অ্যাডাম স্মিথের দৃষ্টিতে উপনিবেশ-অর্থনীতি

ডিসেম্বর 25, 2012

ঔপনিবেশিকতা নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে দেখলাম বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথের বই দ্য ওয়েলথ অব নেশনশে (১৭৭৬) ঔপনিবেশিকতা ও তার অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা আছে। অ্যাডাম স্মিথের লেখা বইটিকে আধুনিক অর্থনীতির জনক বলা যায়। বইতে কলো্নী সংক্রান্ত অর্থনীতি নিয়ে আলোচনার সময় মাথায় রাখা দরকার যে অ্যাডাম স্মিথ ঔপনিবেশিকতার তীব্র বিরোধী ছিলেন। কিন্তু তার বিরোধিতা মানবিকতা বা অধিকারের প্রশ্নে নয়, নিতান্তই অর্থনীতির প্রশ্নে। যদিও তার বইতে তিনি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীকে বরাবর দায়ী করেছেন বাংলার দুরাবস্থার জন্য, কিন্তু তার অর্থনীতির ফোকাস থেকে সরে যান নি। তিনি বইতে দেখানোর চেষ্টা করেছেন ঔপনিবেশিকের জন্যও কলোনী-ব্যবস্থা লাভজনক নয় ও দীর্ঘমেয়াদে যে দেশগুলো ঔপনিবেশিক হবে না, তারা অন্যেদের থেকে অর্থনৈতিকভাবে অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে।

উপনিবেশের সাথে ইউরোপের ব্যবসা দু’ভাবে দেখছেন স্মিথ। প্রথমটা শুধুমাত্র ব্যবসার সম্পর্ক – যাতে ইউরোপীয়রা লাভ করছে। বর্তমান উপনিবেশেরা কেউই খুব একটা শিল্পোন্নত নয়, তাই সেই দেশগুলো থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করা ও শিল্পজাত পণ্য বিক্রি করার কাজটা ইউরোপীয়রা ভাল-ভাবেই করছে। এই ব্যবসায় লাভ এতটাই হচ্ছে যে তার ফলে মুদ্রার অপর পিঠ দেখা হচ্ছে না। মুদ্রার অপর পিঠ ক্ষতিকর – সেটা হল একচেটিয়া বাণিজ্য। একচেটিয়া বাণিজ্য ঔপনিবেশিকের জন্য ক্ষতিকর। কারণ কি?

স্মিথের মতে ঔপনিবেশিকেরা একে অপরের সাথে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এই একচেটিয়া বাণিজ্যের সুবিধাটুকু হারিয়ে ফেলে। ইংল্যন্ডের পক্ষে তুলো আনা সহজ বলে ইংল্যান্ড টেক্সটাইলের ক্ষেত্রে বেশী দাম চাইতে যেমন পারে, তেমন ইন্দোনেশিয়ার মালিক ডাচেরা মশলার জন্য বেশী দাম চাইছে। উভয়ের কারও সকল সম্পত্তির ওপর যেহেতু অধিকার নেই, তাই স্থানীয় ভোগের ক্ষেত্রে ছাড়া ইউরোপে রপ্তানীর ক্ষেত্রে লাভ-লোকসান মোটের ওপর শূন্যে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। এ তো গেল প্রথম সমস্যা। এর পরের সমস্যা হল শিফট অব ক্যাপিটাল বা মূলধনের সরণ। স্মিথের মতে মূলধনের স্বভাবই হল কম লাভজনক ব্যবসা থেকে সরে বেশী লাভজনক ব্যবসায় চলে যাওয়া। ঔপনিবেশিকের ঘরোয়া বাজারের মূলধন ইউরোপীয় বাণিজ্য থেকে সরে কলোনী বাণিজ্যে চলে যাবে – যা দীর্ঘমেয়াদে দেশকে ইউরোপীয় বাণিজ্যে দুর্বল করে দেবে। যদি ভবিষ্যতে কখনো কলোনী-বাণিজ্য অনিশ্চিত হয়ে পড়ে তাহলে ঔপনিবেশিকের অনেক পরিশ্রম করে গড়ে তোলা কলোনী বাণিজ্য থেকে মূলধন আবার সরিয়ে আনা শক্ত হবে। এই একচেটিয়া বাণিজ্য বিষয়ে স্মিথের একটা পর্যবেক্ষণ ও একটা ভবিষ্যতবাণীর উল্লেখ না করে পারছি না। স্মিথের মতে ইউরোপে নৌশক্তি ও ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে অগ্রণী ছিল স্পেন ও পর্তুগাল। সেইমত তারাই প্রথম কলোনী-বাণিজ্যে নামে। কিন্তু স্মিথের মতে, দক্ষিণ আমেরিকাকে কলোনী বানাবার পরে এই দুই দেশের বাণিজ্য এদের উপনিবেশের পথ ধরে মূলত কৃষিভিত্তিক হয়ে পড়ে। তাই ধীরে ধীরে তাদের ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প মার খাবে ও ফলশ্রুতিতে নৌশক্তিও দুর্বল হয়ে পড়বে। অন্যদিকে গরিব ডেনমার্ক (তৎকালীন ডেনমার্ক ও নরওয়ে) বা সুইডেন (বর্তমানের সুইডেন ও ফিনল্যান্ড) – যাদের অর্থনীতি বাকিদের তুলনায় দুর্বল বা জার্মানী – যার নৌশক্তি সীমিত – তারা তাদের মূলধনের সর্বোত্তম ব্যবহারে (ইউরোপমুখী বাণিজ্য) মনোযোগ দেবে ও কখনও কলোনী বাণিজ্য বিপন্ন হলে এরা ঔপনিবেশিকদের তুলনায় অনেক দ্রুত উন্নতি করবে।

আমি ১৮৭০ সালে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মাথাপিছু গড় আয়ের সাথে বর্তমানের বিভিন্ন দেশের গড় আয়ের একটা তুলনা দিলাম। তালিকা (ব্র্যাকেটে র‌্যাঙ্ক) থেকে স্পষ্ট, স্পেন ও পর্তুগাল তাদের প্রাথমিক ঔপনিবেশিক সুবিধা হারিয়েছে সেই উনিশ শতকের গোড়ায় লাতিন আমেরিকার ওপর থেকে দখল উঠে যাওয়ায়। ব্রিটেন, ফ্রান্স ও হল্যান্ড আছে মাঝে আর ওপরে আছে সুইডেন, নরওয়ে ও ডেনমার্ক – ঠিক যেমনটা বলেছিলেন স্মিথ। জার্মানীর ক্ষেত্রে বিষয়টা ততটা খাটে নি, হয়ত পূর্ব-জার্মানীর কারণে। ১৭৭৬ সালে বসে উপনিবেশ-উত্তর পৃথিবীর অর্থনীতি সম্পর্কে ভবিষ্যতবাণী করার মত একটা শক্ত পরীক্ষায় স্মিথ উত্তীর্ণ। আগের লেখায় আমি দেখিয়েছিলাম উপনিবেশ-উত্তর যুগে উপনিবেশগুলোর তুলনায় ঔপনিবেশিকেরা অনেক দ্রুত উন্নতি করেছে। আসলে, যারা উপনিবেশ-ব্যবসায় নামে নি অথচ মুক্ত-বাণিজ্যে নাম লিখিয়েছে, তারা আরও তাড়াতাড়ি উন্নতি করেছে।

ব্রিটেন – ৩১৯০(১), ৩৭৭৮০(৭)
স্পেন – ১২০৭(৭), ৩০৯০০(৮)
পর্তুগাল – ৯৭৫(৯), ২১২৫০(৯)
ডেনমার্ক – ২০০৩(৩), ৬০৩৯০(২)
নরওয়ে – ১৩৬০(৬), ৮৮৮৯০(১)
সুইডেন – ১৬৬২(৫), ৫৩২৩০(৩)
নেদারল্যান্ডস – ২৭৫৭(২), ৪৯৭৩০(৪)
ফিনল্যান্ড – ১১৪০(৮), ৪৮৪২০(৫)
জার্মানী – ১৮৩৯(৪), ৪৩৯৮০(৬)

তবে এ সব সত্ত্বেও স্মিথ বলেছেন, একচেটিয়া বাণিজ্যের ফলে আপেক্ষিক ক্ষতির তুলনায় হয়ত বর্তমান কলোনী-বাণিজ্য বস্তুটা বেশী লাভজনক। কিন্তু আসল লোকসান অন্যখানে। এই একচেটিয়া বাণিজ্য চালিয়ে যেতে গেলে যে সামরিক শক্তিতে যে পরিমাণ বিনিয়োগ করতে হয় সেই খরচা একচেটিয়া বাণিজ্য থেকে আসা লাভের তুলনায় অনেক বেশী। ১৭৩৯ সালে শুরু হওয়া ইঙ্গ-স্প্যানিশ যুদ্ধের উদাহরণ টেনে বলেছেন – এটা যেন গুপ্তধনের সন্ধান পাওয়া দুইদল দস্যুর লড়াই। লড়াই শেষে উভয়েই ভাগ-বাঁটোয়ারায় সম্মত হল বটে – কিন্তু ততক্ষণে তাদের অনেক শক্তিক্ষয় হয়েই গেছে। মুক্ত-বাণিজ্যের পরিবর্তে একচেটিয়া বাণিজ্যে যে বাড়তি লাভ হচ্ছে তার থেকে অনেক বেশীই ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে সাম্রাজ্য বজায় রাখতে। এরপরে উপনিবেশগুলো চিরকাল ঔপনিবেশিক শাসন মেনে নেবে এমনটা ভাবারও কোনো কারণ নেই, তাদের স্বাধীনতা ঘোষণার সাথেই ঔপনিবেশিকদের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হবে। শুধু এখানেই শেষ না, এই বাড়তি সামরিক শক্তি ও সাম্রাজ্য বজায় রাখতে যে দক্ষ মানব-সম্পদ ব্যবহার হচ্ছে তারা অন্য কোনো অধিকতর উৎপাদনশীল খাতে (স্মিথের মতে ম্যানুফ্যাকচারিং) সময় বিনিয়োগ করতে পারত। সবশেষে, একচেটিয়া বাণিজ্য ও তার নিমিত্ত সামরিক শক্তি – এই দুই খাতে বেশী মনোযোগী হওয়ায় সরকারের পক্ষে নাগরিকদের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার দিকে নজর দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না। লবি অব শপ-কিপার্স কার্যত সরকার চালাচ্ছে – দেশের অন্যান্য শ্রেণীর মানুষ সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

ঔপনিবেশিকতার ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরার পরেও স্মিথের ব্যাখ্যা থেমে থাকে নি। ইংল্যান্ড কি তাহলে উপনিবেশগুলোকে স্বাধীন করে দেবে? স্মিথ বলেছেন – ব্যাপারটা অত সহজ না। কার্যত এটাই আদর্শ হলেও ইতিহাসে কোনো দেশই স্বেচ্ছায় কোনো দেশই সূচ্যাগ্র মেদিনীও ছেড়ে দেয় নি, তার জন্য যত ক্ষতি বা কষ্টই স্বীকার করতে হোক না কেন। কারণ এই বিষয়টা দেশের গৌরবের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত আছে, আর সাধারণ মানুষ চাইলেও দেশের শাসক শ্রেণীর কাছে দেশের গৌরব বিষয়টার মূল্য অপরিসীম। আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধিতেও বুঝেছি যে সাম্রাজ্যবাদের মূলকথা আসলে এইখানেই। নিজের অধীনস্থ মানুষ বা অঞ্চলের পরিমাপের মাধ্যমে মানুষের শূন্য আত্মগৌরবের জন্ম, যা বিবর্তনীয় ইতিহাসের পথে অন্যান্য জীবের মধ্যেও পরিলক্ষিত হয়। এর সন্ধানেই সাম্রাজ্যবাদের পেছনে ছোটে দেশ, শাসক বা রাষ্ট্র – তাতে দেশের লাভ হতে পারে, লোকসানও হতে পারে।

মুক্তবাণিজ্যের সমর্থক স্মিথ এরপরে বর্ণনা দিয়েছেন কি ভাবে উপনিবেশের সাথে সুসম্পর্ক রেখে শুধু মুক্ত-বাণিজ্য চালানোই দেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত। ট্যাক্স-অনুপাতে ভোটাধিকার দিয়ে একটা আন্তর্জাতিক পার্লামেন্ট তৈরীর প্রস্তাবও আছে। সবেমিলে, স্মিথের লেখায় আমি এমন অনেক সামগ্রী পেলাম যা ১৭৭৬ সালে লেখা কোনো বইতে পাব বলে ভেবে দেখিনি। আগ্রহী পাঠকেরা বইটার ফ্রি-পিডিএফ ভার্সান, সংক্ষেপিত যে কোনো ভার্সান বা ওই সংক্রান্ত আর্টিকেল পড়ে দেখতে পারেন। অর্থনীতি নিয়ে বিন্দুমাত্র আগ্রহ থাকলে বলেই দিতে পারি – হতাশ হবেন না।

পড়ে দেখতে পারেন -
১) বইটার পিডিএফ
২) সাম্রাজ্যবাদ দিয়ে লেখার সংক্ষেপ
৩) ইউরোপের কিছু দেশের মাথাপিছু আয়ের গুগল-চার্ট

ফুরান্তিস বনাম অফুরান্তিস

ডিসেম্বর 25, 2012

পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে – এরকম প্রেডিকশন বোধহয় একমাত্র মায়া-সভ্যতার অবদান নয়। আদি-অনন্তকাল ধরেই ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় বিভিন্ন সভ্যতায় এই ভবিষ্যতবাণী ব্যবহার হয়ে আসছে। মানব-সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবার কথা আসে ঐ হাত ধরেই। তবে আজকাল বিজ্ঞানীরাও মাঝে মাঝে বলেন অমুক সালে অমুক জায়গায় দু’চারটে উল্কা পড়ে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। কিন্তু যখন একজন অর্থনীতিবিদ বা সমাজ-বিজ্ঞানী বলেন সভ্যতার শেষের কথা তখন তিনি ঠিক কি বোঝাতে চান?

পৃথিবীর সম্পদ সীমিত অথচ মানুষের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। এর ওপর ভিত্তি করে এক শ্রেণীর অর্থনীতিবিদ অনেকদিন ধরেই বলে আসছেন যে একটা সময় আসন্ন যখন অর্থনীতির “গ্রোথ” ঋণাত্ত্বক হয়ে যাবে – অর্থাৎ জীবনযাত্রার মান আর বাড়বে না। এই যেমন এখন চারদিকে নতুন নতুন বাড়ি-ব্রিজ-রাস্তা হচ্ছে – তেমনটা আর থাকবে না। আমি এই অর্থনীতিবিদদের দলটাকে নাম দিই ফুরান্তিস – মানে সবকিছু ফুরিয়ে যাবে, এরকমটাই তাদের মত।

অন্য আরেকটা দল আছে যাদের বক্তব্য মানব-সভ্যতার এই ক্রমোন্নতি অবশ্যম্ভাবী। স্বাভাবিক পৃথিবীতে মানুষ ঠিকই তার উন্নতির পথ খুঁজে নেবে। যদি কিছু ফুরিয়ে যায় তার বিকল্প বের করবে, বিকল্প দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়লে অন্য কোনো পথে সেই সামগ্রীর ব্যবহার বন্ধ করে দেবে, তাও আদম্য মানুষ ফিরে তাকাবে না। মানবসভ্যতার ইতিহাস থেকে আজ অবধি দেখলে এই কর্নুকোপিয়ানদের মতামতই সঠিক বলে মনে হয়। এদের নাম দিই অফুরান্তিস – মানে কিছুই ফুরাবার নয়, ভাবখানা এমন।

ফুরান্তিস দলের কর্ণধার হলেন ম্যালথাস। ম্যালথাস সেই ১৭৯৮ সালেই একটা মারাত্মক বই লিখে তখনকার সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাতে তিনি দেখিয়েছিলেন জনসংখ্যার বৃদ্ধির প্রবণতা এক্সপোনেন্সিয়াল অথচ খাদ্য ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের সরবরাহ কেবলমাত্র লিনিয়ার-গ্রোথ পেতে পারে। অর্থাৎ, কোনো সমৃদ্ধির সময়ে জনসংখ্যা কিছুদিন বাড়ার পরেই খাদ্যে ঘাটতি দেখা যাবে – সমৃদ্ধির সময়ের পরেই আসবে দুর্ভিক্ষ, বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধ আর মোটের ওপর ঋণাত্ত্বক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। ম্যালথাসের নাম থেকে এই বিশেষ সময়ের নাম দেওয়া হয় ম্যালথাসিয়ান ক্যাটাস্ট্রফি

ফুরান্তিসদের বিশেষ বাড়বাড়ন্ত শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে। এই সময়ে জন্মহার কমলেও মৃত্যুর হার তার থেকেও বেশী হারে কমে যাওয়ায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বাড়তে থাকে। পল এল্রিচ ও তার সহযোগী সিয়েরা ক্লাব ছিলেন এই দলের মানুষ। তার বইতে তিনি দাবী জানান যে সত্তরের দশকেই উন্নয়নশীল বিশ্ব দুর্ভিক্ষের পর দুর্ভিক্ষে উজার হয়ে যাবে , কারণ ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সাথে তাল মিলিয়ে সম্পদের জোগান দেওয়া ধরিত্রীর পক্ষে অসম্ভব। এই অবস্থার উন্নতির জন্য তিনি আবার কিছু নীতি-প্রবর্তনের দাবীও জানিয়েছিলেন। তবে বলাই বাহুল্য তার এইসব ভবিষ্যতবাণীর কোনোটাই ফলে নি। ২০০৯ সালে একটি সাক্ষাতকারে তাকে যখন প্রশ্ন করা হয়, উনি বলেন ওনার উদ্দেশ্য ছিল মানবজাতিকে সতর্ক করে দেওয়া এবং উনি তাতে সফল। বর্ধিত সতর্কতার কারণেই এই যাত্রায় প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করে সভ্যতা গণ-মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়ে গেছে।

