে দোষ দেওয়া শুরু করল, তখন প্রথমে ক্রোধ ও পরে অস্বীকারের রাস্তায় হাঁটতে থাকে সবাই। পাকিস্তানের মাটি থেকেই আক্রমণের ছক কষা হয়েছে – এ দাবী তারা মানতে নারাজ। জনপ্রিয় টিভি-নিউজ ব্যক্তিত্বরা সবাই টিভিতে এসে একের পর এক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব খাড়া করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বছর কয়েক আগে এই ব্যক্তিত্বরাই কান্দাহার বিমান ছিনতাই মামলায় র’-এর ছায়া দাঁড় করিয়ে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছিল, যার কোনোটাই ধোপে টেঁকেনি। পাকিস্তান যে কারগিলের ঘটনায় জড়িত, তা-ও এরা হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। সমঝোতা এক্সপ্রেসের বোমা হামলার উল্লেখ করে এখন তারা একে একে হিন্দু জঙ্গী গোষ্ঠী, আমেরিকা বা ইহুদীদের দোষারোপ করে।

পাকিস্তান অনেককাল ধরেই বলে আসছে যে ভারতের দিক থেকে হামলার আশঙ্কা করলে তারাই প্রথম নিউক্লিয়ার হামলা করবে। পাকিস্তানে সেরকম কোনো সম্ভাবনা দেখছেন আপনি?

মুম্বাই হামলার সপ্তাহখানেক আগে জারদারি আশ্বস্ত করেছেন যে পাকিস্তান কখনই প্রথমে নিউক্লিয়ার আক্রমণ করবে না। ভারতও বছর দশেক আগেই এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে জারদারির এই দাবী ভিত্তিহীন কারণ পাকিস্তান আর্মির পক্ষ থেকে এরকম কোনো বক্তব্য রাখা হয় নি। সবাই জানে, পাকিস্তানে আর্মির হাতেই নিউক্লিয়ার বোমা আছে। অনেকদিন ধরেই বিভিন্ন বিশেষজ্ঞরা পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সিমুলেশন করে সিদ্ধান্তে এসেছেন যে কোনোভাবে যুদ্ধ শুরু হলে নিউক্লিয়ার বোমাতে গিয়েই যুদ্ধ শেষ হবে।

সন্ত্রাসীরা আফগানিস্থান আর সেখানের পশ্চিমি সেনাদের ছেড়ে কেন ভারতকে লক্ষ্য হিসাবে বেছে নিল?

লস্করের মূল ঘাঁটি হল লাহোরের কাছে ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে অবস্থিত মুর্দিকে শহরে। এই শহরে এদের আছে একটা বড় ট্রেনিং ক্যাম্প আর সমাজসেবক সংস্থা। লস্করের অধিকাংশ সদস্যই পাঞ্জাবী, তাই এরা আফগানিস্থানে লড়াই করার পক্ষে অনুপযুক্ত, কারণ এরা সহজে পাশতুন বা আফগানদের সাথে মিশে যেতে পারে না। লস্কর হল ভারতমুখী ও কাশ্মীরমুখী একটি সন্ত্রাসী দল। কিন্তু, পাকিস্তানের অন্যান্য জঙ্গীগোষ্ঠীদের মতই এরাও ভারত, আমেরিকা আর ইসরায়েলের মধ্যে বোঝাপড়া আছে বলে মনে করে। তাই, এরা সবাই এই দেশগুলোর শত্রু।

মুম্বই-সন্ত্রাসীদের হামলার দাবী কি ছিল?

সব জিম্মিদের হত্যা করা হয়েছে আর কোনো দাবী সরকারীভাবে প্রকাশিত হয় নি। লস্কর বা সমধর্মী পাকিস্তানি জঙ্গীগোষ্ঠীদের উদ্দেশ্য খুবই পরিষ্কার। এই ক্ষেত্রে, ভারতের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কেন্দ্রস্থল হিসাবে মুম্বইকে আক্রমণ করা হয়েছে, হয়ত ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বাধিয়ে দেওয়াও উদ্দেশ্য ছিল। ভারত-সীমান্তে পাকিস্তানী সেনা সরালে তাদের দলের তালিবানদের সুবিধা হবে। ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিন্দু দক্ষিণপন্থীদের হাত শক্ত করাও এদের লক্ষ্যের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, কারণ এর ফলে এদের দলে আরো নতুন মুখ পাওয়া সোজা হবে। সবেশেষে, অমুসলিমদের বিরুদ্ধে ক্ষোভের উদ্গিরণও ঘটেছে এই আক্রমণে।

পশ্চিমা সাংবাদিকেরা বলছেন আল-কায়দা আর লস্কর-ই-তৈবা এখন যৌথ কার্যক্রম চালাচ্ছে, এ বিষয়ে আপনার মত কি?

এদের উদ্দেশ্য একই রকম হলেও সামান্য কিছু মতাদর্শগত তফাৎ থাকতেই পারে। সন্ত্রাসীদের দুনিয়ায় সামান্য মতাদর্শের পার্থক্যই দুই দলের মিলিত কার্যক্রমের জন্য যথেষ্ট প্রতিবন্ধকতা হয়ে দেখা দিতে পারে। এখনও অবধি এদের যৌথ কার্যক্রমের কোনো পরিচয় পাওয়া যায় নি, তাই এই ধারণাকে আমি এখনও সন্দেহাতীত বলে মনে করি না।

এই সন্ত্রাসে কাশ্মীরের ভূমিকা কতটা?

কাশ্মীরে ১৯৮৭ থেকেই বিপ্লব চলছে। ১৯৮৭ সালের ভোটে ব্যাপক আকারে কারচুপির ফলে এক গণবিক্ষোভ সৃষ্টি হয় যা ভারত সেনা পাঠিয়ে বলপূর্বক দমন করে। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এই সুযোগে এক গোপন যুদ্ধ শুরু করে ভারতের বিরুদ্ধে। ইউনাইটেড জিহাদ কাউন্সিল বলে এক ২২টি পাকিস্তানী সংগঠনের সমবায় সংস্থা সেনা ও আই-এস-আই-এর সহায়তায় তাদের কার্যকলাপ চালিয়ে যায়। এদের সহায়তায় জেনারেল মুশারফ ১৯৯৯ সালে কারগিলে যুদ্ধ শুরু করেন। এতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্ষতি হলেও পাকিস্তানও শেষমেষ সেনা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। জেনারেল মুশারফ যুদ্ধে বিজয়ীর মর্যাদা পান, আর ভীরু বলে চিহ্ণিত হন নওয়াজ শরিফ। এর পরের ঘটনা সবারই জানা।

পাকিস্তানি সমাজের কোন অংশ আল কায়দা আর ওসামা বিন লাদেনকে সমর্থন করে?

বালুচিস্তান আর সিন্ধে ওসামার প্রতি সমর্থন পাঞ্জাব আর উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের তুলনায় অনেক কম। মজার কথা হল পাকিস্তানের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী নিজেরা পশ্চিম-ঘেঁষা জীবনযাপণ করেন আবার ওসামার প্রতি সমর্থন বা পশ্চিম-বিদ্বেষও তাদের মধ্যেই বেশী। আমি খুবই অবাক হই যখন তালিবান আত্মঘাতী ঘাতকেরা দেশের মসজিদ, শোকসভা, হাসপাতাল, মেয়েদের স্কুল আক্রমণ করে বা নিরীহ পুলিশদের মেরে ফেলে অথচ তাদের বিরুদ্ধে কিছু শোনা যায় না। জনগণ এতটাই আমেরিকা-বিরোধী যে এই ঘটনাগুলোও তাদের মনে দাগ কাটে না। অনেক সময় পাকিস্তানী বামপন্থীরাও তালিবানদের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী শক্তি বলে ভুল ভেবে বসে।

এ বিষয়ে আপনার মতামত কি? এই তালিবানদের কি সত্যিই পাকিস্তান-সমাজে কিছু অবদান আছে?

পৃথিবীর সর্বত্র মানুষ যা চায় পাকিস্তানীদেরও তাই দাবী। খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান, চাকরি-বাকরি, উন্নত বিচারব্যবস্থা ও উন্নয়নমুখী সরকার আর সুরক্ষা। এর সাথে আছে শিক্ষা ও চিন্তা ও ধর্মাচরণের স্বাধীনতা যা ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইটস ডিক্লারেশনে আছে। এর পরে আসে দেশের সার্বভৌমত্ব, বিদেশনীতি ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যু। এ কারণে, পাকিস্তানে এই তালিবান-গোত্রীয়রা কোনো অবদান রেখেছে বলে মনে হয় না। তারা পরিবার-পরিকল্পনা-বিরোধী, সংখ্যালঘু-বিরোধী, নারীশিক্ষার বিরোধী। বহির্বিশ্ব সম্পর্কে এদের কোনো জ্ঞান নেই, জানার কোনো ইচ্ছাও নেই। তারা শুধু যুদ্ধের মাধ্যমেই সমাধান খোঁজে। পাকিস্তানে এবারের ভোটে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে জনগণ এদের পছন্দ করে না।

২০০২ এর জানুয়ারীতে পারভেজ মুশারফ ঘোষণা করেছিলেন যে পাকিস্তানের জমি ব্যবহার করে কেউ সীমানা পেরিয়ে আক্রমণ চালাতে পারবে না। সেই প্রতিশ্রুতি কি রাখা হয়েছিল?

