Archive for জানুয়ারি, 2008

লাখ টাকার স্বপ্ন

জানুয়ারি 11, 2008


কালকে টিভিতে বসে দেখলাম দিল্লীর প্রগতি ময়দানে টাটার এক-লাখি গাড়ির উদ্বোধন। সত্যি কথা বলতে, গাড়িটা আমাকে একরকম চমকেই দিয়েছে। আমি ভেবেছিলাম একটা পলকা দুই সিট-ওয়ালা একটা মাথা গোঁজার গাড়ি। তার জায়গায় টাটা আমাকে যা দেখালো, তা হল রীতিমত একটা গাড়ি। কালকেই বাবা-মায়ের সাথে কথা হল – গাড়ি কিনছিই। আর কিছু না হোক হুজুগ তো বটে।রতন টাটার কথামত একে “লাখ টাকার স্বপ্ন” বললে কমই বলা হয়। মধ্যবিত্তের চাহিদা আর নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে এত কম দামে গাড়ি ভারতের বাজারে আগে আসেনি। তাই কালকে টাটা ন্যানো বা টাটার এক-লাখি গাড়ি বাজারে আসতেই বাজার সরগরম। নতুন বছরে এই চমকের ফলে নড়ে বসেছে মধ্যবিত্ত, গাড়ি বিক্রেতা থেকে শুরু করে শেয়ার ব্রোকারেরাও। গাড়ির নাম ন্যানো কারণ গাড়ি বাজারে এটাই সবথেকে ছোট আকারে, আর গাড়িতে ব্যবহৃত হয়েছে আধুনিক ন্যানো-টেকনলজি।

টাটা সন্সের প্রধান রতন টাটা সাক্ষাতকারে বলছেন এটাই তার “একলা চলো রে” নীতির ফসল। উনি আগে এশিয়ানদের জন্য স্কুটারের যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে “জনগণের গাড়ি”(Peoples’ car) প্রস্তাব দিয়েছিলেন গাড়ি-নির্মাতাদের সম্মেলনে – যা ব্যবহৃত হতে পারে ভারতীয় উপমহাদেশ ছাড়াও ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া বা চীনে। তখন কেউ সাড়া দেয়নি, হয়ত বা অবাস্তব বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। তারপরে গত চার বছরে পাঁচশ জনের গবেষকদল এই গাড়ি বানিয়েছেন। পথ মসৃণ ছিল না, একদিকে ছিল দামের বাধা, আরেকদিকে গুণগত মান সুনিশ্চিত করার ইচ্ছা। আপাতদৃষ্টিতে, উনি সফল। সময় কিছুটা বেশী লাগলেও – সব টপকে এখন টাটা আবার সামনের সারিতে।

কতটা ভাল এই গাড়ি? সাধারণভাবে বললে মোটেও ভাল না। কিন্তু এই দামের কথা ভাবা হলে তা পুষিয়ে যায়। ডিজাইনের কথায় আসা যাক। গাড়ির বডি হবে অ্যালুমিনিয়াম আর প্লাস্টিকের। পাওয়ার স্টিয়ারিং থাকবে না। থাকবে না নিরাপত্তার জন্য এয়ার কন্ডিশনার, এয়ার ব্যাগ বা সেফটি বিম। গাড়ির সর্বোচ্চ গতিবেগ ধরা হচ্ছে ১০৫ কিমি প্রতি ঘন্টা, যদিও আদর্শ গতিবেগ বলা হয়েছে ৭০ কিমি/ঘন্টা। ভারতের শহুরে রাস্তার জন্য এই গতিবেগ আদর্শ। ৬২৩ সিসির ইঞ্জিন তৈরী হবে জার্মান কোম্পানী বস (Bosch) এর কারখানায়। প্রতি লিটার তেলে ২০-২৫ কিমি গাড়ি চলবে।

এই গাড়ি ব্যবসা করবে কি ভাবে? সাধারণ হিসাবে টাটার বাজার আসবে মূলত মারুতি আর মোটরবাইকের বাজার থেকেই। প্রতি বছর দেশে প্রায় ১৫ লাখ মারুতি অল্টো আর মারুতি ৮০০ বিক্রি হয়। প্রাথমিক সমীক্ষায় বলা হচ্ছে, মোটরসাইকেল বাজারের ১০% লোকে এবার টাটার গাড়ি কিনবে। মূলত তিনটি মডেল বাজারে আনছে টাটা। প্রথমটি টাটার বেসিক মডেল, যার দাম হবে ১ লাখ টাকা – ট্যাক্স আর পরিবহন মিলে রাস্তায় নামাতে আরো তিরিশ হাজার। এ ছাড়াও থাকছে আরো দুটি একই রকম দেখতে ডিলাক্স মডেল। সেগুলোতে থাকছে বাকি নিরাপত্তা সম্পর্কিত সুবিধা গুলো আর সাথে এয়ার কন্ডিশনার। রতন টাটার বক্তব্যমতে, টাটার বেসিক মডেল থেকে নগণ্য লাভ হবে, যা পুষিয়ে যাবে ডিলাক্স গাড়ির বিক্রি থেকে। টাটার এই গাড়ির উতপাদন মূল্য ধরা হয়েছে মাত্র ৬৫,০০০ টাকা। বিক্রির বাজার ধরা হচ্ছে ভারতীয় উপমহাদেশ ছাড়াও পূর্ব ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া, ব্রাজিল সহ লাতিন আমেরিকা আর আফ্রিকা। টাটার প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা বছরে আড়াই লাখ গাড়ি বেচা।

এসব সত্ত্বেও সমালোচনা পিছু ছাড়ে নি টাটা ন্যানোর। ইংল্যান্ডের টাইমস অনলাইন গাড়িটার সমালোচনা করে লিখেছে যে দাম কমাতে টাটা গাড়ির নিরাপত্তাও কমিয়ে দিয়েছে। রতন টাটা অবশ্য বলেছেন যে ব্রিটিশ বাজারের জন্য তার গাড়ি নয় – তাই ব্রিটিশ সেফটি স্ট্যান্ডার্ডের কথা উনি ভাবেন নি। ভারতেও পরিবেশবিদেরা আগে থেকেই সতর্ক করে দিচ্ছেন যে এর ফলে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা হু হু করে বেড়ে যেতে পারে। ফলে বাড়তে পারে পরিবেশ দূষণ আর সাথে ট্র্যাফিক জ্যাম। ভর্তুকি দেওয়া পেট্রোলের চাহিদা বাড়ার কারণে লোকসান করবে তেল আমদানীকারক সংস্থাগুলোও। আর আছে রাস্তায় ঝুঁকি – বাড়বে দুর্ঘটনা। টাটার এই গাড়ি যে কারখানায় তৈরী হবার কথা, সেই সিঙ্গুরের গণ্ডোগোল তো আগেই সমস্যা বাধিয়েছে। অনেক মানুষকে নিজের জায়গা থেকে তুলে দিয়ে শুরু হয়েছে কারখানা।

কালকেই টাটার প্রতিদ্বন্দী সংস্থা বাজাজ (এরা অটো বিক্রেতা হিসাবে খ্যাত) ঘোষণা করেছেন তারা বাজারে ২০১০ এর মধ্যে ১,২০,০০০ টাকার গাড়ি আনবেন – যার নাম হবে “হামারা”। এর জন্য তারা হাত মিলিয়েছেন বিশ্বখ্যাত সংস্থা রেনল্ট ও নিশান-এর সাথে।

কিছুকাল আগে দেখলাম পাকিস্তানও নিজস্ব এক লাখ টাকার গাড়ি বানিয়েছে – হাবিব মোটরসের এই গাড়িটির বর্তমান দাম ১,৫৯,০০০ পাকিস্তানি রুপি। সিতারা নামের এই গাড়ি পাকিস্তানের রাস্তায় খুব একটা চলেনি। তবে সম্প্রতি পাকিস্তানের রাস্তায় ট্যাক্সি হিসাবে ব্যবহারের অনুমতি দেবার পরে মনে করা হচ্ছে এর বাজার বাড়বে। বাংলাদেশের গাড়ি প্রথম কবে দেখতে পাবো?

তবে একটা ব্যাপার খুবই ঠিক, যে আজ থেকে ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগে ইন্দিরা গান্ধীর আমলে স্বনির্ভরতার জন্য মারুতির হাত ধরে যে উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, আজকের টাটা ন্যানো তারই ফসল। মারুতি প্রথমদিকে অত্যন্ত খারাপ গাড়ি বানাতো, সেই গাড়ির বাজার সুনিশ্চিত করতে সরকার উচ্চহারে শুল্ক বসিয়েছিল বিদেশী গাড়ি আমদানির ওপর। একটা সময় ছিল যখন ১০ লাখ টাকা দামের গাড়ি আমদানী করতে কর দিতে হত ৩০ লাখ টাকা, এখন কিছুটা কমলেও বিশেষ কিছু কমে নি। ভারতে এখনো যে দামী বিদেশী গাড়ি দেখা যায় তাও মূলত দেশে অ্যাসেম্বল্ড – মার্সিডিস থেকে লোগান। এর ফলে দীর্ঘ সময় ধরে তৈরী হয়েছে অনেক দক্ষ শ্রমিক, ইঞ্জিনিয়ার আর ব্র্যান্ড। আর দেশীয় গাড়ি নির্মাতার উতসাহ পেয়ে দেশে কম দামে গাড়ি তৈরীর চেষ্টা করে গেছে। গাড়ির মান প্রথমে অনেক খারাপ ছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে উন্নতিও হয়েছে। টাটা ন্যানোর ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতা এসেছে এই মারুতি থেকে সরিয়ে আনা ইঞ্জিনিয়ারদের হাত ধরেই।

আমি নিজে অবশ্য ধীরে চল নীতি নিচ্ছি। আগেরবারে টাটার ইন্ডিকা গাড়িতে প্রথম এডিশনে চাকায় ভুলত্রুটি ছিল। পরের এডিশনে অবশ্য তা শুধরে নিয়েছে। এবারেও একই ঘটনা ঘটবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়? গাড়ি কিনলে হাইপের স্টেজটা কেটে গেলে তারপরেই কেনা ভাল।

বছরের শেষে এই গাড়ি বাজারে আসবে। কিন্তু বছরের শুরুতেই সেরকম হাইপ তৈরী হয়েছে যে টাটা এখন খুব সংকটে। যদি বছরের শেষে গ্রাহকদের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারে? তাহলে টাটার নাম বা ব্র্যান্ড কিছুদিনের জন্য একটা বড় ধাক্কা খেতে চলেছে। আর উল্টোদিকে সফল হলে সবটাই ইতিহাস হয়ে যাবে।

টাটার গাড়ির উদ্বোধনী অনুষ্ঠান (ইউটিউব ভিডিও)
একনজরে টাটা ন্যানো ১
একনজরে টাটা ন্যানো ২
একনজরে টাটা ন্যানো ৩

আমার অরকুটপ্রীতি নিয়ে

জানুয়ারি 11, 2008

সচলায়তনে অরকুটের কমিউনিটি ভোটের মত ভোটের ব্যবস্থার অভাব আমি খুব অনুভব করি। অবশ্য সেক্ষেত্রেও অনেকেই ভোটে বিরত থেকে ভোট বিফল করে দিতে পারেন, তাও। এমনকি খবরের কাগজগুলোর মত রোজকার বা এমনকি সাপ্তাহিক ভোটের ব্যবস্থা থাকলে আরো ভাল হত। আর ভোটের সাথে সাথে মন্তব্য করার ব্যবস্থা থাকলে তো সোনায় সোহাগা। ব্লগ তখন আর ব্লগ না থেকে পুরোদস্তুর সামাজিক মায়াজালে পরিণত হত।

যাহোক, অরকুট নিয়ে কথা শুরু করেছিলাম অরকুটেই ফিরে যাই। অরকুট করা শুরু করি আমি বছর দুয়েক আগে। সোসাল নেটওয়ার্কিং বলে বস্তুটা যে কি, তা বিশেষ একটা টের পাইনি তখনো। যাহোক, অরকুটের দৌলতে প্রথম দিকে আমি কলেজের পরিচিত, আর অল্প-পরিচিতদের সাথে পরিচিতিটা ঝালিয়ে নেবার জন্যই ব্যবহার করতাম। পরিচিতি শুধু বললে ভুল হবে, পরিচিতির সাথে সাথে কে কি করছে, কোথায় আছে – কেমন আছে, সবই টের পাওয়া যেত। বুঝলাম, ইন্টারনেট মানুষকে কাছে এনে দেবার যে উদ্যোগ নিয়েছে, সোসাল নেটওয়ার্কিং হল তার একটা অঙ্গ।