তবে ফুরান্তিসদের মধ্যে সবথেকে স্টার হলেন ক্লাব অফ রোম। চার গবেষকের একটি দল ১৯৭২ সালে এম আই টি-র ল্যাবে পাঁচ প্যারামিটারের সিমুলেশন চালিয়ে দাবী জানান ২০১২-২০২০ সাল নাগাদ কোনো এক সময়ে আমাদের অর্থনৈতিক স্থিতি একটা এমন অবস্থায় পৌঁছবে যেখান থেকে আর বৃদ্ধি সম্ভব না। যে পাঁচটি প্যারামিটার এই ক্লাব অব রোম তাদের সিমুলেশনের জন্য ব্যবহার করেছিলেন সেগুলো হল – জনসংখ্যা, শিল্পায়ণ, দূষণ, খাদ্য উৎপাদন ও প্রাকৃতিক সম্পদের আহরণ মাত্রা। সিমুলেশনে দেখা যায় প্রাথমিকভাবে এই সব প্যারামিটারই ক্রমবর্ধমান কারণ একে অন্যের সাথে সম্পর্কিত। এইভাবে, একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় পৌঁছনর পরেই শুরু হয় ভাঙণ। ক্লাব অব রোম এই বিষয়ে প্রথম জনসমক্ষে প্রকাশ করেন লিমিটস-টু-গ্রোথ নামে একটি বইয়ে। । ২০০৩ সালে প্রকাশিত একটি আপডেটে দেখা যায় ১৯৭২-২০০২ অবধি এই পাঁচটি প্যারামিটারের পরিবর্তন হয়েছে ১৯৭২ সালে তাদের ভবিষ্যতবাণী যেমন হয়েছিল – ঠিক সেইভাবে। অর্থাৎ আমরা এগিয়ে যাচ্ছি হয়ত সেই ভাঙণের পথেই। তবে তারা এও যুক্ত করেন যে প্রযুক্তির অভূতপূর্ব বিকাশের ফলে তাদের সিমুলেশনে বর্ণিত ভাঙণ হয়ত আরেকটু দেরীতে (২১ শতকের শেষের দিকে) আসবে।

অনেক তো বললাম ফুরান্তিসদের কথা, এখন বলা যাক অফুরান্তিসদের কথা। আরবানা-শ্যাম্পেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জুলিয়ান সাইমন আবার বলেন যে জনসংখ্যাকে বোঝা হিসাবে দেখার ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভুল। বাড়তি জনসংখ্যা আদপে প্রযুক্তিগত উন্নয়নে সাহায্য করে। আর বাজার অর্থনীতি এমনভাবে চলে যাতে কোনো দামী জিনিসের বিকল্প সস্তা কিছু বের করতে পারলে দুয়ের দামই পড়ে যায়। ব্যাখ্যাটা অনেকটা এরকম -

“জনসংখ্যা ও আয়ের বৃদ্ধি সীমিত সময়ের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদের চাহিদা বৃদ্ধি করে দাম বাড়িয়ে দেয়। এই বাড়তি দাম ব্যবসায়ী আর আবিষ্কারকদের কাছে ইনসেন্টিভ হিসাবে কাজ করে। তারা সবাই সমাধান খোঁজার কাজে সময় ও অর্থ বিনিয়োগ করে। এদের অধিকাংশই ব্যর্থ হলেও, শেষমেষ কেউ না কেউ বিকল্প কিছু একটা বের করে ফেলে। দীর্ঘমেয়াদে বিকল্প আসায় দাম আবার আগের স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে যায়।” 

 

শেষ করার আগে এই সাইমন আর এল্রিচের একটা বিবাদের কথা না বলে পারছি না। এল্রিচের দাবী প্রাকৃতিক সম্পদের দাম বাড়তেই থাকবে, কারণ বর্ধিত জনসংখ্যার চাপ। সাইমনের বক্তব্য দাম বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে তা স্থিতিশীল হয়ে যাবে। এই নিয়ে ১৯৮০ সালে সাইমন আর এল্রিচ একটা বেটিং করেন। এল্রিচের পছন্দমত পাঁচটি খনিজ দ্রব্যের (ক্রোমিয়াম, কপার, নিকেল, টিন ও টাংস্টেন) দাম দশ বছর পরে কত দাঁড়ায় তা দেখা হবে। এই দশ বছরে যদি দাম বেড়ে যায় তাহলে সাইমন এল্রিচকে বর্ধিত দামের সমানুপাতে “ক্ষতিপূরণ” দেবেন। উলটো হলে এল্রিচ দেবেন সাইমনকে। দশকের শেষে দেখা গেল সবাইকে অবাক করে শেষ হাসি হেসেছেন সাইমন, উনি পকেটস্থ করলেন ৫৭৬ ডলার। ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ এর মধ্যে পৃথিবীর জনসংখ্যা বেড়েছিল ৮০০ মিলিয়ন। অথচ পাঁচটি অবশ্য প্রয়োজনীয় খনিজের দাম গড়ে বাড়ল না। পাঁচটির প্রত্যেকটিই দামে কমে গেল। এবং সাইমনের কথাই সত্যি হল। ১৯৮০ সালে বসে যে কেউ হয়ত বলে দিতে পারত কপারের দাম এক দশক পরে বেড়ে যাবে, কারণ তখন কমিউনিকেশন নেট-ওয়ার্কের জন্য অবশ্য-প্রয়োজনীয় ছিল কপার। কিন্তু সেই দশকের মাঝে একবার অপটিক ফাইবার নেটওয়ার্ক বাজারে চলে আসার পরে আর কপারের প্রয়োজনীয়তা আগের মত রইল না। বাজারের চাহিদার সাথে দামও ঝটপট পড়ে গেল।

জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিষয়ক প্যানেলের মতে ২১ শতকে জনসংখ্যা “পিক” করবে, অর্থাৎ পরের শতাব্দীতে জনসংখ্যা কমতে থাকবে। তাছাড়া জনসংখ্যাকে এখন আর কেউ সেরকমভাবে “থ্রেট” বলে মনে করে না। এখন যখন খবরে মাঝে মাঝে পড়ি খনিজ তেল অর্থাৎ পেট্রোলিয়াম আর কত বছর পরে ফুরিয়ে যাবে তখন মনে হয় আমি কি জীবদ্দশায় পেট্রোলিয়াম-উত্তর যুগ দেখে যেতে পারব? ফুরান্তিস না অফুরান্তিস – কে হবেন জয়ী? খেয়াল রাখুন, ফুরান্তিসদের কিন্তু একবার জয়ই যথেষ্ট আর অন্যদিকে অফুরান্তিসদের জয়ী হতে হবে বারে বারে, মানবসভ্যতার উন্নয়নের পতাকা তুলে রাখতে।

উপনিবেশের পরে

ডিসেম্বর 25, 2012

দেশ থেকে বাইরে কাটিয়ে দিলাম দীর্ঘ সাড়ে চার বছর। মাঝে দেশে গেছি বার-দুয়েক। দেশেও উন্নতি হচ্ছে, বড় বড় বিল্ডিং হচ্ছে, চাকরি হচ্ছে রাস্তাঘাট হচ্ছে – দিনে দিনে দিন-বদলের ছোঁয়া দেখা যায়। ধানক্ষেত জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে হাউসিং ডেভেলপমেন্ট জোনের জন্য। কিছু পরিবর্তন আমেরিকাতেও হচ্ছে। মন্দার পরবর্তী রাস্তাঘাট মেরামতের কাজ এখন কমে আসছে, যত মন্দা কাটছে ততই বোঝা যাচ্ছে মন্দার পরবর্তী রিকভারি হয়ত তত চাকরি আনবে না বাজারে। হাউসিং বাবল বার্স্ট করার পরে দাম আবার বাড়া শুরু হয়েছে বটে কিন্তু বাবলের সময়ের দামের কাছাকাছি পর্যায়ে যেতেও এখনও অন্তত বছর পাঁচেক বাকি। তাও তফাৎ চোখে পড়ে। প্রথম বিশ্ব আর তৃতীয় বিশ্ব নামগুলো ঠিক কে কিভাবে দিয়েছিল জানি না, দেশে গেলেই দুই বিশ্বের তফাতের কথা ভালভাবে বোঝা যায়। একটা বছর তিনেকের শিশু দুয়েক দিনেই হয়ত বুঝে যায় পার্থক্যটা।

ছোটবেলায় ইতিহাস-সাহিত্য বা সমাজ-বিজ্ঞানের ক্লাসে একটা ব্যাপার আমাদের মাথায় খুব ভালভাবে গেঁথে দেবার একটা চেষ্টা করা হয়েছে। আমাদের, মানে যারা একদা উপনিবেশ ছিলাম, সেই দেশগুলোর স্বাধীনতার সময় থেকেই এই বিষয়ে সকলে একমত – অন্যের উপনিবেশে পরিণত না হলে হয়ত আমরাও এমন উন্নত দেশই হতাম। ইতিহাসে পড়েছি, ইউরোপিয়ান ঔপনিবেশিকদের আসার আগে আমরা যথেষ্ট ধনীই ছিলাম – ইউরোপীয়রা দেশে আসার জন্য ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্র পার হত। শ’-দুয়েক বছরের ঔপনিবেশিক ইতিহাস সব বদলে দিয়ে গেছে। উপনিবেশকালে আমাদের দেশগুলো থেকে কাঁচামাল নিয়ে গিয়ে ইউরোপে শিল্প-কারখানায় ব্যবহার করা হত, আমাদের ন্যায্য মূল্য দেওয়া হত না। আমাদের গর্বের ক্ষুদ্র-কুটীর শিল্প ধ্বংস হয়ে গেছে উপনিবেশ অবস্থায়, দেশের বাজার ছেয়ে গেছে বিদেশী পণ্য-সামগ্রীতে। ঔপনিবেশিক প্রভুদের কৃষি বা কৃষকের বিষয়ে গুরুত্ব ছিল না – তাই আমাদের একের পর এক দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে স্বাধীনতার পরে আমরা দ্রুত উন্নতি করা শুরু করি। খাদ্য-বিষয়ক নিরাপত্তা এসেছে, স্বাস্থ্য-শিক্ষা সবকিছুতেই ভুরিভুরি উন্নয়নের নিদর্শন আসে স্বাধীনতার পরে। আসলে জাতি হিসাবে আমরা উন্নতই, পুরোনো ট্র্যাকে ফিরে যেতে কিছু সময় লাগছে আর কি। এমনকি অমর্ত্য সেনের লেখা পড়েও সেইরকম মনে হয়।

ইতিহাস মিথ্যা বলে। ইতিহাস বইতে ইচ্ছামত লিখে পাবলিশ করে দেওয়া যায়। কিন্তু পরিসংখ্যান মিথ্যা বলে না। তাই আমি পরিসংখ্যান দিয়েই দেখার চেষ্টা করলাম সত্যি কি ঘটেছে উপনিবেশ আর ঔপনিবেশিকদের মধ্যে। সহজ সূত্রে যদি ধরেই নেওয়া যায় যে উপনিবেশের কাঁচামালের পয়সায় ঔপনিবেশিকদের এত রমরমা, তাহলে ধরেই নেওয়া যায় যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যখন উপনিবেশগুলো এক-ধাক্কায় স্বাধীনতা পেয়ে গেল, তখন ঔপনিবেশিকদের সর্বনাশ আর উপনিবেশদের রমরমা।

কিন্তু এই গ্রাফ থেকে দেখি পুরো তার উল্টোটাই ঘটে চলেছে। মাথাপিছু গড় আয় – যা কিনা ব্যবহারিক জীবনে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের অন্যতম নির্ণায়ক, তা ঔপনিবেশিক দেশগুলোতে ঊর্ধ্বমুখী। ক্রমাগত মাটি ঘেঁষে চলার পরে এই শতকের পরে উপনিবেশগুলোতে কিছুটা হলেও গড় আয়ে কিছুটা উন্নতি দেখা যায়। দুইয়ের মধ্যে ব্যবধান বেড়েই চলেছে – এমনকি গত দশকেও এই ব্যবধান প্রায় দেড়গুণ বেড়েছে। যদিও আমরা অনেক আন্দোলনের মাধ্যমে ঔপনিবেশিকদের কাছ থেকে স্বাধীনতা আদায় করেছি, কিন্তু ব্যর্থতার গ্রাফ দেখে মনে হয় ওদেরই আমাদের স্বাধীনতা যেচে দিয়ে দেওয়া উচিত ছিল।

তাহলে এবার আসা যাক আসল প্রশ্নটাতে। কেন এই গ্যাপ? কেন বছরের পর বছর এই গ্যাপ বেড়েই চলেছে। প্রথম বিশ্ব কেন প্রথম থেকে যাচ্ছে আর তৃতীয় কেন আরো বেশী করে তৃতীয় থেকে যাচ্ছে? কবে থেকে এই তফাৎ কমবে? আমার কাছে কিছু কিছু ভাসা ভাসা উত্তর আছে – কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই। কিছু ধারণা করা যায় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী প্রথম বিশ্বের রাজনৈতিক পটভূমিকা থেকে। ইউরোপীয়দের কাছে আর উপনিবেশ নেই, তাই গত কয়েক দশকের উপনিবেশ নিয়ে যুদ্ধের বাতাবরণও নেই। জার্মানী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দ্রুত উন্নতি করে, কিন্তু এবারে আর তা নিয়ে বাকি দেশগুলোর সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হয় নি। সার্বিকভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর প্রথম বিশ্বে দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্কের বহুল উন্নতি ঘটে, আগের অর্ধশতকের বৈরিতার ইতিহাস মাথায় রাখলে তা অভাবনীয় ধরে নেওয়া যায়। এর কিছুটা কারণ ঠান্ডা যুদ্ধ – অন্যটা পুঁজীর বিকাশ। সম্পর্কোন্নয়ন যদি প্রথম কারণ হয়ে থাকে, দ্বিতীয় কারণ অবশ্যই অর্থনীতির ধারা। কাঁচামালের ওপর নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ায় প্রথম বিশ্বের অর্থনীতি আরো বেশী করে টার্শিয়ারী খাতে (সার্ভিস, ব্যাঙ্কিং, অটোমেশন, গাড়ি – ইত্যাদি সেক্টর) নির্ভর করতে থাকে, যার ভিত্তি হিসাবে তাদের শিক্ষাব্যবস্থা আর উদ্ভাবনী ক্ষমতার কথা মাথায় আসে।

অন্যদিকে প্রাক্তন উপনিবেশগুলোতে শক্তিশালী জাতীয়তাবাদের যে ধাক্কায় স্বাধীনতা এসেছিল, তার হাত ধরে দেশগুলো ব্যবসা-অবান্ধব হয়ে ওঠে। সময়ের উপযোগি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার জায়গায় কৃষি বা ক্ষুদ্রশিল্পের পেছনে বিনিয়োগ করা হয় রাষ্ট্রিয় সম্পদ। বিদেশী বিনিয়োগ থেকে দক্ষতা – অনেক কিছুই বর্জন করা হয়। এর ওপর তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর নিজেরদের মধ্যেও সম্পর্কও ভাল ছিল না। সবের ফলে সার্বিকভাবেই পিছিয়ে পড়তে থাকে তৃতীয় বিশ্ব – এবার আর পরাধীনতার কারণে নয়, নিজেদের ব্যর্থতায়। তবে সামাজিক পরিকাঠামোর উন্নয়নের ফলে ও বিজ্ঞানের সার্বিক অগ্রগতির কারণে স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মানে উন্নতি ঘটে – যার কিছুটা হলেও ফল উন্নয়নশীল দেশগুলো ভোগ করছে শেষ দশকে।

ইতিহাসে ফিরে গেলে কি মনে হয় আরো আগে স্বাধীনতা পেলে বা একেবারেই পরাধীন না হলে কি আমরা আরো ভাল থাকতাম? আমি এ নিয়ে সংশয়বাদী। আজ থেকে প্রায় শ’দেড়েক বছর আগে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের দিকে ফিরে তাকালে দেখি ভারতীয়রা তখন মুঘল বা মারাঠা রাজাদের পুনরায় মসনদে বসানোর জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু এর পেছনে কোনও আধুনিক রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নেই। মুঘল বাদশা’র ফরমান বা নানাসাহেবের বক্তব্যে যতটা ইংরেজ বিতাড়নের চেষ্টা আছে তার সিকিভাগও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা বা সংবিধান লেখার প্রচেষ্টা নেই। এর সাথে প্রায় আট দশক আগের আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণা দেখলে মনে হয় ১৮৫৭ সালেও ভারত বা ভারতীয়রা প্রস্তরযুগেই পড়ে ছিল। ওই সমসামিয়িক মার্কিণ কোর্ট তখন পেটেন্টের নন-অবভিয়াসনেস নিয়ে আলোচনা করছে। চার্লস ডারউইন বিবর্তন নিয়ে মানব-সমাজের গঠনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। আরও পিছিয়ে ভারতীয় ঐতিহাসিকদের প্রিয় মুঘল বাদশা আকবরের আমলে যদি ফিরে যাই তাহলে দেখা যায় বাদশা কিছুটা হলেও সমাজ-সংষ্কারের প্রচেষ্টা করেছেন বটে, কিন্তু সমসাময়িক ইউরোপের তুলনায় তা যথারীতি প্রস্তরযুগের। তার সমসাময়িক ইউরোপে গ্যালিলিও বা কেপলার গবেষণা করছেন অথচ আকবরের আমলে কোনও বিজ্ঞান-চর্চায় উৎসাহ দেবার লক্ষণ দেখা যায় না। শিল্প ও বাণিজ্য সম্পর্কে বাদশাহদের জ্ঞানও কোন অংশে বাড়তি পরে না। ব্রিটিশদের মুক্ত-বাণিজ্যের অধিকার দেবার সময় তারা কতটুকু লাভ-লোকসানের হিসাব করেছিলেন তা নিয়ে সন্দেহ আছে। আকবরের এক শতক আগেই ষষ্ঠ হেনরী ইংল্যান্ডে ২০ বছরের পেটেন্ট-ব্যবস্থা চালু করেছিলেন যা আজও চালু আছে। মেধা – তার আবার সত্ত্ব ও তার সংরক্ষণ – এই ব্যাপারটা এখনও দেশের অধিকাংশ মানুষ বোঝে বলে মনে হয় না। খোদ বাদশা আকবরের হাল দেখে মনে হয় ভারতের কোনও দেশীয় শাসক আধুনিক রাষ্ট্রের চিন্তা মাথায় আনতে সক্ষম ছিলেন না।

সংক্ষেপে বললে, আমাদের যা প্রাপ্য ছিল সেটাই আমরা হয়ত ভোগ করছি। ঔপনিবেশিকতা (যা আমার স্বাভাবিক ঘটনা বলেই মনে হয়) বলে কোনও বস্তু আদৌ না থাকলেও কি আমরা সত্যি উন্নত জীবন-যাপণ করতাম? তিনটের জায়গায় হয়ত গোটা কুড়ি দেশ থাকত উপমহাদেশে, যাদের কিছু কিছু তুলনামূলক-ভাবে ভাল হত অন্যের তুলনায়। এর বেশী খুব কিছু আশাবাদী হওয়ার কোনও সম্ভাবনা দেখি না। মুঘল-মারাঠা রাজা বা তাদের অধীনের সামন্তবর্গ আমাদের এর থেকে উন্নত জীবনযাত্রা এনে নিতে পারত বলে মনে হয় না।

ভবিষ্যতে কি এর আমূল পরিবর্তন হতে পারে? আমি খুব একটা আশাবাদী নই। ঔপনিবেশিকদের মধ্যে সবথেকে খারাপ পারফর্মার হল পর্তুগাল। আর আমাদের উন্নয়নশীল বিশ্বে স্টার পারফর্মার হল মালয়েশিয়া। দুয়ের মধ্যে তুলনা করলে দেখি মালয়েশিয়ার সাথে ১৯৬০-এর দশকে পর্তুগালের মাথাপিছু আয়ের পার্থক্য ছিল মাত্র ১১০ ডলারের। তা এখন বেড়ে ১২,০০০ ডলারে চলে গেছে। অর্থাৎ ব্যবধান দশগুণ বেড়েছে। যেখানে আমাদের স্টার পারফর্মারের এই হাল, সেখানে আমরাই বা কিভাবে আশা রাখতে পারি?