এই ঘোষণার পরে সত্যিই সীমানা পেরিয়ে আক্রমণ অনেকটা কমে গিয়েছিল, কিন্তু কোনোভাবেই নির্মূল হয়ে যায় নি। অক্টোবরের ভূমিকম্পের পরে আমি নিজে ত্রাণের কাজে আজাদ কাশ্মীরের বিভিন্ন অংশে ঘুরে এসেছি। দেখেছি – লস্কর-ই-তৈবা, জৈশ-ই-মুহম্মদ বা সিপাহী-ই-সাহেবা আর অন্যান্য নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন ত্রাণ বিলি করছে। এদের ত্রাণ বিতরণের পরিকল্পনা পাকিস্তান সরকার বা আর্মির চেয়ে অনেকগুণ উন্নত – এমনকি আহত সেনাদেরও এরা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করেছে। অথচ, পারভেজ মুশারফকে কয়েক মাস পরে এ কথা বলাতে দেখলাম উনি রেগে যাচ্ছেন, যেন এই দলগুলো নিয়ে আলোচনাও নিষিদ্ধ।

পাকিস্তানে কিছু গোষ্ঠী আছে যারা আমেরিকা-বিরোধী ও কড়া ধর্মীয় আইন প্রবর্তন করার পক্ষে, আর উল্টোদিকে দেশের সরকার আমেরিকার বন্ধুদেশ বলে নিজেদের দাবী জানায়। এই মেরুকরণের কারণ কি? পাকিস্তানে উগ্রবাদের উত্থানে এই মেরুকরণের ভূমিকা কতটা?

পাকিস্তানে মৌলবাদী শক্তির উত্থানের মূলে আছেন আমেরিকা ও রোনাল্ড রেগানের সমর্থিত পাকিস্তানী জেনারেল জিয়া উল হক। আজ থেকে বছর পঁচিশেক আগে, এই দুই নেতা হাত মিলিয়ে আফগানিস্তানে সোভিয়েতদের তাড়ানোর জন্য দেশে উগ্রবাদী শক্তির বীজ বপন করেন। সেই সময়ে মৌলবাদের প্রসারে আমেরিকা খুশীই হত, কারণ সেই প্রসার তাদের লক্ষ্যপূরণের মাধ্যম হিসাবে কাজ করত। সেই একই সময়ে, জেনারেল জিয়ার আমলে সারা দেশে একটা সামাজিক পরিবর্তন দেখা দেয়। সব সরকারি অফিসে নামাজ পড়া বাধ্যতামূলক করা হল, জনসমক্ষে অপরাধীদের বেত্রাঘাত করা শুরু হল, রমজানে উপোস না করলে শাস্তির ব্যবস্থা করা হল, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের সময় ইসলাম সম্পর্কিত জ্ঞানেরও পরীক্ষা নেওয়া শুরু হল এবং সব মুসলিমদের জন্য জিহাদ বাধ্যতামূলক করা হল। কিন্তু আজকে সেই উগ্রবাদীদের সাথেই সরকারের লড়াইতে যেতে হয়েছে, আবার সেই আমেরিকারই নির্দেশে। দেশের আর্মি ও সরকার আমেরিকার সাথে থাকলেও তাই জনগণ স্বাভাবিকভাবেই আমেরিকা বিরোধী।

প্রেসিডেন্ট জারদারি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে উনি উগ্রবাদীদের খুঁজে তাদের ট্রেনিং ক্যাম্প ধ্বংস করবেন। কিন্তু কাজে সেরকম কোনো লক্ষণ দেখছি না। উনি কি এর চেয়ে বেশী কিছু করতে চান না? নাকি এর থেকে বেশী কিছু করার ক্ষমতাই ওনার নেই?

আসল ক্ষমতা পাকিস্তানের আর্মির হাতে। এই উগ্রবাদীদের সাথে লড়াইতে দু’হাজার সেনা মারা পড়েছে। তাও আর্মি ভেতর থেকে নিশ্চিত নয় যে এই উগ্রবাদীরা পাকিস্তান দেশটাকে বাঁচিয়ে রাখার পরিপন্থী। আমি এদের এই দ্বিধার কারণ বুঝি। বছরের পর বছর ধরে আর্মিতে এই বুঝিয়ে লোক নেওয়া হয়েছে যে তারা ভারতের সাথে যুদ্ধ করবে ও ইসলামকে রক্ষা করবে। কার্যত, এখন তারা লড়াই করছে এমন এক দলের সাথে যারা ইসলামের আরো বড় রক্ষক। শুধু তাই নয়, আর্মিকে এখন ভারতের সাথে যুদ্ধও করতে হচ্ছে না। এই ধোঁয়াশা থেকেই তাদের ডিমরালাইজেশন আর তার সাথে যোগ হয়েছে গণসমর্থনের অভাব। উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে পাকিস্তানী সেনাদের অনেকেই তাই যুদ্ধের আগেই আত্মসমর্পণ করে দিচ্ছে।

সরকারের উগ্রবাদ-বিরোধী যুদ্ধ কি আপনি সমর্থন করেন?

জীবনে এই প্রথমবারের মত আমি মনে করি আর্মিকে সমর্থন করা দরকার, যতক্ষণ তারা নিরীহ লোকদের ছেড়ে শুধু উগ্রবাদীদের খুঁজে মারতে পারবে। দুঃখের বিষয়, নিজেদের কাজ কমানোর জন্য আর্মি এখন কোনো গ্রামে কিছু উগ্রবাদী আছে বলে সন্দেহ করলেই গোটা গ্রামশুদ্ধু উড়িয়ে দিচ্ছে। এরকম নিরীহ মানুষ হত্যা করা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।

পাকিস্তান একসময় তালিবানদের অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছে। আল-কায়দার সদস্যদের ধরে দেবার জন্য সদস্যপিছু পাকিস্তানকে সি-আই-এ টাকা দেয়। সেই টাকা নাকি পাকিস্তান উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে তালিবানদের সাহায্য করার জন্য ব্যবহার করে?

আর্মি তালিবানদের হাতে পর্যুদস্ত হলেও তারা এখনও “ভাল” আর “খারাপ” তালিবানদের মধ্যে তফাৎ করে। “ভাল” তালিবানেরা শুধু আমেরিকা, ন্যাটো ও ভারতীয়দের লক্ষ্য করে আক্রমণ চালায়, আর “খারাপ” তালিবানেরা পাকিস্তানের আর্মির বিরুদ্ধেও আক্রমণ চালিয়ে যায়। যখন আমেরিকানরা আফগানিস্তান থেকে চলে যাবে, এই “ভাল” তালিবানেরা তখন আফগানিস্তানের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কে সাহায্য করবে। জালালুদ্দিন হাক্কানি এরকমই এক “ভাল” তালিবান নেতা। আবার মৌলানা ফজলুল্লাহের মত নেতা হলেন “খারাপ” তালিবান কারণ এরা পাকিস্তান আর্মিকেও ছেড়ে কথা বলেন না। আর্মি সাধারণত এদের “ভারতের চর” আখ্যা দিয়ে প্রচার চালায়।

পাকিস্তান নিউক্লিয়ার স্টেট। এই নিউক্লিয়ার বোমা তালিবান বা আল কায়দার হাতে চলে যাবার সম্ভাবনা কতটা?

আমি বেশী চিন্তিত এই ভেবে যদি কোনোভাবে কিছু নিউক্লিয়ার বোমা তৈরীর অন্তর্বর্তী পদার্থ (সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম) তাদের হাতে চলে যায়। মজার কথা পশ্চিমের দেশগুলো আজকাল নিউক্লিয়ার অস্ত্র তৈরীতে ততটা মনযোগী নয়। নিউক্লিয়ার বোমা আজ আর ক্ষমতার মেরুকরণ করে না, কারণ সুস্থচিন্তার কোনো রাষ্ট্র কখনই এই বোমা ব্যবহার করতে পারবে না। এর ফলে আজকে নিউক্লিয়ার বোমা পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকেই সম্পূর্ণ দূর করা সম্ভব। জঙ্গীদের হাত থেকে বোমা বাঁচানোর এই একটা পথই খোলা আছে।

আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষার্থে ভারত কি করতে পারে?

