বুদ্ধির ক্রমবিকাশ – ৩

By Diganta

মস্তিষ্ক কিভাবে প্রজাতিভেদে সরল থেকে জটিল ও জটিলতর আকার ধারণ করল, তা বোঝা গেল। কিন্তু মস্তিষ্কের বিবর্তনের আরো একটি মাত্রা আছে। একই জীবের জীবদ্দশায় শিশুবয়স থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স অবধি তার মস্তিষ্ক একইরকম থাকে না – পরিবর্তিত হয়। কিভাবে আপাত সরল শিশুমস্তিষ্ক পরিণত হয় প্রাপ্তবয়স্কের জটিল মস্তিষ্কে, তা বিবর্তনের অন্য এক মাত্রা।

নিউরোন ও সাইন্যাপস

মানবমস্তিষ্কের মূল গঠন-উপাদান হল নিউরোন। মস্তিষ্কে মোট ১১ বিলিয়ন স্নায়ুকোষ বা নিউরোন থাকে। এই কোষগুলো বৈদ্যুতিক সঙ্কেতের আকারে অনুভূতি পরিবহন করতে পারে। এদের দুই প্রান্তে যে শাখাপ্রশাখার মত প্রবর্ধক থাকে তারা হল ডেন্ড্রাইট, আর মূল তন্তুর মত অংশের নাম অ্যাক্সন। ডেন্ড্রাইট হল সঙ্কেতগ্রাহক অ্যান্টেনার মত, যা অন্য নিউরোন থেকে সঙ্কেত গ্রহণ করে। অ্যাক্সন সেই সঙ্কেত পরিবহন করে অপরপ্রান্তের ডেন্ড্রাইটে নিয়ে যায়। দুটি বা ততোধিক নিউরোনের সংযোগস্থলকে বলে সাইন্যাপ্স, যেখানে এদের সঙ্কেত বিনিময় হয়। মানুষের করটেক্সে মোটামুটি ১০,০০০ এর মত সাইন্যাপ্স থাকে। সাইন্যাপসের ‘ওয়ারিং’-এর মাধ্যমেই আমাদের মস্তিষ্ক জটিল থেকে জটিলতর হয়ে ওঠে।

মস্তিষ্ক ও জিন

অনেককাল আগে মস্তিষ্ককে একটি অপরিবর্তনশীল অঙ্গ বলে মনে করা হত। প্রথম সেই ভ্রান্ত ধারনার অবসান ঘটান রজার স্পেরি। পঞ্চাশের দশকে কিছু পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন মস্তিষ্ক গঠনে বংশগতির বাহক জিনের ভূমিকা আছে। মাছের চোখের সাথে মস্তিষ্কের চক্ষুকেন্দ্র সংযোগকারী স্নায়ু-তন্তুগুলোকে মস্তিষ্কের অন্য জায়গায় জুড়ে দিলেন। কিন্তু কিছুদিন পরে দেখা গেল নিজে থেকেই কিছু তন্তু গজিয়ে আবার চক্ষুকেন্দ্রের সাথে সংযোগ সাধন করে ফেলেছে। একই পরীক্ষা ইঁদুরের ওপরেও করে দেখা গেল, যে স্নায়ু-তন্তুগুলো যেন আগে থেকেই জানে কোন পেশীতে তারা আবদ্ধ থাকবে, অন্য জায়গার সরিয়ে দিলেও তারা আগের জায়গার সাথে সংযুক্তির প্রচেষ্টা করে। তিনি এ থেকে ধারণা করেন যে শরীরে স্নায়ু-তন্তুর সংযুক্তি জীবের জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। মস্তিষ্কের আরো বিভিন্ন চিকিৎসাপদ্ধতি আবিষ্কার করার জন্য তিনি ১৯৮১ সালে নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন।
কিন্তু এই ধারণার মধ্যে কিছু গোলমাল ছিল। জিন আবিষ্কারের পর দেখা গেল সাড়ে তিন বিলিয়ন একক তথ্য রাখার ক্ষমতা আছে, যেখানে মস্তিষ্কে স্নায়ু-সংযুক্তি বা সাইন্যাপসের সংখ্যা এক হাজার মিলিয়ন মিলিয়ন (একের পিঠে ১৫টি শূন্য)। কি করে তাহলে জিনের মধ্যে সমস্ত সাইন্যাপসের অবস্থানগত তথ্য সঞ্চিত থাকা সম্ভব?

