কালকে টিভিতে বসে দেখলাম দিল্লীর প্রগতি ময়দানে টাটার এক-লাখি গাড়ির উদ্বোধন। সত্যি কথা বলতে, গাড়িটা আমাকে একরকম চমকেই দিয়েছে। আমি ভেবেছিলাম একটা পলকা দুই সিট-ওয়ালা একটা মাথা গোঁজার গাড়ি। তার জায়গায় টাটা আমাকে যা দেখালো, তা হল রীতিমত একটা গাড়ি। কালকেই বাবা-মায়ের সাথে কথা হল – গাড়ি কিনছিই। আর কিছু না হোক হুজুগ তো বটে।রতন টাটার কথামত একে “লাখ টাকার স্বপ্ন” বললে কমই বলা হয়। মধ্যবিত্তের চাহিদা আর নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে এত কম দামে গাড়ি ভারতের বাজারে আগে আসেনি। তাই কালকে টাটা ন্যানো বা টাটার এক-লাখি গাড়ি বাজারে আসতেই বাজার সরগরম। নতুন বছরে এই চমকের ফলে নড়ে বসেছে মধ্যবিত্ত, গাড়ি বিক্রেতা থেকে শুরু করে শেয়ার ব্রোকারেরাও। গাড়ির নাম ন্যানো কারণ গাড়ি বাজারে এটাই সবথেকে ছোট আকারে, আর গাড়িতে ব্যবহৃত হয়েছে আধুনিক ন্যানো-টেকনলজি।
টাটা সন্সের প্রধান রতন টাটা সাক্ষাতকারে বলছেন এটাই তার “একলা চলো রে” নীতির ফসল। উনি আগে এশিয়ানদের জন্য স্কুটারের যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে “জনগণের গাড়ি”(Peoples’ car) প্রস্তাব দিয়েছিলেন গাড়ি-নির্মাতাদের সম্মেলনে – যা ব্যবহৃত হতে পারে ভারতীয় উপমহাদেশ ছাড়াও ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া বা চীনে। তখন কেউ সাড়া দেয়নি, হয়ত বা অবাস্তব বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। তারপরে গত চার বছরে পাঁচশ জনের গবেষকদল এই গাড়ি বানিয়েছেন। পথ মসৃণ ছিল না, একদিকে ছিল দামের বাধা, আরেকদিকে গুণগত মান সুনিশ্চিত করার ইচ্ছা। আপাতদৃষ্টিতে, উনি সফল। সময় কিছুটা বেশী লাগলেও – সব টপকে এখন টাটা আবার সামনের সারিতে।
কতটা ভাল এই গাড়ি? সাধারণভাবে বললে মোটেও ভাল না। কিন্তু এই দামের কথা ভাবা হলে তা পুষিয়ে যায়। ডিজাইনের কথায় আসা যাক। গাড়ির বডি হবে অ্যালুমিনিয়াম আর প্লাস্টিকের। পাওয়ার স্টিয়ারিং থাকবে না। থাকবে না নিরাপত্তার জন্য এয়ার কন্ডিশনার, এয়ার ব্যাগ বা সেফটি বিম। গাড়ির সর্বোচ্চ গতিবেগ ধরা হচ্ছে ১০৫ কিমি প্রতি ঘন্টা, যদিও আদর্শ গতিবেগ বলা হয়েছে ৭০ কিমি/ঘন্টা। ভারতের শহুরে রাস্তার জন্য এই গতিবেগ আদর্শ। ৬২৩ সিসির ইঞ্জিন তৈরী হবে জার্মান কোম্পানী বস (Bosch) এর কারখানায়। প্রতি লিটার তেলে ২০-২৫ কিমি গাড়ি চলবে।
এই গাড়ি ব্যবসা করবে কি ভাবে? সাধারণ হিসাবে টাটার বাজার আসবে মূলত মারুতি আর মোটরবাইকের বাজার থেকেই। প্রতি বছর দেশে প্রায় ১৫ লাখ মারুতি অল্টো আর মারুতি ৮০০ বিক্রি হয়। প্রাথমিক সমীক্ষায় বলা হচ্ছে, মোটরসাইকেল বাজারের ১০% লোকে এবার টাটার গাড়ি কিনবে। মূলত তিনটি মডেল বাজারে আনছে টাটা। প্রথমটি টাটার বেসিক মডেল, যার দাম হবে ১ লাখ টাকা – ট্যাক্স আর পরিবহন মিলে রাস্তায় নামাতে আরো তিরিশ হাজার। এ ছাড়াও থাকছে আরো দুটি একই রকম দেখতে ডিলাক্স মডেল।
সেগুলোতে থাকছে বাকি নিরাপত্তা সম্পর্কিত সুবিধা গুলো আর সাথে এয়ার কন্ডিশনার। রতন টাটার বক্তব্যমতে, টাটার বেসিক মডেল থেকে নগণ্য লাভ হবে, যা পুষিয়ে যাবে ডিলাক্স গাড়ির বিক্রি থেকে। টাটার এই গাড়ির উতপাদন মূল্য ধরা হয়েছে মাত্র ৬৫,০০০ টাকা। বিক্রির বাজার ধরা হচ্ছে ভারতীয় উপমহাদেশ ছাড়াও পূর্ব ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া, ব্রাজিল সহ লাতিন আমেরিকা আর আফ্রিকা। টাটার প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা বছরে আড়াই লাখ গাড়ি বেচা।