ভারতের কোনোমতেই পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধে যাওয়া উচিত নয়। এমনকি যদি ভারত জেতেও, তাহলেও তাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বিশাল হবে। কোনো ছোটো হামলাও আঞ্চলিক স্বার্থবিরোধী হবে, কারণ এর ফলে জঙ্গীদের সাথে আর্মির আঁতাত আবারও মজবুত হবে। আর কোনো ছোটো হামলার প্রতিক্রিয়া অনেক বড় হয়ে দেখা দিতে পারে। পাকিস্তানে জঙ্গীঘাঁটি বন্ধ করে দেবার দাবী আমি সমর্থন জানাই, কিন্তু সেই কাজটা পাকিস্তানের নিজেরই করা উচিত। আঞ্চলিক ভারসাম্যের জন্য, পাকিস্তান ও ভারত, উভয় দেশেরই উচিত নিজের নিজের দেশ থেকে দক্ষিণপন্থী ও মৌলবাদী শক্তিকে কড়া হাতে উচ্ছেদ করা।

এই লড়াই-এর অন্তিম ফলাফল সম্পর্কে আপনার ভবিষ্যৎবাণী কি? পাকিস্তানে উগ্রবাদীরাই জিতবেন, না পশ্চিমারাই আর্মির সাহায্যে তাদের পরাজিত করতে সক্ষম হবেন?

সমস্যা খুবই গুরুতর কিন্তু সমাধান অসম্ভব কিছু নয়। গত এক দশকে আমেরিকার সাম্রাজবাদী নীতি ও ইরাক আক্রমণের ফলে জনমানসে আমেরিকা বিরোধী এক মনোভাব তৈরী হয়েছে যার ফলে যারাই আমেরিকার বিরোধিতা করছে তাদেরই তারা সমর্থন করতে পিছপা হচ্ছে না। পাকিস্তানীরা তালিবানদের সামাজিক ও আচার-আচরণগত নীতি সমর্থন করে না। অথচ তারা আমেরিকা-বিরোধী বলে গণসমর্থন পায়। আমি আশা রাখছি বারাক ওবামা ক্ষমতায় এলে আমেরিকা পাকিস্তানের যে ক্ষতি করেছে তার কিছু ক্ষতিপূরণ করবে। কিন্তু মূল কথা হল, পাকিস্তানীদের নিজেদেরই এই সমস্যা সমাধান করতে হবে, বুঝতে হবে কোনো সভ্য দেশ হিসাবে দাঁড়াতে গেলে এসব চলে না। পাকিস্তানকে পশ্চিমা সমর্থন কিছুটা গোপন রাখতে হবে হয়ত। একই ভাবে, পাকিস্তানকে আলাদা করে শাস্তি দিলে বা কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে তালিবান বা সমগোত্রীয়রা রাষ্ট্রের আরো বেশী ক্ষমতা দখল করে ফেলবে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এর চেয়ে বড় কোনো দুশ্চিন্তার কারণ নেই।

নতুন দেশে এসে

মার্চ 17, 2008

গত সপ্তাহেই আমেরিকায় এসে পৌঁছে গেছি। ব্যাপারটা হল ইন্টারনাল ট্রান্সফার নিয়ে পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্ত – আপাতত এটাই। আমাদের কোম্পানীর নিয়মমত দুবছর কোম্পানীতে থাকলে সেখান থেকে যেকোনো প্রান্তে কাজ করতে যেতে পারে। আর তার জন্য দায়িত্ব সবই কোম্পানীর। তা এরকমই ঝোঁকের বশে চলেই এলাম। আপাতত একাই এসেছি, বৌ পড়ে আছে হায়দ্রাবাদে। তবে কোম্পানী আমার স্থানান্তরনের জন্য অনেক সুবিধা দিচ্ছে। প্রথমত আমার ভিসার, বিমানে আসার ও আমার মালপত্র আনার খরচা (এমনকি আসবাবপত্র) দিচ্ছে। তারপরে, প্রথম দুমাস থাকার জায়গা, এক মাস গাড়িগাড়ি চালানো আমাকে আর আমার বৌকে শেখানোও কোম্পানীর দায়িত্ব। আর আমাকে সবসময় সাহায্য করার জন্য লোকও আছে কোম্পানীতে। আর বন্ধুবান্ধবের সংখ্যাও নেহাত কম কিছু নয়।তাও চলে এসে কেমন একটা একা একা লাগছে। একটা বড় দুই বেডরুমের ঘর পেয়েছি, যাতে একা থাকাটা দুঃসহ মনে হয়। আশেপাশে লোকজনও বিশেষ একটা নেই। ঠান্ডা প্রচন্ড … একটা বড় জোব্বামত জ্যাকেট পড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। পায়ে জুতো পরার অভ্যাস আমার কোনোকালেই ছিল না, কিন্তু জুতো না পরলেই জমে যাবো। তাই উপায় নেই। এর ওপর আমি গাড়ি চালাতেও জানি না। এখানে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট আছে ভালই কিন্তু আমাদের অফিসের দিকে কিছু নেই। এখনো মোবাইল আর বাস-পাস পেয়ে উঠিনি। SSN টা না পেলে ক্রেডিট কার্ডও আসবে না – তাই একটা কিছুও কিনতে পারছি না। বাড়িতে ফিরে কাজ কিছু থাকে না, বসে বসে ডিসকভারি চ্যানেল দেখতে হয়।

এরই মধ্যে একটু আধটু করে আমেরিকা চিনছি। পাশাপাশি দুটো দোকান – মানে রিটেল শপ আরকি। দুটোতে দুরকম দাম। আমি প্রথমে আধঘন্টা সার্ভে চালিয়ে তারপরে কিছু কাঁচা সব্জী কিনেই ফেললাম। একটা ইন্ডিয়ান দোকানে গিয়েছিলাম – তা আমার চেনা জিনিসপত্রই কি দামী লাগছে। গড়ে সব জিনিসের দামই অনেকগুণ। আর আমার ওই দামটাকে চল্লিশ দিয়ে গুণ করার বদভ্যাস না যাওয়া অবধি আমাকে মনে হয় মনকে অর্ধভুক্ত করেই রাখতে হবে। একটা জিনিস সস্তা এখানে – সেটা হল দুধ। সুতরাং দুবেলা অনেকটা করে দুধ খাচ্ছি। অনেকটা ভিখারীদের মত মানসিক অবস্থা – দাম কম পরিমাণে বেশী যে কোনো কিছুই কিনে ফেলছি। এই যেমন কালও জল কিনতে গিয়ে শেষে কোল্ড-ড্রিঙ্কস কিনেই ফিরলাম। অফিসে খাবারের দাম বেশ বেশী – তাই বাড়িতে বেশী বেশী করে খেয়ে আসছি। আর অফিসে এসে হ্যামবার্গার খাচ্ছি। এই তো চলছে।মজার ব্যাপার হল এখানে মাসে দুবার মাইনে হয়। এটার জন্য আশা করছি আমি পরের সপ্তাহ থেকে কিছুটা স্বস্তিতে থাকব। কিছু না হোক, পকেটে টাকাকড়ি তো থাকবে। এখন তো দেশ থেকে আনা ডলারে চালাতে হচ্ছে।

ওদিকে ডলারের দাম বাড়ছে, আমি আসার সময় ৩৯ টাকার কম ছিল, এখন আবার ৪০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এটা বেশ স্বস্তির খবর। এরপরে শুরু হবে বাড়ি খোঁজা, তারপরে গাড়ি কেনা। সব কিছুই কেমন একটা সুতোয় গেঁথে করে ফেলতে হচ্ছে, কোনোটা বাদ ফেলার কোনো সম্ভাবনাই নেই। অগত্যা … চলছে।