তথ্য সূত্র – গুগলের তথ্যভাণ্ডার যা বিশ্বব্যাঙ্কের থেকে নেওয়া। এখানে আমি ডলার-জিডিপি দিয়ে মেপেছি যা কিছুটা বিতর্কিত। তবে আন্তর্দেশীয় তুলনার জন্য আমার ওটাই বেশী নিখুঁত বলে মনে হয়েছে।

অপরাধী কে? সন্ত্রাসী না সমব্যাথী?

ডিসেম্বর 25, 2012

ঘটনার সূত্রপাত গতকাল। ব্রেকিং নিউজ হিসাবে সব টিভি চ্যানেল প্রচার করা শুরু করে এক বাংলাদেশী তরুণ ফেডারেল রিজার্ভে বোমা রাখতে গিয়ে ধরা পড়েছে। আরো সময় গেলে বের হয়ে আসে পুরো ব্যাপারটাই একটা স্টিং অপারেশনের ফসল। রেজয়ানুল নাফিস মার্কিন দেশে এসেছে মাত্র নয় মাস আগে। গত জুলাই মাসে ফেসবুকে তার কমেন্টের সূত্র ধরে তার ওপর নজরদারি শুরু হয়। এই অবস্থায় নাফিস মার্কিন দেশে বোমা হামলা চালানোর উদ্যোগ নিলে এফ বি আই-এর এজেন্ট তাকে নিষ্ক্রিয় বোমা সরবরাহ করে। নাফিস সেই ১০০০ পাউন্ড বোমা ফেডারেল রিজার্ভ (বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক ও ভারতের রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার সমতুল্য) -এর সামনে রেখে পাশের একটি হোটেলে বসে তাকে দুর-নিয়ন্ত্রকের সাহায্যে সক্রিয় করার চেষ্টা করে। এই পর্যায়ে বোমাটি ফাটে না এবং মার্কিন এজেন্ট তাকে গ্রেফতার করে মার্কিন আদালতে পেশ করে (গুয়ান্তানামো বে তে পাঠায় নি)।

এই পর্যন্ত ঘটনা কাল অবধি জানা ছিল। যেহেতু নাফিস স্টুডেন্ট ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিল, তার পরেই আমেরিকায় প্রশ্ন উঠতে থাকে স্টুডেন্ট ভিসা এত সহজে পেল। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ও ছাত্র-ছাত্রীরা শংকিত হয়ে ওঠে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০০১ এ টুইন টাওয়ারে হামলা পর থেকে ২০০৫ অবধি আমেরিকায় বাংলাদেশী ছাত্র-ছাত্রীদের বিশেষ সিকিউরিটি চেকের মধ্যে দিয়ে যেতে হত। অনেকেই মনে করছেন সেই অবস্থা আবার ফিরে আসতেই পারে, স্টুডেন্ট ভিসা সহ অন্যান্য ভিসা পাওয়াও এর ফলে শক্ত হয়ে যাবে। সমস্যা শুধু আমেরিকাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না ভিন্ন ভিন্ন দেশেও বাংলাদেশী নাগরিকদের যাওয়ার সময় অতিরিক্ত স্ক্রুটিনির সম্মুখীন হতে হবে তাও এখনও পরিষ্কার নয়।

অন্যদিকে, নাফিসের পরিবারবর্গ স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনায় ব্যথিত এবং মানতে নারাজ যে তাদের ঘরের ছেলে এ ধরনের নাশকতামূলক কাজকর্মের সাথে জড়িয়ে থাকতে পারে। আমেরিকাতেও অনেকেই স্টিং অপারেশনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন – তাদের বক্তব্য হল নাফিসের উদ্দেশ্য জানামাত্র তাকে ডিপোর্ট করা উচিত ছিল, তাহলে ঘটনা এতদূর এগোত না, সাজানো ঘটনায় টেররিস্ট ধরে মার্কিন নিরাপত্তার কোনও উন্নতি হবে না।

আজ এসে দেখতে পেলাম পুরোদমে দুই শ্রেণীর মতামত ফেসবুকে চলছে। দুই শ্রেণীর মূল বক্তব্য একই – আমাদের দোষ না, যত দোষ আমেরিকার। প্রথম শ্রেণীর বক্তব্য পুরো ঘটনা সাজানো হয়েছে যাতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত আরো জোরদার করা যায়। আরেকশ্রেণীর বক্তব্য পুরো ঘটনাই সাজানো হয়েছে ইসলামের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে – বিশ্ববাসীর কাছে ইসলামের নামে সন্ত্রাসের ছবি তুলে ধরার জন্যই এই ছক। সবশেষে জানা গেল বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মতামতরেখেছেন যে নাফিসের পরিচিতি নিয়ে উনি নিশ্চিত নন, নাফিস বাংলাদেশে বসবাসকারী অবৈধ রোহিঙ্গাদের মধ্যে একজন হতেও পারেন (যদিও নাফিসের বাবা কি ভাবে ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের ভাইস-প্রেসিডেন্ট হয়েছেন সে প্রশ্ন ওনাকে করাই অবান্তর)।

দুই ধরনের যুক্তিই আমার কাছে অন্তঃসারশূন্য লেগেছে। প্রথম কথা স্টিং অপারেশন আমেরিকায় অনেকদিন ধরেই চলে আসছে। এমনকি ভারতেও স্টিং অপারেশনে অনেক মন্ত্রী-আমলা ইতিপূর্বে ধরা পড়েছে। এই ধরনের অপারেশনে অপরাধের “ইন্টেন্ট” বা ইচ্ছা/চেষ্টা আছে এরকম যে কোনও ব্যক্তিকে তার অপরাধ সংঘটনে ছদ্ম-সাহায্য করা হয় যাতে সে কতদূর অবধি অপরাধ করতে পারে সেটা দেখে তাকে হাতে-নাতে ধরা হয়। অনেকেই প্রশ্ন করবেন বাংলাদেশে এ ধরনের স্টিং-অপারেশন কি চলে? এই উত্তরটা আমার সঠিক জানা নেই কিন্তু তৃতীয় বিশ্বে অপরাধের ইন্টেন্ট থাকলে অনেক সময়েই তাকে লক-আপে ঢুকিয়ে পিটিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয় যার থেকে স্টিং অপারেশন শতগুণে ভাল। দ্বিতীয় কথা, নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অব ল এন্ড সিকিউরিটির পরিসংখ্যান মতে, সেপ্টেম্বর ১১-র ঘটনার পরে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ১৫৬ টি কেসের মধ্যে ৯৭টিতেই এজেন্টদের ব্যবহার করা হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ডিফেন্স ল’ইয়ার চেষ্টা করেছে “আসামীকে ট্র্যাপ করা হয়েছে” – এই যুক্তি ব্যবহার করতে, কিন্তু কোনও ক্ষেত্রেই সফল হয়নি। এর থেকে প্রমাণিত যে শুধুমাত্র নির্বাচন আসন্ন বলেই এই অপারেশন চলছে তা নয়, সবসময়েই স্টিং অপারেশন চলছে – তার কনভিকশন রেট ১০০%।

স্টিং অপারেশন যে শুধু “মুসলিমদের সন্ত্রাসী বানানো”-র কাজে ব্যবহার হয়েছে তাও না। কখনও ড্রাগ-পেডলারদের ট্র্যাপে ফেলা হয়েছে, তারা যখন ড্রাগ ডেলিভারি করতে গেছে – পুলিশ হাতেনাতে ধরেছে তাদের। ফেসবুকে অপ্রাপ্তবয়স্ক সেজে বসে থাকা এফ-বি-আই এজেন্ট-এর সাথে যৌণ-সম্পর্কে লিপ্ত হবার প্রচেষ্টার কারণে জাভা প্রোগ্রামিং ল্যানগুয়েজের অন্যতম প্রণেতা প্যাট্রিক নটন (যার লেখা বই আমাদের অনেকেই পড়েছে) ধরা পড়ে শাস্তিও পেয়েছেন। অপরাধ লঘু হবার কারণে অনেক কম সাজা পেয়ে উনি ছাড়া পেয়ে গেছেন বটে কিন্তু স্টিং অপারেশন চালানোর কারণে তার অপরাধ লঘূতর করে দেখানোর প্রচেষ্টা সফল হয় নি। এবং এই ঘটনা ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার হামলার আগেই ঘটেছে। সব স্টিং-অপারেশনেই যে “মুসলিমদের সন্ত্রাসী বানানো”-র সফল অপারেশন ঘটে তাও না। দক্ষিণ ক্যালিফোর্ণিয়ার একটি মসজিদে এক প্রাক্তন ড্রাগ-পেডলারকে এজেন্ট হিসাবে নিয়োগ দেয় এফ বি আই। তার কিছুদিনের মধ্যেই মসজিদের অন্য কিছু ব্যক্তি সেই এজেন্টের আচরণ “সন্দেহজনক” বুঝে উল্টে এফ বি আই-কেরিপোর্ট করে। বাধ্য হয়ে ও সমস্যা নেই বুঝে তদন্ত বন্ধ করে দেয় এফ বি আই। আমি আমেরিকান হলে স্পষ্টতই স্টিং অপারেশনের সমর্থন করতাম, কারণ এই ধরনের অপারেশন শুধু বড় জোট গঠন হবার আগেই তাকে ভেঙে দিচ্ছে তাই না, আল-কায়দা সহ জঙ্গী গোষ্ঠীদের মধ্যেও যথেষ্ট “ডাউট” তৈরী করছে, যার ফলে “নিউ রিক্রুট” করার আগে তারা দশবার ভাবছে।

কিছুদিন আগেই মালালা ইউসুফজাই নামে পাকিস্তানী এক বালিকাকে তালেবানী “শিক্ষাব্যবস্থার” সমালোচনা করার কারণে গুলি খেতে হয়েছে। তালিবানী মুখপাত্র ঘটনা স্বীকার করে তার স্বপক্ষে যুক্তিও উপস্থাপন করেছেন। পাকিস্তানী সমাজেও ঘটনাটার বেশ নিন্দা শোনা যায়। কিন্তু ওই পর্যন্তই, কিছুদিনের মধ্যেই অসংখ্য ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হাজির হয় বাজারে ও পাকিস্তানী মধ্যবিত্ত নির্দ্বিধায় সব দোষ তালেবানের জায়গায় মার্কিন যড়যন্ত্রের ওপর চাপিয়ে দেয়। পাকিস্তানের সমস্যা অশিক্ষিত তালিবানেরা যত, তার থেকে ঢের বেশী গুণে এই সব অর্ধ-শিক্ষিতরা – যারা নিজের দোষ ঢাকতে সব-সময়ে ষড়যন্ত্রের কথা বলে বেড়ান। একই ঘটনা এখন বাংলাদেশেও ঘটছে – যদিও পাকিস্তানের দশায় যেতে অনেক দেরী আছে, কিন্তু অংকুরেই এসব বিনাশ করার প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

শুরুতেই বলেছি এফ বি আই আজকাল ফেসবুক সহ সোসাল মিডিয়ার ওপর কড়া নজরদারী করছে। সুতরাং এই ধরনের মতামত প্রচার করে বেড়ালে তাদের এই ধারণা বদ্ধমূল হবে যে এই নাফিসের পেছনে অসংখ্যা সমব্যাথী আছে যাদের অনেককেই হাতে বোমা তুলে দিলে তা মার্কিণ দূতাবাসে বা স্টক-এক্সচেঞ্জে আক্রমণ চালাতে দ্বিধা করবে না। নাফিস একা যতটা ভাবমুর্তির ক্ষতি করেছে, তার সমব্যাথীরা সমষ্টিগতভাবে তার বহুগুণ ক্ষতি বয়ে আনবে দেশের ওপর।

শেষটা করার আগে একটা উপায় নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করে যাই। রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচারের বদলা হিসাবে রামু-উখিয়াতে যারা বৌদ্ধ-হিন্দু মন্দিরে আক্রমণ চালিয়েছিলেন, সেই কয়েকশ’ উৎসাহীদের সবাইকে হাতে বোমা ধরিয়ে দিলে তাদের মধ্যে কিছু লোক থাকতেই পারে যারা এই বোমা জাপানী বা থাই বৌদ্ধদের মারার কাজে ব্যবহার করতে পারেন। আবার তাদের মধ্যে দু-একজন এমনও পাওয়া যাবে যারা সত্যি অর্থেই থাইল্যান্ড বা জাপানে যেতে সক্ষম। এই দুইয়ের মিল হয়ে গেলেই কিন্তু সর্বনাশ – বিদেশে গিয়ে বোমা ফাটিয়ে কেউ না কেউ দেশের নাম উজ্জ্বল করে আসবে। সুতরাং, এই ধরনের অপরাধীদের দেশেই জেলে পুরে ফেলা ভাল যাতে বিদেশে গিয়ে তারা ধরা না পড়ে। এদেরকে ধরিয়ে দিন – দেশের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখুন। বিদেশে ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে গেলে দেশের বিচার ও আইন-ব্যবস্থা ভাল করতেই হবে। আইনের শাসনের কোনও বিকল্প নেই।

নাফিসের ওপর অভিযোগ – সরকারী সূত্র

ইউরোর চাবিকাঠি জার্মানীর হাতে

ডিসেম্বর 25, 2012

ইংল্যান্ডের উত্তরের গ্রামগুলোতে গবাদি পশু চরে বেড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট স্থান থাকত – যা ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত – অর্থাৎ কমন প্রপার্টি। নিজের স্বার্থের কথা ভেবে সব মালিকই চাইত আরও বেশী করে গবাদি পশু চারণ করে বেশী লাভের টাকা ঘরে তুলতে, স্বভাবতই নিজেদের জমি ব্যবহার না করে ওই কমন-প্রপার্টিই ব্যবহৃত হত চারণের জন্য। কিন্তু একসময় দেখা দিল বিপর্যয়, ঘাস গজানোর তুলনায় গবাদি পশুর খেয়ে ফেলার হার বেড়ে গেল, ফলে গবাদি পশুর খাওয়ার জায়গা ফুরোলো। এই থট-এক্সারসাইজ থেকেই একটা সুন্দর তত্ত্বের উদ্ভব। ট্র্যাজেডি অব কমনস শেক্সপিয়ারের লেখা আরেকটি উপন্যাস নয়, বরং একটি তত্ত্ব যার প্রভাব বর্তমান পৃথিবীতে হরহামেশাই চোখে পড়ে।

গ্যারেট হার্ডিন নামে এক বিজ্ঞানী সায়েন্স পত্রিকায় প্রথম প্রকাশ করেন এই নামটা, কিন্তু এর প্রভাব চলে আসছে এর অনেক আগে থেকেই। মূল বক্তব্য হল, যে সম্পদ সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত, সকলেই তার সর্বাধিক ব্যবহারের চেষ্টা করে। আর এই ধরণের সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহার খুব দ্রুত সামগ্রিক বিপদ ডেকে আনতে পারে। সেই “সম্পদ” কখনও বঙ্গোপসাগরের মাছ, কখনও রাস্তা (একটা কার্টুন দেখে বুঝতে পারেন), কখনো সামগ্রিক পরিবেশ। আরও উদাহরণ দিলে গণতান্ত্রিক দেশে সরকারী সম্পত্তি একইভাবে ট্র্যাজেডি অব কমনসের শিকার, রাষ্ট্রায়াত্ত শিল্পের পতনের পেছনে অনেকাংশেই একই তত্ত্ব কাজ করে। অর্থনীতিও ব্যতিক্রম নয়। আর সাম্প্রতিক ইউরোপীয় অর্থনীতির পতনে আমি এই ট্র্যাজেডি অব কমনসের ছায়া দেখতে পাই।