এসব সত্ত্বেও সমালোচনা পিছু ছাড়ে নি টাটা ন্যানোর। ইংল্যান্ডের টাইমস অনলাইন গাড়িটার সমালোচনা করে লিখেছে যে দাম কমাতে টাটা গাড়ির নিরাপত্তাও কমিয়ে দিয়েছে। রতন টাটা অবশ্য বলেছেন যে ব্রিটিশ বাজারের জন্য তার গাড়ি নয় – তাই ব্রিটিশ সেফটি স্ট্যান্ডার্ডের কথা উনি ভাবেন নি। ভারতেও পরিবেশবিদেরা আগে থেকেই সতর্ক করে দিচ্ছেন যে এর ফলে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা হু হু করে বেড়ে যেতে পারে। ফলে বাড়তে পারে পরিবেশ দূষণ আর সাথে ট্র্যাফিক জ্যাম। ভর্তুকি দেওয়া পেট্রোলের চাহিদা বাড়ার কারণে লোকসান করবে তেল আমদানীকারক সংস্থাগুলোও। আর আছে রাস্তায় ঝুঁকি – বাড়বে দুর্ঘটনা। টাটার এই গাড়ি যে কারখানায় তৈরী হবার কথা, সেই সিঙ্গুরের গণ্ডোগোল তো আগেই সমস্যা বাধিয়েছে। অনেক মানুষকে নিজের জায়গা থেকে তুলে দিয়ে শুরু হয়েছে কারখানা।
কালকেই টাটার প্রতিদ্বন্দী সংস্থা বাজাজ (এরা অটো বিক্রেতা হিসাবে খ্যাত) ঘোষণা করেছেন তারা বাজারে ২০১০ এর মধ্যে ১,২০,০০০ টাকার গাড়ি আনবেন – যার নাম হবে “হামারা”। এর জন্য তারা হাত মিলিয়েছেন বিশ্বখ্যাত সংস্থা রেনল্ট ও নিশান-এর সাথে।
কিছুকাল আগে দেখলাম পাকিস্তানও নিজস্ব এক লাখ টাকার গাড়ি বানিয়েছে – হাবিব মোটরসের এই গাড়িটির বর্তমান দাম ১,৫৯,০০০ পাকিস্তানি রুপি।
সিতারা নামের এই গাড়ি পাকিস্তানের রাস্তায় খুব একটা চলেনি। তবে সম্প্রতি পাকিস্তানের রাস্তায় ট্যাক্সি হিসাবে ব্যবহারের অনুমতি দেবার পরে মনে করা হচ্ছে এর বাজার বাড়বে। বাংলাদেশের গাড়ি প্রথম কবে দেখতে পাবো?
তবে একটা ব্যাপার খুবই ঠিক, যে আজ থেকে ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগে ইন্দিরা গান্ধীর আমলে স্বনির্ভরতার জন্য মারুতির হাত ধরে যে উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, আজকের টাটা ন্যানো তারই ফসল। মারুতি প্রথমদিকে অত্যন্ত খারাপ গাড়ি বানাতো, সেই গাড়ির বাজার সুনিশ্চিত করতে সরকার উচ্চহারে শুল্ক বসিয়েছিল বিদেশী গাড়ি আমদানির ওপর। একটা সময় ছিল যখন ১০ লাখ টাকা দামের গাড়ি আমদানী করতে কর দিতে হত ৩০ লাখ টাকা, এখন কিছুটা কমলেও বিশেষ কিছু কমে নি। ভারতে এখনো যে দামী বিদেশী গাড়ি দেখা যায় তাও মূলত দেশে অ্যাসেম্বল্ড – মার্সিডিস থেকে লোগান। এর ফলে দীর্ঘ সময় ধরে তৈরী হয়েছে অনেক দক্ষ শ্রমিক, ইঞ্জিনিয়ার আর ব্র্যান্ড। আর দেশীয় গাড়ি নির্মাতার উতসাহ পেয়ে দেশে কম দামে গাড়ি তৈরীর চেষ্টা করে গেছে। গাড়ির মান প্রথমে অনেক খারাপ ছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে উন্নতিও হয়েছে। টাটা ন্যানোর ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতা এসেছে এই মারুতি থেকে সরিয়ে আনা ইঞ্জিনিয়ারদের হাত ধরেই।
আমি নিজে অবশ্য ধীরে চল নীতি নিচ্ছি। আগেরবারে টাটার ইন্ডিকা গাড়িতে প্রথম এডিশনে চাকায় ভুলত্রুটি ছিল। পরের এডিশনে অবশ্য তা শুধরে নিয়েছে। এবারেও একই ঘটনা ঘটবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়? গাড়ি কিনলে হাইপের স্টেজটা কেটে গেলে তারপরেই কেনা ভাল।
বছরের শেষে এই গাড়ি বাজারে আসবে। কিন্তু বছরের শুরুতেই সেরকম হাইপ তৈরী হয়েছে যে টাটা এখন খুব সংকটে। যদি বছরের শেষে গ্রাহকদের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারে? তাহলে টাটার নাম বা ব্র্যান্ড কিছুদিনের জন্য একটা বড় ধাক্কা খেতে চলেছে। আর উল্টোদিকে সফল হলে সবটাই ইতিহাস হয়ে যাবে।
টাটার গাড়ির উদ্বোধনী অনুষ্ঠান (ইউটিউব ভিডিও)
একনজরে টাটা ন্যানো ১
একনজরে টাটা ন্যানো ২
একনজরে টাটা ন্যানো ৩