দিন গেছে, আমার অরকুটপ্রীতি বেড়েছে বই কমে নি কিছু। এখন মাঝে মাঝে লোকজনের স্ক্র্যাপ ঘেঁটে দেখি কে কি করছে। কি করছের মধ্যে অনেক কিছু আছে। কেউ চাকরি পরিবর্তন করলে সে খবর আসে অরকুট মারফত। কারো প্রেম ফাঁকি দিয়ে গেছে – অরকুট থেকেই বোঝা যাচ্ছে – কারণ বন্ধুতালিকায় প্রেমিকার অনুপস্থিতি। এমনকি, অ্যালবাম থেকে দেখা গেল, পুরোনো প্রেমিকার সাথে বিচ্ছেদের পরে আবার জোড়া লেগে বিয়ে – এ ঘটনাও অরকুটেই দেখলাম। লোকজনের সাথে আর যেচে আড্ডা মেরে জানতে হয় না কেমন আছে, অরকুটের পাতায় চোখ লাগলেই হয়। সবাই সবার অ্যালবাম দেখতে পায় আর স্ক্র্যাপ পড়তে পারে বলে পরনিন্দা-পরচর্চার একটা ভাল উতস হয়ে গেছে এটা। কয়েকজন বন্ধু মিলে বসলে দিব্যি কয়েকঘন্টা কেটে যাবে এর পেছনে।

আমার এই সামাজিক মায়াজালের সবথেকে বড় লাভ হল আমার ছোট্টবেলার স্কুলের বন্ধুদের সাথে আবার যোগাযোগ। সেটা ১৯৮৯ সালের কথা। আমি ক্লাস ফোর পাস করে কল্যাণী ছেড়ে চলে এলাম বর্ধমানে। তারপরে আর তাদের সাথে যোগাযোগ নেই। অরকুট পেতেই, আমার স্কুলের নাম দিয়ে কমিউনিটি দেখে তাতে যোগদান করেছি, কিছুদিন পরে দেখলাম তাতে সুদীপ বরণ দে বলে একটা ছেলে যোগ দিল। আমি মনে করলাম সেই আমার ছোটবেলার প্রিয় বন্ধু সুমিতের ভাই নয় তো? নামটা তো একই রকম – সুমিত বরণ দে আর সুদীপ বরণ দে। সটাসট স্ক্র্যাপ আর তার উত্তরও আসে জলদি। আমিই ঠিক, সুদীপ সুমিত বরণের ভাই। সেই সুমিত আর আমার মধ্যে বন্ধুত্বও ছিল যেমন তেমন ছিল ক্লাসে প্রতিযোগিতাও। তার সাথে ১৮ বছর পরে সাথে ফোনে যোগাযোগ। সে এখন কবি হয়ে গেছে, পুরোদস্তুর সাহিত্যিক। আমার সাথে এতদিন পরে যোগাযোগ পেয়ে সেই স্মৃতিতে একটা কবিতাই লিখে ফেলল। ভাবা যায়!! আমি কোথায় কর্পোরেট জীবনে কম্পিউটার টিপে জীবন চালাচ্ছি, সেই আমার কবি বন্ধু? আরো একে একে আমার বাকি বন্ধুদের সাথেও যোগাযোগ হল। আমার ছোটবেলার খেলার সাথীদের সাথে ভার্চুয়াল দেখা করতে যে কি ভাল লাগল … ক’দিন আগেই এক বন্ধুর সাথে স্ক্র্যাপালোচনা হল, ১৯৮৬র বিশ্বকাপে আমি কেমন প্লাতিনির সমর্থক ছিলাম আর ও মারাদোনার। শেষ হাসি আমি হাসতে পারিনি বলে আমার কেমন দুঃখ ছিল … ইত্যাদি।

আমার আরেকটা নিজের চোখে দেখা বিষয় হল প্রোপাগান্ডা। অরকূটে যথেচ্ছভাবে যে যার খুশীমত নিজের মত লিখে চলে আর দাবী করে সে-ই একমাত্র সত্যের পূজারী। সাথে থাকে কিছু সমগোত্রীয় নিউজপেপার রেফারেন্স, যেগুলো কিছু বিশেষ মতের লোকজন ছাড়া কেউ পড়েই না। প্রোপাগান্ডার মধ্যে ধর্মই দেখি প্রাধান্য পায় – একবিংশ শতাব্দীতে এসেও এরকম ধর্মকেন্দ্রিক ধারণা দেখে আমি যারপরনাই বিস্মিত। আর বুঝলাম মানুষের এখনো শিক্ষিত হতে আরো অনেক দেরি আছে – প্রোপাগান্ডা মোটামুটি সবাইকে কিছু না কিছু প্রভাবিত করে, এত নিউজ-সোর্স থাকা সত্ত্বেও। অনেক কাল ভারত-পাকিস্তান বন্ধুত্ব কমিউনিটির সদস্য হিসাবে বুঝেছিলাম যে কেউ কারোর মতাদর্শ থেকে একচুলও সরতে রাজী নয় – বন্ধুত্ব আসবে কি ভাবে? সবাই তো শত্রুতার ইতিহাস আলোচনাতেই ব্যস্ত।

অরকুটের পরে আসি লিঙ্কড-ইন, হাই-ফাইভ আর ফেসবুকে। প্রথমটা একটা অন্যধরনের লোকজনের জন্য, মানে যারা কর্পোরেট শুধু কর্পোরেটই থাকতে চায় – তাদের জন্য। পরের দুটো অরকুটের সমগোত্রীয়। তার মধ্যে ফেসবুকটাকে আমার খুব একটা পছন্দ হল না, সবকিছুইই বড় জটিল মনে হয়। সাধারণ মানুষ যে কিভাবে ব্যবহার করে এগুলো – বুঝে পেলাম না। এরপরে আমার তো মনে হয় একই জিনিস মোবাইলে চলে আসবে – খুব দ্রুত। এস-এম-এসের মাধ্যমে স্ক্র্যাপিং তো এখনই চলছে …

আর কি দুনিয়া এগিয়ে চলেছে বনবন করে ঘুরতে ঘুরতে, আর আমরাও তার চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছি। নেট খুলে আজকাল আমি আনন্দবাজারের সম্পাদকীয়, টাইমস অব ইন্ডিয়া আর নিজের ই-মেল চেক করার মত অরকুটের পাতাতেও ঢুঁ দিয়ে যাই – যদি দেখা হয়ে যায় আমার পুরোনো কোনো বন্ধুর সাথে।

সফটওয়ারের বুদবুদ

জানুয়ারি 11, 2008

সুবিনয় মুস্তাফীর লেখা পড়ে আমার মনে হল ভারতের অর্থনীতির বর্তমান বুদবুদ সম্পর্কে কিছুটা লিখেই ফেলি। আমার মনে আছে ছোটবেলায় একধরনের অংক করতাম যাতে হিসাব করতে হত বুদবুদের আকার কি হারে বাড়বে। আমাদের এখানের এই সফটওয়ার বুদবুদ আমার সব হিসাব ছাড়িয়ে বড় হয়েই চলেছে, আর আমি এই বুদবুদ ফাটার অপেক্ষায় কান বন্ধ করে অপেক্ষা করছি।

আগে শুরু করা যাক একটু পুরোনো ফ্ল্যাশব্যাক থেকে। এখানে সফটয়ার শিল্পের শুরু হল একরকম নব্বই দশকে উদার অর্থনীতির হাত ধরে। যদিও, ইন্দিরা গান্ধীর আমলে দেশীয় স্বয়ং-সম্পূর্ণতা আনার লক্ষ্যে আই-বি-এম কে তাড়িয়ে দিয়ে একরকম দেশীয় কোম্পানীদের ব্যবসার সুযোগ করে দেওয়া হয়। উইপ্রো, টিসিএস আর ইনফোসিসের সূত্রপাত এ সময়েই। তবে আসল কাজ করার সুযোগ আসে ওয়াই-টু-কে সমস্যার হাত ধরে। প্রচুর কাজ একসাথে এসে পড়ায় আমেরিকান কোম্পানিরা খরচা বাঁচাতে কিছু ভারতীয় কোম্পানীকে কনট্রাকটে কাজ আউটসোর্স করে দিতে থাকে। ভারতের বাজারে তখন সেই সামান্য টাকার চাকরি দেবার লোকও ছিল না। ফলে দলে দলে লোকে সফটওয়ার শিল্পে চলে আসে। কাজে সাফল্য পেয়ে অনেক কোম্পানী অন্য কাজও দিতে শুরু করে – একে একে আসতে থাকে সার্ভার ম্যানাজমেন্ট, ডেটাবেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা প্রোগ্রামিং-এর কাজও। কিন্তু আবার বাদ সাধে ২০০০ সালের মন্দা আর পরবর্তীকালের ৯/১১ হামলা।

আর এই শিল্পের সাথে জড়িয়ে আছে চাকরির বাজার। আমাদের এখানে মোটামুটি ভাল সব ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে শেষ বর্ষে ক্যাম্পাসেই চাকরির ইন্টারভিউ হয়। কোম্পানীগুলো “ফ্রেশার” ছাত্রদের চাকরির অফার দিয়ে যায়। পরে পাশ করে বেরোলে ছাত্ররা সেই কোম্পানীতে সুবিধামত যোগ দেয়। ২০০০ সালে চাকরির বাজার এত ভাল গিয়েছিল যে আমাদের কলেজে খুব তাড়াতাড়িই কম্পিউটার সায়েন্সের সবার চাকরি হয়ে গেছিল, তারপরে অন্য বিভাগের ছেলেরাও সফটওয়ারের চাকরি পাচ্ছিল (ক্যাম্পাসে একজন একটার বেশী চাকরি পেতে পারে না, দ্বিতীয় চাকরি বাইরে থেকে পেতে হয়)। আমাদের ২০০১ সালে আমরা আরো তাড়াতাড়ি চাকরি পেয়ে গেলাম – মাসে ১০-১২ হাজার থেকে শুরু করে ৩০-৩৫ হাজার পর্যন্ত মাইনে। কিন্তু বেরোতে না বেরোতে চাকরি বাজার থেকে উধাও – যারা অফার করে গেছে তাদের আর পাত্তা নেই। কেউ বলে নিতে পারবনা, কেউ বলে পরে নেব – আপাতত জায়গা নেই। খুব হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানীতে জয়েন করতে পারল ছেলেরা। এই মন্দা কাটতে সময় লেগে গেল আরো তিন বছর।

তিন বছর পরে দেখা গেল ভারতীয় কোম্পানীদের সাথে পাল্লা দিয়ে বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানীরাও বাজারে চলে এসেছে। কারণ মন্দার বাজারে, ভারতীয় কোম্পানীদের সাথে পাল্লা দেবার জন্য সেটাই ভাল কৌশল। আর এ এমন কৌশল, যে একজন তা অবলম্বন করলে বাকিরাও তা করতে বাধ্য। তাই, দলে দলে বহুজাতিক ভারতে অফিস খুলে অফারের ঝুলি নিয়ে কলেজে আসা শুরু করল ২০০৩-০৪ নাগাদ। আই-বি-এম ফিরে এল কোলকাতায়, যেখান থেকে তাদের অনশন ধর্মঘট করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল এককালে। আবার ছেলেরা চাকরি পেতে থাকল ভাল বেতনের।

মুশকিলটা হল, এইবারে আর এই চাকরির বুদবুদের কোনো শেষের লক্ষণ দেখছি না। বুদবুদের আকার বেড়েই চলেছে। আমি ১৯৯৭ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে ঢুকেছিলাম যখন পশ্চিমবঙ্গে সাকুল্যে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সংখ্যা ছিল ৬টি, যার মধ্যে একটি বেসরকারি। ছাত্র নেওয়া হত ১৮০০। আর এখন অসংখ্য ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ আর সিট ২৫-৩০ হাজারের মত। কম্পুটারের ছাত্র সফটওয়ারের কাজ করবে – সে দিন আগেই চলে গেছে। নতুন ধারায় সিভিল, মেকানিকালের ছাত্রও সফটওয়ারের কাজে যোগ দেয় মাইনের লোভে। এদের চাকরির বাজার তুঙ্গে। সদ্য খোলা একেকটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের প্রথম ব্যাচের ছাত্রদের প্রায় অর্ধেকই দেখি ক্যাম্পাসেই চাকরি নিয়ে বসে আছে। টিসিএস মাঝে মাঝে এক-একটা প্রোজেক্ট পাচ্ছে যাতে ৮০০০ থেকে ১০০০০ “মাথা” দরকার। তারা আসে কোথা থেকে? ক্যাম্পাসে গিয়ে ধরে আনা হয়। পিছিয়ে নেই বিজ্ঞান বা কলা-বিভাগের ছাত্ররাও – ডিপ্লোমা করে তারাও নাম লেখাচ্ছে একই দলে। বেড়ে চলেছে চাকরির মাইনে – আর সাথে সাথে মাইনে না বাড়ালে অন্য চাকরিতে চলে যাও। গাদা গাদা রিক্রুটমেন্ট এজেন্সী খালি “মাথা” ধরে এনে দেয় – মাথাপিছু তাদেরও টাকা মেলে ভালই। এই সফটওয়ারের সূত্রে গগনচুম্বী হয়ে গেছে রিয়েল এস্টেটের দাম – শুধুমাত্র যে অঞ্চলে সফটওয়ারের লোকজন থাকে সে অঞ্চলেই। সফটওয়ারের সাথে যোগ দিয়েছে বি-পি-ও, ওপারের লোকজনের সাথে ফোনে ইংরেজীতে কথা বলার চাকরি। সাধারণ ছেলেরা উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেই কাঁড়ি-কাঁড়ি পকেটমানি তৈরী করে ফেলছে পার্টটাইম কাজ করে।