প্রশ্নটি ভালভাবে বুঝতে গেলে জীবজগতের একটি উদাহরণ দেখা যেতে পারে। Daphnia Magna বলে একধরণের মাছ, অযৌন জননের মাধ্যমে বংশবিস্তার করতে পারে – উৎপন্ন অপত্য ক্লোনের মত মায়ের সম্পূর্ণ জিনগত বৈশিষ্ট্য লাভ করে। এরকম কিছু অপত্যের মধ্যে দেখা গেল, তাদের নিউরোনের সংখ্যা সমান হলেও সাইন্যাপসের অবস্থান ও জটিলতা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। তাহলে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ, যে সাইন্যাপস গঠনে জিনের ভূমিকা নেই, থাকলেও নগন্য।

এখন প্রশ্ন হল যদি জিনের মধ্যেই সংযোগের জন্য কোনো তথ্য না থাকে, তাহলে কিভাবে নিউরোনগুলো ঠিকঠাক চিনে ঠিক জায়গায় লেগে থাকছে? একটা বিড়ালের দুটো চোখ থেকে আসা নিউরোনগুলো মস্তিষ্কের পাশাপাশি অংশে কি ভাবে লেগে যায়? সূত্র খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীদের নজর গেল অনেক আগে প্রকাশিত কিছু তথ্যের ওপর। ১৯০৬ সালে ভিক্টর হামবার্গার দেখেছিলেন যে, মুরগীর ভ্রূণের সুষুম্নাকান্ডের একটি বিশেষ অংশে যেখানে ২০,০০০ নিউরোন থাকে, সেখানে একই জায়গায় প্রাপ্তবয়স্ক মুরগীর থাকে ১২,০০০ নিউরোন। শুধু তাই নয়, দেখা গেল, নিউরোন শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে একটি অঞ্চলের দিকে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। আর এই বৃদ্ধি ওই অঞ্চলে উপস্থিত কোন রাসায়নিক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। নিউরোনের বৃদ্ধি ঘটে রাসায়নিক দ্বারা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে।

কিন্তু এরকম রান্ডমভাবে বেড়ে ওঠা নিউরোনের শাখাপ্রশাখা ও সংযুক্তির সংখ্যা অনেক বেশি হবার কথা। সেই সংযুক্তির সংখ্যা ধীরে ধীরে প্রাপ্তবয়স্ক জীবের মধ্যে কমে আসবে। যেমন ধরা যাক বিড়ালটার কথা। তার জন্মাবস্থায় দুটো চোখের নিউরোনই একই জায়গায় লেগে থাকে। কিন্তু বাঁ চোখ থেকে আসা তন্তু থেকে আসা সংকেত মস্তিষ্কের যে অংশে প্রক্রিয়াকরণ হয়, সেই অংশ ছাড়া আর সমস্ত অংশের সাথে সংযুক্তি আস্তে আস্তে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সে জন্য প্রাপ্তবয়স্ক বেড়ালের চোখে সঠিকভাবে বিভিন্ন অংশের স্নায়ু-তন্তু ঠিক ঠিক পেশী বা অংশে সংযুক্ত থাকে।

এবার প্রশ্ন হল, কিভাবে শরীর নির্ণয় করে কোন কোন সংযুক্তি দরকার আর কোনটি দরকার নেই? উত্তর জানা গেল ডেভিড হুবেল আর টরস্টেন ওয়েসেলের পরীক্ষায়। তারা সদ্যোজাত একটি বিড়ালের একটি চোখ কোনরকম ক্ষতিগ্রস্ত না করে আবরণ দিয়ে বন্ধ করে দিলেন। এক সপ্তাহ পরে, বিড়ালটির দুটো চোখের সাথে মস্তিষ্কের সংযোগের মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্টভাবে বোঝা গেল। যে চোখটি বন্ধ ছিল, তার তুলনায় খোলা চোখের সাথে মস্তিষ্কের সংযুক্তি অনেক ভালভাবে ঘটেছে, তুলনায় বন্ধ চোখের সংযুক্তির সংখ্যা অনেক কম। সিদ্ধান্ত নেওয়া হল – এই নিউরোনগুলো মস্তিষ্কে সংযুক্তির জন্য নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়, যে যত বেশী অনুভূতি বহন করে, প্রতিযোগিতায় তার জেতার সম্ভাবনাও বেশি।এই কারণেই, কারোর শিশুবয়সে চোখ খারাপ হয়ে গেলে, প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যাবার পরে তার চোখের অপারেশন করেও দৃষ্টি ফিরে পাওয়া শক্ত – ততদিনে তার চোখ-মস্তিষ্ক সংযোগকারী স্নায়ুতন্তু বিলুপ্ত হয়েছে। হুবেল আর ওয়েসেল মস্তিষ্কবিজ্ঞানে অবদানের জন্য ১৯৮১ সালে স্পেরির সাথে নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন।

তাহলে বোঝা গেল, যে আমাদের মস্তিষ্ক সহ স্নায়ুতন্ত্র জিন ও পরিবেশের প্রভাবে গঠিত হয়। জিন যেমন সামগ্রিক কাঠামো তৈরীতে ভূমিকা পালন করে, তেমনই নিউরোনগুলোর সংযুক্তি নির্ভর করে পরিবেশ থেকে আসা সংকেতের ওপরে। তাই, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে দেখা যায় তার মস্তিষ্কের ক্ষমতা জিন এবং পরিবেশ – দুয়ের ওপরেই নির্ভর করে।