ষাটের দশকে ইউরোপের ছয়টি দেশ মিলেজুলে নিজেদের অর্থনীতি থেকে সীমারেখা মুছে দিতে চেয়েছিল। তাদের সেই প্রচেষ্টার সফল রূপায়ণ ঘটে ১৯৯৩ সালে, যখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন তৈরী হয়। আরো বছর দশেকের মধ্যেই ইউনিয়নের সদস্য বেড়ে দাঁড়ায় ২৭-এ। ইউনিয়ন গঠনের কেন্দ্রীয় চালক ছিল অভিন্ন মুদ্রা ইউরোর প্রবর্তন – যার ফলে এক ছাতার তলায় আসতে পেরেছিল ইউরোপের ছোটো-বড় দেশগুলো। স্বাভাবিক ভাবেই এক ছাতার তলায় আসায় গ্রীসের মত দেশে বিনিয়োগের ঝুঁকি কমে যায়, যার ফলে ঋণ-সংগ্রহে সুদের হারও কমে যায়। এইটা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। আপনি যদি কোনও ব্যক্তিকে ঋণ দিতে চান তাহলে যা ঝুঁকি, একটা গোষ্ঠীকে দিতে চাইলে স্বাভাবিকভাবেই তার চেয়ে কম ঝুঁকি – কারণ আপনি স্বাভাবিকভাবেই আশা করবেন গোষ্ঠীর মধ্যে কিছু লোক থাকবেই যারা ঋণ ঠিকঠাক কাজে লাগাবে ও শেষমেষ আপনার টাকা শোধ করে দেবে। অর্থনীতির প্রথম ধাপে, এভাবেই গ্রীস, ইতালী, পর্তুগাল বা স্পেনের মত দেশ অনেক ঋণ নিয়ে দেশে বিনিয়োগ করল – স্থানীয় অর্থনীতিতে জোয়ার এল।

উল্টোদিকে, ফ্রান্স বা জার্মানীর মত দেশও লাভবান হল। তাদের রপ্তানী বাজার রাতারাতি বড় হয়ে গেল। এদের মধ্যে বিশেষত জার্মানীর জিডিপি সম্পূর্ণ রপ্তানীমুখী। রপ্তানী বাড়ায় উৎপাদন বাড়ল, তাছাড়া বিশেষত চিনে জার্মান মেশিনারীর বিশেষ চাহিদা দেখা দেওয়ায় জার্মানীর অর্থনীতি ফুলে-ফেঁপে উঠল। জার্মানীর বাণিজ্য-উদ্বৃত্ত বাড়তে থাকল। এই উদ্বৃত্ত টাকা ঋণের মাধ্যমে জমা হতে থাকল ওই দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলোতে। জার্মানী ইউরোর পূর্ণ সদব্যবহার করল – একদিকে তাদের ঋণের টাকায় দক্ষিণ ইউরোপের ক্রেতারা জিনিস কিনতে থাকল, অন্যদিকে সময় গেলে তাদের অর্থনীতি আরও বেশী দক্ষ হয়ে উঠতে থাকল।

এদিকে ঋণের টাকা একেক-দেশ একেক-ভাবে ব্যবহার করেছে। স্পেনে আমেরিকার মত রিয়েল এস্টেট বুদবুদ তৈরী হয়েছে, গ্রীসে সরকারী কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ। গ্রীসের ঋণ এতটাই বেড়ে গেল যে ইউরো শুরুর সময় মাস্ট্রিক্ট চুক্তিও(৩%-এর কম ঘাটতি) বছরের পর বছর অগ্রাহ্য করতে থাকল। গ্রীসের সাথে তুরস্কের দীর্ঘ-বিবাদের ফলে গ্রীস আয়ের বড় অংশ খরচা করেছে মারণাস্ত্রের পেছনেও। মজার কথা, এই আমদানীর বড় অংশই এসেছিল জার্মানী থেকেই। মূলধন হাতে পেয়ে দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলোর লেবার-কস্ট বাড়তে থাকল, অর্থাৎ তাদের রপ্তানী বাড়ার সম্ভাবনা কমে যেতে থাকল।

যে আশা নিয়ে এক-ইউরোর যাত্রা শুরু হয়েছেল, বছর দশেকের মধ্যেই তার মধ্যে পরিষ্কার ফাটল দেখা দিল। যে কমন-পুল-অব-রিসোর্স ছিল, তার অদক্ষ ব্যবহার শুরু হল। জার্মানী যতই বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বাড়ালো গ্রীস, ইতালী ও স্পেনের ঘাটতি বাড়তে থাকল। এই অবস্থায় গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়ে এল আমেরিকায় অর্থনৈতিক দুর্যোগ – যার শুরু হল রিয়েল এস্টেট বাবলের হাত ধরে। দুর্যোগের মূল কারণ যেহেতু ছিল অত্যাধিক ও সহজলভ্য ঋণ, বিপর্যয়ের পরে সব ব্যাঙ্কই ঋণ দেওয়ার আগে দশবার ভাবতে শুরু করল। যে অর্থনীতিগুলোর অবস্থা ততটা ভাল ছিল না, অর্থাৎ যারা সামর্থ্যের বেশী ঋণ নিয়ে রেখেছিল – তাদের কপাল পুড়ল। তবে বলে রাখা ভাল, গ্রীসের ক্ষেত্রে অত্যধিক ঋণের জন্য দায়ী যেমন সরকার – স্পেনের ক্ষেত্রে কিন্তু মর্টগেজ আর রিয়েল এস্টেট বাবল মূল ঋণ-গ্রহীতা। অর্থাৎ স্পেন সরকার চুক্তি মেনে চলেও ঋণের বোঝায় ডুবে গেছে। এই অবস্থায় ব্যাঙ্ক সব জায়গায় ঋণে সুদের হার আর সমান রাখল না – দুর্বলতর অর্থনীতিতে ঝুঁকি যতই বাড়তে থাকল, সুদের হারও তেমন চড়চড় করে উঠতে শুরু করল। স্পেনে যারা বাড়ি কিনেছিল – তাদের ধার শোধ করা আরও শক্ত হয়ে গেল।

এই অবস্থায় সোজাসাপটা পথ দুটো – প্রথমটা হল খরচা কমিয়ে দেওয়া। খরচা কমানোর মানে বাজার কমে যাওয়া, মানে মন্দা – এদিকে মন্দা তো ২০০৮ থেকেই চলছে। যার মানে মন্দা আরো জাঁকিয়ে বসবে। এর মানে স্পেন, ইতালী, পর্তুগাল বা গ্রীসে আরো বেশী লোকে ধার শোধ করতে পারবে না। মন্দার মানে রাজনৈতিক অশান্তি – মানে বাজার থেকে আরও বিনিয়োগ বেরিয়ে যাবে, অর্থাৎ আরও মন্দা। অন্য পথটা হল খরচা না কমানো। কিন্তু এর মানে হল আরো বড় সমস্যার দিকে এগিয়ে যাওয়া। সব দেশেরই ঋণভার বেড়ে চলেছে – এভাবে চললে আরও ঋণভার বাড়বে, কারণ ঋণ কমানোর কোনও দায় থাকবে না। আস্তে আস্তে সবাই মিলে ডুববে একই সমুদ্রে। অনেকেরই মনে হতে পারে, জার্মানীই সবথেকে সুবিধাজনক অবস্থায় আছে ইউরোপীয় অর্থনীতিতে। কথাটা সত্যি হলেও তাদেরও হাত-পা বাঁধা। হঠাৎ করে তাদের মুখ্য বাজারে মন্দা দেখা দিলে তাদের অর্থনীতিতে আরও বড় ধাক্কা দেখা দেবে – তা নিয়ে কারও দ্বিমত থাকার কারণ নেই। তাছাড়া, এককালীন ঋণ-ডিফল্টে তাদের দুই ট্রিলিয়ন ডলার গচ্চা যাবে বলেও মনে করা হচ্ছে। তাই চাইলেও জার্মানী ডিভোর্স পাচ্ছে না – নিজের লাভের কথা ভেবেই শুধু বুলি আউড়েই শান্ত থাকতে হচ্ছে। অবশ্য তারা সুযোগ বুঝে তর্জন-গর্জন করা কমাচ্ছে না। তাদের বক্তব্য – গ্রীসসহ দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলোর অর্থনীতির রাশ আরও কড়া হাতে ধরতে হবে। বিশেষত গ্রীসের ওপর সকলেই বিশেষভাবে খাপ্পা – কারণ গ্রীসের ঋণগ্রহীতা সরকার। তাই সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন শর্ত, যার মধ্যে আছে সরকারী কর্মচারীদের বেতন-হ্রাস বা শিক্ষা-স্বাস্থ্য-খাতে টাকা কমানোর শর্তও। সম্প্রতি গ্রীসের ভোটের ফলাফলে মনে হয়েছে – গ্রীসের জনগণও সেটা মেনে নিয়েছে। আপাতত মনে হয় আগামী বছর কয়েক ইউরোপ খরচ কমানোর পথেই হাঁটবে। আর ইউরোপের ওপর জার্মানীর কর্তৃত্ব আরও জোরদার হবে।

ইউরোপের এই দুর্যোগের মধ্যে একটা কথা কেউ বলছে না – সেটা হল এশিয়ার কথা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন তৈরীর সময় বলা হয়েছিল গাড়ি-শিল্পের কথা। জার্মান গাড়ি শিল্পের জন্য যন্ত্রপাতি তৈরীর শিল্প ইতালি বা স্পেনে তৈরী হবার কথা ছিল। তার জায়গায় সেই যন্ত্রপাতি এখন আসছে চিন, জাপান বা থাইল্যান্ড থেকে। অর্থাৎ, ইউরোপের ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পের নিচের দিকটা (Low value added parts) নিয়ে নিয়েছে এশিয়া। জার্মানী থেকে আসা ঋণের টাকায় ইতালী বা স্পেন শিল্পের পরিকাঠামো বানায় নি – বিনিয়োগ করে গেছে রিয়েল এস্টেট বাবলে। খেসারত দিতে হচ্ছে তাদের।

পর্তুগালের অর্থনীতির সমস্যার একটা দিক বেশ মজার। বছরের পর বছর যেই অ্যাঙ্গোলাকে শোষণ করে পর্তুগালের সম্পদ এসেছিল, আজকে সেই অ্যাঙ্গোলাই পর্তুগালের অর্থনীতির ভরসা। উপনিবেশিকতার সূত্রে অ্যাঙ্গোলার সরকারী ভাষা পর্তুগীজ। আর তাদের অর্থনীতিতে এখন বুম চলছে – তেলের আবিষ্কারের হাত ধরে। স্বভাবতই দলে দলে পর্তুগীজ ইঞ্জিনিয়ার-ডাক্তার দেশের ২৫% বেকারী এড়িয়ে চাকরি জোটাতে পাড়ি দিচ্ছে অ্যাঙ্গোলার দিকে। না – এবারে আর রাইফেল হাতে নয় – হাতে রেসিউমে – লক্ষ্য ভালো চাকরি, ক্ষমতা দখল নয়। পর্তুগাল এখন অ্যাঙ্গোলা থেকে যা রেমিট্যান্স আনে, তার থেকে কম আনে ব্রিটেন থেকে। নিয়তির পরিহাসে অ্যাঙ্গোলা এখন আর পর্তুগাল থেকে বিশেষ একটা রেমিট্যান্স পায় না।

ইউরোর সমস্যা দেখে ট্র্যাজেডি অব কমনসের কথাই বারবার মনে হয়। মৌলিক-ভাবে ভিন্ন ধারার কয়েকটি অর্থনীতি যদি একসাথে চলতে চায় তাহলে তাদের মধ্যে “কমন-পুল-অব-মানি” সবাই নিজের দিকে টেনে নিতে চাইবে। সবাই বেশী বেশী করে ধার করবে, কারণ পতন ঠেকানোর দায় তাদের একার নয় – বাকিদেরও। উলটোপথে হেঁটে বরং জার্মানী এখন দুই ট্রিলিয়ন ডলার গচ্চা দেওয়ার মুখে। তাই প্রথম থেকেই রেগুলেশন ব্যাপারটা জোরেসোরে না কাজে লাগালে এইরকম অর্থনৈতিক গাঁটছড়া টিকবে না – ভবিষ্যতেও না। তবে এটাও জেনে রাখা ভাল – জাপান, চিন বা জার্মানীর মত রপ্তানী-নির্ভর দেশ সব দেশের পক্ষে হওয়া সম্ভব না – পুরোনো পাটিগণিতের নিয়মেই সম্ভব না। বিক্রেতা বা উৎপাদক আছে বলেই ভোক্তা আছে – এটাও যেমন ঠিক, এর উল্টো-টাও তেমনভাবেই সত্য। তাই জার্মানীর মত দেশকেও নিজের উৎপাদন যাতে ভোগের তুলনায় খুব বেশী না হয়ে যায় – তার দিকে নজর রাখতে হবে।

জার্মানী এর আগে দু-বার ইউরোপের কর্তৃত্ব নিতে চেয়েছিল। দুবারেই যুদ্ধের হাত ধরে। আর দুবারেই পরিণতি হয়েছিল করুণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমস্ত অর্থনৈতিক দায় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল জার্মানীর ওপর – যার পরিণতিতে জার্মান মুদ্রায় এতটা মুদ্রাস্ফীতি হয়েছিল যে ১৯২৩ সালে এক মার্কিণ ডলারের বিরুদ্ধে ৪ ট্রিলিয়ণ জার্মান মার্ক পাওয়া যেত (১৯১৪ সালে ১ ডলার ছিল ৪ মার্ক)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পরে ভেঙে তাদের দু-টুকরো করে দেওয়া হল, যা জোড়া লাগতে দীর্ঘ ৪৫ বছর সময় লাগল। যদি গ্রীসের মত ইতালী, স্পেন আর পর্তুগালকেও জার্মানী নিজের “প্যাকেজে” রাজী করিয়ে ফেলতে পারে – তাহলে দীর্ঘদিনের জন্য অর্ধেক ইউরোপ জার্মানীর কার্যত উপনিবেশে পরিণত হবে। ঋণের বোঝা থেকে চট করে মুক্তি মিলবে না, অথচ জার্মান পণ্য তাদের কিনে যেতে হবে – মানে দেশে শিল্প সম্ভাবনা কম। হিটলার যে কাজটা সমরাস্ত্র দিয়ে করে দেখাতে পারেননি, কর্মঠ জার্মানরা অর্থনীতির হাত ধরে তাই করে দেখিয়ে দিচ্ছে – এভাবেও ফিরে আসা যায়।

আরো কিছু সহজপাঠ্য -
১) তিন ধাপে ইউরোপের ক্রাইসিস
২) বিবিসি থেকে
৩) গ্যারেট হার্ডিনের পেপার
৪) বিবিসির ডকুমেন্টরি

প্রথম ছবিটি এন-পি-আর ব্লগ থেকে, দ্বিতীয় ও তৃতীয়টি উইকি থেকে ও চতুর্থটি নিউ-ইয়র্ক টাইমস ব্লগ থেকে নেওয়া।

বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ও ভবিষ্যত

ডিসেম্বর 25, 2012

বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ঘাটতি নিয়ে দেশীয় পত্রপত্রিকায় অনেক লেখা হয়। বিশেষত ভারতের ও চিনের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে অনেক লেখাই আসে, একইরকম ভাবে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি নিয়েও কিছু লেখা আসে। আমি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাণিজ্যের রেকর্ড নিয়ে কিছু পরিসংখ্যান নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলাম। একটা প্যাটার্ন স্পষ্ট চোখে পড়ে। বাংলাদেশ এশিয়ার দেশগুলোর সাথে ঘাটতি বাণিজ্য চালায়। আবার উল্টোদিকে উন্নত ইউরোপীয় দেশগুলো ও আমেরিকার সাথে বাণিজ্য-উদ্বৃত্ত থাকে। এর সাথে আছে সারা বিশ্ব থেকে পাঠানো শ্রমিকদের রেমিট্যান্স। এই সবে মিলে বাংলাদেশ আয়ের চেয়ে সামান্য কিছু কম ব্যয় করে। এই উদ্বৃত্ত বা কারেন্ট একাউন্ট সারপ্লাস বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার তহবিল মজবুত করে। এ ছাড়া আছে ক্যাপিটাল একাউন্ট – যেখানে জমা পড়ে বিদেশী বিনিয়োগের টাকা। বৈদেশিক মুদ্রা তহবিল (ক্যাপিটাল একাউন্ট ও কারেন্ট একাউন্ট সারপ্লাস) বাংলাদেশের মুদ্রার (টাকা) বিনিময়মূল্য নির্দিষ্ট রাখতেও সাহায্য করে। মোটের ওপর এভাবেই বাংলাদেশের অর্থনীতি চলছে।