আর এর ফলে সমস্যাও কম তৈরী হচ্ছে না। একে তো নতুন ইঞ্জিনিয়ারদের গুণগত মান খারাপ থেকে আরো খারাপের দিকে নেমে চলেছে আরেকদিকে ভাল ছাত্ররা শিক্ষকতার মত মহত পেশায় আর কেউ আসছেনা। বাজার তো ফুলেই চলেছে। সাধারণ সরকারি চাকুরেরা আর প্রতিযোগিতায় না পেরে উঠে মূল্যবৃদ্ধিকে দুষছেন। আর অন্যান্য শিল্পে দক্ষ শ্রমিকের অভাব দেখা দিচ্ছে – ভাবুন তো আর্কিটেক্টরা যদি দলে দলে সফটওয়ারে যায় তবে আর্কিটেকচারের কাজ কে করবে? কদিন আগে দেখলাম লার্সেন অ্যান্ড টুব্রোর মত নামকরা নির্মান শিল্পের কোম্পানী দাবী জানিয়েছে যে তাদের অধিকাংশ কর্মী প্রথম দু-বছরের মধ্যে ছেড়ে চলে যাচ্ছে – তাও কিনা সফটওয়ারে।

কিন্তু বুদবুদ ফাটলে কি ঘটবে? ভেবেও ভয় হয়। যে হারে টাকার(রুপি) দাম ডলারের বিরুদ্ধে বেড়ে চলেছে তাতে ক’দিনের মধ্যে আমেরিকায় সফটওয়ার রপ্তানী করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে। কিন্তু ক্রমবর্ধমান বেতনের বিল তো কোম্পানীর পকেট ফাঁকা করেই চলেছে। তাই এই গ্যাপ ভরাতে নতুন কোনো কৌশল অবলম্বন না করলে অবিলম্বে এই বুদবুদ তো সশব্দে ফেটে পড়বে। প্রভাবিত হবে সারা ভারতের সাথে সাথে আরো অনেক দেশও। তাহলে আমি কি নিজের চোখে দ্বিতীয় বুদবুদের পরিসমাপ্তি দেখতে পাব? (Hard Landing)নাকি কালের সাথে সাথে ধীরে ধীরে চুপসে যাবে? (Soft Landing) সেটাই এখন আমার কাছে লাখ টাকার প্রশ্ন।

বাংলাদেশের অ্যাডমিশন টেস্ট নিয়ে আমার কিছু কথা

জানুয়ারি 11, 2008

অনেকদিন ধরেই অরকুটে বিভিন্ন গ্রুপে বিভিন্নজনের প্রোফাইল দেখে আমার ধারণা হয়েছিল যে বাংলাদেশ বুয়েটে অন্তত অর্ধেক ছাত্রই আসে নটরডাম কলেজ থেকে। আরো কিছু সার্চের পরে, আজকেই একটা ফোরামে পড়তে গিয়ে দেখলাম বাংলাদেশের অগ্রণী প্রতিষ্ঠান বুয়েটে প্রবেশিকা পরীক্ষায় সুযোগ পাওয়া প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ ছাত্রই নটরডাম কলেজের। একই রকমের মেয়েদের যে ক’টি প্রোফাইল দেখা যায় বুয়েটের, তারাও অধিকাংশই ভিকারুন্নিসা স্কুলের। বাংলাদেশের এই দুটো স্কুল যথেষ্ট নামকরা, কিন্তু যে হারে এরা ডমিনেট করে পরবর্তী কেরিয়ার – সেটা দেখে আমি বিস্মিত।

এখানে (পশ্চিমবঙ্গে), একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণী সাধারণত ভাল স্কুলেই সবাই পড়তে চায়। গ্রামের ছাত্ররা মূলত নিকটবর্তী শহরের স্কুলে গিয়েই পড়াশোনা করে। এর সাথে সমান্তরালে আছে ইংরেজী মাধ্যম স্কুল। ইংরেজী মাধ্যম স্কুল আবার দুরকম, একদল পড়ে রাজ্যের সিলেবাসে ও আমাদের মতই প্লাস টু হিসাবে উচ্চমাধ্যমিক দেয় প্রথম ভাষা হিসাবে ইংরেজী নিয়ে। আর আরেকদল সরাসরি জাতীয় সিলেবাসে পরীক্ষা দেয়। উচ্চমাধ্যমিকের সাথে সাথেই জয়েন্ট এন্ট্রান্স (এই পরীক্ষার মাধ্যমে সব ইঞ্জিনিয়ারিং ও ডাক্তারী কলেজে প্রবেশ করে) পরীক্ষার র‌্যাঙ্ক অনুসারে ডাক্তারী বা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে সবাই সুযোগ পায়। একই সাথে অনুষ্ঠিত হয় আই-আই-টি প্রবেশিকা পরীক্ষা, আর জাতীয় মেডিকেল প্রবেশিকা। আবার এক রাজ্যের ছেলে অন্য রাজ্যের প্রবেশিকা পরীক্ষাতেও বসতে পারে – যেমন অন্ধ্রের ৮২ হাজার ইঞ্জিনিয়ারিং-এর সিট অনেকটাই আসে বাইরের রাজ্যের থেকেই।

কিন্তু এখানে কয়েকটা স্কুলের এতটা আধিপত্য নেই। যেমন ধরুন আমি পড়েছি শিবপুর বি-ই কলেজ থেকে (মোটামুটি পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয়)। কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগে আমরা ৩২ জন পড়তাম। শুধুমাত্র দুটো স্কুলের দুজন করে ছাত্র ছিল, বাকি সবাই যার যার স্কুলের একমাত্র প্রতিনিধি। সবাই আসে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অংশ থেকে – বিভিন্ন স্কুল থেকে। শহরের স্কুলের আধিপত্য থাকলেও গ্রামের স্কুলের থেকে আসা ছাত্রও কম নয়। যেমন দুর্গাপুর, মেদিনীপুর বা শিলিগুড়ির ছাত্র সংখ্যায় যথেষ্ট বেশীই থাকত। গোটা কলেজে আমাদের একই ব্যাচের চারশ ছাত্রের মধ্যে কোনো স্কুলের কুড়ি-ত্রিশজনের বেশী পাওয়া দুষ্কর বলে আমার ধারণা। সবথেকে বেশী ছাত্র আসে কোলকাতা সাউথ পয়েন্ট হাই স্কুল থেকে – তাও ব্যাচের ১০ শতাংশেরও কম।

এবার আমার প্রশ্নে আসা যাক। একই স্কুল থেকে এত ছাত্র আসছে কি ভাবে? ধরে নেওয়া যাক সব ভাল ছাত্রই নটরডামে ভর্তি হয়। কিন্তু তার মানে কি এই নয় যে বাকি মফস্বলের কলেজগুলোয় কেউ পড়াশোনা করতে উতসাহী নয় নাকি তাতে ভাল পড়াশোনা হয় না। আমাদের এখানের মত আশা করি বাংলাদেশেও প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রস্তুতি প্রাইভেট টিউশন আর ব্যক্তিগত প্রস্তুতি-নির্ভর। সেক্ষেত্রে, কলেজ কি ভাবে এতটা পার্থক্য তৈরী করতে পারে? আর সরকার কি কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে একই স্কুলের এতটা আধিপত্য খর্ব করার জন্য?

এখানে একটা সময় পর্যন্ত কলকাতার ছাত্ররাই আধিপত্য বজায় রেখেছিল। কিন্তু আশির দশকে সরকারি হস্তক্ষেপে কয়েকটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে সেই চাকা ঘুরিয়ে দেওয়া। গবেষণা করে দেখা গেল গ্রামের দিকে ইংরেজী আর অংকেই ছাত্র-ছাত্রীরা বেশী কাঁচা। তাদের সুবিধার্থে সিলেবাসে ওই দুটি সাবজেক্ট সোজা করে দেওয়া হল – যাতে সবার পড়াশোনায় কিছুটা হলেও আগ্রহ থাকে। এর ফলে পাশের হার বাড়তে থাকে আর আস্তে আস্তে উতসাহ পেয়ে কিছুটা গ্রামের পাশের হার বাড়তে থাকে। অপরদিকে শিক্ষার মান পড়ে যায়, আগের মাধ্যমিক পাশ আর পরের মাধ্যমিক পাশের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত দেখা দেয়। নব্বই-দশকের শেষের দিকে জয়েন্ট-এন্ট্রান্সেও একই পদ্ধতি অবলম্বন করে গ্রামের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু মনে করা হয় সর্বভারতীয় পরীক্ষায় পশ্চিমবঙ্গের স্থান ক্রমাগতই পিছিয়ে গেছে। প্রথম দশে এখন একজনও আসে না সবসময়।

আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন হল মফস্বলের ছাত্ররা তাহলে কি ভাবে নটরডামে আসে? আমার তো অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ঢাকার ছাত্ররা এতে অনেকটা সুবিধা পেয়ে যায়, কারণ তারা হোমগ্রাউন্ডে বসে পড়াশোনার সুবিধা পায় বেশীদূর পর্যন্ত। তাছাড়া, মফস্বলের ছাত্ররা শুনলাম ঢাকায় আসে প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রস্তুতির কোচিং-এর জন্য। সেটাও তো সমস্যার বিষয়। এ নিয়ে সরকারের কোনো প্ল্যান আছে কি?

আমার ব্যক্তিগত ধারণায় বাংলাদেশের পড়াশোনা এখনো ঢাকা-নির্ভর। এখনো স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবারই ডমিনেট করে আর কয়েকটা নামী-দামী স্কুলেই ভাল ফলাফল করে। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে কিন্তু সংখ্যায় বড় কম বলেই মনে হচ্ছে। আমি এই বিষয়ে পুরো জানিনা, তাই পাঠকেরা আলোকপাত করলে খুশী হব। আর প্লিজ কেউ মাইন্ড খাবেন না।

ঘনিষ্ঠতা ও স্বার্থপর জিন

জানুয়ারি 11, 2008

আগের পর্ব

আরো জটিল কিছু উদাহরণের মাঝে ডুব দেওয়ার আগে চট করে একটা তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা সেরে ফেলা যাক। জিন তো হল জীবের বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রক – একেকটি জিন একএকভাবে জীবের প্রকৃতি ও আচরণে প্রভাব আনে। কিন্তু, এই যে লেখার শিরোনামে “স্বার্থপর জিন” বলে একটা খটমটে তত্ত্বের নাম দেখা যাচ্ছে, সেটার মানে কি? সহজ করে বললে, যে জিন জীবগোষ্ঠীর মধ্যে নিজের উপস্থিতি বাড়িয়ে তুলতে সর্বদা সচেষ্ট, তাকেই বলা যায় “স্বার্থপর জিন”। রিচার্ড ডকিন্সের তত্ত্ব অনুসারে, যে জিন যত “স্বার্থপর” হবে – মানে নিজের উপস্থিতি বৃদ্ধিতে যত সচেষ্ট হবে, সেই জিনই জীবজগতে বেশী করে স্থান করে নেবে। কিন্তু জিনের তো নিজস্ব কোনো সচেতনতা নেই, তাহলে সে কিভাবে স্বার্থপর হতে পারে? সমাধানটাও সহজ। যে জিনের প্রভাবে জীব নিজের জিন বৃদ্ধিতে সচেষ্ট হবে, সেই জিনই নির্বাচিত হবে – যেন, জিন চালকের আসনে বসে জীবকে নিয়ন্ত্রণ করে এমনভাবে চালাচ্ছে, যাতে সে জিনের আরো “কপি” তৈরীতে সাহায্য করে – নিজের “স্বার্থে” জীবকে চালনা করছে। “কপি” করার এক পদ্ধতি তো প্রজনন, কিন্তু আরো এক ভাবে জিনের স্বার্থপরতা প্রকাশ পায়। অন্য যে জীবের শরীরে একই জিন উপস্থিত আছে, জীবকে তার প্রতি পক্ষপাতিত্বে প্রলুব্ধ করে। কিন্তু কিভাবে জানা সম্ভব কার দেহে কিসের জিন আছে? প্রকৃতিতে একটাই উপায় আছে এটা অনুমান করার – আত্মীয়তা। একদল নিকটাত্মীয়কে বাঁচানোর জন্য যদি কোনো জীব প্রাণ বিসর্জন দেয়, তাহলে তা হবে কোনো এক এরকম “স্বার্থপর জিন”-এর “প্ররোচনা” বা প্রভাবে – কারণ জীব নিজে মরে গেলেও তার জিনের “কপি” কিন্তু তার নিকটাত্মীয়দের দেহে সুরক্ষিত থাকার সম্ভাবনা খুবই বেশী। বিবর্তনের দৃষ্টিতে দেখলে, যে জিন জীবকে নিকটাত্মীয়দের সাথে ঘনিষ্ঠ করে তোলে বা তাকে নিকটাত্মীয়দের জন্য প্রাণ অবধি দিতে প্ররোচিত করে, সেই জিনের নির্বাচিত হবার সম্ভাবনা বেশী – কারণ, জীবগোষ্ঠীতে এই জিনের “কপি” বেড়েই চলবে। ক্রমে, জীবের বৈশিষ্ট্য হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে এই ঘনিষ্ঠতা – জীবজগতে এর ব্যতিক্রম মেলা দুস্কর। এই একই কারণে জীবের বাবা-মায়ের পক্ষপাতিত্ত্ব পেয়ে বড় হয়। বিজ্ঞানী ফিশার, হ্যালডেন আর সর্বোপরি হ্যামিল্টনের প্রতিষ্ঠিত এই তত্ত্বই জনসমক্ষে এনেছেন রিচার্ড ডকিন্স তার “সেলফিশ জিন” বইতে।