আবার কবে দেশে ফিরব সেটাও ঠিক নেই কিছু – কিন্তু ফিরতে তো হবেই। তাই সে দিকেও একটু আধটু নজর রাখতে হচ্ছে। এখন ছটা বাইশ বেজে গেছে, এতক্ষণে এখানে লোকজনে ফাঁকা হয়ে যায় – লোকে এখানে সকাল ৮টায় এসে ৫টায় বেরিয়ে যায়। এরই মাঝে ৯ই মার্চ এখানে ডে-লাইট সেভিং চালু হওয়ায় ১ ঘন্টা সময় এগিয়ে দিতে হল। তার পর থেকে আমার শারীরবৃত্তীয় ঘড়ি আমাকে ৯টার আগে অফিসে ঢুকতে দেয় না। আবহাওয়া ভাল যেদিন রোদ ওঠে। তবে অর্ধেক দিনেই বৃষ্টিই হয়ে চলে। রোদ উঠলে এখানে থেকে দূরের পাহাড় দেখা যায় – ভিউটা খুব সুন্দর (ক্যামেরা না থাকায় ছবি দিতে পারলাম না)। রাস্তাঘাট ঝকঝকে তকতকে – যেমনটা হওয়া উচিত আরকি। কিন্তু ট্রাফিকের ভয়ে নির্দিষ্ট জায়গা দিয়ে রাস্তা পার হতে গিয়ে আমাকে অন্তত আধ মাইল ঘুরে আসতে হয়। মাইলের কথায় বলা ভাল – এখানে সবই মাইল, গ্যালন আর ফারেনহাইট। মনে মনে কনভার্সন না করে শান্তি হয় না, মাইলটা নাহয় দু কিলোমিটার ধরে নিই, কিন্তু ফারেনহাইট স্কেলটা খুবই গোলমেলে। আর গ্যালনের জ্বালা তো এখনো সহ্য করতে হচ্ছে না। আমার একটা বন্ধু নতুন হন্ডা সিভিক কিনেছে – সেদিন বলে ২৫ দিচ্ছে মাইলেজ। তা ভাল, আমি মনে মনে হিসাব করতে বসলাম ২৫ মাইল প্রতি গ্যালন হলে সেটা কত কিলোমিটার প্রতি লিটার হবে। এক গ্যালন আবার ৩.৭৮ লিটার। বুঝে দেখুন হিসাবটা কত গোলমেলে।

এর মাঝে একদিন মেল পেলাম বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে কিছু অনুষ্ঠান হবে – যাব বলে মেলও করলাম – এখনো কোনো উত্তর নেই। দেখা যাক, যেতে পারলে আমি এটার একটা আপডেট দেব। তা এভাবেই চালিয়ে যাচ্ছি। দেখা যাক এখানে আরো কতদিন চালিয়ে দেওয়া যায়। আর না পারলে তো দেশে ফেরার পথ খোলাই আছে। লড়াই হল বেঁচে থাকার আরেক নাম …

লাখ টাকার স্বপ্ন

জানুয়ারি 11, 2008


কালকে টিভিতে বসে দেখলাম দিল্লীর প্রগতি ময়দানে টাটার এক-লাখি গাড়ির উদ্বোধন। সত্যি কথা বলতে, গাড়িটা আমাকে একরকম চমকেই দিয়েছে। আমি ভেবেছিলাম একটা পলকা দুই সিট-ওয়ালা একটা মাথা গোঁজার গাড়ি। তার জায়গায় টাটা আমাকে যা দেখালো, তা হল রীতিমত একটা গাড়ি। কালকেই বাবা-মায়ের সাথে কথা হল – গাড়ি কিনছিই। আর কিছু না হোক হুজুগ তো বটে।রতন টাটার কথামত একে “লাখ টাকার স্বপ্ন” বললে কমই বলা হয়। মধ্যবিত্তের চাহিদা আর নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে এত কম দামে গাড়ি ভারতের বাজারে আগে আসেনি। তাই কালকে টাটা ন্যানো বা টাটার এক-লাখি গাড়ি বাজারে আসতেই বাজার সরগরম। নতুন বছরে এই চমকের ফলে নড়ে বসেছে মধ্যবিত্ত, গাড়ি বিক্রেতা থেকে শুরু করে শেয়ার ব্রোকারেরাও। গাড়ির নাম ন্যানো কারণ গাড়ি বাজারে এটাই সবথেকে ছোট আকারে, আর গাড়িতে ব্যবহৃত হয়েছে আধুনিক ন্যানো-টেকনলজি।

টাটা সন্সের প্রধান রতন টাটা সাক্ষাতকারে বলছেন এটাই তার “একলা চলো রে” নীতির ফসল। উনি আগে এশিয়ানদের জন্য স্কুটারের যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে “জনগণের গাড়ি”(Peoples’ car) প্রস্তাব দিয়েছিলেন গাড়ি-নির্মাতাদের সম্মেলনে – যা ব্যবহৃত হতে পারে ভারতীয় উপমহাদেশ ছাড়াও ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া বা চীনে। তখন কেউ সাড়া দেয়নি, হয়ত বা অবাস্তব বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। তারপরে গত চার বছরে পাঁচশ জনের গবেষকদল এই গাড়ি বানিয়েছেন। পথ মসৃণ ছিল না, একদিকে ছিল দামের বাধা, আরেকদিকে গুণগত মান সুনিশ্চিত করার ইচ্ছা। আপাতদৃষ্টিতে, উনি সফল। সময় কিছুটা বেশী লাগলেও – সব টপকে এখন টাটা আবার সামনের সারিতে।

কতটা ভাল এই গাড়ি? সাধারণভাবে বললে মোটেও ভাল না। কিন্তু এই দামের কথা ভাবা হলে তা পুষিয়ে যায়। ডিজাইনের কথায় আসা যাক। গাড়ির বডি হবে অ্যালুমিনিয়াম আর প্লাস্টিকের। পাওয়ার স্টিয়ারিং থাকবে না। থাকবে না নিরাপত্তার জন্য এয়ার কন্ডিশনার, এয়ার ব্যাগ বা সেফটি বিম। গাড়ির সর্বোচ্চ গতিবেগ ধরা হচ্ছে ১০৫ কিমি প্রতি ঘন্টা, যদিও আদর্শ গতিবেগ বলা হয়েছে ৭০ কিমি/ঘন্টা। ভারতের শহুরে রাস্তার জন্য এই গতিবেগ আদর্শ। ৬২৩ সিসির ইঞ্জিন তৈরী হবে জার্মান কোম্পানী বস (Bosch) এর কারখানায়। প্রতি লিটার তেলে ২০-২৫ কিমি গাড়ি চলবে।

এই গাড়ি ব্যবসা করবে কি ভাবে? সাধারণ হিসাবে টাটার বাজার আসবে মূলত মারুতি আর মোটরবাইকের বাজার থেকেই। প্রতি বছর দেশে প্রায় ১৫ লাখ মারুতি অল্টো আর মারুতি ৮০০ বিক্রি হয়। প্রাথমিক সমীক্ষায় বলা হচ্ছে, মোটরসাইকেল বাজারের ১০% লোকে এবার টাটার গাড়ি কিনবে। মূলত তিনটি মডেল বাজারে আনছে টাটা। প্রথমটি টাটার বেসিক মডেল, যার দাম হবে ১ লাখ টাকা – ট্যাক্স আর পরিবহন মিলে রাস্তায় নামাতে আরো তিরিশ হাজার। এ ছাড়াও থাকছে আরো দুটি একই রকম দেখতে ডিলাক্স মডেল। সেগুলোতে থাকছে বাকি নিরাপত্তা সম্পর্কিত সুবিধা গুলো আর সাথে এয়ার কন্ডিশনার। রতন টাটার বক্তব্যমতে, টাটার বেসিক মডেল থেকে নগণ্য লাভ হবে, যা পুষিয়ে যাবে ডিলাক্স গাড়ির বিক্রি থেকে। টাটার এই গাড়ির উতপাদন মূল্য ধরা হয়েছে মাত্র ৬৫,০০০ টাকা। বিক্রির বাজার ধরা হচ্ছে ভারতীয় উপমহাদেশ ছাড়াও পূর্ব ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া, ব্রাজিল সহ লাতিন আমেরিকা আর আফ্রিকা। টাটার প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা বছরে আড়াই লাখ গাড়ি বেচা।

এসব সত্ত্বেও সমালোচনা পিছু ছাড়ে নি টাটা ন্যানোর। ইংল্যান্ডের টাইমস অনলাইন গাড়িটার সমালোচনা করে লিখেছে যে দাম কমাতে টাটা গাড়ির নিরাপত্তাও কমিয়ে দিয়েছে। রতন টাটা অবশ্য বলেছেন যে ব্রিটিশ বাজারের জন্য তার গাড়ি নয় – তাই ব্রিটিশ সেফটি স্ট্যান্ডার্ডের কথা উনি ভাবেন নি। ভারতেও পরিবেশবিদেরা আগে থেকেই সতর্ক করে দিচ্ছেন যে এর ফলে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা হু হু করে বেড়ে যেতে পারে। ফলে বাড়তে পারে পরিবেশ দূষণ আর সাথে ট্র্যাফিক জ্যাম। ভর্তুকি দেওয়া পেট্রোলের চাহিদা বাড়ার কারণে লোকসান করবে তেল আমদানীকারক সংস্থাগুলোও। আর আছে রাস্তায় ঝুঁকি – বাড়বে দুর্ঘটনা। টাটার এই গাড়ি যে কারখানায় তৈরী হবার কথা, সেই সিঙ্গুরের গণ্ডোগোল তো আগেই সমস্যা বাধিয়েছে। অনেক মানুষকে নিজের জায়গা থেকে তুলে দিয়ে শুরু হয়েছে কারখানা।