আমি মূলত আলোচনা করব বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে। বাংলাদেশের পত্রিকায় এই বিশেষ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় অনেক। মূল বক্তব্য থাকে দেশ আমদানী-নির্ভর হবার সমস্যা, এর সাথে আসে কিছু রাজনৈতিক আলোচনা। পরিসংখ্যানগতভাবে খুব একটা গভীরে আলোচনা যায় না, তাই আমি কিছু পরিসংখ্যান প্রস্তুত করার চেষ্টা করি। আমি ২০০৯ সালে বাংলাদেশের ২৫ টি বৃহত্তম এশিয়ান বাণিজ্য পার্টনার নিয়ে কিছু চার্ট তৈরী করলাম। দেখা গেল – এর ২৩টি দেশের সাথেই বাংলাদেশের ঘাটতি বাণিজ্য চলে। উদ্বৃত্ত বাণিজ্য চলে শুধুমাত্র ইরান ও তাজিকিস্তানের সাথে। এর মধ্যে ক্রমাণ্বয়ে চিন, ভারত, সিঙ্গাপুর, জাপান, মালয়েশিয়া, হংকং ও দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে দুশো মিলিয়ন ডলারেরও বেশী বাণিজ্য ঘাটতি। ভারতের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি ১৭৮৪ মিলিয়ন ইউরো (আমদানী ১৯৭৪ মিলিয়ন , রপ্তানী ১৯০ মিলিয়ন) ও অপর প্রতিবেশী মায়ানমারের সাথে ঘাটতি ৪৫ মিলিয়ন ইউরোর (আমদানী ৫০ মিলিয়ন, রপ্তানী ৫ মিলিয়ন)। চিনের সাথে সর্বোচ্চ ঘাটতি ২৪৫১ মিলিয়ন ইউরোর (আমদানী ২৫২২ মিলিয়ন ও রপ্তানী ৭১ মিলিয়ন)। ১৫টি দেশের একটা চার্ট দিলাম -

auto

তবে এ থেকে পরিষ্কার বোঝা সম্ভব নয় কোন দেশের সাথে বাণিজ্য কতটা একমুখী (অর্থাৎ আমদানী-নির্ভর)। এজন্য আমি এই দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের মোট বাণিজ্য ও তাতে ঘাটতির অনুপাত হিসাব করলাম। এই হিসাবেও দেখা যায় অধিকাংশ এশিয়ান দেশের সাথেই বাংলাদেশের ঘাটতির অনুপাত ৫০% – এরও বেশী – অর্থাৎ ১০০ টাকা বাণিজ্য হলে ৫০ টাকা ঘাটতি। এরকম দেশের মধ্যে শিল্পোন্নত জাপান বা কোরিয়া যেমন আছে, উন্নয়নশীল ভারত-চিন-থাইল্যান্ড আছে তেমন স্বল্পোন্নত মায়ানমার বা নেপালও আছে। এদের সবার ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি অনুপাত ৫০ এরও বেশী, কার্যত নেপাল ছাড়া বাকিদের ক্ষেত্রে এই অনুপাত ৮০-র ও বেশী। আমি আমদানী নির্ভরতার একটা ইনডেক্স বানিয়ে তাতে দেশগুলোকে ক্রমাণ্বয়ে সাজালাম। সবার ওপরে আসে উজবেকিস্তান – যারা বাংলাদেশে ২৬৯ মিলিয়ন ইউরো মূল্যের রপ্তানী করেছেন, অথচ আমদানী করেছেন মাত্র ২ মিলিয়ন মূল্যের সামগ্রী। এর পরে একে একে আসে যথাক্রমে কুয়েত, চিন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, কাতার, তুর্কমেনিস্তান, ভারত, মায়ানমার ও জাপান।

auto

একটু গভীরে আলোচনা করি – তালিকার সবার ওপরে থাকা উজবেকিস্তানকে নিয়েই আলোচনা করা যাক। উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ মূলত তুলো কেনে বাংলাদেশের নিজস্ব টেক্সটাইল শিল্প চালানোর জন্য। উজবেকিস্তানে তুলো চাষ অনেক হলেও শ্রমিক তুলনায় কম – যা আছে বাংলাদেশে। তাই উজবেকিস্তান থেকে আমদানী করা কাঁচামাল যদি গারমেন্টস-এর আকারে পশ্চিমে যায় তাহলে দুই দেশেরই লাভ – যাকে বলে উইন-উইন সিচুয়েশন। সেইক্ষেত্রে বাংলাদেশ একতরফা বিশাল বাণিজ্য ঘাটতির সম্মুখীন হলেও এই কাঁচামাল আদপে বাংলাদেশের কাজে আসছে। তাই ঘাটতি বাণিজ্য সবসময় খারাপ নয়, যদি সেই ঘাটতি অন্য কোথাও রপ্তানী উদ্বৃত্তের কাজে আসে।

এই বাণিজ্য ঘাটতি কি চিন্তার বিষয়? আপাতত না। কারণ, মোটের ওপর বাংলাদেশের আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্য আছে। কিছু দেশের সাথে ঘাটতি বাড়লেও অন্য দেশের সাথে উদ্বৃত্ত বেড়ে সেই ঘাটতি পুষিয়ে যায়। তাছাড়া উজবেকিস্তানের ক্ষেত্রে যেমন দেখলাম, সেভাবে কাঁচামাল আমদানী বাড়লে সাময়িকভাবে কোনো কোনো দেশের সাথে একতরফা আমদানী-সম্পর্ক তৈরী হতেই পারে। এগুলোতে সমস্যা নেই। সহজভাবে ভাবলে এক ব্যক্তি অফিসে কাজ করে মাইনে পায় যা তার “বাণিজ্য-উদ্বৃত্ত”, আর সে যে যে দোকানে গিয়ে জিনিস কেনে তাদের সাথে তার “বাণিজ্য-ঘাটতি” – মোটের ওপর হিসাব নিয়ন্ত্রণে থাকলে চিন্তার কিছু থাকে না।

কিন্তু ভবিষ্যতের কথা মাথায় রাখলে চিন্তার কিছু কিছু কারণ আছে। প্রথমত, বাংলাদেশের রপ্তানী-বাণিজ্যের ৮০% এরও বেশী শুধুমাত্র টেক্সটাইল ও গারমেন্টস-কেন্দ্রিক। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ ইউরোপে প্রতিদ্বন্দীদের তুলনায় কিছুটা শুল্ক-সুবিধা পায় স্বল্পোন্নত দেশ হিসাবে। ভবিষ্যতে এই সুবিধা না থাকলে এই শিল্পের সমস্যা তৈরী হতে পারে। একইভাবে, কাঁচামালের যোগানে সমস্যা সৃষ্টি হলেও রপ্তানী মার খেতে পারে। তবে বিগত কিছু বছরের ট্রেন্ড থেকে মনে হয় না এরকম সমস্যা তৈরী হতে পারে।

দ্বিতীয়ত বিশ্ব-বাণিজ্যের ভরকেন্দ্র যে আস্তে আস্তে এশিয়ার দিকে সরে আসছে তা সব অর্থনীতিবিদেরাই বলছেন। এশিয়ার সাথে বাণিজ্য ঘাটতি কিছু কিছু উদ্বৃত্তে না পরিণত করতে পারলে ভবিষ্যতে সমস্যা হতে পারে – কারণ পশ্চিমের বাজার এশিয়ার মত অত দ্রুতহারে ক্রমবর্ধমান নয়। সেক্ষেত্রে বাণিজ্য ঘাটতি ক্রমাগত বেড়েই চলবে। এশিয়ার দেশগুলোতে পশ্চিমের মত শস্তাশ্রমের অভাব নেই, তাই শ্রমঘন শিল্প ছাড়াও অন্যান্য দক্ষতাভিত্তিক শিল্পখাতে উন্নতি করতে হবে।

তৃতীয়ত বাংলাদেশে রপ্তানীমুখী শিল্পের বিকাশ ঘটাতে হবে। সন্দেহ নেই এটা অত সহজে হবে না, কারণ বাংলাদেশে কাঁচামালের প্রাপ্যতার সমস্যা আছে। তাও পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ সিঙ্গাপুরে ৩৫ মিলিয়ন ইউরো, মালয়েশিয়ায় ২৫ মিলিয়ন ইউরো থাইল্যান্ডে ২৪ মিলিয়ন ইউরো এবং মায়ানমারে ৫ মিলিয়ন ইউরো মূল্যের সামগ্রী রপ্তানী করেছে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দূরত্বের নিরিখে এই চারটে দেশই বাংলাদেশের প্রতিবেশী-তুল্য। এবং এদের জিডিপি ও বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিমাণও যথেষ্ট বেশী। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের রপ্তানী-ব্যর্থতা চোখে পড়ার মত। একই ভাবে, সংযুক্ত আরব আমীরশাহী, কুয়েত ও কাতারে বাংলাদেশের রপ্তানীর পরিমাণ যথাক্রমে ৪১, ৫ ও ৪ মিলিয়ন ইউরো। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো তেল ও গ্যাস রপ্তানী করে প্রায় বাকি সবই আমদানী করে। আবার এই দেশগুলোতে প্রচুর সংখ্যায় বাংলাদেশী কর্মরত। তাই এখানেও বাংলাদেশের রপ্তানী-ব্যর্থতা চোখে পড়ে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার চারটি দেশে ভারতের রপ্তানী যথাক্রমে ৩৬৬৯, ১৭২৫, ১১২৮ ও ১৫০ মিলিয়ন ইউরো। আর মধ্যপ্রাচ্যের তিনটি দেশে রপ্তানী হল ১৪৭৬২, ৫১৪ ও ৪২৯ মিলিয়ন ইউরো। এশিয়া-মুখী বাণিজ্যে বাংলাদেশকে আরও দ্রুত রপ্তানী বাড়াতে হবে, এটাই বোঝা যায়।

রপ্তানীমুখী শিল্পের বিকাশের জন্য দেশে বিনিয়োগের দরকার। বিশ্বব্যাঙ্কের ঋণ দিয়ে কিছু পরিকাঠামো গড়া যায় বটে কিন্তু বৈদেশিক বিনিয়োগই এশিয়ার বিভিন্ন দেশগুলোকে উন্নতির পথে ঠেলেছে। এখানে সমস্যা হল রাজনৈতিক। বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য বেশী ঝুঁকি নিচ্ছে, তাই তারা বেশী সুযোগসুবিধা চাইবে – যা নিয়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরী হয়। অথচ শিল্পায়নে বিনিয়োগের বিকল্প নেই। দেশের আয়-উদ্বৃত্ত দিয়ে যদি পরিকাঠামো তৈরী হয় তাহলে টাকার বিনিময়মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প অবশ্যই ভাল – কিন্তু কয়েকটি সেক্টর ছাড়া (যেমন মাইনিং, এগ্রো-বেসড) পৃথিবীতে সফল রপ্তানীমুখী রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের উদাহরণ খুবই কম। তাছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প অধিকাংশ সময়েই একচেটিয়া বাণিজ্যের অধিকার পায় যার ফলে দ্রুত স্বজনপোষণ ও দুর্নীতির পীঠস্থান হয়ে ওঠে। এশিয়ার শিল্পোন্নত কিছু দেশ (জাপান, কোরিয়া) থেকে বিনিয়োগ আনতে পারলে ভাল ছাড়া খারাপ কিছু হয় না, বিনিয়োগকারীরা নিজেরাই লবি করে ওইসব দেশে বাংলাদেশের জন্য বাণিজ্য সুবিধা করে দেবে।

শেষের কথায় আসি। রপ্তানীমুখী শিল্পের দরকার আছে ঠিকই, কিন্তু সেখানেও একটা প্রশ্নচিহ্ণ রেখে দেওয়া ভাল। রপ্তানীমুখী শিল্পের মাধ্যমে উন্নয়নের সবথেকে ভাল মডেল হল চিন। কিন্তু দেশে শিল্প গড়তে গিয়ে দেশের মধ্যে যে পরিমাণ দূষণের সম্মুখীন হতে হয় তার উদাহরণও চিন থেকে পাওয়া যায়। একইভাবে ভারতে শিল্প গঠনে জমি অধিগ্রহণের সময় একাধিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা থেকে বোঝা যায় বাংলাদেশেও শিল্পের বিকাশ অতটা সহজে হবে না। শুধু তাই নয়, চিন যেমন জাতিসংঘে ও বিশ্ব-দরবারে নিজের প্রভাব খাটিয়ে অনুন্নত দেশগুলো থেকে কাঁচামাল আমদানী করে, সেটাও বাংলাদেশের পক্ষে অতটা সহজ না-ও হতে পারে। তাই শিল্প ছাড়াও সেবা বা সার্ভিসেস সেক্টরে জোর দেওয়া দরকার। সেবা-খাতে সুবিধা হল এখানে প্রবৃদ্ধির জন্য মেধা-সম্পদ ছাড়া আর কোনো কাঁচামালের প্রয়োজন পড়ে না, পরিবেশ দূষণের সম্ভাবনাও অনেক কম (একমাত্র ব্যবহৃত বিদ্যুতের জন্য যতটা)। এর পরে রেমিট্যান্স ও শ্রমিক-রপ্তানী। এই খাতে বাংলাদেশের বর্তমান সাফল্যও চোখে পড়ার মত। তবু, পরিসংখ্যানের কথায় বলি, ২০১০ সালের বাংলাদেশের শ্রমিক-পিছু রেমিট্যান্সের পরিমাণ ২০৮৪ ডলার যেটা ভারতের ক্ষেত্রে ৪৮৬৭ ডলার। তাই, শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়ানোর কাজে সরকারী উদ্যোগ চাই, যাতে একই সংখ্যক শ্রমিক আরো বেশী রেমিট্যান্স পাঠাতে পারে, সেই সাথে বেশী শ্রমিক পাঠাবার উদ্যোগও জারী রাখতে হবে। বাণিজ্যের ভবিষ্যত হল বিশ্বায়ন ও মুক্তবাণিজ্যের হাত ধরে – মুক্তবাণিজ্যের বিশ্বে সাফল্যের জন্য দক্ষতা ও পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই।

আন্তর্জাতিক আদালতে বাংলাদেশ-মায়ানমার সমুদ্রসীমা বিরোধ

ডিসেম্বর 25, 2012

বাংলাদেশের সাথে মায়ানমারের আইনি লড়াই চলছে সমুদ্র-আইন বিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে। মামলার শুনানি চলছে, এই বছরের মধ্যেই (হয়ত সামনের মাসেই) রায় জানা যাবে। প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশ ও মায়ানমার দু’বার করে তাদের তরফে কাগজপত্র জমা দিয়েছে, এর পরে মৌখিক শুনানি শুরু হয়েছে। মৌখিক শুনানির প্রথম পর্যায়ে এখন বাংলাদেশের পক্ষের আইনজীবীরা সওয়াল করছেন। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখা থেকে অনেকেই জানেন হয়ত যে বাংলাদেশের সাথে মায়ানমারের সমুদ্রসীমা বিরোধের গুরুত্ব অনেকটা – বিশেষত বাংলাদেশ-মায়ানমার বিরোধপূর্ণ অঞ্চলটিতে গ্যাস পাওয়া যাওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্টই।


প্রাথমিক পর্যায়ের চারটি ডকুমেন্ট পড়েছি ও তার ভিত্তিতে কিছু কিছু বিষয় সবার সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করি। প্রথমত বাংলাদেশের মিডিয়াতে যতটা অঞ্চল বিরোধপূর্ণ বলে জানানো হচ্ছে, বাংলাদেশ কোর্টে কার্যত ততটা অঞ্চলের দাবী জানায়নি। উল্লেখ্য যে মায়ানমারও তাদের পুরোনো দাবী থেকে সরে কিছুটা কম অঞ্চল দাবী জানিয়েছে – দুয়ের ফলে বিরোধপূর্ণ অঞ্চল আয়তনে অনেক কমে গেছে। মায়ানমারের পুরোনো দাবী ছিল লম্বরেখার সাথে ২৪৩ ডিগ্রি রেখা বরাবর(ছবিতে হাল্কা নীল রেখা), যা এখন হয়েছে লম্বরেখার সাথে ২৩০ ডিগ্রি(মোটা নীল রেখা) রেখা বরাবর। একইভাবে বাংলাদেশের পুরোনো দাবী ছিল মোটা লাল রেখা বরাবর – অর্থাৎ ১৮০ ডিগ্রিতে, যা এখন হয়েছে ২১৫ ডিগ্রিতে – হাল্কা লাল রঙের রেখায়। এই অবস্থান পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ ও মায়ানমার – উভয়েরই মামলা জেতার সম্ভাবনা কিছুটা বেড়েছে। একই সাথে বাংলাদেশ জানিয়েছে তাদের আগের দাবীর যে ভিত্তি – সেই ১৯৭৪ সালের বাংলাদেশের সমুদ্র-আইনের বেশ কিছু অংশ ১৯৮২ সালের আন্তর্জাতিক আইনের সাথে মেলে না। তাই তারা তাদের দাবী কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে। দুঃখের বিষয়, এই পরিবর্তনের কথা সরকার পার্লামেন্ট বা জনগণকে জানায়নি – ফলে এখনও পত্রপত্রিকায় সমুদ্রসীমা বিষয়ক যে লেখা আসে তাতে বাংলাদেশের দাবী বলতে পুরোনো সীমাই দেখানো হয় ও পুরোনো যুক্তিই লেখা হয়ে আসছে।

কিছুদিন আগে পত্রপত্রিকায় একটি লেখা এসেছিল যে সুগত হাজরা নামে একজন গবেষক দাবী করেছেন যে দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ তলিয়ে গেছে। বাংলাদেশের প্রদত্ত ডকুমেন্টেও সেরকমই লেখা আছে।

“when a patch of sedimentary mud near the Bangladesh-India boundary known as South Talpatty emerged above the waterline in 1971 following a massive cyclone. No sooner had the feature emerged, however, than waves and storms began to wash it back into the sea. By 1990, satellite imagery showed that it had disappeared completely.” 