হ্যামিল্টন আরো এক ধাপ এগিয়ে গাণিতিকভাবে হিসাব করার চেষ্টা করেছেন ঠিক কতটা নিকট আত্মীয় হলে তার জন্য জীব প্রাণ দিতেও প্রস্তুত থাকে। তার বক্তব্য হল – এক জীব অপর এক জীবের সাথে যতটা জিন শেয়ার করে, ততটাই তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা। কিন্তু বাস্তবে কেউ জানে না কে কতটা জিন শেয়ার করে, তাই জীব শেয়ার করার সম্ভাবনার ওপর দিয়ে “হিসাব” করে। এই হিসাব মত, সন্তান বাবা-মায়ের ৫০% জিন শেয়ার করার সম্ভাবনা রাখে, তাই সন্তানের সাথে ঘনিষ্ঠতা ৫০% বলা যায়। একই ভাবে সন্তানদের নিজেদের মধ্যে জিন শেয়ার করার সম্ভাবনাও ৫০% – তাই তাদের মধ্যেও ঘনিষ্ঠতা সমান। কিন্তু তুতো ভাই-বোনেদের সাথে জিন শেয়ার করার সম্ভাবনা ১২.৫%, তাই এদের ঘনিষ্ঠতাও তুলনায় কম (চিত্র দ্রষ্টব্য)। এই ঘনিষ্ঠতার কারণটা খুবই সহজাত। স্বার্থপর জিন জীবকে বিবর্তনে এমন পথে নিয়ে চলে যাতে তার জিন-বিস্তারে সে উদ্যোগী হয়। যার সাথে সে বেশী জিন শেয়ার করবে, তার জিন-বিস্তার একরকম তার নিজের জিন-বিস্তারের সমতুল্য – যত ঘনিষ্ঠতা বাড়বে, তত বাড়বে নিজের জিন বিস্তারের সম্ভাবনা। এখন এ থেকে সহজেই অনুমেয় কিভাবে জীব তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের জন্য প্রাণ দিতেও প্রস্তুত হয় – নিজে মরে গেলেও তার জিন-বিস্তারের সম্ভাবনা মরে না। তাই এই পরোপকারী জিন বিস্তৃত হয় – জীবসমাজে স্থান করে নেয়।

এবার অনেকেই প্রশ্ন করবেন কেন অপত্যের তুলনায় বাবা-মায়ের আত্মবিসর্জন দেবার প্রবণতা বেশী দেখা যায় জীবজগতে? কারণ ব্যাখ্যা করা যায় অন্য দৃষ্ঠিভঙ্গী থেকে। অপত্য জীবের বয়স কম বলে তার জিন সঞ্চারের সম্ভাবনাও বেশী বাবা-মায়ের তুলনায়। তাই অপত্যস্নেহের জিন ভারসাম্য রেখে জীবসমাজে স্থান পেয়ে গেছে। উদাহরণ হিসাবে ধরা যায় যে মনে করা যাক এক বাবার মধ্যে এই অপত্য-স্নেহের জিন আছে। তার চার বাচ্চাকে বাঁচাতে গিয়ে সে মারা গেল। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেই অপত্য-স্নেহের জিন তাদের বংশবিস্তারের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে, আর বাড়িয়ে তোলে জিনপুলে নিজের অস্ত্বিত্ত্ব। তাই এই অপত্য-স্নেহের জিন আসলে একটি স্বার্থপর জিন – জিনপুলে নিজের সংখ্যা বাড়াতে সদা-”সচেতন”। অন্যদিকে, স্বার্থপর জিন মোটেও জীবকে স্বার্থপর করে তোলে না, বরং ঘনিষ্ঠদের ক্ষেত্রে পরোপকারী করে তোলে।


নিজভূমে পরবাসী

জানুয়ারি 11, 2008


আজ বিশ্ব মানবাধিকার দিবস। এবার এই দিন সোমবারে পড়েছে বলে এখানে মিছিল-মিটিং-ধিক্কারের সংখ্যা কম। তাও শুনলাম কাশ্মীরে আর কোলকাতায় কোনো কোনো জায়গায় কিছু বিচ্ছিন্ন সভা আয়োজন হচ্ছে। লোকে এখন আজকাল এতোটাই কেরিয়ার-সচেতন যে অফিস কামাই করে দুটো মিটিং-এ যোগ দেবার সদিচ্ছা কারো নেই – তাও যদি ইস্যুটা হয় “অন্যের মানবাধিকার”। সবাই নিজের নিজের ইস্যুতে সিদ্ধহস্ত, নিজের অধিকার সচেতন, কিন্তু অন্যের অধিকারের বিষয়ে গা নেই। স্বভাবতই এখানে মানবাধিকার দিবস অলিখিত হিসাবে সরে চলে এসেছে রবিবারে। তাই কাল ভাবলাম এদিকে ওদিকে একটু ঢুঁ মেরে দেখেই আসি কোথায় কি চলছে।

আমাদের সাথে কাজ করে রাহুল রাজদান বলে এক কাশ্মীরী (নামে কাশ্মীরী – নিজেকে ইউরোপিয়ান বলে দাবি জানিয়ে পার পেয়ে যেতে পারে যেকোনো জায়গায়)। যাহোক তিনি আমাদের আগেই আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তাদের মৌন মিছিলে যোগদান করার জন্য। অনেক খুঁজে পেতে গিয়ে হাজির হলাম তাদের সংস্থা রূটস ইন কাশ্মীরের (RIK) মিটিং-এ। একটা বড় রাস্তার পাশে ১০-১২ জন ছেলে-মেয়ে কিছু প্ল্যাকার্ড-ফেস্টুন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কপালে লাল ফেট্টি বাঁধা – লেখা “RIK”। রাহুল সহ আর কয়েকজন পাশে ল্যাপটপে পাওয়ার-পয়েন্ট প্রেসেন্টেশন দিয়ে চলেছে – কাশ্মীরে পণ্ডিতদের ওপর কিরকম কি অত্যাচার হয়েছে। একের পর এক স্তুপীকৃত লাশের বা ভাঙা দালানের ছবি আর পাশে স্থান-কাল। আমরা যেতে খুব খুশী হল আর অনেকবার ধরে ধন্যবাদ জানালো। সাথে দিল কয়েকটা প্যামফ্লেট – যাতে অসংখ্য রেফারেন্স দিয়ে বোঝানো আছে কি সমস্যা তাদের – কিভাবে সরকার আর জঙ্গীদের মাঝে “স্যান্ডুইচ” হয়ে তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ছে দিনে দিনে। প্রতিবছর এই কয়েকজন পণ্ডিত মিলে হায়দ্রাবাদে রোড শো করে আর মোমবাতি জ্বালিয়ে সবাইকে জানান দিয় যান – যে তারা হায়দ্রাবাদে থাকলেও তারা আসলে কাশ্মীরী।

কাশ্মীরে পণ্ডিতেরা হল আদি কাশ্মীরী – কয়েক হাজার বছর ধরে কাশ্মীর উপত্যকার স্থায়ী বাসিন্দা। আগে বেশ কয়েক দফায় এই সম্প্রদায়ের লোকজন কাশ্মীর থেকে পাতাতাড়ি গুটিয়ে ভারতে বিভিন্ন জায়গায় বাসা বেঁধেছে। এখন এরা তাই সংখ্যায় খুবই কম – মাত্র পাঁচ কি ছয় লাখ হবে। ভোটের দেশে চিরকালের মত এখানেও সংখ্যালঘুদের পাত্তা এমনিতেও কম – তার ওপর যদি জায়গাটা হয় কাশ্মীরের মত “Disputed”। ১৯৮৯ সালে যখন প্রথম কাশ্মীরে সংঘর্ষ শুরু হল, তখন প্রথম আক্রান্ত হয় এই পণ্ডিতেরাই। ভারত সরকারের প্রতিনিধি হিসাবে এদের প্রক্সি দাঁড় করিয়ে শুরু হয় জঙ্গীদের অত্যাচার। মসজিদ থেকে মাইকে ঘোষণা শুরু হয় পণ্ডিতদের ঘরছাড়া করার আদেশ। শুরু হয় যাকে বলা হয় এথনিক ক্লিনসিং – বছরের পর বছর সংখ্যালঘুদের নিশ্চিহ্ন করে দেবার যে খেলা চলে এসেছে তারই আরো এক দফা। একের পর এক পণ্ডিতকে দলে দলে মারা শুরু হয় – কোথাও গলায় দড়ি দিয়ে, কোথাও গুলি করে, কখনো হাত-পা কেটে আর কখনও বা জ্যান্ত পুড়িয়ে। এসব লোমহর্ষক কাহিনী এখন আমাদের কাছে পুরোনো হয়ে গেছে – স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছে শুধু উদ্বাস্তু পণ্ডিতেরা যারা কোনোরকমে পালিয়ে বেঁচে আছে জম্মু আর দিল্লীর কিছু রিফিউজি ক্যাম্পে। সংখ্যার খাতিরে বলে রাখা ভাল – ১৯৮৯ সালের পরে কাশ্মীরে হামলায় মৃত ৭০ হাজার মানুষের মধ্যে প্রায় ১২ হাজার হলেন সম্প্রদায়ভুক্ত (অত্যাচার করে মারার ঘটনা প্রায় ১,১০০র মত) আর রিফিউজি-র সংখ্যা তিন থেকে পাঁচ লাখের মধ্যে (সরকারি ভাবে যদিও সংখ্যাটা এক-দেড় লাখের বেশী নয়)। আক্রান্ত প্রায় একশো মন্দিরের মধ্যে অনেকগুলোই এখন পরিত্যক্ত। জংগীদের ঠেলায় কাশ্মীর উপত্যকার শতকরা নব্বই থেকে পচানব্বই ভাগই এখন থাকেন জম্মু আর দিল্লীর ক্যাম্পে – ত্রিপলের তাঁবুতে।

আরো মজার কথা, যারা ছিলেন এই গণহত্যার দায়িত্বে, তাদের মধ্যে অনেকেই ব্যক্তিগত সাক্ষাতকারে স্বীকার করেছেন গণহত্যার কথা। যেমন ধরা যাক ইয়াসিন মালিক বা
“বিট্টা কারাটে”র (ফারুক আহমেদ দার) কথা। এরা গণহত্যার পরে এখন হিরো হয়ে বেঁচে আছেন। কাল “বিট্টা কারাটে”র ইন্টারভিউ দেখলাম ইউটিউবে। শান্ত গলায় সে দাবী জানাল সে বিশ জনকে মেরেছে – আর তার জন্য সে যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা ফাঁসির সাজা আশা করছে (২০০৬ সালে ছাড়া পেয়েছে ফারুক, এখনো কাশ্মীরে আছে)। বিবিসির সাথে ইন্টারভিউতে একইভাবে গণহত্যার কথা স্বীকার করেছেন ইয়াসিন মালিকও। কিন্তু এদের বিচারের ব্যবস্থা নেই – যেমন নেই গুজরাটে দাঙ্গাকারীদেরও।

কালরাতে বাড়ি ফিরে আরো একটু ইন্টারনেট ঘাঁটাঘাঁটি করে মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল। কাশ্মীরী পণ্ডিতেরা ভারতের – নিজভূমে পরবাসী’দের (Internally Displaced People) মাত্র অর্ধেক। বাকি অর্ধেকের মধ্যে আছে আসামের সাঁওতালরা – যাদের এককালে আসামে এনেছিল ব্রিটিশেরা – চা বাগানে কাজ করানোর জন্য। আছে গুজরাটি দাঙ্গাপীড়িতরা, মিজোরামের উপজাতিরা – যারা আশ্রয় নিয়েছে ত্রিপুরাতে আর মাওবাদী হামলায় ঘরছাড়া গ্রামবাসীরা। এর সাথে শুরু হচ্ছে কর্পোরেট ডিসপ্লেসমেন্ট – মানে শিল্পের জন্য জমি নিতে গিয়ে উচ্ছেদ। কম করেও ছয় লাখ লোক আছেন এই “নিজভূমে পরবাসী”দের দলে। দিন যাচ্ছে, কারোর দেশে ফেরার কোনও আশা দেখা যাচ্ছে না – সরকার পুনর্বাসনের জন্য “কথাবার্তা” চালাচ্ছে। মাঝে মাঝে মনে হয়, আদিম মানুষেরা নিজের জায়গায় থাকার অধিকারটা অন্তত নিশ্চিত করেছিল। আমরা অনেক এগিয়ে গিয়ে কি সেই পুরোনো অধিকারটাই হারিয়ে ফেলছি? তবে ওই – “অন্যের মানবাধিকার” নিয়ে মাথা ঘামিয়ে কি লাভ? তাই আজ আমিও আবার পুরোপুরি কাজে ডুবে গেছি। স্বার্থপরতা জিন্দাবাদ!!