কালকেই টাটার প্রতিদ্বন্দী সংস্থা বাজাজ (এরা অটো বিক্রেতা হিসাবে খ্যাত) ঘোষণা করেছেন তারা বাজারে ২০১০ এর মধ্যে ১,২০,০০০ টাকার গাড়ি আনবেন – যার নাম হবে “হামারা”। এর জন্য তারা হাত মিলিয়েছেন বিশ্বখ্যাত সংস্থা রেনল্ট ও নিশান-এর সাথে।

কিছুকাল আগে দেখলাম পাকিস্তানও নিজস্ব এক লাখ টাকার গাড়ি বানিয়েছে – হাবিব মোটরসের এই গাড়িটির বর্তমান দাম ১,৫৯,০০০ পাকিস্তানি রুপি। সিতারা নামের এই গাড়ি পাকিস্তানের রাস্তায় খুব একটা চলেনি। তবে সম্প্রতি পাকিস্তানের রাস্তায় ট্যাক্সি হিসাবে ব্যবহারের অনুমতি দেবার পরে মনে করা হচ্ছে এর বাজার বাড়বে। বাংলাদেশের গাড়ি প্রথম কবে দেখতে পাবো?

তবে একটা ব্যাপার খুবই ঠিক, যে আজ থেকে ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগে ইন্দিরা গান্ধীর আমলে স্বনির্ভরতার জন্য মারুতির হাত ধরে যে উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, আজকের টাটা ন্যানো তারই ফসল। মারুতি প্রথমদিকে অত্যন্ত খারাপ গাড়ি বানাতো, সেই গাড়ির বাজার সুনিশ্চিত করতে সরকার উচ্চহারে শুল্ক বসিয়েছিল বিদেশী গাড়ি আমদানির ওপর। একটা সময় ছিল যখন ১০ লাখ টাকা দামের গাড়ি আমদানী করতে কর দিতে হত ৩০ লাখ টাকা, এখন কিছুটা কমলেও বিশেষ কিছু কমে নি। ভারতে এখনো যে দামী বিদেশী গাড়ি দেখা যায় তাও মূলত দেশে অ্যাসেম্বল্ড – মার্সিডিস থেকে লোগান। এর ফলে দীর্ঘ সময় ধরে তৈরী হয়েছে অনেক দক্ষ শ্রমিক, ইঞ্জিনিয়ার আর ব্র্যান্ড। আর দেশীয় গাড়ি নির্মাতার উতসাহ পেয়ে দেশে কম দামে গাড়ি তৈরীর চেষ্টা করে গেছে। গাড়ির মান প্রথমে অনেক খারাপ ছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে উন্নতিও হয়েছে। টাটা ন্যানোর ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতা এসেছে এই মারুতি থেকে সরিয়ে আনা ইঞ্জিনিয়ারদের হাত ধরেই।

আমি নিজে অবশ্য ধীরে চল নীতি নিচ্ছি। আগেরবারে টাটার ইন্ডিকা গাড়িতে প্রথম এডিশনে চাকায় ভুলত্রুটি ছিল। পরের এডিশনে অবশ্য তা শুধরে নিয়েছে। এবারেও একই ঘটনা ঘটবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়? গাড়ি কিনলে হাইপের স্টেজটা কেটে গেলে তারপরেই কেনা ভাল।

বছরের শেষে এই গাড়ি বাজারে আসবে। কিন্তু বছরের শুরুতেই সেরকম হাইপ তৈরী হয়েছে যে টাটা এখন খুব সংকটে। যদি বছরের শেষে গ্রাহকদের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারে? তাহলে টাটার নাম বা ব্র্যান্ড কিছুদিনের জন্য একটা বড় ধাক্কা খেতে চলেছে। আর উল্টোদিকে সফল হলে সবটাই ইতিহাস হয়ে যাবে।

টাটার গাড়ির উদ্বোধনী অনুষ্ঠান (ইউটিউব ভিডিও)
একনজরে টাটা ন্যানো ১
একনজরে টাটা ন্যানো ২
একনজরে টাটা ন্যানো ৩

সফটওয়ারের বুদবুদ

জানুয়ারি 11, 2008

সুবিনয় মুস্তাফীর লেখা পড়ে আমার মনে হল ভারতের অর্থনীতির বর্তমান বুদবুদ সম্পর্কে কিছুটা লিখেই ফেলি। আমার মনে আছে ছোটবেলায় একধরনের অংক করতাম যাতে হিসাব করতে হত বুদবুদের আকার কি হারে বাড়বে। আমাদের এখানের এই সফটওয়ার বুদবুদ আমার সব হিসাব ছাড়িয়ে বড় হয়েই চলেছে, আর আমি এই বুদবুদ ফাটার অপেক্ষায় কান বন্ধ করে অপেক্ষা করছি।

আগে শুরু করা যাক একটু পুরোনো ফ্ল্যাশব্যাক থেকে। এখানে সফটয়ার শিল্পের শুরু হল একরকম নব্বই দশকে উদার অর্থনীতির হাত ধরে। যদিও, ইন্দিরা গান্ধীর আমলে দেশীয় স্বয়ং-সম্পূর্ণতা আনার লক্ষ্যে আই-বি-এম কে তাড়িয়ে দিয়ে একরকম দেশীয় কোম্পানীদের ব্যবসার সুযোগ করে দেওয়া হয়। উইপ্রো, টিসিএস আর ইনফোসিসের সূত্রপাত এ সময়েই। তবে আসল কাজ করার সুযোগ আসে ওয়াই-টু-কে সমস্যার হাত ধরে। প্রচুর কাজ একসাথে এসে পড়ায় আমেরিকান কোম্পানিরা খরচা বাঁচাতে কিছু ভারতীয় কোম্পানীকে কনট্রাকটে কাজ আউটসোর্স করে দিতে থাকে। ভারতের বাজারে তখন সেই সামান্য টাকার চাকরি দেবার লোকও ছিল না। ফলে দলে দলে লোকে সফটওয়ার শিল্পে চলে আসে। কাজে সাফল্য পেয়ে অনেক কোম্পানী অন্য কাজও দিতে শুরু করে – একে একে আসতে থাকে সার্ভার ম্যানাজমেন্ট, ডেটাবেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা প্রোগ্রামিং-এর কাজও। কিন্তু আবার বাদ সাধে ২০০০ সালের মন্দা আর পরবর্তীকালের ৯/১১ হামলা।

আর এই শিল্পের সাথে জড়িয়ে আছে চাকরির বাজার। আমাদের এখানে মোটামুটি ভাল সব ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে শেষ বর্ষে ক্যাম্পাসেই চাকরির ইন্টারভিউ হয়। কোম্পানীগুলো “ফ্রেশার” ছাত্রদের চাকরির অফার দিয়ে যায়। পরে পাশ করে বেরোলে ছাত্ররা সেই কোম্পানীতে সুবিধামত যোগ দেয়। ২০০০ সালে চাকরির বাজার এত ভাল গিয়েছিল যে আমাদের কলেজে খুব তাড়াতাড়িই কম্পিউটার সায়েন্সের সবার চাকরি হয়ে গেছিল, তারপরে অন্য বিভাগের ছেলেরাও সফটওয়ারের চাকরি পাচ্ছিল (ক্যাম্পাসে একজন একটার বেশী চাকরি পেতে পারে না, দ্বিতীয় চাকরি বাইরে থেকে পেতে হয়)। আমাদের ২০০১ সালে আমরা আরো তাড়াতাড়ি চাকরি পেয়ে গেলাম – মাসে ১০-১২ হাজার থেকে শুরু করে ৩০-৩৫ হাজার পর্যন্ত মাইনে। কিন্তু বেরোতে না বেরোতে চাকরি বাজার থেকে উধাও – যারা অফার করে গেছে তাদের আর পাত্তা নেই। কেউ বলে নিতে পারবনা, কেউ বলে পরে নেব – আপাতত জায়গা নেই। খুব হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানীতে জয়েন করতে পারল ছেলেরা। এই মন্দা কাটতে সময় লেগে গেল আরো তিন বছর।