ডকুমেন্টের সাথে লাগানো ছবিতে দেওয়া আছে ১৯৭৩ ও ১৯৯০ সালের ওই দ্বীপের ছবি। এর মানে বোঝা যাচ্ছে, দ্বীপটি যে তলিয়ে গেছে, তা বিভিন্ন সরকারের পক্ষে জানানো সম্ভব ছিল ১৯৯০ থেকেই – কিন্তু তা জনগণকে জানানো হয়নি।

বাংলাদেশ-মায়ানমার আইনী লড়াই তিনটি মূল পর্যায়ে হচ্ছে – প্রথমটি টেরিটোরিয়াল সমুদ্রসীমা (সমুদ্রেতীর থেকে ১২ নটিকাল মাইল) নিয়ে, দ্বিতীয়টি পরবর্তী ২০০ নটিক্যাল মাইল নিয়ে ও শেষেরটা কন্টিনেন্টাল শেলফ নিয়ে (যা সমুদ্রতীর থেকে ৩৫০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত)।

টেরিটোরিয়াল সমুদ্রসীমা নিয়ে ১৯৭৪ সালে দুই দেশের মধ্যে একটি মিটিং হয়েছিল – যার বিস্তারিত মানচিত্র সহ বাংলাদেশ দাবী তুলে ধরেছে। মায়ানমারের তরফে ওই আলোচনাকে গুরুত্বহীন আখ্যা দিয়ে নতুন একটি রেখা প্রস্তাবনা করা হয়েছে। নতুন রেখাটি সেন্ট মার্টিন দ্বীপের অস্ত্বিত্ব উপেক্ষা করেই আঁকা সমদ্বিখণ্ডক রেখা। এ নিয়ে ভিন্নমতের যুক্তি ও প্রতি-যুক্তি চলছে।

পরবর্তী ২০০ নটিকাল মাইলের জন্য মায়ানমারের প্রস্তাব সমদূরত্ব রেখা টেনে সীমা বিভাজন – যে নিয়ে মিডিয়াতে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের এই বিষয়ে প্রস্তাবনা বাংলাদেশ-মায়ানমার টেরিটোরিয়াল জলসীমা থেকে কৌণিক সমদ্বিখণ্ডক রেখা দিয়ে বাংলাদেশ-মায়ানমার সমুদ্রসীমা বিভাজন করার। বাংলাদেশের বক্তব্য তাদের ভৌগোলিক অবস্থানের জন্য সমদ্বিখণ্ডক রেখা দিয়ে সমুদ্রসীমা টানা হলে তা অসম হবে, কারণ এর ফলে তারা আন্তর্জাতিক জলসীমায় সরাসরি প্রবেশ পাবে না ও উপকূলের দৈর্ঘ্যের অনুপাতে সুমুদ্রসীমার আয়তন হবে না। এ বিষয়ে তাদের জোরালো দাবী ১৯৬৯ সালের আন্তর্জাতিক আদালতের একটি বিবাদকে কেন্দ্র করে – যাতে একই রকম যুক্তি দেখিয়ে জার্মানী তার প্রতিবেশী ডেনমার্ক ও হল্যান্ডের বিরুদ্ধে জিতেছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক আইনে সমুদ্রসীমার টানার কথা বলা আছে সাম্যের ভিত্তিতে। মায়ানমারের বক্তব্য বাংলাদেশের অসাম্য প্রাকৃতিক অবস্থানের কারণে, আইন করে এর নিরসন করা কোর্টের দায়িত্ব হওয়া উচিত না।


সবশেষে আসে কন্টিনেন্টাল শেলফ – যা ২০০ থেকে ৩৫০ নটিক্যাল মাইলের মধ্যের সমুদ্রসীমা। এ নিয়ে বাংলাদেশের বক্তব্য – বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশ থেকে আসা নদীগুলোর বয়ে আনা পলি-সমৃদ্ধ – অর্থাৎ গ্রেট বেঙ্গল ফ্যানের অংশ। তাই বঙ্গোপসাগরকে বাংলাদেশের বিরবিচ্ছিন্ন মহাদেশীয় শেলফের প্রবর্ধক হিসাবে ধরা যায়। এ নিয়ে মায়ানমারের বক্তব্য বোধগম্য হয় নি – তবে কিছু ব্যতিক্রমী উদাহরণ তারা দিয়েছে। মায়ানমারের মুল বক্তব্য হল বর্তমান কোর্ট কন্টিনেন্টাল শেলফ নিয়ে আইনী সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না (No jurisdiction)। বলাই বাহুল্য, মায়ানমারের এই বক্তব্যের বিরোধিতা করছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ অন্য কোনো দেশের সাথে এই প্রথমবারের মত আইনী লড়াইতে গেছে। বলে রাখা ভাল যে এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশের দাবী যথেষ্ট ভালভাবেই উপস্থাপিত হলেও বাংলাদেশ যেহেতু এই মামলায় বাদী পক্ষ – তাই প্রমাণ করার দায়ভার বাংলাদেশের ঘাড়ে। অর্থাৎ, সঠিকভাবে প্রমাণ না করতে পারলে মায়ানমারের পক্ষে যাবে রায়। তবে তা সত্ত্বেও আইনী লড়াই যুদ্ধজাহাজ নিয়ে লড়াই করার থেকে বহুগুণে ভাল।

সূত্র -
১) বাংলাদেশের দাবী
২) মায়ানমারের প্রতি-দাবী
৩) বাংলাদেশের উত্তর
৪) মায়ানমারের প্রতি-উত্তর

পুরো ব্যাপারটা নিয়ে ধারণা পেতে হলে নিচের ছবিগুলোও দেখে নিন -
৫) টেরিটোরিয়াল ওয়াটার ক্লেমের ছবি 
৬) বাংলাদেশের কৌণিক সমদ্বিখণ্ডক
৭) মায়ানমারের সমদূরত্ব রেখা
৮) ভারত-বাংলাদেশ-মায়ানমারের কন্টিনেন্টাল শেলফ নিয়ে দাবী-প্রতিদাবীর মানচিত্র
৯) বাংলাদেশ ও মায়ানমারের পুরোনো দাবীর মানচিত্র
১০) গ্রেট বেঙ্গল ফ্যান
১১) বাংলাদেশের বিরোধপূর্ণ গ্যাস-ব্লকগুলো
সবশেষে -
আপডেট পেতে চোখ রাখুন কোর্টের ওয়েবপেজে

ডিজিটাল ডিভাইড আর শিক্ষানীতি

ডিসেম্বর 25, 2012

লেখাটার কথা ভেবেছিলাম অনেক আগেই – যখন সচলে ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে লেখা হচ্ছিল। আমার ধারণা সমস্যা অনেক গোড়ায়, তাই গোড়া থেকেই সমাধান শুরু হওয়া উচিত।

অনেক বছর আগের কথা। আমি তখন সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। স্কুলে নতুন কম্পিউটার এসেছে, ঘরের দরজাও খোলা। দেখি ভেতরে বেশ কয়েকজনে বসে কম্পিউটারে কিছু কাজ করার চেষ্টা করছে। টাইপরাইটার আগে দেখেছি, কম্পিউটারে টাইপ করতে অন্তত পারব, এটুকু বিশ্বাস নিয়ে বসে পড়লাম। আমার এক বন্ধু কিছুটা কম্পিউটার লিটারেট হয়েছে, সে ক’দিন হল ওই ঘরে আসা-যাওয়া করছে। সে আমাকে দেখাল কিভাবে বেসিক প্রোগ্রাম লিখতে হয়। সে আবার কোনো এক স্যারের কাজ করা দেখে দেখে শিখেছে। হেল্প ফাইল দেখে দেখে দুজনে মিলে বেসিক ব্যবহার করে ছবি আঁকা শিখলাম। নিজে শেখার মজাই আলাদা। শেষে যখন বুঝলাম মোটামুটি যেকোনো জ্যামিতিক ছবি আঁকতে পারছি তখনই ঘটল বিপর্যয়। স্কুলের শিক্ষকেরা সিদ্ধান্ত নিলেন যে ওই ঘরটা তালাবন্ধ থাকবে, কারণ কম্পিউটার “দামী জিনিস”, বাচ্চারা তা নিয়ে “খেলাধূলা করলে” তা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে কম্পিউটার শিখেছি, কিন্তু শিক্ষকদের ওই মানসিকতার কোনো পরিবর্তন দেখিনি। তারা মনে করেন, ছাত্রদের কম্পিউটার আর ইন্টারনেট নিয়ে ছেড়ে দিলে তারা কোনো কাজের কাজ করে না। আমি এখনও মনে করি, এটাই আমার ছাত্রাবস্থায় শিক্ষার অপূর্ণতার সবথেকে বড় কারণ। রিসোর্স থাকতেও আমি সব রিসোর্সে ঠিকমত অধিকার পেতাম না।

****

আমাদের দেশে এখন এক অদ্ভূত অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। দেশের সফটওয়ার শিল্পের কল্যাণে একশ্রেণীর লোক সৃষ্টি হয়েছে যারা কম্পিউটার তথা ইন্টারনেটে যথেষ্ট সময় কাটায়। তারা এর উপযোগিতাও বোঝে। তাই তারা তাদের আশেপাশে সবাইকে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে উৎসাহও দেয়। আরেকটা বিরাট দল আছে যারা এখনও কম্পিউটার বা ইন্টারনেট দেখেনি, তাই তারা এর গুরুত্বও বোঝে না। দিনে দিনে যত ইন্টারনেটের আকার, দক্ষতা ও উপযোগিতা বাড়বে, তত প্রথম শ্রেণীর লোকজনে সহজে তথ্য ও জ্ঞান আহরণ করতে পারবে। অপরদিকে, দ্বিতীয় দলে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়বে। যেহেতু আমাদের সমাজ আস্তে আস্তে শিল্পভিত্তিক থেকে পরিবর্তিত হয়ে জ্ঞানভিত্তিক হয়ে যাবে তাই তখন আমাদের সমাজের একটা বড় অংশ চির-অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে, যেমনটা ঘটেছিল শিল্পবিপ্লবের ইউরোপে কৃষকদের ক্ষেত্রে। কিন্তু এই অবশ্যম্ভাবী পরিণতি থেকে মুক্তি কোথায়?

****

এই ডিজিটাল ডিভাইড নিয়ে ভেবেছিলেন সুগত মিত্রও। ১৯৯৯ সালে দিল্লীতে তিনি একটি সফটওয়্যার বহুজাতিকের অফিসের শিক্ষানীতি নিয়ে গবেষণা করার সময় দেখেন তার বহুতল অফিসের বাইরে এক বিশাল বস্তি এলাকার শিশুরা প্রায় কোনো শিক্ষার সুযোগই পায় না। আর স্কুলের জন্য কম্পিউটার বরাদ্দ করলে সেই কম্পিউটার তালাবন্ধ ঘরেই পড়ে থাকবে। সরকারকে দিলে পুলিশ স্টেশনের মত করে কম্পিউটার নিয়ন্ত্রণ করা হবে। তাই ব্যতিক্রমী কিছু ভাবতে হত। তিনি নিজে স্বপরিকল্পিত শিক্ষানীতির প্রবক্তা ছিলেন। এই নীতি বাস্তবে রূপায়িত করার জন্য উনি একটা নতুন প্রোজেক্ট উদ্ভাবন করলেন – যার নাম দিলেন হোল ইন দ্য ওয়াল (Hole in the wall) প্রোজেক্ট। তিনি অফিসের দেওয়ালে একটা গর্ত করে তাতে একটা কম্পিউটার কিয়স্ক (kiosk) রেখে দিলেন। সাথে রাখলেন ওয়েবক্যাম – বাচ্চাদের আচার-আচরণ লক্ষ্য করার জন্য। বড়রা যাতে এতে অধিকার স্থাপন না করতে পারে সেজন্য এগুলো বাচ্চাদের মত উচ্চতায় রাখা হল। মাউসটা একটা খোপের মধ্যে এমনভাবে রাখা হল যাতে বাচ্চাদের হাতই সেখানে ঢুকতে পারে। স্বভাবতই সেটা নিয়ে বস্তিবাসী বাচ্চারা খেলতে শুরু করল। খেলতে খেলতে তারা খুব দ্রুত কম্পিউটার ব্যবহার করতে শিখে গেল। উনি এরপরে কম্পিউটারের সাথে জুড়ে দিলেন হাই-স্পিড ইন্টারনেট। বস্তিবাসী ছেলেরা দ্রুত শিখতে শুরু করল, তাদের ক্লাসের পড়াতেও দ্রুত উন্নতি শুরু হল – বিশেষত ইংরেজী, অঙ্ক আর বিজ্ঞানে। এরপরেও এই পরীক্ষা অনেকবার ভারতের (পরে কম্বোডিয়াতেও) অনেক গ্রামে ও বস্তিতে চালানো হয়েছে। সব ক্ষেত্রেই দেখা গেছে বাচ্চারা কয়েক ঘন্টায় কম্পিউটার চালানো শিখে ফেলছে। তার পরে ইন্টারনেট – আরও পরে গুগল। তার পরে জ্ঞানের ভান্ডার হাতের সামনে পেয়ে যাচ্ছে। অনেকে প্রচুর গেমও খেলছে, গুগলের পাশাপাশি ডিসনি ডট কম তাদের প্রিয় সাইট। তার বক্তব্যে -

“হঠাৎ করে দেখা গেল তারা তাদের শিক্ষকদের থেকে বেশী জেনে ফেলেছে। শিক্ষকদের ক্লাসে এমন কিছু প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে যার উত্তর তারা নিজেরা জানেন না। কয়েকমাস আগে আমি নিজেকে একরকম চ্যালেঞ্জ করে তামিলনাডুর একটা গ্রামে কম্পিউটার কিয়স্কে ডি-এন-এ সম্পর্কিত অনেক ডকুমেন্ট রেখে দিলাম। আমার ধারণা ছিল ৬-১২ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে উচ্চতর শিক্ষার ডকুমেন্ট অপ্রয়োজনীয় মনে হবে ও তারা এর কিছুই বুঝবে না। কিন্তু তিন মাস পরে, তাদের ওই ডকুমেন্ট-সংক্রান্ত বিষয়ে পরীক্ষা নিয়ে দেখলাম অন্তত ৩০% বিষয়ে তারা জ্ঞান অর্জন করেছে। আর তাও সব ইংরেজীতে পড়েই। “

 

মজার কথা, দিল্লীর বস্তির বাচ্চারা কিন্তু কম্পিউটারের টার্মগুলোই তখনও শেখে নি, তারা বরং নিজেদের মত কিছু কিছু নাম দিয়ে এগুলোকে চিহ্নিত করেছে। মাউসের নাম দিয়েছে “সুই” (সূচ) আর আওয়ারগ্লাসের নাম দিয়েছে ডম্বরু (ডুগডুগি)। তাদের বক্তব্য হল -

“যখন কম্পিউটার কোনো কাজে ব্যস্ত হয় তখন “সুই” থাকে না, তা “ডম্বরু” হয়ে যায়।”

 

পরীক্ষার কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ ও চমকপ্রদ পর্যবেক্ষণ ছিল। প্রথমত, ইংরেজী বা অন্য বিজাতীয় ভাষা কোনোভাবেই শিক্ষার প্রতিবন্ধকতা হয় না – যদি বাচ্চাদের মধ্যে যথেষ্ট আগ্রহ তৈরী করা যায়। প্রথমদিকে উনি হিন্দিতে কিছু লেখা ও লিঙ্ক বানিয়ে ডেস্কটপে রেখে দিতেন, যাতে থাকত কিছু হিন্দি ওয়েবসাইটের লিঙ্ক। দেখা গেল বাচ্চারা সেসব পাত্তাই দেয়নি, তারা সরাসরি ইংরেজীতেই ইন্টারনেট সার্ফ করে গেছে। সব ইংরেজী শব্দের মানেও তারা বোঝে নি, কিন্তু ধীরে ধীরে কার্যকরী শিক্ষা পেয়ে গেছে তা থেকে। যেসব অঞ্চলের বাচ্চারা কিছুটা স্কুলশিক্ষা পেয়েছে, তারা ডিকশানারিও বের করে ফেলেছে ইন্টারনেট থেকে।

দ্বিতীয়ত, এদের শিক্ষাগ্রহণের পদ্ধতিটাও অন্যরকম। প্রথম কয়েক ঘন্টার মধ্যেই কার্যত কিছু লিডার তৈরী হয়ে যায় ভিড়ের মধ্যে থেকে। কেউ কেউ তাড়াতাড়ি শিখতে পারে, তারা কাজ করে যায়। কেউ কেউ ব্যাপারটা ভাল বোঝাতে পারে, তারা ভিড়ের উৎসুক জনতাকে বুঝিয়ে চলে। কেউ বা আবার দেখাশোনা করে যাতে সবাই কিছুক্ষনের জন্য বস্তুটা ছুঁতে-ধরতে পারে। দল-বেঁধে শিক্ষাগ্রহণের এই পদ্ধতি স্কুলেও আছে – কিন্তু স্কুলে তা বাইরে থেকে শেখানো হয়। এখানে একই পদ্ধতি নিজে থেকেই বাচ্চারা তৈরী করে নেয়।

এই পরীক্ষাগুলোর ভিত্তিতে উনি প্রস্তাব করেন যে একবিংশ শতকে উন্নয়নশীল বিশ্বে যেহেতু গ্রামাঞ্চলে ও বস্তি এলাকায় উপযুক্ত শিক্ষকের ও বইপত্রের অভাব বড় হয়ে দেখা যেতে পারে, তাই কম্পিউটারের মাধ্যমে কার্যকর শিক্ষা দিয়ে সম্পূর্ণ স্কুল-সিস্টেমের বাইরেও শিক্ষিত জনসাধারণ গড়ে তোলা যায়। অনেকেই মনে করেন শিক্ষকের ও স্কুলের অভাব কম্পিউটার দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। সুগত মিত্রের দাবী -

“যদি কোনো শিক্ষককে কম্পিউটার দিয়ে প্রতিস্থাপিত করাই যায় – তাহলে করাই শ্রেয়। ন্যূনতম শিক্ষার অধিকার পেতে যেখানে বছরের পর বছর লেগে যায়, সেখানে কোনো লাল-ফিতে ছাড়াই কম খরচে যদি তার ৩০% শিক্ষাও সাধারণ জনগণের মধ্যে আনা যায়, তাহলে তা-ই কেন নয়? শুধু তাই নয়, ছাত্ররা ঝটপট শিখতে শুরু করলে দ্রুত শিক্ষকেরাও শিখতে বাধ্য হবেন – শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে”।

 

বর্তমানে দিল্লীতে চল্লিশ জায়গায় এরকম “হোল” বসানো হয়েছে। হায়দ্রাবাদে বসানো হয়েছে গোটা দশেক। পরের পদক্ষেপ – প্রত্যন্ত গ্রামে একে নিয়ে যাওয়া ওয়্যারলেস প্রযুক্তি ব্যবহার করে।

আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয় এই ডিজিটাল ডিভাইড দূর করার পথে এই মুক্ত ও দলবদ্ধ স্বপরিচালিত শিক্ষাই প্রথম অস্ত্র হতে পারে উন্নয়নশীল যেকোনো দেশে। আর এই ডিভাইড দূর না করতে পারলে ই-কমার্স বা ইন্টারনেট-ভিত্তিক সেলফ-লার্নিংও দেশে আনা সম্ভব নয়। যে কোনো মূল্যে এখন কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে কার্যকরী শিক্ষা প্রণয়ন না করতে পারলে ভবিষ্যতে তার জন্য বড় ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে।

একটা ট্রিভিয়া – সম্প্রতি স্লামডগ মিলিয়নিয়ারের লেখক বিকাশ স্বরূপ বলেছেন তার লেখার অনুপ্রেরণা ছিল সুগত মিত্রের এই হোল ইন দ্য ওয়াল প্রোজেক্ট। প্রত্যুত্তরে সুগত মিত্রের দাবী – উনি নিজে লিখলে বইটার নাম দিতেন স্লামডগ নোবেল লরিয়েট – কারণ তার প্রোজেক্টের মূল লক্ষ্য ছিল বাচ্চাদের শিক্ষা দেওয়া – বড়লোক বানানো নয়।