পুনশ্চ – অশোক পণ্ডিতের একটি তথ্যচিত্র ইউটিউবে দেখতে পারেন কাশ্মীরী পণ্ডিতদের নিয়ে – প্রথম খণ্ড, দ্বিতীয় খণ্ড

বিট্টা কারাটের ইন্টারভিউ ইউটিউব থেকে তুলে দিলাম।

স্বার্থপর জিন ও আত্মত্যাগ

জানুয়ারি 11, 2008

শুধুমাত্র আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে থাকিলেই বিবর্তনে সুবিধা পাওয়া যায় – এই ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে আগের পর্বে লিখেছিলাম। আগ্রাসী জীবেদের নিজেদের মধ্যে মারামারি করার প্রবণতা তাদের বিবর্তনগত ভারসাম্যে পৌঁছতে বাধা দেয়, যার ফলে সেই “আগ্রাসী জিন” স্থায়ী হতে পারে না। এবারে লিখছি দলবদ্ধ জীবদের নিয়ে। প্রকৃতিতে এইরকম দলবদ্ধ জীবের সংখ্যাই বেশী। পাখিরা জোট বেঁধে ওড়ে, মাছ দলে দলে সাঁতার কাটে, পোকামাকড় দলবেঁধে বাসা বানায় বা হায়েনারা দল বেঁধে শিকার করে। এখানে আলোচ্য মূল প্রশ্ন হল – এই দলবদ্ধ থাকার সহজাত প্রবণতা কিভাবে স্বার্থপর জিন তত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে? প্রতিটি জীব স্বার্থপর হলে কি তাদের দল গঠিত হতে পারে না? আরো বড় কথা সেই দল বা পরিবারের জন্য সহজাত আত্মত্যাগের কি ব্যাখ্যা হতে পারে? আর একই তত্ত্ব দিয়ে জীব কিভাবে উপকারীর উপকার করতে শেখে তা নিয়েও আলোচনা করছি।

প্রথমেই নজর দেওয়া যায় দলবদ্ধ ভাবে থাকার স্বাভাবিক কিছু সুবিধার দিকে। একসাথে শিকার করায় হায়েনাদের শিকার পাবার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। পেঙ্গুইনেরা নিজেদের মধ্যে জড়াজড়ি করে হাঁটে, যাতে এদের ঠান্ডা কম লাগে। একসাথে সাঁতার কাটলে সামনের মাছের তৈরী প্রবাহের মধ্যে শরীর ভাসিয়ে সাঁতার কাটাও সহজ হয়। আর V-আকৃতির জোট করে পাখিরা দূর-দূরান্তে পাড়ি দেয় একই প্রবাহ-জনিত সুবিধার কারণে। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে হ্যামিল্টনের স্বার্থপর জোটের মডেলে কথা। ভুল বোঝার অবকাশ না রাখার জন্য বলে রাখা ভাল, এখানে স্বার্থপর জোট বলতে স্বার্থপর জীবের জোট বোঝানো হচ্ছে।

ডিসকভারি বা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলে আমরা অনেকবারই দেখেছি বাঘের হরিণ শিকার করার দৃশ্য। মোটামুটি একটা সংক্ষিপ্ত জায়গার মধ্যে হরিণ দলবেঁধে চরে বেড়ায়। বাঘ যখন আক্রমণ করে, কাছাকাছি একটা হরিণকে বেছে নিয়ে তাড়া করে ধরে ফেলে। খুব স্বাভাবিকভাবেই বাঘের নজর থাকে দলের প্রান্তবর্তী হরিণগুলোর দিকে, যাদের ধরতে পারলে বাঘের শক্তিক্ষয় কম হবে। আর একই কারণে, হরিণদের দল গঠনের সময়ে সব হরিণই চাইবে যত পারা যায় দলে মাঝখানে থাকতে যাতে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা কমে যায়। ঘাস খাবার সময়ে হয়ত কিছুটা বিচ্ছিন্ন হবার দরকার পড়ে, কারণ মাঝের অংশে ঘাস দ্রুত কমে যায়। কিন্তু সাধারণভাবে চলাচল করার সময় হরিণেরা (ভাল দেখা যায় ভেড়াদের মধ্যে) যথাসম্ভব গা ঘেঁষাঘেঁষি করে চলতে থাকে। দূর থেকে দেখে এরা দলবদ্ধ বলে মনে হলেও এর পেছনে আছে প্রত্যেকের নিজ-নিজ স্বার্থপর উদ্দেশ্য – বিপদ-এলাকা কম করা আর প্রান্ত ছেড়ে মাঝের দিকে আসার প্রবণতা। এই ধরণের জোটকেই বলা যায় স্বার্থপর জোট – যেখানে সবাই নিজের স্বার্থের জন্যই জোট বেঁধে থাকে।

তবে, প্রকৃতিতে জোট-গঠন ছাড়াও সহমর্মিতার আরো অনেক উদাহরণ আছে যা এই মডেল দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। সবথেকে বড় সমস্যা হয় যেখানে জীব নিজের বিপদ এনেও দলকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। আপাতত সেরকম কয়েকটা উদাহরণ নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। ছোটো অনেক পাখি আছে যারা বাজ বা ঈগলের মত শিকারী পাখি দেখলেই কিচিরমিচির শব্দ করে দলের বাকি পাখিদের সতর্ক করে দেয়। এর ফলে ওই পাখিটার বিপদ কিছুটা বেড়ে যায়, কারণ শিকারী তাকে সহজেই খুঁজে পেতে পারে। সে কিন্তু ইচ্ছা করলেই বিপদ বুঝে সটকে পড়তে পারে, কিন্তু সে তা না করে নিজেকে শিকারীর নিশানায় এনেও দলকে সাহায্য করছে – এই আত্মত্যাগের ব্যাখ্যা কি হতে পারে? এই ঘটনার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের আগে একটা ব্যাপার বলে রাখা ভাল। পাখিদের এই এল্যার্ম কল নিয়ে বিশদ গবেষণা করে শব্দবিজ্ঞানী মার্লার দেখিয়েছেন এই ডাকগুলো এমনভাবে ডাকা হয় যাতে শিকারীরা কিছুতেই ডাক কোথা থেকে আসছে বুঝতে না পারে। স্বাভাবিকভাবে, কোনো এক সময়ে এই এল্যার্ম কল ঠিকঠাক না আসায় অনেক পাখি শিকার হয়েছে। তাই যাদের এল্যার্ম কল ঠিকঠাক, তারা বেঁচে থেকে বেশী বংশবৃদ্ধি করেছে। এল্যার্ম কল দেওয়ায় সুপটু করে তোলার জিনও প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে স্বার্থপরের মত পাখিদের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে।

এবার আসা যাক আত্মত্যাগের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে। সাধারণভাবে দেখা যায় যে একই গোষ্ঠীতে জীবের “কিন” বা আত্মীয় থাকার সম্ভাবনা বেশী। আর আত্মীয়দের মধ্যে একই ধরনের জিন থাকার সম্ভাবনাও বেশী। তাই “কিন সিলেকশন” তত্ত্ব অনুসারে জীব নিজের স্বার্থপর জিনের “কপি” বাঁচানোর জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে। দুটো ভিন্ন প্রেক্ষাপটে দেখা যাক এল্যার্ম কলের গুরুত্ব।

একধরনের পাখি আছে যারা মাটিতে চরে বেড়ায়। শিকারী আক্রমণ করলে তাদের আত্মরক্ষার সহজ উপায় হল আশেপাশের ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে পড়া। ধরা যাক এরকমই একটি পাখির দলে একটি পাখি এক শিকারীকে আগেভাগে দেখে ফেলেছে। যেকোন মুহূর্তে এরপরে শিকারী আঘাত হানবে। এখন তার কাছে দুটো পথ খোলা আছে – প্রথমটি হল নিজের মত চুপচাপ ঝোপে লুকিয়ে পড়া, আরেকটা হল সবাইকে সতর্ক করে দেওয়া। এখানে ভেবে দেখলে বোঝা যায়, পাখিটা যদি একা একা ঝোপে লুকিয়েও পড়ে, শিকারী আক্রমণ করলে গোটা দলই বিপদে পড়বে। শিকারী যদি দলবেঁধে আসে, তাহলে তো কথাই নেই। অন্যদিকে, শিকারী আঘাত হানার আগেই যদি সবাই মিলে লুকিয়ে পড়া যায়, তাহলেই বেঁচে যাওয়া যাবে। এধরনের পাখিরা তাই হিস-হিস শব্দে বাকিদের সতর্ক করে দেয়।

আরেক ধরনের পাখির কথা আসে, যারা আক্রান্ত হলে দলবেঁধে উড়ে পালিয়ে যায়। আগেরবারের মতই ভাবা যাক যে কোনো এক শ্যেনদৃষ্টি পাখি শিকারীকে আগে থেকেই দেখে ফেলেছে। এখন সে একা উড়ে যেতে পারে। কিন্তু শ্বাপদসংকুল পৃথিবীতে একা উড়ে গেলে তার বিপদের সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়া ছাড়া কমে না। শিকারী পাখিরা সাধারণত এরকম একা-হয়ে-যাওয়া পাখিদেরই আক্রমণ করে সহজ শিকার বানিয়ে ফেলে। পড়ে যদি তার আবার দলে ফিরে আসার সম্ভাবনাও থাকে তাও সাময়িকভাবে তাকে একা হয়ে যেতে হবে। তাই এই অবস্থানে সবথেকে ভাল নীতি হল নিজেও উড়ে পালানো, আর সাথে আর সবাই যাতে পালায় সেজন্য কিচিরমিচির শব্দে তাদেরও সতর্ক করে তোলা। হ্যামিলটনের এই তত্ত্ব ঠিক হোক বা না হোক, পাখিদের মধ্যে এই আচরণ বারে বারে একই রকম ভাবে দেখা যায়।

বেঁচে থাকার পথে এই কৌশল খুবই দক্ষ। এই এল্যার্ম কল নিখুঁত না হবার কারণে যেমন অনেক পাখি শিকারে পরিণত হয়েছে, তেমনই এল্যার্ম কল না দেওয়ার কারণে অনেক দলও বিপদ্গ্রস্ত হয়েছে। সবে মিলে এল্যার্ম কল যারা ঠিকঠাক দিতে পেরেছে, সময়ের সাথে সাথে তাদের স্বার্থপর জিন বেশী হারে ছড়িয়ে পড়েছে। জীব নিজে স্বার্থপরের মত এল্যার্ম কল দিতে শিখেছে আর তা দেখে আমরা তাদের আত্মত্যাগের কথা ভেবে বিমোহিত হয়েছি।
(চলবে)