তিন বছর পরে দেখা গেল ভারতীয় কোম্পানীদের সাথে পাল্লা দিয়ে বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানীরাও বাজারে চলে এসেছে। কারণ মন্দার বাজারে, ভারতীয় কোম্পানীদের সাথে পাল্লা দেবার জন্য সেটাই ভাল কৌশল। আর এ এমন কৌশল, যে একজন তা অবলম্বন করলে বাকিরাও তা করতে বাধ্য। তাই, দলে দলে বহুজাতিক ভারতে অফিস খুলে অফারের ঝুলি নিয়ে কলেজে আসা শুরু করল ২০০৩-০৪ নাগাদ। আই-বি-এম ফিরে এল কোলকাতায়, যেখান থেকে তাদের অনশন ধর্মঘট করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল এককালে। আবার ছেলেরা চাকরি পেতে থাকল ভাল বেতনের।

মুশকিলটা হল, এইবারে আর এই চাকরির বুদবুদের কোনো শেষের লক্ষণ দেখছি না। বুদবুদের আকার বেড়েই চলেছে। আমি ১৯৯৭ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে ঢুকেছিলাম যখন পশ্চিমবঙ্গে সাকুল্যে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সংখ্যা ছিল ৬টি, যার মধ্যে একটি বেসরকারি। ছাত্র নেওয়া হত ১৮০০। আর এখন অসংখ্য ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ আর সিট ২৫-৩০ হাজারের মত। কম্পুটারের ছাত্র সফটওয়ারের কাজ করবে – সে দিন আগেই চলে গেছে। নতুন ধারায় সিভিল, মেকানিকালের ছাত্রও সফটওয়ারের কাজে যোগ দেয় মাইনের লোভে। এদের চাকরির বাজার তুঙ্গে। সদ্য খোলা একেকটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের প্রথম ব্যাচের ছাত্রদের প্রায় অর্ধেকই দেখি ক্যাম্পাসেই চাকরি নিয়ে বসে আছে। টিসিএস মাঝে মাঝে এক-একটা প্রোজেক্ট পাচ্ছে যাতে ৮০০০ থেকে ১০০০০ “মাথা” দরকার। তারা আসে কোথা থেকে? ক্যাম্পাসে গিয়ে ধরে আনা হয়। পিছিয়ে নেই বিজ্ঞান বা কলা-বিভাগের ছাত্ররাও – ডিপ্লোমা করে তারাও নাম লেখাচ্ছে একই দলে। বেড়ে চলেছে চাকরির মাইনে – আর সাথে সাথে মাইনে না বাড়ালে অন্য চাকরিতে চলে যাও। গাদা গাদা রিক্রুটমেন্ট এজেন্সী খালি “মাথা” ধরে এনে দেয় – মাথাপিছু তাদেরও টাকা মেলে ভালই। এই সফটওয়ারের সূত্রে গগনচুম্বী হয়ে গেছে রিয়েল এস্টেটের দাম – শুধুমাত্র যে অঞ্চলে সফটওয়ারের লোকজন থাকে সে অঞ্চলেই। সফটওয়ারের সাথে যোগ দিয়েছে বি-পি-ও, ওপারের লোকজনের সাথে ফোনে ইংরেজীতে কথা বলার চাকরি। সাধারণ ছেলেরা উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেই কাঁড়ি-কাঁড়ি পকেটমানি তৈরী করে ফেলছে পার্টটাইম কাজ করে।

আর এর ফলে সমস্যাও কম তৈরী হচ্ছে না। একে তো নতুন ইঞ্জিনিয়ারদের গুণগত মান খারাপ থেকে আরো খারাপের দিকে নেমে চলেছে আরেকদিকে ভাল ছাত্ররা শিক্ষকতার মত মহত পেশায় আর কেউ আসছেনা। বাজার তো ফুলেই চলেছে। সাধারণ সরকারি চাকুরেরা আর প্রতিযোগিতায় না পেরে উঠে মূল্যবৃদ্ধিকে দুষছেন। আর অন্যান্য শিল্পে দক্ষ শ্রমিকের অভাব দেখা দিচ্ছে – ভাবুন তো আর্কিটেক্টরা যদি দলে দলে সফটওয়ারে যায় তবে আর্কিটেকচারের কাজ কে করবে? কদিন আগে দেখলাম লার্সেন অ্যান্ড টুব্রোর মত নামকরা নির্মান শিল্পের কোম্পানী দাবী জানিয়েছে যে তাদের অধিকাংশ কর্মী প্রথম দু-বছরের মধ্যে ছেড়ে চলে যাচ্ছে – তাও কিনা সফটওয়ারে।

কিন্তু বুদবুদ ফাটলে কি ঘটবে? ভেবেও ভয় হয়। যে হারে টাকার(রুপি) দাম ডলারের বিরুদ্ধে বেড়ে চলেছে তাতে ক’দিনের মধ্যে আমেরিকায় সফটওয়ার রপ্তানী করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে। কিন্তু ক্রমবর্ধমান বেতনের বিল তো কোম্পানীর পকেট ফাঁকা করেই চলেছে। তাই এই গ্যাপ ভরাতে নতুন কোনো কৌশল অবলম্বন না করলে অবিলম্বে এই বুদবুদ তো সশব্দে ফেটে পড়বে। প্রভাবিত হবে সারা ভারতের সাথে সাথে আরো অনেক দেশও। তাহলে আমি কি নিজের চোখে দ্বিতীয় বুদবুদের পরিসমাপ্তি দেখতে পাব? (Hard Landing)নাকি কালের সাথে সাথে ধীরে ধীরে চুপসে যাবে? (Soft Landing) সেটাই এখন আমার কাছে লাখ টাকার প্রশ্ন।

নিজভূমে পরবাসী

জানুয়ারি 11, 2008


আজ বিশ্ব মানবাধিকার দিবস। এবার এই দিন সোমবারে পড়েছে বলে এখানে মিছিল-মিটিং-ধিক্কারের সংখ্যা কম। তাও শুনলাম কাশ্মীরে আর কোলকাতায় কোনো কোনো জায়গায় কিছু বিচ্ছিন্ন সভা আয়োজন হচ্ছে। লোকে এখন আজকাল এতোটাই কেরিয়ার-সচেতন যে অফিস কামাই করে দুটো মিটিং-এ যোগ দেবার সদিচ্ছা কারো নেই – তাও যদি ইস্যুটা হয় “অন্যের মানবাধিকার”। সবাই নিজের নিজের ইস্যুতে সিদ্ধহস্ত, নিজের অধিকার সচেতন, কিন্তু অন্যের অধিকারের বিষয়ে গা নেই। স্বভাবতই এখানে মানবাধিকার দিবস অলিখিত হিসাবে সরে চলে এসেছে রবিবারে। তাই কাল ভাবলাম এদিকে ওদিকে একটু ঢুঁ মেরে দেখেই আসি কোথায় কি চলছে।

আমাদের সাথে কাজ করে রাহুল রাজদান বলে এক কাশ্মীরী (নামে কাশ্মীরী – নিজেকে ইউরোপিয়ান বলে দাবি জানিয়ে পার পেয়ে যেতে পারে যেকোনো জায়গায়)। যাহোক তিনি আমাদের আগেই আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তাদের মৌন মিছিলে যোগদান করার জন্য। অনেক খুঁজে পেতে গিয়ে হাজির হলাম তাদের সংস্থা রূটস ইন কাশ্মীরের (RIK) মিটিং-এ। একটা বড় রাস্তার পাশে ১০-১২ জন ছেলে-মেয়ে কিছু প্ল্যাকার্ড-ফেস্টুন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কপালে লাল ফেট্টি বাঁধা – লেখা “RIK”। রাহুল সহ আর কয়েকজন পাশে ল্যাপটপে পাওয়ার-পয়েন্ট প্রেসেন্টেশন দিয়ে চলেছে – কাশ্মীরে পণ্ডিতদের ওপর কিরকম কি অত্যাচার হয়েছে। একের পর এক স্তুপীকৃত লাশের বা ভাঙা দালানের ছবি আর পাশে স্থান-কাল। আমরা যেতে খুব খুশী হল আর অনেকবার ধরে ধন্যবাদ জানালো। সাথে দিল কয়েকটা প্যামফ্লেট – যাতে অসংখ্য রেফারেন্স দিয়ে বোঝানো আছে কি সমস্যা তাদের – কিভাবে সরকার আর জঙ্গীদের মাঝে “স্যান্ডুইচ” হয়ে তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ছে দিনে দিনে। প্রতিবছর এই কয়েকজন পণ্ডিত মিলে হায়দ্রাবাদে রোড শো করে আর মোমবাতি জ্বালিয়ে সবাইকে জানান দিয় যান – যে তারা হায়দ্রাবাদে থাকলেও তারা আসলে কাশ্মীরী।