সাম্প্রতিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, সদ্যোজাত জীবের মস্তিষ্কে প্রয়োজনের প্রায় দ্বিগুণ সংখ্যায় নিউরোন থাকে – আর জন্মানোর পরে ধীরে ধীরে সংকেতের রকমফেরে ‘অতিরিক্ত’ নিউরোনগুলো ‘এলিমিনেট’ (eliminate) হতে থাকে। ভাষাবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে শিশুবয়সে মানুষের দুটো বিভিন্ন ধ্বনির মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা বেশি থাকে, তাই তারা তাড়াতাড়ি নতুন ভাষা শিখতে পারে। জেনি বলে আমেরিকান এক কিশোরী তার জীবনের প্রথম তেরো বছর মানব-সংস্পর্শ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সে বাকি জীবনে আর কোনো ভাষা শিখে উঠতে পারে নি। একই কারণে শিশুবেলার স্মৃতি খুব অস্পষ্ট – সাধারণত মানুষ মনে রাখতে পারে না।

স্মৃতি ও জ্ঞান আহরণ

কিন্তু তাহলে স্মৃতি কি করে কাজ করে? যদি নিউরোন কমেই যায় তাহলে মানুষ কি প্রাপ্তবয়স্ক হলে শিখতে পারত? একজন বাঙালী যখন হিন্দি শেখে তখন সে প্রতিটি বাংলা শব্দের হিন্দি প্রতিশব্দ মনে রাখার চেষ্টা করে। প্রাপ্তবয়স্ক হলে তার মস্তিষ্কে ভাষার জায়গাতে তো আগেই বাংলা শব্দগুলো বসে আছে, প্রতিশব্দগুলো যাবে কোথায়?

জ্য পিয়ের শানগেক্স ধারণা করেন জন্ম থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত নিউরোন শুধু কমে চলে না, সাইন্যাপ্স বা সংযুক্তিগুলো বাড়া কমা চলে। এদের সংখ্যায় বাড়া-কমা নিয়ন্ত্রিত হয় ওই অংশে কতটা সঙ্কেত পরিবাহিত হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে। নিউরোন-সংযোগের এই ধর্মকে ডারউইনের ‘যোগ্যতমের উদ্বর্তন’ তত্ত্বের কথা মাথায় রেখে নাম দেওয়া হয় নিউরাল ডারউইনিসম। প্রতিটি নতুন শিক্ষা বা নতুন জ্ঞান আমাদের মস্তিষ্কে নিউরোনের ও তাদের সংযুক্তিগত বিন্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে জায়গা করে নেয়। শানগেক্স তার এই ধারণার স্বপক্ষে কোন প্রমাণ পেশ করতে পারেননি। সম্প্রতি উইলিয়াম গ্রীনাফ দেখিয়েছেন যে, কঠিন পরিস্থিতিতে পড়লে, প্রাপ্তবয়স্ক ইঁদুরের মস্তিষ্কে নিউরোন-সংযোগের সংখ্যা ২০% অবধি বৃদ্ধি পেতে পারে। তাই এখন বলা হয়, সংযোগ বাড়া-কমার মাধ্যমেই জীব নতুন জিনিস শেখে।

আসলে, প্রতিনিয়ত মস্তিষ্কে সংযোগ তৈরি হয়, বিলুপ্তও হয়। প্রতিকূল পরিবেশে মস্তিষ্কে বেশী অনুভূতি পরিবাহিত হয় বলে বেশীসংখ্যক সংযোগ বেঁচে যায়, কমসংখ্যক বিলুপ্ত হয়। এভাবেই মস্তিষ্ক অভিযোজিত হয় আর নতুন অভিজ্ঞতা ধরে রাখে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে সংযোগ উৎপাদন ও বিলুপ্তি, দুয়েরই হার কমে যায়, তাই প্রাপ্তবয়স্করা শিখতে বেশী সময় নেয়। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে নতুন জ্ঞান, ‘কতটা নতুন’ তার ওপরেও নির্ভর করে সে শিখতে কতটা সময় নেবে, কারণ নিউরোনের বিন্যাস তত বেশি পরিবর্তিত হতে হবে। জীববিজ্ঞানী উইলিয়াম কেলভিনও এই মতের সমর্থক।

সঠিক কি উপায়ে মস্তিষ্ক স্মৃতি সঞ্চয় করে বা নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে, তার স্বপক্ষে এখনো কোনো বাস্তব পরীক্ষা-প্রমাণ নেই। তাই বিষয়গুলো যথেষ্ট বিতর্কিত। একবিংশ শতকে নতুন গবেষণার মাধ্যমে সেই সত্য উদ্ঘাটিত হবে – এরকমই আশা রাখি।

সূত্র –
১) http://faculty.ed.uiuc.edu/g-cziko/wm/05.html
২) http://williamcalvin.com/
৩) http://www.stevenharris.com/theory/085.htm

Leave a Reply