স্বার্থপর জিন ও স্থিতিশীল কৌশল

জানুয়ারি 11, 2008

আগের পর্ব

বিবাদী আর আগ্রাসী নীতি ছাড়াও অনেকরকম কৌশল নিয়ে আলোচনা করেছেন স্মিথ আর প্রাইস। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল প্রতি-আক্রমণের কৌশল। এই কৌশলে জীব প্রথমে বিবাদীর মত আচরণ করে, কিন্তু আক্রান্ত হলে প্রতি-আক্রমণও করে, বিবাদীদের মত পালিয়ে যায় না। এছাড়াও কোনো কোনো জীব শুরুতে আগ্রাসীদের মত ব্যবহার করে আক্রান্ত হলে পালিয়ে যেতে পারে – সেটাও একটা কৌশল। আর আছে শুরুতে পরীক্ষা করে যাচাই করে দেখে নেবার কৌশল। স্মিথ আর প্রাইস দেখিয়েছেন, এসবের মধ্যে প্রতি-আক্রমণের কৌশল বা টিট-ফর-ট্যাটই হল একমাত্র স্থিতিশীল কৌশল, অর্থাৎ, জীবগোষ্ঠীতে শুধু এই কৌশলই চালু থাকলে, বাকি কৌশল অবলম্বন করে জীবেরা অতিরিক্ত সুবিধা আদায় করে উঠতে পারেনা। শুরুতে পরীক্ষা করে নেবার কৌশলও প্রায় স্থিতিশীল, তবে এই কৌশল অবলম্বনকারী জীবগোষ্ঠীর মধ্যেও প্রতি-আক্রমণকারীরা সামান্য সুবিধায় থাকেন। উৎসাহী পাঠকেরা নিজেরা একই পয়েন্ট সিস্টেমে হিসাব করে দেখতে পারেন কোন ক্ষেত্রে কিভাবে কারা সুবিধাপ্রাপ্ত হয়। প্রকৃতিতে এই পয়েন্ট সিস্টেমের কিছু হেরফের হলেও মূলনীতি প্রায় একই থাকে। মেরু অঞ্চলের পাখীদের ক্ষেত্রে দিনের আলো যেটুকু সময় থাকে তা শিকার না করে নিজেদের মধ্যে মারামারি করলে সময় নষ্ট করার জন্য অনেক বেশী খেসারত দিতে হবে, তাই তাদের ক্ষেত্রে সময় নষ্ট করার পেনাল্টি -১০ এর জায়গায় -৩০ ভাবা যেতে পারে। তাই সাধারণ কিছু গাণিতিক হিসাবে সমগ্র প্রকৃতির হিসাবকে মাপতে গেলে অনেক সতর্কভাবে হিসাব করতে হবে।

এবার আসা যাক আরো একধরণের লড়াইতে – যাকে পরিভাষায় বলা যায় “পলায়নের লড়াই”(War of attrition)। এর মানে, যতক্ষণ না একজন পলায়ন করে, ততক্ষণ এই লড়াই চলে। প্রকৃতিতে এধরণের লড়াই বহুল প্রচলিত – সাধারণত খুব সহজে কাবু হয়না এরকম প্রজাতির (যেমন গণ্ডার) মধ্যে চলে। দুটো জীব একে অন্যের দিকে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গী আর তর্জন-গর্জন করতে থাকে, যতক্ষণ না একজন ‘রণক্ষেত্র’ থেকে পালিয়ে যায়। জেতার জন্য শুধু অপরের থেকে বেশী সময় ব্যয় করতে হয়, সময়ই একমাত্র শক্তি এই যুদ্ধে। এটা অনেকটা দুজনের মধ্যে নিলাম, যেখানে সময় হল কারেন্সীর সমতুল্য। উদাহরণ দেখতে হলে আমার মনে হয় কোনো জঙ্গলে যাবার দরকার নেই, মানবসমাজে এই পলায়নের লড়াই সর্বত্র চলে, বিশেষত বিশ্বাসের প্রশ্নে। অরকুটে বা অনেক ফোরামে (সচলায়তনেও) প্রায়ই দেখা যায় দুপক্ষ নিজের নিজের মতামত একতরফা বলে চলেছে। তারা উভয়েই আলাদা আলাদা মাপকাঠি দিয়ে অপরের মত ভুল আর নিজের মত ঠিক বলে দাবী জানাচ্ছে। লড়াই চলে ততক্ষণ, যতক্ষণ না একপক্ষ ময়দান ছেড়ে পালিয়ে যায় বা ভাবে এই বিষয়ে আর সময় ‘নষ্ট’ করা ঠিক হবে না।

ধরা যাক সবাই যদি নিজেদের মধ্যে ঠিক করে নেয় যে তারা একেকটি বিষয়ে সর্বাধিক এতগুলো পোস্ট দেওয়া যাবে। সেক্ষেত্রেও কোনো চালাক ব্যক্তি নিয়ম ভেঙ্গে আরো একটা বেশী পোস্ট দিয়ে বাজিমাত করবে (বাস্তবে থাকলেও প্রকৃতির নিয়মে পোস্টের ঊর্দ্ধসীমা নেই)। তাই এই কৌশল ধোপে টিঁকবে না। আবার যে লড়াইতে হেরে যাচ্ছে, সে যদি আগে থেকেই হিসাব করে নিতে পারে যে সে হেরে যাবে, তাহলে সে ওই বিষয়ে কোনো পোস্টই করবেনা, সময়ের অপব্যবহার থেকে নিজেকে সরিয়ে নেবে। সেক্ষেত্রে আবার যারা শুধু কয়েকটি পোস্ট দিয়ে বাজার ‘যাচাই’ করে নিতে চায় ক’জন তার সাথে থাকতে পারে, তারা সুবিধাপ্রাপ্ত হবে। কারণ তার সমমতে কয়েকটি পোস্ট আসা-মাত্রই সংখ্যালঘুরা আর বিরুদ্ধে পোস্ট দিয়ে সময় নষ্ট না করার কথা ভাববে। গল্প পড়ে আবার মনে হতে পারে যে কিছুদিন পড়ে অন্যেরা এই কৌশল ধরে ফেলবে আর তারা কয়েকটা বেশী পোস্ট অবধি ধৈর্য ধরবে। আবার আমরা ঘুরেফিরে সেই গল্পের শুরুতে হাজির। তাহলে স্থিতিশীলতা আসবে কি করে? গাণিতিক বা তার্কিকভাবে দেখানো যায় যে প্রতি ব্যক্তি তার নিজের নিজের মত করে লড়াইতে তার নিজের লাভ-ক্ষতির মূল্য যা ভাবে, সেই অনুপাতেই সময় ব্যয় করবে। অরকুটে বা ফোরামে যার বিশ্বাস দৃঢ়তর (অবশ্যবিশ্বাস দৃঢ়তর বলে সেই ঠিক এমন কোনো মানে নেই), সেই জেতে – কারণ তার কাছে জেতার ‘মূল্য’ও বেশী। এটাই স্থিতিশীল কৌশল।

এ বিষয়ে কৌশলের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হল প্রতিদ্বন্দীকে বুঝতে না দেওয়া যে সে কখন পলায়ন করতে চায়। অনেকসময়েই, ফোরাম ছেড়ে বেরিয়ে যাবার আগে একপক্ষের লেখার দৈর্ঘ্য ছোটো হতে থাকে, যুক্তির তীব্রতা কমতে থাকে – যা থেকে প্রতিদ্বন্দী বুঝে যায় যে এবার প্রতিপক্ষ হার-স্বীকার করতে চলেছে। হিসাবের থেকে সামান্য বেশী হলেও সে তখন সেই অতিরিক্ত সময় ব্যয় করে লড়াইতে জেতার জন্য। তাই প্রাকৃতিক নির্বাচনের ক্ষেত্রে যাদের পলায়ন আগে থেকেই বোঝা যায়, তারা সুবিধা পায় না। শেষ অবধি যারা একইভাবে লড়াই করতে পারে, তারাই নির্বাচিত হয়, তাই এই কৌশলই স্থিতিশীল।

এখন অবধি যা আলোচনা হয়েছে সব ক্ষেত্রেই ধরে নেওয়া হয়েছে লড়াইতে উভয়পক্ষ সমান বা প্রায় সমমাপের। বাস্তব প্রকৃতিতে কিন্তু তার উল্টোটাও প্রচুর দেখা যায়। মেনার্ড আর প্রাইস এই তত্ত্ব অসম লড়াই-এর ক্ষেত্রেও সফলভাবে প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন সেখানেও স্থিতিশীল কৌশলে পৌঁছন সম্ভব। তাদের হিসাবমত, অসাম্য প্রধানত তিনপ্রকারের –
১) আকার বা গঠনগত (বাঘ বনাম হরিণ)
২) যুদ্ধে প্রাপ্তি অনুসারে (তৃণভূমি নিয়ে মাংসাশী প্রাণী কেন লড়াই করবে?)
৩) অবস্থান নিয়ে (‘হোম গ্রাউন্ড’ বনাম ‘অ্যাওয়ে গ্রাউন্ড’)। এর মানে হল যুযুধান দুই পক্ষের এক পক্ষ আগে থেকেই সেখানকার বাসিন্দা আর অন্যপক্ষ অনুপ্রবেশকারী।
এবার দেখা যাক তৃতীয় প্রকারের অসাম্যের (হোম আর অ্যাওয়ে) সাপেক্ষে স্থিতিশীলতা কিভাবে আসতে পারে। সাধারণ হিসাবে বোঝা যায় যে “বাসিন্দা জেতে আর অনুপ্রবেশকারী পালায়” – এরকম কৌশল স্থিতিশীল। কারণ কোনো এক জীব যদি সর্বদা আক্রমণের কৌশল অবলম্বন করে, তাহলে সে অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে ভাল ফল করলেও বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে লড়াইতে জড়িয়ে পড়ে অর্ধেক লড়াইতে আহত হবার সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলবে। অপরদিকে, জীবগোষ্ঠীর বাকি জীবেরা কোনো লড়াইতেই যাচ্ছেনা, কেউ না কেউ পালিয়েই যাচ্ছে। তাই তারা ওই আগ্রাসী জীবের তুলনায় সুবিধাপ্রাপ্ত হবে। একই ভাবে দেখা যেতে পারে “বাসিন্দা পালায় আর অনুপ্রবেশকারী জেতে” – এটাও একটা স্থিতিশীল কৌশল – যদিও প্রকৃতিতে এর উদাহরণ খুবই কম। কারণ, সাধারণত বাসিন্দারা নিজেদের অবস্থানগত সুবিধার কারণে সেই জায়গা সম্পর্কে বেশী ভাল ধারণা রাখে, যা তাদের লড়াইতে সাহায্য করে। স্মিথের মতে, এই দ্বিতীয়টি একরকম বিভ্রান্তিকর কৌশল। কারণ, এর ফলে, বাসিন্দ বলে আর কিছু থাকে না – যে অনুপ্রবেশ করে সেই অন্যেকে একরকম তাড়িয়ে দেয়। আর প্রথমটি প্রকৃতিতে সর্বত্র দেখা যায় – যাকে বলে আঞ্চলিক আচরণ (Territotorial behaviour)।

এই আঞ্চলিক আচরণের একটা ভাল নিদর্শন দেখা যায় নিকো টিনবার্জেন-এর পরীক্ষায়। তিনি একটি অ্যাকোরিয়ামের দুপাশে দুটো যুদ্ধবাজ মাছ ছেড়ে দিলেন। তারা দুপাশে দুটো বাসাও বানিয়ে ফেলল এবং নিজেদের বাসার প্রতিরক্ষাও করতে থাকল। এবার উনি দুটো টেস্ট-টিউবে মাছদুটোকে আলাদা করলেন। এবার তাদের পাশাপাশি আনলেই দেখা যায় তারা কাঁচের ওপারে থাকা প্রতিদ্বন্দীর সাথে মারামারি করতে উদ্যত হচ্ছে। মজার ব্যাপার হল, যদি টেস্ট-টিউব দুটোকে যদি একজনের বাসার কাছে বসিয়ে পাশাপাশি আনা যায় তাহলে দেখা যাবে যার বাসার কাছে সে মারমুখী, আর অপরজন পালাতে ব্যস্ত। বিবর্তনের পথে “বাসিন্দা জেতে আর অনুপ্রবেশকারী পালায়” – এই স্থিতিশীল কৌশল মাছগুলো আয়ত্ত করে ফেলেছে।

কিন্তু মেক্সিকোর সামাজিক মাকড়সা আচরণে ভিন্ন। কোনো মাকড়সা নিজের জালে বসে আক্রান্ত হলে সে পাথরের অপরদিকে চলে যায়, অনেকসময়ে সেখানকার মাকড়সাটাকে উৎখাত করে। এভাবে চলতে থাকে যতক্ষণ না কোনো এক মাকড়সা নতুন জায়গা পেয়ে যায়। এদের আচরণ দ্বিতীয় স্থিতিশীল কৌশলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এক্ষেত্রে বিবর্তনের পথে “বাসিন্দা পালায় আর অনুপ্রবেশকারী জেতে” – এই স্থিতিশীল কৌশল মাকড়সারা নির্বাচনের মাধ্যমে আয়ত্ত করে ফেলেছে। (চলবে)

স্বার্থপর জিন

জানুয়ারি 11, 2008

স্বার্থপর জিন কথাটা রিচার্ড ডকিন্সের The Selfish Gene এর বাংলা অনুবাদ। জীবের আচরণ কিভাবে বিবর্তনের পথে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে স্বার্থপর জিন দিয়ে – সে বিষয়েই বইটা। এই লেখটা মূলত বইয়ের পঞ্চম চ্যাপ্টার থেকে নেওয়া। বাংলা প্রতিশব্দের ব্যাপারে আমি কিছুটা কাঁচা, তাই জনগণ আমাকে সাহায্য করলে বাধিত হব।

বাংলাভাষায় একটা কথা আছে – “অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী”। আমার ধারণা ডারুইনের “যোগ্যতমের উদ্বর্তন” নিয়েও এরকমই কিছু ভয়ঙ্করী ভুল ধারণা রয়েছে – তাদের মধ্যে একটি হল আগ্রাসী মনোভাবের ব্যাখ্যা। খুব সহজ চিন্তাভাবনা করলে মনে হবে যে যদি যোগ্যতমই সবসময় নির্বাচিত হবে তাহলে সব জীবই তো চাইবে অন্যেকে মেরে ফেলতে আর নিজের বংশবিস্তার করতে। তাহলে সেই প্রাণীদেরই আমাদের এখন চারপাশে দেখতে পাওয়ার কথা যারা হিংস্র, শক্তিশালী ও আগ্রাসী। একটি জীবকে যদি জিনসমষ্টি নিয়ন্ত্রিত একটি স্বার্থপর যন্ত্র (যাকে আমরা বলব সজীব যন্ত্র) বলে মনে করা যায়, তবে সেই জিনগুলোই বেঁচে থাকার কথা, যারা প্রাণীদের মধ্যে এই আগ্রাসী নীতি অবলম্বনে প্রলুব্ধ করে। কিন্তু বাস্তবে আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার ব্যতিক্রম দেখি, কেন?