কাশ্মীরে পণ্ডিতেরা হল আদি কাশ্মীরী – কয়েক হাজার বছর ধরে কাশ্মীর উপত্যকার স্থায়ী বাসিন্দা। আগে বেশ কয়েক দফায় এই সম্প্রদায়ের লোকজন কাশ্মীর থেকে পাতাতাড়ি গুটিয়ে ভারতে বিভিন্ন জায়গায় বাসা বেঁধেছে। এখন এরা তাই সংখ্যায় খুবই কম – মাত্র পাঁচ কি ছয় লাখ হবে। ভোটের দেশে চিরকালের মত এখানেও সংখ্যালঘুদের পাত্তা এমনিতেও কম – তার ওপর যদি জায়গাটা হয় কাশ্মীরের মত “Disputed”। ১৯৮৯ সালে যখন প্রথম কাশ্মীরে সংঘর্ষ শুরু হল, তখন প্রথম আক্রান্ত হয় এই পণ্ডিতেরাই। ভারত সরকারের প্রতিনিধি হিসাবে এদের প্রক্সি দাঁড় করিয়ে শুরু হয় জঙ্গীদের অত্যাচার। মসজিদ থেকে মাইকে ঘোষণা শুরু হয় পণ্ডিতদের ঘরছাড়া করার আদেশ। শুরু হয় যাকে বলা হয় এথনিক ক্লিনসিং – বছরের পর বছর সংখ্যালঘুদের নিশ্চিহ্ন করে দেবার যে খেলা চলে এসেছে তারই আরো এক দফা। একের পর এক পণ্ডিতকে দলে দলে মারা শুরু হয় – কোথাও গলায় দড়ি দিয়ে, কোথাও গুলি করে, কখনো হাত-পা কেটে আর কখনও বা জ্যান্ত পুড়িয়ে। এসব লোমহর্ষক কাহিনী এখন আমাদের কাছে পুরোনো হয়ে গেছে – স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছে শুধু উদ্বাস্তু পণ্ডিতেরা যারা কোনোরকমে পালিয়ে বেঁচে আছে জম্মু আর দিল্লীর কিছু রিফিউজি ক্যাম্পে। সংখ্যার খাতিরে বলে রাখা ভাল – ১৯৮৯ সালের পরে কাশ্মীরে হামলায় মৃত ৭০ হাজার মানুষের মধ্যে প্রায় ১২ হাজার হলেন সম্প্রদায়ভুক্ত (অত্যাচার করে মারার ঘটনা প্রায় ১,১০০র মত) আর রিফিউজি-র সংখ্যা তিন থেকে পাঁচ লাখের মধ্যে (সরকারি ভাবে যদিও সংখ্যাটা এক-দেড় লাখের বেশী নয়)। আক্রান্ত প্রায় একশো মন্দিরের মধ্যে অনেকগুলোই এখন পরিত্যক্ত। জংগীদের ঠেলায় কাশ্মীর উপত্যকার শতকরা নব্বই থেকে পচানব্বই ভাগই এখন থাকেন জম্মু আর দিল্লীর ক্যাম্পে – ত্রিপলের তাঁবুতে।

আরো মজার কথা, যারা ছিলেন এই গণহত্যার দায়িত্বে, তাদের মধ্যে অনেকেই ব্যক্তিগত সাক্ষাতকারে স্বীকার করেছেন গণহত্যার কথা। যেমন ধরা যাক ইয়াসিন মালিক বা
“বিট্টা কারাটে”র (ফারুক আহমেদ দার) কথা। এরা গণহত্যার পরে এখন হিরো হয়ে বেঁচে আছেন। কাল “বিট্টা কারাটে”র ইন্টারভিউ দেখলাম ইউটিউবে। শান্ত গলায় সে দাবী জানাল সে বিশ জনকে মেরেছে – আর তার জন্য সে যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা ফাঁসির সাজা আশা করছে (২০০৬ সালে ছাড়া পেয়েছে ফারুক, এখনো কাশ্মীরে আছে)। বিবিসির সাথে ইন্টারভিউতে একইভাবে গণহত্যার কথা স্বীকার করেছেন ইয়াসিন মালিকও। কিন্তু এদের বিচারের ব্যবস্থা নেই – যেমন নেই গুজরাটে দাঙ্গাকারীদেরও।

কালরাতে বাড়ি ফিরে আরো একটু ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি করে মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল। কাশ্মীরী পণ্ডিতেরা ভারতের – নিজভূমে পরবাসী’দের (Internally Displaced People) মাত্র অর্ধেক। বাকি অর্ধেকের মধ্যে আছে আসামের সাঁওতালরা – যাদের এককালে আসামে এনেছিল ব্রিটিশেরা – চা বাগানে কাজ করানোর জন্য। আছে গুজরাটি দাঙ্গাপীড়িতরা, মিজোরামের উপজাতিরা – যারা আশ্রয় নিয়েছে ত্রিপুরাতে আর মাওবাদী হামলায় ঘরছাড়া গ্রামবাসীরা। এর সাথে শুরু হচ্ছে কর্পোরেট ডিসপ্লেসমেন্ট – মানে শিল্পের জন্য জমি নিতে গিয়ে উচ্ছেদ। কম করেও ছয় লাখ লোক আছেন এই “নিজভূমে পরবাসী”দের দলে। দিন যাচ্ছে, কারোর দেশে ফেরার কোনও আশা দেখা যাচ্ছে না – সরকার পুনর্বাসনের জন্য “কথাবার্তা” চালাচ্ছে। মাঝে মাঝে মনে হয়, আদিম মানুষেরা নিজের জায়গায় থাকার অধিকারটা অন্তত নিশ্চিত করেছিল। আমরা অনেক এগিয়ে গিয়ে কি সেই পুরোনো অধিকারটাই হারিয়ে ফেলছি? তবে ওই – “অন্যের মানবাধিকার” নিয়ে মাথা ঘামিয়ে কি লাভ? তাই আজ আমিও আবার পুরোপুরি কাজে ডুবে গেছি। স্বার্থপরতা জিন্দাবাদ!!

পুনশ্চ – অশোক পণ্ডিতের একটি তথ্যচিত্র ইউটিউবে দেখতে পারেন কাশ্মীরী পণ্ডিতদের নিয়ে – প্রথম খণ্ড, দ্বিতীয় খণ্ড

বিট্টা কারাটের ইন্টারভিউ ইউটিউব থেকে তুলে দিলাম।

ষাট বছরে ভারত

জানুয়ারি 11, 2008

ভারতের স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহ সম্প্রতি CNN-IBN চ্যানেলের হয়ে স্বাধীন ভারতের দশটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তুলে ধরেছেন, যেগুলোকে স্বাধীন ভারতের যাত্রাপথে বিভিন্ন মোড় বলে ভাবা যেতে পারে। কোনো ঘটনা ভাল প্রভাব এনেছে তো কোনোটি খারাপ। তবে ভারতীয় জনমানসে এই ঘটনাগুলোর স্মৃতি বা পরিণতি বহুকাল থাকবে। ঘটনাগুলোর মধ্যে আটটি রাজনৈতিক ও বাকিদুটোকে অরাজনৈতিক বলা চলে।

প্রথমটি শুরু হয় কাশ্মীরের ভারত সংযুক্তি নিয়ে। পাকিস্তান কাশ্মীর আক্রমণ করলে, স্বাধীন জম্মু ও কাশ্মীরের রাজা হরি সিং ও নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ আবদুল্লা ভারতের সাথে প্রতিরক্ষার বিনিময়ে ‘Treaty of Accession’-এ সই করেন। চুক্তিমত ভারত পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ করে। এক শান্তিপূর্ণ গণভোটের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে জাতিসংঘ যুদ্ধ থামালেও পরবর্তীকালে ভারত ও পাকিস্তান কেউই গণভোটে কোনোরকম আগ্রহ না দেখিয়ে কাশ্মীর নিয়ে বারবার যুদ্ধে লিপ্ত হয়। অপরদিকে, কাশ্মীরের জনগণ তাদের বলপূর্বক ভারতভুক্তির প্রতিবাদে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করে। কাশ্মীর ছাড়াও আরো কিছু রাজতন্ত্রের বলপূর্বক ভারতভুক্তি নিয়ে আজও প্রশ্নচিহ্ণ থেকে গেছে।

দ্বিতীয়টি হল ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারক সংবিধান রচনা। ১৯৪৯ সালে রচিত এই সংবিধান ১৯৫০ সালে কার্যকর হয়। সংবিধানের সাহায্যে ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের পথ চলা শুরু হলেও পরবর্তীকালে বারবার সংবিধান লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে স্বাধীন ভারতে।