সূত্র – টেড টক

সংক্ষেপে আরেকটা ভিডিও হোল ইন দ্য ওয়াল ও স্লামডগ মিলিয়নেয়ার নিয়ে নিয়ে।

সাক্ষাতকার – প্রথম ও দ্বিতীয় লিঙ্ক। স্লামডগ মিলিয়নেয়ার নিয়ে এখানে

নদী অববাহিকা ও আন্তর্জাতিক আইন

ডিসেম্বর 25, 2012

জলসম্পদ নিয়ে দেশে দেশে বিবাদ বহুবছরের পুরোনো, কারণ জল মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান উপাদান। মধ্যপ্রাচ্যের মত অঞ্চলে যেখানে পৃথিবীর জলসম্পদের মাত্র ১% পাওয়া যায় অথচ জনসংখ্যা ক্রমবর্ধমান, সেখানে এই বিবাদ বাকী অংশের থেকে বেশী জোরালো। সাম্প্রতিককালে জলসম্পদের ক্রমাগত দুষ্প্রাপ্যতার কারণে বিবাদের সংখ্যাও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু জল-সম্পদের ভাগাভাগি নিয়ে আইনি সহায়তায় বিবাদ-মীমাংসা আধুনিক যুগে শুরু হয়েছিল ইউরোপ আর আমেরিকাতে। প্রথমদিকে মনে করা হত যে দেশ বা অঞ্চলে নদী বা কোনো জলসম্পদের অবস্থান, সেই দেশের সার্বভৌম অধিকার থাকবে সেই সম্পদের ওপর (Harmon Doctrine)। কিন্তু প্রযুক্তিগত উন্নতির পর বড় বড় বাঁধ তৈরীর ফলে বোঝা গেল এরকম অধিকারের ফলে অববাহিকার উজানের দেশ বেশী সুবিধা পেয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে অন্য বিকল্প হিসাবে মোহানার নিকটবর্তী দেশের প্রয়োজন ছিল নদীর জলের পরিমাণ ও গুণাবলীর ওপর সম্পূর্ণ অধিকার যাতে উজানের দেশ কোনোভাবেই সেই জল নিতে (বা দূষিত করতে) না পারে। উভয় নীতিই পক্ষপাত দোষে দুষ্ট, তাই এই দুই নীতি থেকে সরে এসে সমতার (Equity) নীতি অনুসারে জলসম্পদের বন্টন করার আইন চালু হল। সমতা অর্থাৎ সকল বিষয় ও প্রভাব ভেবে নিয়েই জলসম্পদ বন্টন হবে।

autoআন্তর্জাতিকভাবে প্রথম এই জলসম্পদ-আইন প্রস্তাব করা হল হেলসিঙ্কিতে। প্রাথমিকভাবে এই খসড়া প্রস্তাবনা বা গাইডলাইন শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক নদীগুলো জন্য প্রযোজ্য ছিল। এর পরে জাতিসংঘের উদ্যোগে ১৯৭০ সালে এ নিয়ে একটি বহুপাক্ষিক চুক্তির প্রস্তাবনা হয়। এর নাম দেওয়া হয় নৌচলাচল ব্যতিরেকে আন্তর্জাতিক নদীসম্পদ ব্যবহারের আইন (সংক্ষিপ্তপূর্ণাঙ্গ)। ১৯৯৭ সালে এই সনদের প্রস্তাবিত বয়ানের ওপর ভোটাভুটি হয় ও ১০৩-৩ ভোটে তা গৃহীত হয়। একে আইন হিসাবে গ্রাহ্য হবার জন্য সব দেশকে আভ্যন্তরীণ পার্লামেন্টে তার গ্রহণযোগ্যতা স্বীকার করতে হবে। সনদটির মূল সমস্যা দেখা দেয় চিন (তুরস্ক, চিন আর রোয়ান্ডা বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল **) এর বিরোধিতা করায়। এই চুক্তির ভবিষ্যত অনিশ্চিত তাই এখনও অবধি মাত্র ১৬টি দেশ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। (ছবিতে – স্বাক্ষরকারী দেশ, পক্ষের-বিপক্ষের দেশ)

আশার কথা, আন্তর্জাতিক আইন সংঘ (International Law Association) নামে একটি সংস্থা – যারা জাতিসংঘকে আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ক সাহায্য করে – তাদের প্রস্তাবিত আইনসমূহ নিয়ে বার্লিনে আলোচনার পরে ২০০৪ সালে জলসম্পদ আইনের প্রস্তাবনা (সংক্ষিপ্ত ,পূর্ণাঙ্গ) হয়। এই আইন আদপে জাতিসংঘের আইনের পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত রূপ, যাতে নৌচলাচল সম্পর্কিত আইনও অন্তর্ভুক্তি পেয়েছে এবং হেলসিঙ্কি আইনের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। এই আইন কমিটিতে ভারত ও বাংলাদেশের সদস্যরাও অংশগ্রহণ করেছে ও উভয় দেশই আইন নিজদেশে স্থানীয় আইনের মাধ্যমে একে গ্রহণ করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

autoআগের আইনগুলোর মত এক্ষেত্রেও আইনের মূলনীতি হল সমতা। তবে আগের তুলনায় বার্লিন কনভেনশনে অনেক স্পষ্টভাবে তা উল্লিখিত আছে। সমতার নীতি অনুসারে যে যে মাত্রা অনুসারে অববাহিকার একাধিক দেশের মধ্যে জলসম্পদ বন্টন হওয়া উচিত সেগুলো হল (আর্টিকেল ১২, ১৩) -
১) ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক অবস্থা
২) সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজন,
৩) জনসংখ্যা,
৪) এক দেশের ব্যবহার অন্য দেশকে প্রভাবিত করে,
৫) বর্তমান, ভবিষ্যত ও সম্ভাব্য ব্যবহার
৬) জলসম্পদ সংরক্ষণের ও উন্নয়নের খরচা
৭) বিকল্পের সুযোগ
৮) প্রস্তাবের সময়কাল
৯) পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব
১০) প্রাসঙ্গিক অন্য যে কোনো মাত্রা
এ বিষয়ে উল্লেখ্য যে এখানে জলসম্পদের মধ্যে পানীয় ও রান্নার জন্য ব্যবহৃত জলকে ধরা হচ্ছে না (ধরা হচ্ছে না খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত ন্যূনতম প্রয়োজনীয় জলকেও)। সমতার মাধ্যমে বন্টনের সময় জনসাধারণের জীবনধারণের জন্য অবশ্য-প্রয়োজনীয় জলের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে আর এজন্য প্রয়োজনীয় জল বরাদ্দ রাখতে হবে। (আর্টিকেল ১৪)

autoজলসম্পদ বন্টনের মত নৌচলাচলের ক্ষেত্রেও অববাহিকার সব দেশই একে অপরকে সমতার ভিত্তিতে স্বাধীনভাবে জলপথ ব্যবহার করতে দেবার কথা বলা আছে। নৌচলাচলের স্বাধীনতার মধ্যে পড়ে জলপথ ব্যবহারের, অববাহিকার বন্দর ও ডক ব্যবহারের এবং নদীপথে মালপত্র পরিবহনের স্বাধীনতা (অস্ত্রবাহী বা নৌবাহিনীর জাহাজ এই চুক্তির আওতায় আসে না) – অবশ্য সেজন্য ব্যবহারকারী দেশের ওপর নন-ডিস্ক্রিকিমিনেটরি কিছু শুল্ক আরোপ করা যেতে পারে। (আর্টিকেল ৪৩-৪৯)

এছাড়াও এই আইনে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি, অববাহিকার অবস্থা পর্যালোচনার কমিটি গঠন, ভৌমজল ব্যবহার, খরা-বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ দূষণ, জৈববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, বিবাদ-মীমাংসা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে মোট ৭৩টি অনুচ্ছেদ আছে। তবে এদের সকলেরই মূলভিত্তি একই – সমতা। কোনো অবস্থাতেই অববাহিকার সম্পদের সার্বভৌম অধিকারের কথা বলা নেই।

কিন্তু এই সমতার আইনটা নিয়ে বিশেষজ্ঞ ম্যাকেফ্রি প্রশ্ন তুলেছেন ও বলেছেন যে এই সমতার সংজ্ঞায়িতকরণের জন্য পরের বিশেষজ্ঞরা যে দ্বন্দে পড়বেন। একটা প্রশ্ন রেখেছেন উনি। ধরা যাক তিনটি দেশ (বা অঞ্চল) ক, খ আর গ একই নদী অববাহিকায় অবস্থিত(তুলনীয় বলে যথাক্রমে নেপাল, ভারত আর বাংলাদেশ ভাবতে পারেন)। ধরা যাক পর্বতসঙ্কুল “ক” অঞ্চলে কোনো চাষাবাদ হয়না কিন্তু সমতল “খ” ও “গ” দেশে হাজার হাজার বছর ধরেই চাষ হয়ে আসছে। এখন, প্রযুক্তির উন্নতির ফলে দেখা গেল “ক”-তেও চাষ করা সম্ভব হবে। তাই, ক সিদ্ধান্ত নিল যে তারও জল লাগবে। কিন্তু এর ফলে খ ও গ দেশে জলের যোগাণ কমতে বাধ্য। এখন সমতা এখানে কি ভাবে আনা সম্ভব হবে? যদি, ক-কে কিছু জল দিতেই হয় তাহলে খ আর গ বলবে আমাদের কৃষকেরা না খেয়ে মারা যাবে। আবার ক বলবে সমতা অনুসারে চাষ করার অধিকার আমার আছে, নদী অববাহিকার জলের ভাগ আমারও প্রাপ্য।

জটিলতা থাকলেও একটা বিষয় বুঝে নেওয়া উচিত যে নদী-অববাহিকার সব সম্পদের সমতা মেনেই ব্যবহার হওয়া উচিত। আর এই সমতার মাধ্যমেই একমাত্র বিবাদ-মীমাংসা হতে পারে। দুঃখের বিষয় এই ব্যাপারে রাষ্ট্রনীতি খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। চিন, তুরস্ক ও রোয়ান্ডার জাতিসংঘে বিরুদ্ধ ভোট থেকেই তা স্পষ্ট। তাছাড়াও, অববাহিকার দুই দেশের বিবাদের সময় প্রায়শই উজানের দেশ নদীবাঁধের সময় নিজ জলসম্পদের ওপর সার্বভৌমত্বের দাবী জানায় আর ভাটির দেশ জলপথ ও বন্দরের ওপর নিজের সার্বভৌমত্বের দাবী ছাড়তে চায় না। শুধু তাই নয়, এই সার্বভৌমত্বের ধারণা জনগণকে বোঝানোও সহজ – দেশের ভৌগোলিক সীমার মধ্যে অবস্থিত সব কিছুর সর্বভৌম অধিকার রাষ্ট্রের। অথচ, ভাটির দেশের জলপথ উজানের দেশ ব্যবহার করলে নিজ-স্বার্থেই সে জলসম্পদের যথেচ্ছাচার করবে না, এই ফর্মুলায় উভয়েরই লাভ, সমতা মেনেই। আন্তর্জাতিক আইন মাত্রেই এক-একটি কম্প্রোমাইজ ফর্মুলা – যা মেনে উভয়পক্ষই কিছুটা করে ক্ষতি স্বীকার করেও বিবাদ-মীমাংসা করা সম্ভব। সেই হিসাবে জলসম্পদ সহ অববাহিকার সকল প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পদের সমতা মেনেই সর্বোত্তম ব্যবহার করা উচিত। এতেই রাষ্ট্রের কাল্পনিক সার্বভৌমত্বের কিছুটা ক্ষতি হলেও অববাহিকার মানুষের সবথেকে বেশী লাভ। ভবিষ্যতে আইনও সেই পথেই চলবে। আর অববাহিকার দেশগুলোও আশা রাখা যায় সমতার পথে চলে নিজেদের মধ্যেই আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিবাদ-মীমাংসা করে নেবে।

** এই তিন দেশ মূলত নদীর ওপর সার্বভৌম ক্ষমতায় বিশ্বাসী। চিনের সব বড় নদীরই উৎপত্তি চিনেই, বরং মেকং ও ইরাবতী সহ কয়েকটি দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার নদীরও উৎসও চিন। তুরস্কের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার – টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর তুরস্কে উৎস হলেও ইরাকে এই দুই নদী জনজীবনে গুরুত্বপূর্ণ। রোয়ান্ডা ও উগান্ডা হল নীলনদের (শুভ্রনীল বা হোয়াইট নীল) উৎস। তাই এরা ভাটির দেশের সাথে সমতা মেনে জলসম্পদ ভাগ করতে উৎসুক নয়।

পারভেজ হুদভয়ের চোখে আজকের পাকিস্তান

ডিসেম্বর 25, 2012

সচলায়াতনে পাকিস্তানী হিউম্যানিস্ট কোনো লেখকের লেখা প্রকাশিত হয় নি। আমি পারভেজ হুদভয়ের একটা সময়পোযোগী সাক্ষাৎকার বাংলায় অনুবাদ করে দিলাম। এম-এই-টি থেকে পি-এইচ-ডি করা পারভেজ হুদভয় ১৯৭৩ সাল থেকে পাকিস্তানের কায়েদে আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক। ইনি পাকিস্তানে মশাল নামে একটি সংগঠনেরও পরিচালক। এই সংগঠনের কাজ হল নারীশিক্ষার প্রসার ও পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি। বিজ্ঞান-সচেতনতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে নির্মিত ওনার ১৩ পর্বের ডকুমেন্টরিও পাকিস্তান টিভিতে প্রচারিত হয়েছে। ২০০৩ সালে বিজ্ঞানশিক্ষা প্রসারের ওপর কাজ করার জন্য ইউনেস্কো থেকে উনি বিশেষ পুরষ্কার পান।

নিচের সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ক্রিশ্চিনা ওটেন, জার্মান ফোকাস পত্রিকার জন্য। এটা প্রকাশিত হয়েছে কাউন্টারকারেন্টসে, গত ১৫ই ডিসেম্বর।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক মুম্বই হামলার পরে ক্রমাগত খারাপ হয়েই চলেছে। যুদ্ধ লাগার সম্ভাবনা কতটা?

জনগণের দাবী সত্ত্বেও মনমোহন সরকার সীমান্ত পেরিয়ে কোনো আক্রমণ করেনি। দেশে অনেকের সমালোচনা সত্ত্বেও পাকিস্তান সরকার লস্কর-ই-তৈবার বিরুদ্ধে কিছু ব্যবস্থা নিচ্ছে। হয়ত এখন আর কিছু হবে না, তবে এখনকার মত কোনো সম্ভাবনা না থাকলেও আরো একবার একই রকমের হামলা হলে ব্যাপারটা যুদ্ধের আকার ধারণ করতেই পারে।

লস্কর-ই-তৈবার সাথে আর সন্ত্রাসী দলগুলোর তফাৎ কোথায়? পাকিস্তান কি সত্যিই এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে?

আজ থেকে বছর পনের আগে আই-এস-আই আর আর্মির হাত ধরে কাশ্মীরে ভারতীয় সেনার বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করার জন্য লস্করের গোড়াপত্তন। আজকের দিনে এরা খুব বিরল প্রজাতির সন্ত্রাসী দল যাদের পাকিস্তানী রাষ্ট্র বা সেনাবাহিনী সম্পর্কে কোনো অভিযোগ নেই, কিন্তু বাকি সকলেই এদের শত্রু হয়ে গেছে। এখন শুনছি পাকিস্তান কিছু লস্কর সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। সময়ই বলে দেবে এটা আন্তর্জাতিক চাপ কমানোর চেষ্টা না সত্যিকারের সন্ত্রাসদমন প্রচেষ্টা। যদি সত্যিকারের প্রচেষ্টা হয়ে থাকে, তাহলে কিছু সময়ের মধ্যেই আর্মি আর আই-এস-আই এর সাথে এদের শত্রুতা দেখা দেবে, যেমনটা হয়েছিল জৈশ-ই-মহম্মদের ক্ষেত্রে।

মুম্বাই গণহত্যা সম্পর্কে পাকিস্তানের জনগণের প্রতিক্রিয়া কি?

৯/১১ এর পরে যেমন আনন্দোৎসব দেখা গিয়েছিল, সে জায়গায় মুম্বই হামলার পরে পাকিস্তানি জনগণ প্রাথমিকভাবে ভারতের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। কিন্তু ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো যখনই পাকিস্তানকে দোষ দেওয়া শুরু করল, তখন প্রথমে ক্রোধ ও পরে অস্বীকারের রাস্তায় হাঁটতে থাকে সবাই। পাকিস্তানের মাটি থেকেই আক্রমণের ছক কষা হয়েছে – এ দাবী তারা মানতে নারাজ। জনপ্রিয় টিভি-নিউজ ব্যক্তিত্বরা সবাই টিভিতে এসে একের পর এক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব খাড়া করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বছর কয়েক আগে এই ব্যক্তিত্বরাই কান্দাহার বিমান ছিনতাই মামলায় র’-এর ছায়া দাঁড় করিয়ে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছিল, যার কোনোটাই ধোপে টেঁকেনি। পাকিস্তান যে কারগিলের ঘটনায় জড়িত, তা-ও এরা হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। সমঝোতা এক্সপ্রেসের বোমা হামলার উল্লেখ করে এখন তারা একে একে হিন্দু জঙ্গী গোষ্ঠী, আমেরিকা বা ইহুদীদের দোষারোপ করে।

পাকিস্তান অনেককাল ধরেই বলে আসছে যে ভারতের দিক থেকে হামলার আশঙ্কা করলে তারাই প্রথম নিউক্লিয়ার হামলা করবে। পাকিস্তানে সেরকম কোনো সম্ভাবনা দেখছেন আপনি?

মুম্বাই হামলার সপ্তাহখানেক আগে জারদারি আশ্বস্ত করেছেন যে পাকিস্তান কখনই প্রথমে নিউক্লিয়ার আক্রমণ করবে না। ভারতও বছর দশেক আগেই এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে জারদারির এই দাবী ভিত্তিহীন কারণ পাকিস্তান আর্মির পক্ষ থেকে এরকম কোনো বক্তব্য রাখা হয় নি। সবাই জানে, পাকিস্তানে আর্মির হাতেই নিউক্লিয়ার বোমা আছে। অনেকদিন ধরেই বিভিন্ন বিশেষজ্ঞরা পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সিমুলেশন করে সিদ্ধান্তে এসেছেন যে কোনোভাবে যুদ্ধ শুরু হলে নিউক্লিয়ার বোমাতে গিয়েই যুদ্ধ শেষ হবে।

সন্ত্রাসীরা আফগানিস্থান আর সেখানের পশ্চিমি সেনাদের ছেড়ে কেন ভারতকে লক্ষ্য হিসাবে বেছে নিল?