ব্যাপারটা একটু বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা যাক। একটি সজীব যন্ত্রের কাছে বাকী জীব বা সজীব যন্ত্রেরা হল জল, কাঠ বা পাথরের মত প্রকৃতির আরো কিছু অংশমাত্র। প্রাকৃতিক নির্বাচন সেই জিনগুলোকেই নির্বাচিত করে যারা সজীব যন্ত্রকে তার পারিপার্শ্বিক প্রকৃতির পক্ষে সবথেকে উপযোগী করে গড়ে তোলে। পারিপার্শ্বিক প্রকৃতির মধ্যে অন্যান্য সজীব যন্ত্র বা জীবও অন্তর্ভুক্ত। ভিন্ন প্রজাতির জীবেরা একে অপরকে প্রভাবিত করে – খাদ্য-খাদক সম্পর্ক ছাড়াও পরাগরেণু বাহক প্রজাপতির মত উদাহরণও কম নেই। তবে একই প্রজাতির জীবেদের পারস্পরিক প্রভাব তুলনায় বেশী। কোনো এক জীবের কাছে বাকি সব জীব খাদ্যশৃঙ্খলে তার প্রতিযোগী আবার অর্ধেক (সাধারণভাবে) জীব তার সম্ভাব্য প্রজনন-সঙ্গী, বাকি অর্ধেকের সাথে প্রতিযোগিতা করেই তবে সে বংশবিস্তারে সক্ষম হবে। সাধারণ বিচারে, তাই জীবের পক্ষে তার প্রতিযোগীকে হত্যা করাটা (এবং খেয়ে ফেলাটা) খুবই স্বাভাবিক বলে মনে হয়। বাস্তবে কিন্তু তার উল্টোটাই বেশী করে চোখে পড়ে। শুধু তাই নয়, কনরাড লোরাঞ্জের ‘অন অ্যাগ্রেসন’ বই-এর মতে, নিজেদের মধ্যে এই মারামারিও জীবজগতে বিভিন্নভাবে হয়, এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার ফলে পরাজিত পক্ষের প্রাণসংশয় হয় না। উন্নততর জীবজগতে, বিশেষত মানুষের মধ্যে আবার আগ্রাসনের পরিবর্তে পারস্পরিক সহযোগিতাই বেশী করে চোখে পড়ে। জীবজগতে হানাহানির পরিবর্তে এরকম সহযোগিতা কেন দেখা যায় যদি স্বার্থপর জিন-বিস্তার করাই জীবের লক্ষ্য হয়ে থাকে?

উত্তরটা প্রথমে একটা উদাহরণের সাহায্যে ব্যাখ্যা করা যাক। ধরা যাক হিমু আর বন্যাদি সচলায়তনে আমার প্রতিযোগী দুই ব্লগার। এটা ভাবা খুবই স্বাভাবিক যে আমি এখন হিমুর মুখোমুখী হলেই তাকে মেরে ফেলতে উদ্যত হব। কিন্তু, এমন যদি হয় যে হিমু আবার বন্যাদিরও প্রতিযোগী, তাহলে হিমুকে মারলে আদপে বন্যাদির সুবিধাই হয়ে যাবে। বরং, বন্যাদি আর হিমুর মধ্যে প্রতিযোগিতা তীব্র হলেই আমার লাভ বেশী। তাই, প্রতিযোগিতার জটিল ঘূর্ণাবর্তে প্রতিযোগীদের নির্বিচারে হত্যা করাটা নির্বাচিত হবার জন্য খুব একটা ভাল কৌশল নাও হতে পারে। চাষের ক্ষেতে অনেকসময়েই একটি কীটনাশক ব্যবহার করে কোনো একটি ক্ষতিকর কীট ধ্বংস করে তার প্রতিযোগী আরো ক্ষতিকর কীটের সুবিধা করে দেবার ঘটনা ঘটে – যার ফলাফল ক্ষতিকর। উদাহরণ থেকে বোঝা যাচ্ছে, প্রতিযোগিতা বা লড়াইতে নামার আগে বা রণকৌশল নির্ধারণে সব সজীব যন্ত্রেরই সচেতন বা অবচেতন ভাবে লাভ-ক্ষতির হিসাব করতে হবে। আর এখানেই আসে হ্যামিলটনের “বিবর্তনগত স্থিতিশীল কৌশল”।

“বিবর্তনগত স্থিতিশীল কৌশল” হল এমন একটি কৌশল বা নীতি, যেকোনো জীবগোষ্ঠীর অধিকাংশ জীব তা অবলম্বন করলে অন্য কোনো কৌশল এসে তার স্থান দখল করতে পারবে না। পরিবর্তিত পরিবেশে কৌশল পরিবর্তন হতে পারে, প্রতি জীবের নিজে নির্বাচিত হবার কৌশল একই জীবগোষ্ঠীর অধিকাংশ জীবের কৌশলের ওপর সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। মূল কথা হল, একবার জীবগোষ্ঠীর অধিকাংশ জীব এই কৌশল অবলম্বন করা শুরু করলে এর বিরোধীদের প্রাকৃতিক নির্বাচনের সরাসরি বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হবে।

মেনার্ড স্মিথের কাল্পনিক উদাহরণ দিয়েই ব্যাখ্যা করা যাক। ধরা যাক, একটি জীবগোষ্ঠীর মধ্যে দুধরণের কৌশল অবলম্বনকারী জীব দেখা যায়। প্রথমটি আগ্রাসী নীতি, আরেকটি বিবাদ নীতি। আগ্রাসীরা সবসময় শেষ রক্তবিন্দু অবধি লড়াই করে, মৃতপ্রায় না হলে রণক্ষেত্র থেকে পলায়ন করে না। বিবাদীরা মারামারি না করে অন্য উপায়ে লড়াই করে, ঝগড়া করে, রক্তচক্ষু দেখায়, আক্রমণের ভাব করে কিন্তু রক্তপাত করেনা। এদের পার্থক্যটা অনেকটা অনেকটা ডিপ্লোম্যাট আর আর্মির পার্থক্যের মত। আগ্রাসীর সাথে বিবাদীর লড়াই হয়না, বিবাদী পালিয়ে যায়। কিন্তু দুই আগ্রাসীর লড়াইতে সর্বদা কোনো না কোনো একজন মারা যায় (বা গুরুতর আহত হয়)। প্রথমে, হিসাবের সুবিধার্থে ধরে নেওয়া যাক, কোনো জীবই জীবদ্দশায় তার কৌশল বদলায় না, এবং প্রতিযোগিতার শুরুতে একে অন্যের কৌশল জানে না। আমাদের এই মডেলের কাল্পনিক পয়েন্ট সিস্টেমে ধরা যাক, প্রতিযোগিতায় জিতলে ৫০ পয়েণ্ট, হারলে ০, সময় নষ্টের জন্য -১০, গুরুতর আহত হলে -১০০ পয়েন্ট – জিনের নির্বাচনের সম্ভাবনার সাথে মিল রেখেই এরকম পয়েন্ট সিস্টেম। এখানে মনে রাখতে হবে যে, আমরা লড়াইতে কে জিতবে তা নিয়ে আগ্রহী নই, তা নিয়ে আগেই আলোচনা হয়েছে। আমরা হিসাব করতে চাই যে এদের মধ্যে কোন কৌশলটি (বা এদের কোনো মিশ্রণ) স্থিতিশীল হতে পারে।

মনে করা যাক, জীবগোষ্ঠীর সব জীবই বিবাদী নীতি অবলম্বন করছে। তাহলে প্রতিটি প্রতিযোগিতায়, একজন জেতে (+৫০), একজন হারে (০) আর দুজনেই সময় নষ্ট করে (-১০x২ = -২০)। সমষ্টিগতভাবে লাভ হয় ৩০ পয়েন্ট, প্রত্যেকের ভাগে যায় ১৫ পয়েন্ট করে। এবার ধরা যাক একটা আগ্রাসী জীব এসে হাজির হল এই গোষ্ঠীতে। সে বিবাদীদের সহজেই লড়াইতে হারিয়ে দেবে, প্রতি যুদ্ধে +৫০ পয়েণ্ট হাসিল করবে। তার ফলে আগ্রাসন নিয়ন্ত্রক জিন খুব সহজেই জীবগোষ্ঠীতে বিস্তার লাভ করবে। এবার ধরি, যথেষ্ট সময় পরে, জীবগোষ্ঠীতে সবাই আগ্রাসী হয়ে গেছে। একইভাবে হিসাব করে দেখা যায়, দুটি আগ্রাসী জীবের লড়াইতে গড়ে -২৫ পয়েণ্ট পায় (জেতায় +৫০, সময় নষ্টে -১০x২ = -২০ আর গুরুতর আহত হওয়ায় -১০০)। একটি বিবাদী সেই দলে থাকলে সে সব লড়াইতে হারে, কিন্তু গড়ে সে ০ পয়েণ্ট পায়। ২৫ পয়েন্টের সুবিধা থাকায় সহজেই বিবাদ কৌশল নিয়ন্ত্রক জিন বিস্তার লাভ করবে।

এতদূর পর্যন্ত গল্পটা শুনে মনে হতে পারে যে জীবগোষ্ঠীতে সবসময় এই দুই কৌশলের জীবেদের মধ্যে একটা বাড়াকমা চলবে। আদপে, অংক কষে দেখানো যায় যে বিবাদী আর আগ্রাসী অনুপাত ৫:৭ অনুপাতে পৌঁছলে স্থিতিশীলতা লাভ করে। মানে, ওই অনুপাতে পৌঁছনর পরে প্রতিটি আগ্রাসী আর প্রতিটি বিবাদীর গড়পরতা লাভ-ক্ষতির হিসাব মিলে যায়। নির্বাচনে আর কেউই অন্যের তুলনায় সুবিধা পায় না। যদি কোনোভাবে আগ্রাসীর সংখ্যা এর চেয়ে বেড়ে যায়, তাহলে বিবাদীরা সুবিধা পেতে থাকে, যেভাবে আগ্রাসীদের দলে একটি বিবাদী সুবিধা পেত। একইভাবে দেখানো যায়, মানবসমাজে নারী-পুরুষের স্থিতিশীল অনুপাত ১:১।

মানবসমাজে অনুরূপ নীতি দেখা যায় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে, যা গেম থিয়োরী দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। কোনো ব্যবসায়ী একই দ্রব্য কমদামে বিক্রি শুরু করলে সে সাময়িকভাবে লাভ বাড়িয়ে ফেলতে পারে, কিন্তু তার প্রতিযোগিরাও সাথে সাথেই দাম কমিয়ে প্রত্যুত্তর দিলে তার আদপে লোকসানই হবে। তাই শেষমেষ নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া ছাড়া বাজারে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে লাভ বাড়ানো সম্ভব নয়। (চলবে)

অন্ধবিশ্বাস না সহজাত তত্ত্বীয়করণ?