তৃতীয় ঘটনা হল ১৯৫২ সালের প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচন। নির্বাচন চলাকালে লোকজনের উৎসাহ ও উদ্দীপনা ছিল তা আজো দেখা যায় না। ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসেন স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু, কিন্তু ভোটের অঘোষিত নায়ক ছিলেন সুকুমার সেন, ভারতের প্রথম নির্বাচন কমিশনার। তিনি ভোট পরিচালনায় বহু অদ্ভূত পন্থা অবলম্বন করেছিলেন যা সমসাময়িক বিশ্বে নজিরবিহীন। তবে তখনকার মত এখনো ভোটপ্রক্রিয়ায় জনগণের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্নচিহ্ণ রয়েই গেছে। তবে, শুরু থেকেই ভোটে সব ভারতীয়র ভোটাধিকার ছিল, যা তৎকালীন বিশ্বে হাতে গোনা কয়েকটি দেশে পাওয়া যেত, ছিলনা আমেরিকা বা সুইজারল্যান্ডেও।
(আমি এবিষয়ে খুঁজে দেখলাম ভারতেও যৌন প্রতিবন্ধীদের(হিজড়ে) ভোটাধিকার দেওয়া হয় নব্বই-এর দশকে – সুতরাং সবার ভোটাধিকার ছিল না। বর্তমানে লোকসভায় একজন প্রতিনিধিও এই গোষ্ঠিভুক্ত।)

চতুর্থ হল পঞ্চাশের দশকের ভাষাভিত্তিক রাজ্য-পুনর্গঠন। ১৯৫২ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামী পট্টি শ্রীরামালু তেলেগুভাষী অন্ধ্রপ্রদেশের জন্য ৫৮ দিন অনশনের পরে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যু এক আন্দোলনের সুচনা করে যার ফলশ্রুতিতে গঠিত হয় সহায়তা কমিশন। কমিশনের বক্তব্য অনুসারে গঠিত হয় কেরল, অন্ধ্র ও কর্নাটক। পরে বাকি রাজ্যগুলোও পুনর্বিন্যস্ত হয় একই প্রক্রিয়ায়। ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠনের সাথে সাথে সব রাজ্যকে নিজস্ব ভাষায় রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়, যার ফলে আজও হিন্দিকে জাতীয় বা সরকারি ভাষা হিসাবে কেন্দ্র চাপিয়ে দিতে পারেনি।

পঞ্চম ঘটনা হল পোখরাণের পরমাণু বোমা পরীক্ষা। এর মধ্যে নেহেরুর জায়গায় এসে গেছেন ইন্দিরা, নেহেরুর সুযোগ্য কন্যা। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭৪ অবধি গবেষণার ফল হিসাবে ভারত ষষ্ঠ দেশ হিসাবে পরমাণু শক্তিধর হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। রামচন্দ্র গুহর মতে, এই ঘটনার পর থেকে গান্ধীবাদী শান্তিকামী বিদেশনীতি ভারত ধীরে ধীরে বর্জন করে আন্তর্জাতিক সুবিধাবাদী বিদেশনীতি গ্রহণ করে।

ষষ্ঠ হল ১৯৭৪-এর কুখ্যাত জরুরী অবস্থা। ঘটনার সূত্রপাত ঘটে এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ে যখন ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচন অবৈধ ঘোষণা করা হয়। ১৯ মাসের এই জরুরী অবস্থায় এই সময়ে সংবিধান ও লোকসভা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ইন্দিরা গান্ধী স্বৈরাচারী শাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। সারাদেশে কংগ্রেস জনপ্রিয়তা হারায় ও ফলশ্রুতিতে ১৯৭৭-এর নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসেন মোরারজি দেশাই। ইন্দিরা গান্ধী নিজে দুটি নির্বাচন কেন্দ্র থেকে দাঁড়িয়ে দুটিতেই পঞ্চাশ হাজারেরও বেশী ভোটে পরাজিত হন। দেশে কংগ্রেস কেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটে।

সপ্তম হল ১৯৮৯ এর মন্ডল কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করা। প্রধানমন্ত্রী ভিপি সিংহ এই আইন পাশ করিয়ে নিম্নবর্গীয় জাতিদের জন্য অতিরিক্ত ২৭% সংরক্ষণ চালু করেন। এই ঘটনা ভারতের ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত সিদ্ধান্ত যা আজও বিভিন্ন আকারে আত্মপ্রকাশ করে আসছে। সম্প্রতি আই-আই-টি সহ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একই সংরক্ষণ কার্যকর করার সময় একই বিতর্ক উঠে আসে। বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে সংরক্ষণের মাধ্যমে সত্যি কতটা উন্নতি হয় – সেই প্রশ্ন। আর আছে অর্থনৈতিক মাত্রার পরিবর্তে সামাজিক মাত্রায় সংরক্ষণে সমাজের সুস্থিতি নষ্ট হবার সম্ভাবনা।

অষ্টমে আসে ১৯৯২ সালের বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার ঘটনা। এর ফলশ্রুতিতে ভারতে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের অবনতি ঘটে। নেহেরু যে ‘হিন্দু পাকিস্তান’ বর্জন করতে চেয়েছিলেন, ঘুরেফিরে তাই যেন হাতছানি দেয় পরবর্তী নির্বাচনে। এখন অবস্থার উন্নতি হলেও ভারতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিরুদ্ধে এটাই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

এরপরে অরাজনৈতিক ঘটনাদুটো চলে আসে। আসে ১৯৮৩ সালের ক্রিকেট বিশকাপ জয়। এই জয় আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গণে ভারতের প্রথম বিশ্বজয়। তার থেকেও বড় কথা, এর ফলে ক্রিকেট ভারতের নবতম ফ্যাশনে পরিণত হয়। উঠে আসেন একের পর এক ক্রিকেট আইকন – কপিল দেব, গাভাসকার ও শচিন তেন্ডুলকর। ভারতে আয়োজিত পরবর্তী বিশ্বকাপের সময় সেই উন্মাদনা আরো গভীরে প্রোথিত হয়।

সবশেষে আসে ভারতের অর্থনৈতিক সংষ্কার। ১৯৯১ সালে বেকায়দায় পড়ে সরকার যে উদারীকরণের পথে চলা শুরু করেছিল, তা আজকে ভারতের অর্থনৈতিক উন্নতির শুরু বলে পরিগণিত হয়। একদা সমাজতান্ত্রিক অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিংহ যে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছিলেন, তার ফলে ভারতের অর্থনীতি যেমন একদিকে বার্ষিক ৬% হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, ভারতীয় কোম্পানিরা যেমন শূন্য থেকে শুরু করে তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার বাজারে স্থান করে নিয়েছে, তেমনই ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান দিন গেছে বেড়েই চলেছে। তৈরী হয়ছে পুঁজিহীন বনাম পুঁজিবাদীদের এক অদৃশ্য লড়াই। মোটের ওপর আপাতদৃষ্টিতে অর্থনৈতিক সংষ্কারের ফলাফল ভাল বলে মনে হলেও আরো দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হবে এর সঠিক মূল্যায়নের জন্য।

এছাড়াও আলোচনায় আসে ষাটের দশকে আই-আই-টির পত্তন, একাত্তরের ভারত-পাক যুদ্ধ, পরিবেশবাদী চিপকো আন্দোলন, ইনফোসিসের ন্যাসড্যাকে যোগদান ও টাটার কোরাস কিনে নেবার ঘটনাও।

আমি অনুষ্ঠানের মূল বক্তব্যের সাথে সহমত হলেও ১৯৮৩-এর বিশ্বকাপ জয়ের পরিবর্তে চিপকো আন্দোলনকে আগে রাখবো। কারণ ভারতের মত গরিব দেশে যে পরিবেশ রক্ষায় গণ-আন্দোলন হতে পারে, সেটাই প্রমাণ করে দেয় সত্তরের দশকের এই আন্দোলন। পরে নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। তাছাড়া, বর্তমান শিল্পায়নের যুগে পরিবেশ-রক্ষার গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

তবে একটা ব্যাপার অনস্বীকার্য যে ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা দিবসে কেউ হলফ করে বলতে পারেনি যে এই দেশ ষাট বছর অটুট থাকবে। পশ্চিমের রাজনীতিবিদরা মনে করেছিলেন বহুভাষা-ধর্মের দেশে অচিরেই ফাটল ধরবে। অর্থনীতিবিদেরা মনে করেছিলেন ব্রিটিশ পুঁজির প্রস্থান ও প্রযুক্তির অভাবে শিল্পায়ন হবে না। কিন্তু সব সত্ত্বেও ভারতের ষাট বছর পূরণ হল। রামচন্দ্র গুহর মতে এর জন্য সর্বাধিক কৃতিত্ব প্রাপ্য হল ভারতীয় সংবিধানের, তাই শ্রেষ্ঠর শিরোপা যায় সংবিধান প্রণয়নের – স্বাধীন ভারতে এটাই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

অনুষ্ঠানের ভিডিওটি পাবেন এখানে


Follow

Get every new post delivered to your Inbox.