লস্করের মূল ঘাঁটি হল লাহোরের কাছে ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে অবস্থিত মুর্দিকে শহরে। এই শহরে এদের আছে একটা বড় ট্রেনিং ক্যাম্প আর সমাজসেবক সংস্থা। লস্করের অধিকাংশ সদস্যই পাঞ্জাবী, তাই এরা আফগানিস্থানে লড়াই করার পক্ষে অনুপযুক্ত, কারণ এরা সহজে পাশতুন বা আফগানদের সাথে মিশে যেতে পারে না। লস্কর হল ভারতমুখী ও কাশ্মীরমুখী একটি সন্ত্রাসী দল। কিন্তু, পাকিস্তানের অন্যান্য জঙ্গীগোষ্ঠীদের মতই এরাও ভারত, আমেরিকা আর ইসরায়েলের মধ্যে বোঝাপড়া আছে বলে মনে করে। তাই, এরা সবাই এই দেশগুলোর শত্রু।

মুম্বই-সন্ত্রাসীদের হামলার দাবী কি ছিল?

সব জিম্মিদের হত্যা করা হয়েছে আর কোনো দাবী সরকারীভাবে প্রকাশিত হয় নি। লস্কর বা সমধর্মী পাকিস্তানি জঙ্গীগোষ্ঠীদের উদ্দেশ্য খুবই পরিষ্কার। এই ক্ষেত্রে, ভারতের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কেন্দ্রস্থল হিসাবে মুম্বইকে আক্রমণ করা হয়েছে, হয়ত ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বাধিয়ে দেওয়াও উদ্দেশ্য ছিল। ভারত-সীমান্তে পাকিস্তানী সেনা সরালে তাদের দলের তালিবানদের সুবিধা হবে। ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিন্দু দক্ষিণপন্থীদের হাত শক্ত করাও এদের লক্ষ্যের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, কারণ এর ফলে এদের দলে আরো নতুন মুখ পাওয়া সোজা হবে। সবেশেষে, অমুসলিমদের বিরুদ্ধে ক্ষোভের উদ্গিরণও ঘটেছে এই আক্রমণে।

পশ্চিমা সাংবাদিকেরা বলছেন আল-কায়দা আর লস্কর-ই-তৈবা এখন যৌথ কার্যক্রম চালাচ্ছে, এ বিষয়ে আপনার মত কি?

এদের উদ্দেশ্য একই রকম হলেও সামান্য কিছু মতাদর্শগত তফাৎ থাকতেই পারে। সন্ত্রাসীদের দুনিয়ায় সামান্য মতাদর্শের পার্থক্যই দুই দলের মিলিত কার্যক্রমের জন্য যথেষ্ট প্রতিবন্ধকতা হয়ে দেখা দিতে পারে। এখনও অবধি এদের যৌথ কার্যক্রমের কোনো পরিচয় পাওয়া যায় নি, তাই এই ধারণাকে আমি এখনও সন্দেহাতীত বলে মনে করি না।

এই সন্ত্রাসে কাশ্মীরের ভূমিকা কতটা?

কাশ্মীরে ১৯৮৭ থেকেই বিপ্লব চলছে। ১৯৮৭ সালের ভোটে ব্যাপক আকারে কারচুপির ফলে এক গণবিক্ষোভ সৃষ্টি হয় যা ভারত সেনা পাঠিয়ে বলপূর্বক দমন করে। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এই সুযোগে এক গোপন যুদ্ধ শুরু করে ভারতের বিরুদ্ধে। ইউনাইটেড জিহাদ কাউন্সিল বলে এক ২২টি পাকিস্তানী সংগঠনের সমবায় সংস্থা সেনা ও আই-এস-আই-এর সহায়তায় তাদের কার্যকলাপ চালিয়ে যায়। এদের সহায়তায় জেনারেল মুশারফ ১৯৯৯ সালে কারগিলে যুদ্ধ শুরু করেন। এতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্ষতি হলেও পাকিস্তানও শেষমেষ সেনা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। জেনারেল মুশারফ যুদ্ধে বিজয়ীর মর্যাদা পান, আর ভীরু বলে চিহ্ণিত হন নওয়াজ শরিফ। এর পরের ঘটনা সবারই জানা।

পাকিস্তানি সমাজের কোন অংশ আল কায়দা আর ওসামা বিন লাদেনকে সমর্থন করে?

বালুচিস্তান আর সিন্ধে ওসামার প্রতি সমর্থন পাঞ্জাব আর উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের তুলনায় অনেক কম। মজার কথা হল পাকিস্তানের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী নিজেরা পশ্চিম-ঘেঁষা জীবনযাপণ করেন আবার ওসামার প্রতি সমর্থন বা পশ্চিম-বিদ্বেষও তাদের মধ্যেই বেশী। আমি খুবই অবাক হই যখন তালিবান আত্মঘাতী ঘাতকেরা দেশের মসজিদ, শোকসভা, হাসপাতাল, মেয়েদের স্কুল আক্রমণ করে বা নিরীহ পুলিশদের মেরে ফেলে অথচ তাদের বিরুদ্ধে কিছু শোনা যায় না। জনগণ এতটাই আমেরিকা-বিরোধী যে এই ঘটনাগুলোও তাদের মনে দাগ কাটে না। অনেক সময় পাকিস্তানী বামপন্থীরাও তালিবানদের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী শক্তি বলে ভুল ভেবে বসে।

এ বিষয়ে আপনার মতামত কি? এই তালিবানদের কি সত্যিই পাকিস্তান-সমাজে কিছু অবদান আছে?

পৃথিবীর সর্বত্র মানুষ যা চায় পাকিস্তানীদেরও তাই দাবী। খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান, চাকরি-বাকরি, উন্নত বিচারব্যবস্থা ও উন্নয়নমুখী সরকার আর সুরক্ষা। এর সাথে আছে শিক্ষা ও চিন্তা ও ধর্মাচরণের স্বাধীনতা যা ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইটস ডিক্লারেশনে আছে। এর পরে আসে দেশের সার্বভৌমত্ব, বিদেশনীতি ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যু। এ কারণে, পাকিস্তানে এই তালিবান-গোত্রীয়রা কোনো অবদান রেখেছে বলে মনে হয় না। তারা পরিবার-পরিকল্পনা-বিরোধী, সংখ্যালঘু-বিরোধী, নারীশিক্ষার বিরোধী। বহির্বিশ্ব সম্পর্কে এদের কোনো জ্ঞান নেই, জানার কোনো ইচ্ছাও নেই। তারা শুধু যুদ্ধের মাধ্যমেই সমাধান খোঁজে। পাকিস্তানে এবারের ভোটে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে জনগণ এদের পছন্দ করে না।

২০০২ এর জানুয়ারীতে পারভেজ মুশারফ ঘোষণা করেছিলেন যে পাকিস্তানের জমি ব্যবহার করে কেউ সীমানা পেরিয়ে আক্রমণ চালাতে পারবে না। সেই প্রতিশ্রুতি কি রাখা হয়েছিল?

এই ঘোষণার পরে সত্যিই সীমানা পেরিয়ে আক্রমণ অনেকটা কমে গিয়েছিল, কিন্তু কোনোভাবেই নির্মূল হয়ে যায় নি। অক্টোবরের ভূমিকম্পের পরে আমি নিজে ত্রাণের কাজে আজাদ কাশ্মীরের বিভিন্ন অংশে ঘুরে এসেছি। দেখেছি – লস্কর-ই-তৈবা, জৈশ-ই-মুহম্মদ বা সিপাহী-ই-সাহেবা আর অন্যান্য নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন ত্রাণ বিলি করছে। এদের ত্রাণ বিতরণের পরিকল্পনা পাকিস্তান সরকার বা আর্মির চেয়ে অনেকগুণ উন্নত – এমনকি আহত সেনাদেরও এরা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করেছে। অথচ, পারভেজ মুশারফকে কয়েক মাস পরে এ কথা বলাতে দেখলাম উনি রেগে যাচ্ছেন, যেন এই দলগুলো নিয়ে আলোচনাও নিষিদ্ধ।

পাকিস্তানে কিছু গোষ্ঠী আছে যারা আমেরিকা-বিরোধী ও কড়া ধর্মীয় আইন প্রবর্তন করার পক্ষে, আর উল্টোদিকে দেশের সরকার আমেরিকার বন্ধুদেশ বলে নিজেদের দাবী জানায়। এই মেরুকরণের কারণ কি? পাকিস্তানে উগ্রবাদের উত্থানে এই মেরুকরণের ভূমিকা কতটা?

পাকিস্তানে মৌলবাদী শক্তির উত্থানের মূলে আছেন আমেরিকা ও রোনাল্ড রেগানের সমর্থিত পাকিস্তানী জেনারেল জিয়া উল হক। আজ থেকে বছর পঁচিশেক আগে, এই দুই নেতা হাত মিলিয়ে আফগানিস্তানে সোভিয়েতদের তাড়ানোর জন্য দেশে উগ্রবাদী শক্তির বীজ বপন করেন। সেই সময়ে মৌলবাদের প্রসারে আমেরিকা খুশীই হত, কারণ সেই প্রসার তাদের লক্ষ্যপূরণের মাধ্যম হিসাবে কাজ করত। সেই একই সময়ে, জেনারেল জিয়ার আমলে সারা দেশে একটা সামাজিক পরিবর্তন দেখা দেয়। সব সরকারি অফিসে নামাজ পড়া বাধ্যতামূলক করা হল, জনসমক্ষে অপরাধীদের বেত্রাঘাত করা শুরু হল, রমজানে উপোস না করলে শাস্তির ব্যবস্থা করা হল, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের সময় ইসলাম সম্পর্কিত জ্ঞানেরও পরীক্ষা নেওয়া শুরু হল এবং সব মুসলিমদের জন্য জিহাদ বাধ্যতামূলক করা হল। কিন্তু আজকে সেই উগ্রবাদীদের সাথেই সরকারের লড়াইতে যেতে হয়েছে, আবার সেই আমেরিকারই নির্দেশে। দেশের আর্মি ও সরকার আমেরিকার সাথে থাকলেও তাই জনগণ স্বাভাবিকভাবেই আমেরিকা বিরোধী।

প্রেসিডেন্ট জারদারি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে উনি উগ্রবাদীদের খুঁজে তাদের ট্রেনিং ক্যাম্প ধ্বংস করবেন। কিন্তু কাজে সেরকম কোনো লক্ষণ দেখছি না। উনি কি এর চেয়ে বেশী কিছু করতে চান না? নাকি এর থেকে বেশী কিছু করার ক্ষমতাই ওনার নেই?

আসল ক্ষমতা পাকিস্তানের আর্মির হাতে। এই উগ্রবাদীদের সাথে লড়াইতে দু’হাজার সেনা মারা পড়েছে। তাও আর্মি ভেতর থেকে নিশ্চিত নয় যে এই উগ্রবাদীরা পাকিস্তান দেশটাকে বাঁচিয়ে রাখার পরিপন্থী। আমি এদের এই দ্বিধার কারণ বুঝি। বছরের পর বছর ধরে আর্মিতে এই বুঝিয়ে লোক নেওয়া হয়েছে যে তারা ভারতের সাথে যুদ্ধ করবে ও ইসলামকে রক্ষা করবে। কার্যত, এখন তারা লড়াই করছে এমন এক দলের সাথে যারা ইসলামের আরো বড় রক্ষক। শুধু তাই নয়, আর্মিকে এখন ভারতের সাথে যুদ্ধও করতে হচ্ছে না। এই ধোঁয়াশা থেকেই তাদের ডিমরালাইজেশন আর তার সাথে যোগ হয়েছে গণসমর্থনের অভাব। উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে পাকিস্তানী সেনাদের অনেকেই তাই যুদ্ধের আগেই আত্মসমর্পণ করে দিচ্ছে।

সরকারের উগ্রবাদ-বিরোধী যুদ্ধ কি আপনি সমর্থন করেন?

জীবনে এই প্রথমবারের মত আমি মনে করি আর্মিকে সমর্থন করা দরকার, যতক্ষণ তারা নিরীহ লোকদের ছেড়ে শুধু উগ্রবাদীদের খুঁজে মারতে পারবে। দুঃখের বিষয়, নিজেদের কাজ কমানোর জন্য আর্মি এখন কোনো গ্রামে কিছু উগ্রবাদী আছে বলে সন্দেহ করলেই গোটা গ্রামশুদ্ধু উড়িয়ে দিচ্ছে। এরকম নিরীহ মানুষ হত্যা করা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।

পাকিস্তান একসময় তালিবানদের অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছে। আল-কায়দার সদস্যদের ধরে দেবার জন্য সদস্যপিছু পাকিস্তানকে সি-আই-এ টাকা দেয়। সেই টাকা নাকি পাকিস্তান উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে তালিবানদের সাহায্য করার জন্য ব্যবহার করে?

আর্মি তালিবানদের হাতে পর্যুদস্ত হলেও তারা এখনও “ভাল” আর “খারাপ” তালিবানদের মধ্যে তফাৎ করে। “ভাল” তালিবানেরা শুধু আমেরিকা, ন্যাটো ও ভারতীয়দের লক্ষ্য করে আক্রমণ চালায়, আর “খারাপ” তালিবানেরা পাকিস্তানের আর্মির বিরুদ্ধেও আক্রমণ চালিয়ে যায়। যখন আমেরিকানরা আফগানিস্তান থেকে চলে যাবে, এই “ভাল” তালিবানেরা তখন আফগানিস্তানের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কে সাহায্য করবে। জালালুদ্দিন হাক্কানি এরকমই এক “ভাল” তালিবান নেতা। আবার মৌলানা ফজলুল্লাহের মত নেতা হলেন “খারাপ” তালিবান কারণ এরা পাকিস্তান আর্মিকেও ছেড়ে কথা বলেন না। আর্মি সাধারণত এদের “ভারতের চর” আখ্যা দিয়ে প্রচার চালায়।

পাকিস্তান নিউক্লিয়ার স্টেট। এই নিউক্লিয়ার বোমা তালিবান বা আল কায়দার হাতে চলে যাবার সম্ভাবনা কতটা?

আমি বেশী চিন্তিত এই ভেবে যদি কোনোভাবে কিছু নিউক্লিয়ার বোমা তৈরীর অন্তর্বর্তী পদার্থ (সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম) তাদের হাতে চলে যায়। মজার কথা পশ্চিমের দেশগুলো আজকাল নিউক্লিয়ার অস্ত্র তৈরীতে ততটা মনযোগী নয়। নিউক্লিয়ার বোমা আজ আর ক্ষমতার মেরুকরণ করে না, কারণ সুস্থচিন্তার কোনো রাষ্ট্র কখনই এই বোমা ব্যবহার করতে পারবে না। এর ফলে আজকে নিউক্লিয়ার বোমা পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকেই সম্পূর্ণ দূর করা সম্ভব। জঙ্গীদের হাত থেকে বোমা বাঁচানোর এই একটা পথই খোলা আছে।

আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষার্থে ভারত কি করতে পারে?

ভারতের কোনোমতেই পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধে যাওয়া উচিত নয়। এমনকি যদি ভারত জেতেও, তাহলেও তাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বিশাল হবে। কোনো ছোটো হামলাও আঞ্চলিক স্বার্থবিরোধী হবে, কারণ এর ফলে জঙ্গীদের সাথে আর্মির আঁতাত আবারও মজবুত হবে। আর কোনো ছোটো হামলার প্রতিক্রিয়া অনেক বড় হয়ে দেখা দিতে পারে। পাকিস্তানে জঙ্গীঘাঁটি বন্ধ করে দেবার দাবী আমি সমর্থন জানাই, কিন্তু সেই কাজটা পাকিস্তানের নিজেরই করা উচিত। আঞ্চলিক ভারসাম্যের জন্য, পাকিস্তান ও ভারত, উভয় দেশেরই উচিত নিজের নিজের দেশ থেকে দক্ষিণপন্থী ও মৌলবাদী শক্তিকে কড়া হাতে উচ্ছেদ করা।

এই লড়াই-এর অন্তিম ফলাফল সম্পর্কে আপনার ভবিষ্যৎবাণী কি? পাকিস্তানে উগ্রবাদীরাই জিতবেন, না পশ্চিমারাই আর্মির সাহায্যে তাদের পরাজিত করতে সক্ষম হবেন?

সমস্যা খুবই গুরুতর কিন্তু সমাধান অসম্ভব কিছু নয়। গত এক দশকে আমেরিকার সাম্রাজবাদী নীতি ও ইরাক আক্রমণের ফলে জনমানসে আমেরিকা বিরোধী এক মনোভাব তৈরী হয়েছে যার ফলে যারাই আমেরিকার বিরোধিতা করছে তাদেরই তারা সমর্থন করতে পিছপা হচ্ছে না। পাকিস্তানীরা তালিবানদের সামাজিক ও আচার-আচরণগত নীতি সমর্থন করে না। অথচ তারা আমেরিকা-বিরোধী বলে গণসমর্থন পায়। আমি আশা রাখছি বারাক ওবামা ক্ষমতায় এলে আমেরিকা পাকিস্তানের যে ক্ষতি করেছে তার কিছু ক্ষতিপূরণ করবে। কিন্তু মূল কথা হল, পাকিস্তানীদের নিজেদেরই এই সমস্যা সমাধান করতে হবে, বুঝতে হবে কোনো সভ্য দেশ হিসাবে দাঁড়াতে গেলে এসব চলে না। পাকিস্তানকে পশ্চিমা সমর্থন কিছুটা গোপন রাখতে হবে হয়ত। একই ভাবে, পাকিস্তানকে আলাদা করে শাস্তি দিলে বা কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে তালিবান বা সমগোত্রীয়রা রাষ্ট্রের আরো বেশী ক্ষমতা দখল করে ফেলবে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এর চেয়ে বড় কোনো দুশ্চিন্তার কারণ নেই।


Follow

Get every new post delivered to your Inbox.