জানুয়ারি 11, 2008

অনেককাল হল শুনছি যে অন্ধবিশ্বাস হল বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় শত্রু। অনেকসময় ধর্ম বা ধর্মগ্রন্থকে দায়ী করা হয় অন্ধবিশ্বাস ছড়ানোর জন্য। কিন্তু অন্ধবিশ্বাস ব্যাপারটা ঠিক কি? সাধারণভাবে, পরীক্ষা না করেই বিশ্বাস করাকে সাধারণভাবে অন্ধবিশ্বাস বলা হয়। এই বিষয়ে আমার ছোটোবেলা থেকেই একটা প্রশ্ন ছিল, যা আমি কিছুটা উত্তর পেলাম সম্প্রতি কয়েকটা গবেষণাধর্মী প্রবন্ধে। খুব সহজ একটা প্রশ্ন হল, যদি সবাই নিজের নিজের মত বিশ্বাস করতে থাকেন তাহলে পৃথিবীতে সব মানুষের অন্ধবিশ্বাস আলাদা আলাদা নয় কেন? কিভাবে সারা পৃথিবীর লোক একসময় বিশ্বাস করত পৃথিবী চ্যাপ্টা? যদি অন্ধবিশ্বাস যদি র‌্যান্ডম হয়, তাহলে তো অন্তত, সংখ্যালঘু কিছু গোষ্ঠী পাওয়া যাবার কথা যারা বিশ্বাস করবে পৃথিবী গোল বা নিদেনপক্ষে পৃথিবী ঘনক-আকৃতির। কেন তা হয় না?

আসলে অন্ধবিশ্বাসকে আমরা যতটা অন্ধ ভাবি, ততটা অন্ধ এই বিশ্বাস নয়। এও কিছু একটা ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে ও কোনো নির্দিষ্ট ভাবে গঠিত হয় – যার ফলে সারা পৃথিবীর মানবজাতির বিভিন্ন তথাকথিত অন্ধবিশ্বাসের মধ্যে অদ্ভূত সাদৃশ্য পাওয়া যায়। অন্ধবিশ্বাস কি তাহলে মানবমনে প্রোথিত কিছু নিয়মের থেকে সৃষ্টি? অথবা আমাদের মানসিকতার কোনো দুর্বল প্রান্তে এর উৎপত্তি?

আংশিক উত্তর পাওয়া যায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান-শিক্ষকদের মতামতে। তাদের মতে শিশুদের বিজ্ঞানশিক্ষার পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হল শিশু-মানসিকতা। বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানশিক্ষা পাবার আগেই শিশুরা প্রকৃতি ও সমাজ সম্পর্কে কিছু কিছু ধারণা পেতে শুরু করে। সামাজিক ধারণার মধ্যে পড়ে তাদের বাবা-মা ও নিকটাত্মীয়দের চিনে ফেলা। আর প্রাকৃতিক ধারণার মধ্যে পড়ে সাধারণ অভিজ্ঞতালব্ধ ধারণা – “বস্তু ওপর থেকে নিচে পড়ে” বা “ওপর থেকে নিচে পড়লে ব্যাথা লাগে”। তাই শিশুদের বিজ্ঞান শেখাতে গেলে তারা যা জেনে বসে আছে দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকে, তার বিরুদ্ধে যেতে হয় অনেকসময়। যেমন ধরা যাক, বাচ্চারা দেখেছে যে “বস্তু ওপর থেকে নিচে পড়ে”। তাই তাদের যদি বলা হয় যে পৃথিবী গোল, তাহলে তারা প্রতিবাদ করবে। জিজ্ঞাসা করবে – তাহলে নিচের দিকে থাকা মানুষেরা পড়ে যায়না কেন? স্বভাবতই, সংগঠিত বিজ্ঞানশিক্ষা না পেলে শিশুমস্তিষ্কে চ্যাপ্টা পৃথিবীর ধারণাই স্বাভাবিক বলে মনে হবে।

মাইকেল ম্যাকলস্কি নামে জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কগনিটিভ সায়েন্স-এর অধ্যাপক সম্প্রতি আমেরিকায় সাধারণ ছাত্রদের ওপর কিছু সমীক্ষা চালিয়েছিলেন। তার সমীক্ষার ক্ষেত্র ছিল বস্তুর গতির নিয়মাবলী – যার পর্যবেক্ষণলব্ধ অভিজ্ঞতা সাধারণ সারাজীবন ধরে সংগৃহিত হয় আবার তত্ত্বগত ভাবেও এর সাথে সকলে সাধারণভাবে পরিচিত। তার মূল আগ্রহ ছিল – এই তত্ত্বগত ব্যাখ্যা মানুষ কতটা আত্মস্থ করতে পারে – নাকি তত্ত্বের শিক্ষা বইয়ের পাতাতেই থেকে যায়। তাই তিনি, কিছু ছবি এঁকে বিভিন্ন অবস্থায় বস্তুর গতিরেখা কেমন হবে তা জানতে চাইলেন। যেমন ধরা যাক, গতিশীল একটা উড়োজাহাজ থেকে ফেলা একটা বল কি ভাবে মাটিতে পড়বে? অধিকাংশ ছাত্রের মতে সেটা পড়বে সোজা – সরলরৈখিক গতিতে। একটা চক্রাকারে বাঁকানো নল থেকে একটা গতিশীল বল বেরিয়ে এলে তার গতিরেখা কি হবে? আবার অধিকাংশ ছাত্রের মতে সেটা চক্রাকারে বেরোবে। বলাই বাহুল্য যে সাধারণ ছাত্ররা এই ধরণের গতিপথ দৈনন্দিন জীবনে চোখে দেখেনি। কিন্তু অন্যদিকে, যেখানে সরাসরি পর্যবেক্ষণলব্ধ অভিজ্ঞতা উপস্থিত, সেখানে ছাত্ররা সঠিক উত্তর দিয়েছে। যেমন, একটা চক্রাকারে বাঁকানো হোসপাইপ থেকে জল যে চক্রাকারে বেরোয় না – বেরোয় সরলরৈখিক গতিতে – তা প্রায় সকলেই সঠিকভাবে বলেছে। তাহলে মোটকথা হল, যা আমাদের সরাসরি পর্যবেক্ষণলব্ধ জ্ঞানের মধ্যে আসে তা আমরা স্মৃতির মাধ্যমে ধরে রাখি। আর যা আসে না, সেই ক্ষেত্রেও আমরা আমাদের পর্যবেক্ষণলব্ধ জ্ঞানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সাধারণ তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি। কয়েকটি সাধারণ পর্যবেক্ষণলব্ধ জ্ঞান ও ধারণাকে একত্রিত করে সরলীকরণের প্রচেষ্টা করি। অন্ধবিশ্বাসের উৎপত্তি এই অতি-সরলীকরণের চেষ্টা থেকেই।

সাধারণ মানুষের কাছে দুভাবে কোনো প্রাকৃতিক ঘটনার ব্যাখ্যা আসে – প্রথমত, দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকে, দ্বিতীয়ত বইতে পড়া বিজ্ঞান থেকে। উভয়ের সংমিশ্রণে ও মিলিত প্রচেষ্টায় বিজ্ঞান-মানসিকতার জন্ম মানবমনে। দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব অনেকসময়েই ভুল, তাই বিজ্ঞানশিক্ষার একটা অন্যতম অঙ্গ হল বিভিন্নভাবে ও বিভিন্ন দৃষ্টিকোণে চিন্তা করতে শেখানো। যাতে এই সহজাত তত্ত্ব বিকশিত হবার আগেই তার বিরুদ্ধে অসংখ্য প্রশ্ন জেগে উঠতে পারে ও সঠিক তত্ত্ব মস্তিষ্কে স্থান পেতে পারে। আমাদের অন্ধবিশ্বাস হল একেকটি সহজাত তত্ত্ব। সাধারণভাবে, হোমো সেপিয়েন্সরূপী মানুষে-মানুষে খুব একটা পার্থক্য তো নেই, তাই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের মনে একই ধরণের তত্ত্বের উদ্ভব ঘটেছে – আদি গণতান্ত্রিক সমাজ সেই সহজাত প্রাকৃতিক তত্ত্বকেই গ্রহণ করেছে – সৃষ্টি হয়েছে অন্ধবিশ্বাস।

এতো গেল সহজাত প্রাকৃতিক তত্ত্বের কথা। একইভাবে সহজাত সামাজিক তত্ত্বের সংখ্যা কম নয়। শিশুরা খুব দ্রুত বুঝে নেয় (বা শিশু-মানসিকতায় জিনগতভাবে প্রোথিত থাকে) যে তাদের সমবয়সীদের তুলনায় বড়দের জ্ঞান বেশী। তাই কোনো ক্লাসমেট তাদের যদি নতুন কোনো বিষয়ে তথ্য দেয়, তারা চেষ্টা করে সেটা বড়দের কাছে মিলিয়ে নিয়ে নিশ্চিত হতে। শুধু তাই নয়, বড়দের মধ্যেও তারা শ্রেণীবিভাগ করে নেয় – শিক্ষক বা বাবা-মা তার কাছে যতটা গুরুত্ব পায়, এক নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীও হয়ত ততটা পায় না। আবার স্কুলে যদি বিবর্তনতত্ত্ব পড়ানো হয়, আর বাড়িতে বাবা-মা তার বিরোধিতা করেন, তাহলে অধিকাংশ শিশু বিবর্তনবাদে অবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। এরকম সামাজিক অপরীক্ষিত তত্ত্ব মানবমনে দিনের পর দিন বেড়ে চলে – দখল করে রাজনৈতিক বা দার্শনিক মানসিকতার ক্ষেত্রও। ছোটোবেলায় যেমন তথ্যের উৎস হিসাবে তারা বাবা-মায়ের ওপর ভরসা করে, বড় হলে সংবাদ-পত্র বা টিভি শো-কে সেই একইভাবে বিশ্বাসী উৎস হিসাবে গণ্য করে। এগুলোও একইরকম অন্ধবিশ্বাস। এর পেছনেও আছে আমাদের জটিল সমাজের কার্যকারণের সরলীকরণের প্রচেষ্টা।

মানুষের এই সহজাত সরলীকরণের বা তত্ত্বীয়করণের প্রচেষ্টা ব্যাখ্যা করা যায় মানব-বিবর্তনের ধাপগুলোর সাহায্যে। চিন্তাশক্তি বিকশিত হবার পরে, এই সরলীকরণের ক্ষমতাই মানুষকে অন্য প্রাণীর থেকে আলাদা করেছিল। আর সব প্রাণী যেখানে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ব্যতিরেকে অচল, সেখানে মানুষ প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে তত্ত্ব গঠনে সক্ষম ছিল। মানুষ চিন্তা করতে পারত উচ্চতর মাত্রায়। সাধারণ একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। টোপ ফেলে শিকার ধরা ছিল শিকারী আদিম মানুষের অন্যতম বিশেষত্ব। মানুষ দেখেছে যে পশুরাও তাদের মতই খাবার দেখলে এগিয়ে যায়। তা থেকে তত্ত্বীয়করণ হয়েছে যে – যেকোনো পশুই খাবার দেখলে খাবারের দিকে ছুটে আসবে। তখন শিকার করাও সহজ হবে। সহজাত তত্ত্বীয়করণের ক্ষমতা এক মানুষকে অন্যের থেকে বাঁচার সুবিধা দিয়েছে বেশী করে, তার ফলে এই ক্ষমতা বর্তমান মানবজাতির মধ্যে সর্বজনীন রূপ লাভ করেছে।

দেরীতে হলেও আমার ধারণা মানবসমাজ তত্ত্বীয়করণের সীমাবদ্ধতা বুঝেছে। মূল সীমাবদ্ধতা হল, তত্ত্ব নির্ভর করে পর্যবেক্ষণের বিস্তারের ওপর। তত্ত্বের বিস্তার যে পর্যবেক্ষণের বিস্তারের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল তার খুব ভাল একটা সামাজিক উদাহরণ হল রেসিজম বা জাতিবিদ্দ্বেষ – যার মূলে আছে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি গোষ্ঠীর একে অপরের ক্ষেত্রে অজ্ঞানতা। গত কয়েক শতকে বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতির মূলেও আছে পর্যবেক্ষণের বিস্তারে উন্নতি – একের পরে এক যন্ত্রের আবিষ্কার। আর সেখানেই শুরু হয় অন্ধবিশ্বাসের সাথে বিজ্ঞানের লড়াই। অন্ধবিশ্বাস যেখানে সাধারণ মানুষকে সাধারণ বিস্তারের পর্যবেক্ষণ থেকে প্রাপ্ত সহজাত তত্ত্বে আবিষ্ট রাখে, সেখানে বিজ্ঞান সেই বিস্তার ক্রমাগত বাড়িয়ে চলে। যেহেতু মানব-প্রবৃত্তির মধ্যে এই তত্ত্বীয়করণের প্রবণতা সহজাত, তাই ভবিষ্যতেও এই লড়াই থামার নয়। হয়ত ধর্মের জায়গা নেবে আরো অন্য কোনো সরলীকৃত তত্ত্ব, যার সাথে লড়াই হবে প্রকৃত বিজ্ঞানের। আজকের বিজ্ঞান আর অন্ধবিশ্বাসের লড়াই তাই আসলে সহজাত তত্ত্ব বনাম বিস্তৃত পর্যবেক্ষণলব্ধ তত্ত্বের যুদ্ধ – এর কোনো শেষ নেই।